kalerkantho


গৃহকর্মী থেকে ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর ফাতেমা

৯ বছর বয়স থেকে গৃহকর্মীর কাজ করত ফাতেমা। বাল্যবিয়ের হাত থেকে বাঁচিয়ে তাকে প্রযুক্তিশিক্ষায় দক্ষ করে ‘আশার আলো পাঠশালা’। পাশে দাঁড়ায় বেসরকারি সংস্থা সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন (সিআরআই) ও মাইক্রোসফট। ফাতেমা এখন মাইক্রোসফটের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর। বিস্তারিত জানাচ্ছেন আব্দুল খালেক ফারুকআল-আমিন দেওয়ান

৩ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



গৃহকর্মী থেকে ব্র্যান্ড  অ্যাম্বাসাডর ফাতেমা

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার রামখানা ইউনিয়নের নাখারগঞ্জ গ্রামে ফাতেমার ঘর। দিনমজুর বাবার সংসার আর চলছিল না। মাত্র ৯ বছর বয়সে তাই ফাতেমাকে পাঠিয়ে দিলেন এক সচ্ছল বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজে। দুমুঠো খাবারের জন্য এ বাড়ি-সে বাড়ি কাজ করে এভাবেই কেটে গেছে ফাতেমার জীবনের দুটি বছর।

 

উঠ ছুঁড়ি তোর বিয়ে

হঠাৎ একদিন মা-বাবার তলব। বাড়িতে মা-বাবার সঙ্গে থাকতে পারার আনন্দে চোখে খুশির রং। সে রং ধূসর হতে সময় লাগেনি। বাড়িতে এসে দেখে তার বিয়ের আয়োজন করা হয়েছে, বরের বয়স ২৫।

ঠিক দিনক্ষণে বিয়ের পিঁড়িতে বসার আয়োজন।

রঙিন কাগজ ত্রিকোণ কেটে সুতায় বেঁধে ঘরের এ মাথা-ও মাথা, দরজায় হলুদ গাঁদা ফুলের দিকে তাকিয়ে ঝাপসা হয়ে আসে ফাতেমার চোখ, তাহলে কী আর কোনো আশার আলো নেই?

যেন সিনেমার কাহিনিকেও হার মানিয়ে ফাতেমার জীবনে আলো এসে হাজির হয়। বাল্যবিয়ে থেকে বিয়ের দিনেই ফাতেমাকে রক্ষা করে ‘আশার আলো পাঠশালা’। সুবিধাবঞ্চিত, গরিব ও ঝরেপড়া শিশুদের বিনা বেতনে শিক্ষা দেয় এই অলাভজনক প্রতিষ্ঠানটি।

বিয়ে বন্ধ করার পর আশার আলো ফাতেমার শিক্ষার দায়িত্ব নেয়। তাকে ভর্তি করা হয় চতুর্থ শ্রেণিতে। এরপর ফাতেমা আর পেছনে তাকায়নি। পিইসি পরীক্ষায় ভালো ফল করে, জেএসসিতে পায় জিপিএ ৫। এসএসসিও উতরে যায় ভালোভাবেই। এখন ফাতেমা রায়গঞ্জ ডিগ্রি কলেজের এইচএসসি প্রথম বর্ষে পড়ছে।

 

ফাতেমার পাশে আরো আলো

বেসরকারি সংগঠন সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন (সিআরআই) প্রতিবছর সৃজনশীল কাজ ও সমাজকর্মে যুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ‘ইয়াংবাংলা’ অ্যাওয়ার্ড দেয়। আশার আলো পাঠশালা সেই অ্যাওয়ার্ড পায়।

সিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক তন্ময় আহমেদ বলেন, ‘মাইক্রোসফটের সহায়তায় আশার আলো পাঠশালায় একটি ল্যাব স্থাপন করে দেওয়া হয়। এই ল্যাবের প্রশিক্ষক ফাতেমা বাল্যবিয়ের কবলমুক্ত কিশোরীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বনির্ভর করছে। তাই মাইক্রোসফট বাংলাদেশ ফাতেমাকে ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর নিযুক্ত করেছে।

