kalerkantho


নানা আয়োজনের প্রযুক্তি মেলা

গতকাল শেষ হলো তিন দিনের ‘আইসিটি এক্সপো’। ‘মেইক ইন বাংলাদেশ’ স্লোগানের এই প্রদর্শনীতে ডিজিটাল লাইফস্টাইল পণ্য প্রদর্শনের পাশাপাশি দেশে উৎপাদিত প্রযুক্তিপণ্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। সঙ্গে ছিল আরো কিছু আয়োজন। বিস্তারিত জানাচ্ছেন তুসিন আহম্মেদ

২১ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



নানা আয়োজনের প্রযুক্তি মেলা

ছিল গ্রামীণ আবহে প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রদর্শন। ছবি : তারেক আজিজ নিশক

প্রযুক্তি মেলার এই এক বৈশিষ্ট্য। পণ্যের গুণাগুণ বোঝাতে কথার ব্যবহার খুব একটা পছন্দ করেন না প্রযুক্তি ব্যবসায়ীরা।

তার বদলে আগ্রহী ক্রেতার হাতে তুলে দেন পণ্যের সব সুবিধাসহ একটি মূল্য তালিকা। প্রযুক্তিপণ্যের ক্রেতারাও অভ্যস্ত এ ব্যবস্থায়। গতকাল বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে শেষ হওয়া তিন দিনের আইসিটি এক্সপোও এর ব্যতিক্রম ছিল না।

মেলার দ্বিতীয় দিন বৃহস্পতিবার প্রবেশপথেই কথা হলো এমনই এক ক্রেতা সাইদ হাসান পার্থর সঙ্গে। এসেছেন রামপুরা থেকে। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। এ দর্শনার্থীর হাতে একগাদা ব্রশিওর। জানালেন, আজ মেলায় এসেছিলেন শুধু ল্যাপটপের ব্রশিওরগুলো সংগ্রহ করতে। সময়-সুযোগমতো বাসায় বসে নতুন পণ্যগুলো সম্পর্কে জানবেন।

এরপর সিদ্ধান্ত নিয়ে আগামী মাসের শুরুতে কিনবেন। পার্থর মতো অনেক দর্শক আইসিটি মেলা থেকে ফিরছিলেন ব্রশিওর হাতে। নতুন প্রযুক্তিপণ্যও কিনেছেন অনেকে।

 

জমজমাট তিন দিন

প্রদর্শনীর আহ্বায়ক ও বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির মহাসচিব সুব্রত সরকার জানান, এবারের প্রদর্শনী শুরু থেকেই ছিল জমজমাট। তবে শেষদিন শুক্রবার বৃষ্টির কারণে অনেক আগ্রহী দর্শক-ক্রেতা আসতে পারেননি। তবে মূল উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। হার্ডওয়্যার খাতে বাংলাদেশের সাফল্য ও অগ্রগতির তথ্য দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে দিতে ছিল তৃতীয়বারের মতো এ আয়োজন। এবারের স্লোগান ছিল ‘মেইক ইন বাংলাদেশ’। প্রদর্শনীতে স্থানীয় প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদন, উদ্ভাবন, ডিজিটাল লাইফস্টাইল, সেমিনার, আন্তর্জাতিক ক্রেতা-বিক্রেতা সম্পর্কোন্নয়নসহ মোট ১০টি স্বতন্ত্র জোন ছিল।

একই ছাদের নিচে ১৩২টি প্যাভিলিয়ন ও স্টলে প্রদর্শন করা হয়েছিল প্রযুক্তি খাতে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রকল্প, কর্মসূচি এবং উদ্যোগ। মিডিয়া পার্টনার হিসেবে ছিল কালের কণ্ঠ ও এটিএন বাংলা।

কথা হলো শ্যামলী থেকে আসা জাহিদ হাসানের সঙ্গে। জানালেন, তিনি এসেছেন দেশে তৈরি কী কী নতুন পণ্য এসেছে তা দেখার জন্য। সঙ্গে নতুন মডেলের সাউন্ড সিস্টেম ও গেইমিং মাদারবোর্ড দেখাই উদ্দেশ্য ছিল তাঁর।

