kalerkantho


এসিএম-আইসিপিসি ২০১৭

ঢাকা পর্বে এরাই সেরা

বিশ্বজুড়ে শিক্ষার্থীদের কাছে সবচেয়ে মর্যাদার কম্পিউটার প্রগ্রামিং প্রতিযোগিতা ‘এসিএম-আইসিপিসি’। এর ঢাকা আঞ্চলিক পর্বে অংশ নেয় ১৫০টি দল। সেরা তিন দলের সাফল্যের কথা জানাচ্ছেন তুসিন আহম্মেদ

১৮ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



ঢাকা পর্বে এরাই সেরা

পুরস্কার নিচ্ছে ১০টি সমস্যার সমাধান করে চ্যাম্পিয়ন দল ‘বুয়েট ড্রাক্যারিস’। ছবি : সংগৃহীত

আগামী বছর এপ্রিলে চীনে বসবে এসিএম-আইসিপিসির চূড়ান্ত আসর। এই প্রতিযোগিতার জন্য বাংলাদেশ থেকে যোগ্য দল খুঁজে নিতে ঢাকায় ১০ ও ১১ নভেম্বর বসেছিল প্রতিযোগিতার ঢাকা অঞ্চল পর্ব।

ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকে (ইউএপি) অনুষ্ঠিত এ প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন ও প্রথম রানার আপসহ সেরা ১০টি দলের পাঁচটিই নিজেদের দখলে নিয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অর্জনও কম নয়, তিনটি স্থানে জায়গা করে নিয়েছে তারা। প্রতিযোগিতায় ১০টি সমস্যার সব কটির সমাধান করে চ্যাম্পিয়ন ও প্রথম রানার আপ হয়েছে বুয়েট শিক্ষার্থীদের দল ‘বুয়েট ড্রাক্যারিস’ ও ‘বুয়েট নেভারমাইন্ড’। ৯টি সমস্যা সমাধান করে তৃতীয় ও চতুর্থ হয়েছে যথাক্রমে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সাস্টথটিমএক্স’ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ডিইউ ডার্কস্ল্যায়ার্স’।

 

বুয়েট ড্রাক্যারিস

বুয়েটের প্রগ্রামিং দলে সুযোগ পাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। অনেকের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে দলে সুযোগ পেতে হয়। তাই চর্চায় থাকতে হয় অনেক দিন ধরে। বুয়েট ড্রাক্যারিসের তিন সদস্যকেই দীর্ঘ সময় হাঁটতে হয়েছে এই পথে।

যেমন—দলনেতা তন্ময় মল্লিক এখন বুয়েটের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী হলেও প্রগ্রামিংয়ে মজেছিলেন কলেজে পড়ার সময়ই। ইন্টারন্যাশনাল অলিম্পিক ইন ইনফরমেটিকসে (আইওআই) অংশ নেওয়ার জন্য নিয়মিত প্রগ্রামিং চর্চাও করতেন তখন। তবে এইচএসসি পরীক্ষার কারণে প্রগ্রামিং মাঝে কিছুদিন ছেদ পড়ে। অংশ নেওয়া হয়নি আর আইওআইতে। বুয়েটে ভর্তি হয়ে আবারও শুরু করেন। প্রথম বর্ষেই এশিয়া-প্যাসিফিক ইনফরমেটিকস অলিম্পিয়াডে অংশ নিয়ে জেতেন ব্রোঞ্জপদক। উৎসাহ পেয়ে বাড়িয়ে দেন চর্চা। এই দলের অন্য দুই সদস্য নাজমুর রশিদ নূর ও রিয়াজুল ইসলামের শুরুটা একটু পরে। এই দুজনও এখন চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। বুয়েটে ভর্তির পরপরই এসিএম-আইসিপিসি প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে শুরু করেন প্রগ্রামিং চর্চা। কারণ বুয়েটে চাইলেই দল গড়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ মেলে না। দল নির্বাচনের জন্য আগে ব্যক্তিগত প্রগ্রামিং প্রতিযোগিতা হয়। সেখান থেকে সেরা শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে দল গঠন করা হয়। এ বিষয়ে শিক্ষকরাও সহযোগিতা করেন। আর তাই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে বেশ কয়েক মাস ধরেই প্রগ্রামিং দক্ষতা বাড়াতে মনোযোগী হন তাঁরা। প্রতি সপ্তাহেই প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার পাশাপাশি বন্ধুদের সঙ্গে প্রগ্রামিংয়ের বিভিন্ন খুঁটিনাটি দিক নিয়ে আলোচনা করতেন। তাঁদের এ উদ্যোগে পাশে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অগ্রজ শিক্ষার্থীরা। সব মিলে এসেছে সার্থকতা। সেরা হয়েছে তাঁদের দল। প্রতিযোগিতার সময় পাঁচ ঘণ্টা হলেও সি++ প্রগ্রামিং ভাষার মাধ্যমে মাত্র সাড়ে চার ঘণ্টার মধ্যেই ১১টির মধ্যে ১০টি সমস্যার সমাধান করে দলটি। তন্ময় জানান, প্রগ্রামিংয়ের সঙ্গে একাডেমিক লেখাপড়ার খুব বেশি মিল নেই। একটিতে ভালো করতে হলে আরেকটিতে প্রভাব পড়বে—এটাই স্বাভাবিক। তবে দুটিতেই ভালো থাকতে হলে যন্ত্রের মতোই কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। যুক্তি ও লজিকের প্রগ্রামিংয়েই বেশি আনন্দ খুঁজে পান তিনি।