আশার আলো পাঠশালার প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান কুমার বিশ্বজিৎ বর্মণ ফাতেমাকে নিয়ে গর্ব করে বলেন, জীবনযুদ্ধজয়ী দরিদ্র কিশোরীটিকে এমন সুযোগ দেওয়ার জন্য মাইক্রোসফট ও ইয়াংবাংলা ধন্যবাদ প্রাপ্য। তাদের সহযোগিতায় গ্রামের মেয়েটি যা অর্জন করছে, তা অনেক গ্রামকেই বদলে দিতে অনুপ্রেরণা জোগাবে।

 

নিজেই ছড়ায় আলো

বিয়ে ফাতেমার পিছু ছাড়েনি। পরিবারের চাপের মধ্যেও ফাতেমা হার মানেনি। কারণ তত দিনে সে স্বপ্ন দেখতে শিখে গেছে। তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার করে তার মতো আরো অনেকে ফাতেমার পাশে দাঁড়াতে কাজ করতে চায়।

অন্য যেসব কিশোরী বাল্যবিয়ের ঝুঁকিতে আছে ফাতেমা এখন তাদের ডিজিটাল দক্ষতার ওপর প্রশিক্ষণ দেয়। আশার আলো পাঠশালার যুবসমাজ উন্নয়ন সংস্থার আইটি স্কুলের সে প্রশিক্ষক।

ইয়াংবাংলা ও মাইক্রোসফটের সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠিত এই স্কুলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৫০।

 

কী বলছে ফাতেমা

ফাতেমাকে নিয়ে মাইক্রোসফট তাদের ওয়েবসাইটে একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে। সেখানে ফাতেমার স্মৃতিচারণা, ‘আমার সব আনন্দ মাটি হয়ে গেল যখন বুঝলাম আমাকে আসলে বিয়ের জন্য ডেকে পাঠানো হয়েছে। বিয়ের সব আয়োজন চূড়ান্ত। তবে ঠিক আগমুহূর্তে সেখানে গিয়ে হাজির হয় আশার আলো। বাল্যবিয়ের ছোবল থেকে আমাকে রক্ষা করে।’

‘নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে উপলব্ধি করেছি বাল্যবিয়ে একটি মেয়ের জীবনে বিপর্যয় ডেকে আনে। তাই আমার লক্ষ্য দরিদ্র ও বাল্যবিয়ের ঝুঁকিতে থাকাদের প্রযুক্তি শিক্ষায় শিক্ষিত করে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া’—বলছিলেন ফাতেমা।

ভিডিওটিতে মাইক্রোসফটের ভাষ্য, ‘বাংলাদেশের প্রায় ৫২ শতাংশ মেয়েরই ১৮ বছরের আগে বিয়ে হয়ে যায়। এই বাস্তবতার বাইরে ছিল না গৃহকর্মী ফাতেমা খাতুনের জীবন। কিন্তু প্রযুক্তির ছোঁয়ায় ফাতেমা এখন মাইক্রোসফটের অ্যাম্বাসাডর।’

 

পাশে কেন মাইক্রোসফট

‘উইন্ডোজ উইমেন ডিজিটাল লিটারেসি’ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রত্যন্ত এলাকার নারীদের প্রযুক্তিশিক্ষায় শিক্ষিত করছে মাইক্রোসফট। ইয়াংবাংলার সঙ্গে মিলে এরই মধ্যে ১০টি কম্পিউটার ল্যাব করেছে তারা।

চলতি বছর ৬৪টি জেলায় এই ল্যাব হবে। ল্যাবে পাঁচটি করে কম্পিউটার, একটা রাউটার, স্ক্যানার, কপিয়ার ও মডেম দিয়েছে মাইক্রোসফট।

‘‘আসলে এই উদ্যোগ ফাতেমার মতো মানুষদের স্বনির্ভর শিক্ষায় আলোকিত করতেই। তাই যখন ফাতেমার বাল্যবিয়ে ঠেকানোর কথা জানা গেল তখন আমরা তার পাশে দাঁড়ালাম। বাংলাদেশে এমন যত ফাতেমা আছে আমরা সবাইকে খুঁজে বের করব, পাশে দাঁড়াব। ফাতেমা এখন নিজেই প্রশিক্ষক। মাইক্রোসফটের বিভিন্ন প্রগ্রামে ফাতেমাকে আমন্ত্রণ করা হয় অন্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য। এখন তাকে ‘নেক্সট লেভেল ট্রেইনার’ করতে কাজ করছে মাইক্রোসফট।” বলছিলেন মাইক্রোসফট বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোনিয়া বশির কবির।



মন্তব্য