সব ধরনের প্রযুক্তিপ্রেমীর কথা মাথায় রেখে পণ্য সাজিয়ে বসেছিল পণ্য বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো। ল্যাপটপ, গেইমিং কম্পিউটার, কি-বোর্ড, মাউস, সার্ভার ও নেটওয়ার্ক পণ্য, প্রিন্টার, স্মার্টফোন, ক্যামেরা, পাওয়ার ব্যাংক, ডেস্কটপ কম্পিউটার, ইউপিএসসহ বিভিন্ন পণ্য ছিল প্রদর্শন ও বিক্রির জন্য।

 

পেপাল-জুম সেবার উদ্বোধন

সব জল্পনা-কল্পনা আর অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে প্রদর্শনীর দ্বিতীয় দিন ফ্রিল্যান্সার কনফারেন্সে দেশে বৈদেশিক মুদ্রা স্থানান্তরের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম পেপাল-জুম সেবা চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়। উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য-প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়।

এ সময় তিনি বলেন, এত দিন ধরে প্রবাসীরা বিভিন্ন চ্যানেলে তাঁদের কষ্টার্জিত অর্থ দেশে পাঠাচ্ছেন। এতে যেমন পয়সা খরচ বেশি হচ্ছে, তেমনি শিকার হতে হচ্ছে বিড়ম্বনার।

পেপাল-জুম সেবা চালুর মাধ্যমে এখন থেকে তাঁরা সহজেই পেপালের অ্যাকাউন্ট থেকে বাংলাদেশে খুব কম সময়ে টাকা পাঠাতে পারবেন।

অনুষ্ঠানের সভাপতি জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রবাসীরা তাঁদের পেপাল অ্যাকাউন্ট থেকে সোনালী ব্যাংকের আটটি শাখার মাধ্যমে দেশে অর্থ পাঠাতে পারবেন। এটা আমাদের সফলতার প্রথম ধাপ।

 

ছিল মূল্যছাড় ও উপহার

প্রদর্শনীর পাশাপাশি এক্সপোতে ছিল মূল্যছাড়। তাই তো একটু কম দামে পছন্দের পণ্যটি পেতে এক্সপোতে ভিড় করেছেন অনেক ক্রেতা। গ্রাহক টানতে চেষ্টার কমতি ছিল না প্রতিষ্ঠানগুলো। প্রবেশমুখেই ছিল দেশি ব্র্যান্ড ওয়ালটনের প্যাভিলিয়ন। তারা ল্যাপটপ, স্মার্টফোন, টিভি, কি-বোর্ড, মাউস ও ফ্রিজ বিক্রি করছে।

ওয়ালটনের কম্পিউটার বিভাগের প্রকল্প ব্যবস্থাপক আবুল হাসনাত জানান, সর্বনিম্ন ১০ হাজার টাকার পণ্য কিনে নগদ অর্থছাড় পেয়েছেন ক্রেতারা। এ ছাড়া প্রতিদিন লটারির মাধ্যমে নির্বাচিত ক্রেতা পেয়েছেন সর্বোচ্চ লাখ টাকা নগদ অর্থ পুরস্কার।

মেলায় সুলভমূল্যে ল্যাপটপ বিক্রি করেছে আমেরিকান ব্র্যান্ড আই লাইফ। পরিচয়পত্র দেখিয়ে শিক্ষার্থীরা মূল্যছাড় পেয়েছেন। সঙ্গে উপহার হিসেবে ছিল স্মার্টঘড়ি, পলো শার্ট, ল্যাপটপ ব্যাগ ও কলম।

পান্ডা ইন্টারনেট সিকিউরিটি কেনা গেছে বাজার মূল্যের অর্ধেক দামে। সঙ্গে স্ক্র্যাচ কার্ড ঘষে বাইসাইকেলসহ বিভিন্ন উপহার জিতেছেন অনেকে ।

