kalerkantho


এবারের কারখানাটি কম্পিউটার তৈরির

২০ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



এবারের কারখানাটি কম্পিউটার তৈরির

ওয়ালটনের কারখানায় কম্পিউটার উৎপাদনের প্রথম দিনের চিত্র। ছবি : লেখক

অক্টোবরে দেশে প্রথম হ্যান্ডসেট তৈরির কারখানা চালু করে চমক দেখায় ওয়ালটন। তিন মাস না পেরোতেই বড় পরিসরে কম্পিউটার তৈরির কারখানা চালু করে আবারও চমক দেখাল তারা। গাজীপুরে স্থাপিত এই কারখানার ভেতর-বাইরে দেখে এসেছেন আল-আমীন দেওয়ান

 

সকালের কুয়াশা তখনো কাটেনি। এর মধ্যেই আমরা কয়েকজন ছুটছি গাজীপুর। সেখানে দেশীয় প্রতিষ্ঠান ওয়ালটন কম্পিউটার কারখানা স্থাপন করেছে। আমরা যাচ্ছি কম্পিউটার সংযোজন-উৎপাদনের সেই মহাযজ্ঞ দেখতে। গাজীপুরের ওয়ালটন হাইটেক ও মাইক্রোটেক ইন্ডাস্ট্রিজ পার্কের গেটে পৌঁছেই প্রযুক্তি ব্যবসায় দেশীয় কম্পানিটির সাহসের তারিফ করছিলাম আমরা—‘একের পর এক উদ্যোগ, কত বিনিয়োগ!’

দেশের প্রথম হ্যান্ডসেট সংযোজন-উৎপাদন কারখানা স্থাপনের ইতিহাসও যে এই ওয়ালটনেরই। গত বছরের ৫ অক্টোবর সেই কারখানা উদ্বোধনের সাক্ষী ছিলাম আমিও। সেবার এই ইন্ডাস্ট্রিজ পার্কের খুব অল্পই দেখার সুযোগ হয়েছিল। এত বড় এলাকা আর এত উৎপাদন ইউনিট যে—শাটল কার, গলফ কার্টে করে পথের সময় বাঁচিয়ে নিলেও সব যজ্ঞ দেখা শেষ হবে না তিন দিনেও।

সেবার জেনেছিলাম, এই পার্কেই এইচএফসি গ্যাসমুক্ত ইন্টেলিজেন্ট ইনভার্টার প্রযুক্তির রেফ্রিজারেটর ইউনিট, অত্যাধুনিক কম্প্রেসর কারখানা, টিভি, মোটরসাইকেল, রিমোট কন্ট্রোল টেবিল ফ্যান, সিলিং ফ্যান, দেয়াল ফ্যান, রাইস কুকার, ব্লেন্ডার, ইলেকট্রিক সুইচ-সকেট, রিচার্জেবল ব্যাটারি, গ্যাস স্টোভ ও অসংখ্য হোম অ্যাপ্লায়েন্স এবং প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদন কারখানা রয়েছে।

প্রশাসনিক ভবনে খানিক বিশ্রাম শেষে গলফ কার্টে চেপে প্রায় দেড় কিলোমিটার পথ পেরিয়ে পৌঁছলাম কম্পিউটার কারখানার সামনে। মোবাইল তৈরির কারখানা দেখার অভিজ্ঞতা থেকে অনুমান করেছিলাম—এই কারখানাটিও বড়ই হবে। তবে আমাদের অনুমান পুরোপুরি ভুল। এ তো দেখছি বড় নয়, বিশাল! উড়োজাহাজের হ্যাঙ্গার বলে ভুল হয়!

জুতার ধুলা কাভার করা পলি অ্যাপ্রন পরে আমার ঢুকলাম কারখানার উৎপাদন এলাকায়। ঢোকার সময় এয়ার শাওয়ার টানেলে ঘাবড়ে গেল আমাদের কেউ কেউ। কনটেইনার চেম্বারের মতো কক্ষে কারখানার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে এমন ধুলাবালিসহ নানা উপাদান শরীরের উপরিভাগ থেকে সশব্দে ঝেড়ে দেয় এই শাওয়ার টানেল।

আমরা ঘুরতে থাকলাম বিভিন্ন ইউনিটে। একেকটি ইউনিটে কম্পিউটারের একেকটি অংশের কাজ চলছে। সবগুলোর সমন্বয় শেষে অবয়ব পাচ্ছে ডিভাইসগুলো। কারখানা ইউনিফর্ম-অ্যাপ্রনে সারিবদ্ধভাবে থাকা কর্মীরা নিজ নিজ ইউনিটে এই সংযোজনে ব্যস্ত।

একটি ইউনিটের কর্মীরা দানবীয় সব মেশিনপত্রে নিজেরাই বড় বোর্ড কেটেকুটে তাতে খুব সূক্ষ্ম কাজ করছেন। আসলে চলছে মাদারবোর্ড তৈরির সার্ফেস মাউন্টিং টেকনোলজি (এসএমটি) সিস্টেমের কাজ। 

