kalerkantho


যুগ পেরিয়ে বাংলা উইকিপিডিয়া

সম্প্রতি ১২ বছর পূর্ণ হলো বাংলা উইকিপিডিয়ার। এর শুরু, পথচলা, বর্তমান অবস্থানসহ বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন বাংলা উইকিপিডিয়ার প্রশাসক নুরুন্নবী চৌধুরী

২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



যুগ পেরিয়ে বাংলা উইকিপিডিয়া

আগ্রাবাদ সরকারি কলোনি উচ্চ বিদ্যালয়ে বাংলা উইকিপিডিয়ার আয়োজন। ছবি : উইকিমিডিয়া বাংলাদেশ

উইকিমিডিয়া বাংলাদেশ

উইকিমিডিয়া বাংলাদেশ উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশনের অনুমোদিত শাখা। এটি বাংলাদেশে উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন শিক্ষামূলক প্রকল্পের প্রচার ও প্রসারের কাজ পরিচালনা করে।

উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান, যারা বিশ্বজুড়ে ওয়েবভিত্তিক বেশ কিছু সহযোগিতামূলক ও শিক্ষামূলক প্রকল্প পরিচালনা করে। উইকিপিডিয়া তার মধ্যে অন্যতম।

উইকিমিডিয়া বাংলাদেশ এবং এর বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারা যাবে প্রতিষ্ঠানটির মূল ওয়েবসাইট www.wikimedia.org.bd ঠিকানা থেকে। পাশাপাশি উইকিমিডিয়া বাংলাদেশের নানা তথ্যাদি ফেসবুক পেজে (www.facebook.com/wikimediabd) এবং টুইটারে (http://twitter.com/wikimediabd) জানা যাবে।

 

পৃথিবীর প্রতিটি মানুষই মেধাবী, প্রত্যেকেই কোনো না কোনো বিষয়ে পারদর্শী হয়ে থাকেন। পৃথিবীর সব মানুষের প্রচেষ্টায় এমন একটি জ্ঞানভাণ্ডার তৈরি করা সম্ভব, যেখানে প্রতিটি বিষয় সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে। এই মূলমন্ত্রের ওপর ভিত্তি করেই তৈরি করা হয়েছে উইকিপিডিয়া নামের বিশ্বকোষ। উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশন নামের একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান সার্বিকভাবে এ প্রকল্পটির তত্ত্বাবধানের কাজ করে থাকে। তবে এই বিশ্বকোষে নতুন তথ্য সংযোজন, সম্পাদনার মতো সব কাজ করে থাকেন উইকিপিডিয়া কমিউনিটির সদস্যরা এবং এই কাজগুলোর কোনোটিতেই উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করা হয় না।

অলাভজনক এ প্রতিষ্ঠান উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশন পরিচালিত উইকিপিডিয়া একটি ওয়েবভিত্তিক মুক্ত বিশ্বকোষ। অনেকের ছোট ছোট অবদানের মধ্য দিয়েই গড়ে উঠেছে জ্ঞানের এই সুবিশাল ভাণ্ডার, তাই এর নাম উইকিপিডিয়া। কী নেই এখানে? প্রিয় বইয়ের যাবতীয় তথ্য থেকে শুরু করে দাঁত ভেঙে দেওয়া কঠিন সব বিষয় সম্পর্কের তথ্য আছে এখানে। বিশ্বের ২৯৪টি ভাষায় চালু আছে জ্ঞানের এই সবচেয়ে আপডেটেড বিশ্বকোষ। বর্তমানে উইকিপিডিয়া পৃথিবীর ষষ্ঠ জনপ্রিয় ওয়েবসাইট, গড়ে প্রতি মাসে সারা বিশ্বে উইকিপিডিয়া দেখা হয় এক হাজার কোটিবার!

