kalerkantho


অনুগ্রহ নয়, সুযোগ

চতুর্থবারের মতো প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষায়িত চাকরি মেলার আয়োজন করে আইসিটি বিভাগ। নতুন বছরের প্রথম দিনে এই মেলা থেকে চাকরি পেয়েছেন শতাধিক প্রতিবন্ধী। এই মেলা থেকে চাকরি পেয়ে বদলে যাচ্ছে অনেক প্রতিবন্ধীর জীবন। বিস্তারিত জানাচ্ছেন ইমরান হোসেন মিলন

৬ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



অনুগ্রহ নয়, সুযোগ

কল সেন্টারে কাজ করছেন ইলিয়াস সরকার। ছবি : সংগৃহীত

ইলিয়াস সরকার। স্নাতক শেষ করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস বিভাগ থেকে। হাত অকেজো হলেও মনের জোর তাঁকে দমাতে পারেনি। কারো অনুগ্রহ না চেয়ে বরং সুযোগ চেয়েছেন নিজের যোগ্যতা প্রমাণের। সেই সুযোগ তিনি পান গত বছর (২০১৭) আইসিটি বিভাগের কম্পিউটার কাউন্সিল আয়োজিত ‘প্রতিবন্ধীদের জন্য চাকরি মেলা’ থেকে। এর আগে স্নাতক শেষ করে ঢাকায় এসে যোগাযোগ করেন সেন্টার ফর সার্ভিসেস অ্যান্ড ইনফরমেশন অন ডিস-এবিলিটিজ বা সিএসআইডিতে। এখান থেকেই খোঁজ পান মেলার। উপস্থিত হয়ে তাৎক্ষণিক সাক্ষাৎকার দিয়ে চাকরি পেয়ে যান কল সেন্টারে। মাই আউটসোর্সিং লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠানটিতে তিনি যোগ দেন গত বছরের জানুয়ারিতে। এই এক বছরে ইলিয়াস সরকারের জীবন অনেকটা বদলে গেছে। তিনি বলেন, ‘একসময় খুব হীনম্মন্যতায় ভুগতাম। আমাকে দিয়ে কোনো কাজ হবে কি না—এ শঙ্কায় থাকতাম। এই প্রতিষ্ঠানে যোগ দিয়েও প্রথম দিকে দ্বিধায় ছিলাম—কল সেন্টারের কাজ পারব কি না। তবে অল্প সময়েই দ্বিধা কাটিয়ে উঠতে পেরেছি। অনেকেই ভাবেন, কল সেন্টারে কোনো ক্যারিয়ার নেই। এটা ঠিক নয়, এখান থেকে অনেক দূরে যেতে পারব আমি।’

শুধু ইলিয়াস নন, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী খায়রুল ইসলামও কাজ করছেন মাই আউটসোর্সিং লিমিটেডে। অন্য দশজন কর্মীর মতো তিনিও সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা পান। সহকর্মীরাও খুব আন্তরিক বলে জানান তিনি।

আরেক কল সেন্টার ফিফোটেকের প্রধান নির্বাহী তৌহিদ হোসেন জানান, তাঁদের প্রতিষ্ঠানেও বেশ কয়েকজন প্রতিবন্ধী তরুণ-তরুণী কাজ করেন। অন্যদের চেয়ে এঁদের কাজ তিনি কোনোভাবেই আলাদা করতে পারেন না।

 

এবার চাকরি পেলেন ১৭৬ জন

২০১৮ সালের বিশেষায়িত চাকরি মেলা থেকে ১৭৬ জন বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তি অনস্পট সাক্ষাৎকার দিয়ে চাকরি পেয়েছেন। এ ছাড়া আরো ২১৫ জনকে সংক্ষিপ্ত তালিকায় রাখা হয়েছে। আর এই আয়োজনে সারা দেশ থেকে অংশ নেন ৪৮০ জন বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তি। শর্ট লিস্টে রাখা ২১৫ জনকে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ডাকবে বলে জানান বিসিসির ‘তথ্য-প্রযুক্তির মাধ্যমে নিউরো ডেভেলপমেন্টাল ডিস-অর্ডারসহ সব ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির ক্ষমতায়ন’ প্রকল্পের উপরিচালক মো. গোলাম রব্বানি।

 