এরপর গেলাম গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগে। সেখানে প্রকৌশলীরা ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি ও পরিকল্পনার কথা জানালেন। একে একে ডিজাইন ডেভেলপমেন্ট, মাননিয়ন্ত্রণ বিভাগ, টেস্টিং ল্যাব, প্রযুক্তিগত নিরাপত্তাব্যবস্থাসহ কম্পিউটার সংযোজন-উৎপাদনের পুরো সার্কেল দেখলাম আমরা।

 

কারখানার কিছু তথ্য-উপাত্ত

বাংলাদেশের বাজারের ব্যাপকতা ও ভবিষ্যৎ দেখে ওয়ালটন স্থানীয় উৎপাদনের প্রস্তুতিও নিতে শুরু করে ২০১৫ সালে।  ডেস্কটপ ও ল্যাপটপ কম্পিউটার তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে সে অনুযায়ী কারখানা গড়ে তুলতে থাকে, অনেকটা নীরবেই।

এদিকে দেশে কম্পিউটার উৎপাদনের শিল্প গড়ে ওঠার অপরিহার্য সুবিধা করে দেয় সরকার। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে সরকার স্থানীয়ভাবে কম্পিউটার সংযোজন ও উৎপাদনের জন্য যন্ত্রপাতি আমদানির ওপর বড় ধরনের ছাড় দেয়।

এ ক্ষেত্রে এসকেডি (পণ্যের কিছু পার্টস সংযোজিত অবস্থায় আমদানি করে সেগুলো স্থানীয় কারখানায় পুরোপুরি সংযোজন করাকে সেমি নক ডাউন বা এসকেডি বলে।) পদ্ধতির ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ এবং সিকেডি (পণ্যের সব পার্টসই অসংযোজিত বা আলাদা আলাদা অবস্থায় আমদানি করে স্থানীয়ভাবে পুরো পণ্যটিই সংযোজন করাকে কমপ্লিট নক ডাউন বা সিকেডি বলে।) পদ্ধতির ক্ষেত্রে ১ শতাংশ আমদানি শুল্ক নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এর আগে এ দুই ক্ষেত্রে শুল্ক ছিল ৩৭.০৭ শতাংশ।

সরকারের এই উদ্যোগই ছিল স্থানীয় উৎপাদকদের পথচলার মহাসড়ক। শুরুতে কিছু কম্পিউটার যন্ত্রাংশ তৈরি করলেও ওয়ালটন নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করে। লোকবল নিয়োগ, যন্ত্রপাতি আমদানিসহ কারখানা চালুর সব আয়োজন করতে থাকে। 

কারখানা : গাজীপুরের চন্দ্রায় ওয়ালটনের এই কম্পিউটার উৎপাদনের কারখানার আয়তন প্রায় তিন লাখ বর্গফুট। এখানে রয়েছে ল্যাপটপ ও ডেস্কটপের ডিজাইন  ডেভেলপ, গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগ, মাননিয়ন্ত্রণ বিভাগ ও টেস্টিং ল্যাব। উদ্যোক্তারা জানালেন, যন্ত্রপাতিগুলো আনা হয়েছে জার্মানি ও জাপান থেকে। দেশি-বিদেশি প্রকৌশলীসহ কারখানায় সব মিলিয়ে প্রায় এক হাজার কর্মী সম্পৃক্ত রয়েছেন।

কম্পিউটার উৎপাদন : প্রাথমিকভাবে প্রতি মাসে ৬০ হাজার ল্যাপটপ, ৩০ হাজার ডেস্কটপ ও ৩০ হাজার মনিটর উৎপাদন করা হবে।

বিনিয়োগ : প্রায় এক হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। ওয়ালটন বলছে, এটি প্রাথমিক, পর্যায়ক্রমে আরো বিনিয়োগ করা হবে ।

 

আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন

১৮ জানুয়ারি সকাল ১০টা। ওয়ালটন ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের ভেতরে তখন কুয়াশা কেটে গেছে। রোদ্দুরও জানান দিচ্ছে বাংলাদেশের তথ্য-প্রযুক্তি খাতের ইতিহাসের জন্য ঝলমলে হতে যাচ্ছে দিনটি।

ফিতা কেটে কারখানার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করলেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার ও তথ্য-প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ।

সঙ্গে ছিলেন ওয়ালটন হাইটেক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান এস এম শামসুল আলম, ওয়ালটন ডিজিটেক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান এস এম রেজাউল আলম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম মঞ্জুরুল আলম।

 

যা বলছে ওয়ালটন

বিদেশি ব্র্যান্ডের ডেস্কটপ ও ল্যাপটপের সমমানের পণ্য ক্রেতাদের কাছে অন্তত ২০ শতাংশ কম মূল্যে দিতে চায় ওয়ালটন। দেশীয় উৎপাদক প্রতিষ্ঠান হওয়ায় ক্রেতারা দ্রুত ও সেরা বিক্রয়োত্তর সেবা পাবেন। সহজ কিস্তিতে কেনার সুযোগও মিলবে—বলছিলেন ওয়ালটনের কম্পিউটার প্রকল্পের ইনচার্জ লিয়াকত আলী।

তিনি জানান, ওয়ালটনের কম্পিউটার বা ল্যাপটপ রপ্তানির বিষয়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আমাদের আলোচনা হচ্ছে। আসছে মার্চের মধ্যেই নেপালের সঙ্গে একটি চুক্তি হতে পারে।



মন্তব্য