kalerkantho


থাকছে না ওয়ারেন্টি সমস্যা!

৪ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



থাকছে না ওয়ারেন্টি সমস্যা!

দেশের বাজার থেকে খুশি মনে পণ্য কিনলেও পরে ভোগান্তির শিকার হন অনেকে। ছবি : এক্সপো মেকার

দেশে কম্পিউটারসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্যের বিক্রয়োত্তর সেবা নিয়ে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা নেই। এ খাতের প্রধান সংগঠন বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি (বিসিএস) ২০১৪ সালে একটি নীতিমালা তৈরি করলেও তা ক্রেতা ও ব্যবসায়ীবান্ধব না হওয়ায় বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। এবার তাই নতুন করে নীতিমালা তৈরির কাজে হাত দিয়েছে বিসিএস। ক্রেতা, ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে নীতিমালাটি কেমন হওয়া উচিত, তা জানার চেষ্টা করেছেন আল-আমীন দেওয়ান

 

দেশের সবচেয়ে বড় কম্পিউটার বাজার আগারগাঁওয়ের আইডিবি ভবনের বিসিএস কম্পিউটার সিটি থেকে দুই বছর আগে নামি ব্র্যান্ডের একটি ল্যাপটপ কেনেন ফ্রিল্যান্সার কুহেলি পারভীন। ওয়ারেন্টি পান এক বছরের। সেদিন রাতেই ফেইসবুকে চ্যাট করতে করতে প্রবাসী এক বন্ধুকে জানালেন নতুন ল্যাপটপ কেনার কথা। দাম ও ওয়ারেন্টির বিস্তারিত শুনে কুহেলিকে ঠকানো হয়েছে বলে জানালেন তাঁর প্রবাসী বন্ধু।

শুধু কুহেলি নন, দাম, ওয়ারেন্টি আর বিক্রয়োত্তর সেবা নিয়ে বিপাকে থাকেন বাংলাদেশের অধিকাংশ ক্রেতাই। দেশে যথাযথ ওয়ারেন্টি গাইডলাইন বা বিক্রয়োত্তর নীতিমালা নেই বলেই এমন সমস্যা।

 

ওয়ারেন্টি গাইডলাইন

বাংলাদেশের কম্পিউটার হার্ডওয়্যার ব্যবসার ইতিহাসে প্রথম ওয়ারেন্টি গাইডলাইন কার্যকরের ঘোষণা করা হয় ২০১৪ সালের ১ ডিসেম্বর। সেই সময়ের বিসিএস মহাসচিব নজরুল ইসলাম মিলন স্বাক্ষরিত নীতিমালাসংক্রান্ত এক অফিস বিজ্ঞপ্তিতে বিসিএসের সদস্যদের জানানো হয়, আমদানিকারক, পরিবেশক, সরবরাহকারী ও খুচরা ব্যবসায়ীরা ক্রেতাকে সর্বোচ্চ এক বছরের ওয়ারেন্টি প্রদান করতে পারবেন।

সেখানে অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে রয়েছে, এক বছরের বেশি হলে বিসিএসের অনুমোদন নিতে হবে এবং আমদানিকারক বা সরবরাহকারীর কাছ থেকে খুচরা বিক্রেতা ১৩ মাসের ওয়ারেন্টি পাবে।

কম্পিউটার আমদানিকারক, পরিবেশক, সরবরাহকারী, খুচরা ব্যবসায়ী—সব পর্যায়ের সঙ্গে বিসিএস কার্যনির্বাহী কমিটি আলোচনা করে নীতিমালাটি তৈরি করা হয় বলে দাবি করে বিসিএস। তবে ঘোষণার পর কয়েকটি শীর্ষ ব্র্যান্ড দাবি করে যে তাদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা না করেই নীতিমালাটি চূড়ান্ত করা হয়েছে। এটি বাস্তবসম্মত নয় বলেও তখন জানিয়েছিল তারা।

তাদের মতের প্রমাণও মিলেছে গত দুই বছরে। নীতিমালাটি ক্রেতা-বিক্রেতাবান্ধব না হওয়ায় বাস্তবায়ন করা যায়নি। তাই গত ২৬ জানুয়ারি ঢাকায় বিসিএস ইনোভেশন সেন্টারে সংগঠনের কার্যনির্বাহী কমিটি সারা দেশের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে বর্তমান গাইডলাইন পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়।