 

নেভারমাইন্ড

প্রতিযোগিতার চ্যাম্পিয়ন দলের মতোই সি++ প্রগ্রামিং ভাষার সাহায্যে একটু বেশি সময়ে ১১টির মধ্যে ১০টি সমাধান করে প্রথম রানার আপ হয়েছে বুয়েট নেভারমাইন্ড। দলের সদস্যরা হলেন কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের রিপন কুমার রায়, মাহাথির আহমেদ ও সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের আব্দুল্লাহ আল মুনিম। আব্দুল্লাহ আল মুনিম জানান, প্রতিযোগিতার পাঁচ থেকে ছয় মাস আগে থেকেই তাঁরা একসঙ্গে বসে বিভিন্ন প্রগ্রামিং সমস্যা সমাধান শুরু করেছিলেন। নিজেদের দক্ষতা বাড়াতে অনলাইন ও অফলাইনে অনেক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন দলের সদস্যরা। তবে এত ভালো অবস্থান পেয়েও কিছুটা মন খারাপ তাঁদের। কারণ প্রতিযোগিতার নিয়মের ফেরে চূড়ান্ত পর্বে যাওয়া হচ্ছে না তাঁদের। নিয়মে আছে এক প্রতিষ্ঠান থেকে একাধিক দল অংশ নিতে পারবে না চূড়ান্ত পর্বে। তাই ভাগ্যে শিকা ছিঁড়েছে দ্বিতীয় রানার আপ দল টিমএক্সের।

 

সাস্ট-টিমএক্স

১১টি সমস্যার মধ্যে ৯টির সমাধান করে প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় রানার আপ হয়েছে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দলটি। সদস্যরা হলেন নাজিম উদ্দিন, শাহরিয়ার মওদুদ আহমেদ খান ও কাজী নাইম। সবাই পড়ালেখা করছেন কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল নিয়ে। এসিএম-আইসিপিসি ২০১৭-র জন্য টিমএক্স এক বছর আগে থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করে। ১২ মাসকে দুই ভাগে ভাগ করে প্রস্তুতি চলে দলটির। প্রথম ছয় মাস সময় ব্যক্তিগত প্রগ্রামিং দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্র্যাকটিস কনটেস্ট, অ্যালগরিদম, ডাটা স্ট্রাকচার শিখতেন তাঁরা। পরের ছয় মাস দলগত দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য পরিশ্রম করেন। দলটির প্রগ্রামিং কোচ ছিলেন বিভাগের শিক্ষক সাইফুল সাইফ। দল নির্বাচন সম্পর্কে তিনি বলেন, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রগ্রামিং প্রতিযোগিতার আয়োজনের মাধ্যমে দলের সদস্যদের বাছাই করা হয়েছিল।

দলের সদস্য কাজী নাইম জানান, প্রগ্রামিংয়ের জন্য পড়ালেখায় তেমন ক্ষতি হয় না। কারণ একাডেমিক কাজের পরও প্রচুর সময় পাওয়া যায়, প্রগ্রামিংয়ে ভালো করার জন্য এ সময়টা যথেষ্ট। নতুন যাঁরা ভবিষ্যতে এসিএম-আইসিপিসি প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে চান, তাঁদের বেশি করে প্রগ্রামিং সমস্যা সমাধানের অনুশীলন করতে হবে।

 

একনজরে এই প্রতিযোগিতা

এসিএম-আইসিপিসি, পুরো নাম অ্যাসোসিয়েশন ফর কম্পিউটিং মেশিনারি-ইন্টারন্যাশনাল কলেজিয়েট প্রগ্রামিং কনটেস্ট। প্রতিযোগিতার ঢাকা পর্বের আয়োজন করেছিল এশিয়া প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয়। আর এ বিষয়ে সহযোগিতা করেছে তথ্য-প্রযুক্তি বিভাগ ও তথ্য-প্রযুক্তি বিভাগের অধীন বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি)। ঢাকা পর্বের এই প্রতিযোগিতায় বিজয়ী দুটি বা তার বেশি দল আগামী বছরের এপ্রিলে চীনে অনুষ্ঠেয় প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্বে (ওয়ার্ল্ড ফাইনালস) অংশ নিতে পারবে। আয়োজক সূত্রের তথ্য মতে, প্রতিযোগিতার নিয়মানুযায়ী একই বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি দল চূড়ান্ত পর্বে অংশ নিতে পারে না। আর এ কারণেই প্রথম রানার আপ হয়েও এসিএম-আইসিপিসির চূড়ান্ত পর্বে অংশ নিতে পারবে না বুয়েটের নেভারমাইন্ড দলটি। তাই  চ্যাম্পিয়ন ও দ্বিতীয় রানার আপ দল চূড়ান্ত পর্বে অংশ নেবে।


মন্তব্য