সনির ক্যামেরায় ছিল ১০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যছাড়। তাদের সাইবার শট, হ্যান্ডিক্যাম, অ্যাকশন ক্যাম, ডিএসএলআর, লেন্স, ৩৫ এমএম ভিডিও ক্যামেরা বিক্রি হয়েছে বেশি।

দেশের তৈরি প্রথম ন্যানো স্যাটেলাইট দেখা

জুলাই মাসে পৃথিবীর আকাশে উড়েছিল বাংলাদেশের তৈরি প্রথম ন্যানো স্যাটেলাইট ‘ব্র্যাক অন্বেষা’। এই ন্যানো স্যাটেলাইটের প্রোটোটাইপটি নিয়ে এক্সপোতে হাজির হয়েছিলেন এর কারিগররা—ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শিক্ষার্থী রায়হানা শামস, আবদুল্লাহ হিল কাফি ও মাইসুন ইবনে মনোয়ার।

আবদুল্লাহ হিল কাফি বলেন, ‘আমাদের তৈরি ন্যানো স্যাটেলাইটটি ভূ-পৃষ্ঠ থেকে ৪০০ কিলোমিটার ওপরে অবস্থান করছে। পৃথিবীর চারপাশে প্রদক্ষিণ করতে ৯০ মিনিটের মতো সময় নিচ্ছে এটি। দিনে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে চার থকে ছয়বার উড়ে যাচ্ছে। মহাকাশ বিষয় নিয়ে গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ করছে স্যাটেলাইটটি। আমরা এক্সপোতে আসা দর্শনার্থীদের ন্যানো স্যাটেলাইট সম্পর্কে এসব তথ্য জানাচ্ছি। দর্শনার্থীরা ব্র্যাক অন্বেষার প্রোটোটাইপটি হাতে ধরে পরখ করতে পেরেছেন।

 

ছিল একাধিক সেমিনার

এক্সপোর প্রথম দিনে অনুষ্ঠিত হয় সেমিনার ‘টেকনোলজি ট্রান্সফরমেশন ডিজিটাল বাংলাদেশ অ্যান্ড ফোরথ ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভল্যুশন’। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিলিঙ্গার ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রফেসর ড. মোখতার আব্দুলাহ।

দ্বিতীয় দিনে হাইটেক পার্কে বিনিয়োগ ও স্টার্টআপদের জন্য কী কী সুযোগ-সুবিধা বা সম্ভাবনা রয়েছে তা নিয়ে আলোচনাসভা হয়। মূল বক্তা ছিলেন হাইটেক পার্কের পরিচালক এ এন এম সফিকুল ইসলাম।

চাকরির ক্ষেত্রে প্রাযুক্তিক দক্ষতা বিষয়ে সেমিনার ‘এমপ্লোবিলিটি স্কিলস’ সেমিনারের প্রধান আলোচক ছিলেন ড্যাফোডিল গ্রুপের চেয়ারম্যান সবুর খান

এ ছাড়া বাণিজ্য সরলীকরণ এবং ই-ট্রেড বিষয়েও সেমিনার হয়েছে। এসব সেমিনারে দর্শকরা বিনা মূল্যে অংশ নিয়েছেন।

 

ছিল অনুষ্ঠানের মঞ্চ

প্রদর্শনী কেন্দ্রের শেষ প্রান্তে বসানো হয়েছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মঞ্চ। প্রদর্শনী ঘুরে প্রযুক্তিপণ্য দেখার পর দর্শনার্থীরা ভিড় জমিয়েছিল এ মঞ্চের সামনে। প্রতিদিন বিকেলে বিভিন্ন ব্যান্ডের শিল্পীরা আসর জমিয়েছেন। শেষদিন বাবার সঙ্গে মেলায় ঘুরতে আসা কিশোর আব্দুল্লাহ জানায়, এত দিন টিভিতে দেখলেও জীবনে প্রথম লাইভ ব্যান্ড শো দেখল সে। তাই খুশিমন নিয়েই ফিরে যাচ্ছে বাড়িতে।


মন্তব্য