বিসিএস মহাসচিব ইঞ্জিনিয়ার সুব্রত সরকার জানান, বর্তমান কার্যনির্বাহী কমিটি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে কম্পিউটার ব্যবসার সমস্যা খুঁজে বের করে সেসব সমাধানের চেষ্টা করছে। এতে ক্রেতাদের কম্পিউটার পণ্য ক্রয়ে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসায়ীরা কিভাবে লাভবান হতে পারেন, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা চলছে। আগের নীতিমালায় ক্রেতা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে দৃশ্যমান দূরত্ব রয়েছে। ক্রেতা ও কম্পিউটার ব্যবসায়ীদের অনেক অভিযোগ আমরা পাই। তাই তিন মাসের মধ্যে নতুন ‘ওয়ারেন্টি নীতিমালা’ প্রণয়নে দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তিপণ্য পরিবেশক প্রতিষ্ঠান স্মার্ট টেকনোলজিসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহিরুল ইসলামকে বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সভাপতি আলী আশফাক বলেন, ওয়ারেন্টি নিয়ে স্পষ্ট গাইডলাইন না থাকায় কিছু বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হচ্ছে। এতে কেউ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত, আবার কেউ লাভবান হচ্ছে। দিনশেষে সেবা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে বাজারের সুনাম নষ্ট হচ্ছে। শৃঙ্খলা আনার জন্য নতুন গাইডলাইন তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই গাইডে ওয়ারেন্টির বিষয়টি পরিষ্কার করে দেওয়া হবে। সবাই জানবে কোথায় কী হবে, কী মিলবে। গাইডলাইনটি সবাই শ্রদ্ধা ও দায়িত্বের সঙ্গে মানার চেষ্টা করবে বলে আশা করছি।

জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘মাত্রই আমাকে দায়িত্বটি দেওয়া হয়েছে। তাই এখনই বিস্তারিত কিছু বলতে পারছি না। তবে গাইডলাইন গ্রাহক ও ব্যবসায়ীবান্ধব করার জন্যই আমাকে নির্বাচন করা হয়েছে। আমি সে কাজটিই করব। সবার সঙ্গে বসে সবদিক বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেব। তৈরির পর বিস্তারিত বিসিএস ওয়েবসাইটে দেওয়া হবে। ’

 

অন্য দেশে কেমন

প্রযুক্তিপণ্যের ওয়ারেন্টির ক্ষেত্রে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, নেপালসহ পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই ক্রেতাস্বার্থই প্রাধান্য পেয়ে থাকে। মূলত উৎপাদনের বিপণন নীতিতেই পণ্যের ওয়ারেন্টি দেওয়া-না দেওয়া নির্ভর করে। সেখানে দাম ও অন্যান্য বিষয় পর্যালোচনায় ক্রেতা পণ্য কিনে যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হন সেটি বিবেচনায় রাখা হয়। ক্রেতারা উৎপাদক ঘোষিত ওয়ারেন্টিই পেয়ে থাকেন। তবে ওসব দেশে উৎপাদক ঘোষিত ওয়ারেন্টি সুবিধা ক্রেতা ঠিকমতো পাচ্ছেন কি না তা ভোক্তা অধিকারে দেখা হয়।

এইচপি জানায়, তারা বিশ্বজুড়ে কনজিউমার সিরিজে বাইডিফল্ট এক বছর ও বিজনেস সিরিজে তিন বছর ওয়ারেন্টি দিয়ে থাকে। নেপালে আসুসের বিপণন পরিচালনা করেন বাংলাদেশের আল ফুয়াদ। তিনি জানান, সে দেশে কনজিউমারে দুই বছর, কমার্শিয়ালে তিন থেকে পাঁচ বছরও ওয়ারেন্টি রয়েছে আসুসের। তথ্য-প্রযুক্তিবিদ মোস্তাফা জব্বার জানান, পৃথিবীর কোথাও পণ্যের ওয়ারেন্টির সঙ্গে বিপণনকারী বা খুচরা বিক্রেতার ইচ্ছার সম্পর্ক নেই। সেখানে কোনো ট্রেড বডিরও ভূমিকা নেই। ওয়ারেন্টির বিষয়টি সম্পূর্ণ উৎপাদকের। ক্রেতা তাঁর ভোক্তা অধিকারে সেই ওয়ারেন্টি ঠিকঠাক পাচ্ছেন কি না তাই নিশ্চিত করা হয় সব জায়গায়।

ডেল জানায়, উৎপাদক হিসেবে তারা যে ওয়ারেন্টি ঠিক করে তাই পেয়ে থাকেন ক্রেতারা। সেখানে করপোরেটরা তাদের চাহিদা অনুযায়ী আর কনজিউমার সিরিজে দুই বছর ওয়ারেন্টি থাকে।

 

ওয়ারেন্টি নিয়ে ক্রেতার সুরক্ষার জায়গা কোথায়?