চাকরি দিল যেসব প্রতিষ্ঠান

চতুর্থবারের মতো বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের জন্য আয়োজিত এই চাকরি মেলায় তথ্য-প্রযুক্তি খাতের সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান ছাড়াও অন্যান্য কিছু প্রতিষ্ঠান চাকরি দিয়েছে।

এবারের মেলায় বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) সদস্যভুক্ত প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কল সেন্টার অ্যান্ড আউটসোর্সিং (বাক্য), ডিজিকন, ফিফোটেক, সাইবার ক্যাফে ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন চাকরি দিয়েছে।

প্রযুক্তি খাতের প্রতিষ্ঠান ছাড়াও প্রতিবন্ধীদের চাকরি দিয়েছে দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ, নিট গার্মেন্ট শিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টারস অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ), কেবল অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশসহ (কোয়াব) ১৭টি প্রতিষ্ঠান।

 

নেওয়া হয়েছে প্রকল্প

বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি এবং তাঁদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মক্ষেত্রের উপযোগী করে তুলতে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে তথ্য-প্রযুক্তি বিভাগ। বিভাগটির অধীন বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। ‘তথ্য-প্রযুক্তির মাধ্যমে নিউরো ডেভেলপমেন্টাল ডিস-অর্ডারসহ সব ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির ক্ষমতায়ন’ শীর্ষক প্রকল্পটির মেয়াদ তিন বছর। প্রকল্পটির উপপরিচালক মো. গোলাম রব্বানি বলেন, জুলাই ২০১৭ থেকে ২০২০ সালের জুনের মধ্যে মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বিসিসি। এর অধীনে ১৪০ জন মাস্টার ট্রেইনার তৈরি, দুই হাজার ৮০০ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির প্রশিক্ষণ, সারা দেশে ডিস-এবিলিটি সম্পর্কিত ওরিয়েন্টেশন প্রশিক্ষণ হিসেবে ২১০ জন হেলথ অ্যানালাইড প্রফেশনাল, ৩০০ জন কমিউনিটি ডিস-এবিলিটি এক্সপার্ট এবং ৭০০ শিক্ষকের প্রশিক্ষণ দেবে বিসিসি।

 

তৈরি হচ্ছে জব পোর্টাল

গত সোমবার বিশেষায়িত ওই মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তথ্য-প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহেমদ জানান, বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের জন্য আলাদা একটি জব পোর্টাল তৈরি করা হবে। তিনি জানান, আইসিটি বিভাগের প্রকল্পের আওতায় নির্বাচিত তিন হাজার প্রতিবন্ধী ছাড়াও সারা দেশ থেকে এরই মধ্যে প্রায় ৮০ হাজার প্রতিবন্ধীর তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছে। যোগ্যতার ভিত্তিতে পোর্টালটিতে তাঁরা সিভি দিয়ে রাখতে পারবেন। আর আগ্রহী নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনমতো সেখান থেকে এমন বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের নিয়োগ দেবে। এই জব পোর্টালটি শুধু ওয়েব সংস্করণ নয়, মোবাইল সংস্করণ এবং অ্যাপেও থাকবে।

 

উদ্বোধন হয় দুটি অ্যাপ

বিশেষায়িত ওই চাকরি মেলায় দুটি মোবাইল অ্যাপ উদ্বোধন করেন তথ্য-প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহেমদ। এর একটি ‘বলতে চাই’ অ্যাপ। সিমেডের তৈরি অ্যাপটি (https://play.google.com/store/apps/details?id=com.aims.boltechai) আগেও তথ্য-প্রযুক্তি বিভাগ থেকে ইনোভেশন ফান্ড পেয়েছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ এই অ্যাপটি তাদের মনের ভাব প্রকাশের কাজ আরো সহজ করবে। বিশেষ করে প্রতিবন্ধী শিশুরা এই অ্যাপের মাধ্যমে অনেক সুবিধা পাবে।

এ ছাড়া সিএসআইডি ও আইসিটি ডিভিশনের যৌথ উদ্যোগে তৈরি অ্যাপ ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম। এই অ্যাপের মাধ্যমে বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তিরা নানা বিষয়ে জানতে ও শিখতে পারবেন। এটি অল্প সময়ের মধ্যেই অ্যানড্রয়েড অ্যাপ প্ল্যাটফর্ম প্লেস্টোরে পাওয়া যাবে।



মন্তব্য