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ফিরোজ সরকার জানান, ভোক্তা অধিকার আইনে ৩৭ থেকে ৫৪—এই ধারাগুলোর মধ্যে যা যা পড়বে, সেখানে আমরা ব্যবস্থা নিতে পারি। কম্পিউটার পণ্যের ওয়ারেন্টির ক্ষেত্রে উৎপাদক প্রতিশ্রুত বা ঘোষিত ওয়ারেন্টি যদি ক্রেতা ঠিকমতো না পান, তাহলে ক্রেতা জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে অভিযোগ করতে পারেন। ক্রেতার অভিযোগ আমরা গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে থাকি।

 

কে কী চান

মোস্তাফা জব্বার

সাবেক সভাপতি, বিসিএস

ওয়ারেন্টি ক্রেতার অধিকার। তবে ওয়ারেন্টির দায়ভার বিক্রেতার নয়। দায়িত্বটি আসলে উৎপাদকের। পৃথিবীর কোথাও কোনো বিক্রেতা বা অন্য কেউ ঠিক করে না যে ওয়ারেন্টি কত বছর দেবে। আর যে প্রতিষ্ঠান বা উৎপাদক সারা পৃথিবীতে তিন বছর ওয়ারেন্টি দেয় তাকে বাংলাদেশে এক বছর ওয়ারেন্টি দিতে বা এর সময় নির্ধারণ করে চাপিয়ে দিই কিভাবে? এখানে কী কারণে ক্রেতাস্বার্থ ক্ষুণ্ন করা হবে? অন্য দেশে পণ্যটি যে দামে বিক্রি করেছে উৎপাদক, সেই একই দাম দিয়ে বাংলাদেশে ক্রেতা কেন দুই বছর ওয়ারেন্টি কম পাবেন?

 

আতিকুর রহমান

আবাসিক প্রধান, ডেল বাংলাদেশ

ডেল দুই ধরনের বিপণনে যায়। পরিবেশকের মাধ্যমে খুচরা বিক্রি ও সরাসরি প্রতিষ্ঠানে। এখানে ক্রেতার চাওয়াটাই প্রধান। সেই চাওয়া বা চাহিদা অনুয়ায়ী তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত ওয়ারেন্টি দেওয়া হয়। সাধারণত খুচরা বিক্রির ক্ষেত্রে কমপক্ষে দুই বছর আর প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে কমপক্ষে তিন বছর ওয়ারেন্টি পান ক্রেতা।

ক্রেতা চাইলে বাড়তি ওয়ারেন্টি কিনতেও পারেন। তবে পরামর্শ থাকে পণ্যটি কেনার সময়েই যেন তা কেনা হয়। এতে ক্রেতার লাভ বেশি, দাম কম পড়ে।

ওয়ারেন্টি গাইডলাইন তৈরির সময় বিষয়গুলো নজরে রাখতে হবে।

 

সালাউদ্দিন মোহাম্মদ আদেল

ব্যবসায় উন্নয়ন ব্যবস্থাপক, এইচপি বাংলাদেশ

ওয়ারেন্টি কোথাও দুই, কোথাও তিন বছর—এমনটা রাখা ঠিক নয়। এতে ক্রেতারা দ্বিধায় পড়তে পারেন। উৎপাদন পর্যায়ে নির্দিষ্ট সময়ের ওয়ারেন্টি নির্ধারণ করা থাকে। বাড়তি ওয়ারেন্টি ক্রেতার প্রয়োজনের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো ক্রেতার প্রয়োজন না থাকলেও তাঁকে তিন বছর ওয়ারেন্টি চাপিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। এতে ক্রেতা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

 

আল ফুয়াদ

কান্ট্রি প্রডাক্ট ম্যানেজার, আসুস

ওয়ারেন্টির বিষয়ে ক্রেতাদের স্বার্থ প্রাধান্য দেওয়া উচিত। কনজিউমারে দুই বছর, কমার্শিয়ালে তিন থেকে পাঁচ বছরও ওয়ারেন্টি রয়েছে আসুসের। এখন ম্যানুফ্যাকচারার কম্পানি যদি দুই থেকে তিন বছর ওয়ারেন্টি দেয়,

তাহলে তা থেকে ক্রেতাকে বঞ্চিত করা যায় না। ওয়ারেন্টি সময় বেশি হওয়া তো ক্রেতাস্বার্থই নিশ্চিত করে। কেউ যদি বেশি টাকা দিয়ে এক্সট্রা ওয়ারেন্টি কেনেন, তাহলে তা দিতে অসুবিধা কোথায়? বিষয়টি হতে পারে যে যেমন ওয়ারেন্টি বলছে তা ঠিকমতো দিচ্ছে কি না। ক্রেতারা ওয়ারেন্টি নিয়ে ভোগান্তির মধ্যে পড়ছেন কি না। ঘোষিত ওয়ারেন্টি সময়ে ক্রেতাকে সার্ভিস দেওয়াটাও গুরুত্বপূর্ণ।


মন্তব্য