 

যাত্রা হলো শুরু

বাংলা উইকিপিডিয়া (http://bn.wikipedia.org) ২০০৪ সালের জানুয়ারি মাসে যাত্রা শুরু করে। সে সময়ে উইকিপিডিয়ার প্রতি বাংলাদেশের মানুষের আকর্ষণ ছিল অনেক কম। অল্পসংখ্যক শিক্ষার্থী ও ভিন্ন পেশার কিছু মানুষ নিজের প্রয়োজনে ইংরেজি উইকিপিডিয়া ব্যবহার করত। কিন্তু এটি দায়বদ্ধ ছিল না। সেটির পাশাপাশি বাংলায় অবদান রাখতে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা ছিল। বাংলা উইকিপিডিয়ার অন্যতম একজন অগ্রণী ড. রাগিব হাসান বলেন, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ইন্টারনেটে বাংলায় কোনো কিছু লেখা। বাংলা ইউনিকোড বেশির ভাগ অপারেটিং সিস্টেমে সমর্থন করত না, ইন্টারনেটে শুধু কয়েকটি ওয়েবসাইট বাংলা ইউনিকোড সমর্থন করত এবং এটি কনফিগার করতে ব্যবহারকারীদের অসুবিধা ভোগ করতে হতো। এ ছাড়া বাংলা ইউনিকোড দিয়ে কিছু লেখার ধারণা ছিল নতুন। শুরুতে বাংলায় একটি উইকিপিডিয়ার ধারণা আসলে কার্যকর ছিল না।

২০০৬ সালে সম্পূর্ণ দৃশ্যপট পরিবর্তন হয়ে যায়। সে সময় বাংলা ব্লগিং জগৎ ধীরে ধীরে বড় হচ্ছিল এবং অনেক মানুষ বাংলা কম্পিউটিংয়ে অভ্যস্ত হয়ে উঠছিল। ২০০৬ সালের ২৫ মার্চ দেশব্যাপী উইকিপিডিয়া জনপ্রিয় করতে বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্ক (বিডিওএসএন) একটি উইকি দল গঠন করে। লক্ষ্য ছিল উইকিপিডিয়ার মাধ্যমে বিশ্বে দেশের প্রতিনিধিত্ব করা এবং বাংলা ভাষায় একটি সম্পূর্ণ বিশ্বকোষ গড়ে তোলা।

বিডিওএসএনের সাধারণ সম্পাদক মুনির হাসান বলেন, ‘‘মুক্ত সফটওয়্যার চর্চার একটা বড় জায়গায় সবার অংশগ্রহণ বাড়াতে নিয়মিত সারা দেশে কাজ করে যাচ্ছে বিডিওএসএন। আর আমরা তাই ‘মুক্ত সফটওয়্যার ব্যবহার করুন, বাংলা উইকিপিডিয়া সমৃদ্ধ করুন’ স্লোগানে বাংলা উইকিপিডিয়া সম্প্রসারণের কাজটি শুরু থেকেই করে যাচ্ছি। ’’

সে সময় বাংলা উইকিপিডিয়ায় মাত্র ৫০০টি নিবন্ধ ছিল। কিন্তু ‘বিডিওএসএন উইকি দল’ একা ছিল না। তারা কিছু সংবাদপত্রের মাধ্যমে কথাগুলো ছড়িয়ে দিতে শুরু করে এবং একটি বাংলা উইকি মেইলিং লিস্ট পরিচালনা শুরু করে। এতে দেশ ও বিদেশের অনেক বাংলাভাষী এই গতিশীল প্রকল্পে যোগ দেয়। এর ফলস্বরূপ অক্টোবরের শেষে বাংলা উইকিপিডিয়া ১০ হাজার নিবন্ধের মাইলফলক স্পর্শ করে। দক্ষিণ এশীয় ভাষার উইকিপিডিয়ার মধ্যে বাংলা উইকিপিডিয়া প্রথম এই মাইলফলকে পৌঁছে এবং এর মধ্যে অনেক নিবন্ধে বাংলা ভাষা আন্দোলনের সক্রিয় অংশগ্রহণকারী ডা. রফিকুল ইসলামের ছবি দিয়ে চিত্রস্থ করা হয়, যিনি ভাষা আন্দোলনের সময় তোলা তাঁর সব ঐতিহাসিক আলোকচিত্র উইকিমিডিয়া কমন্সে দান করেছিলেন।

 

যুক্ত হলো ভারতের বাংলাভাষীরা

২০০৯ ও ২০১০ সালে পশ্চিমবঙ্গ, ভারতের বাংলাভাষীরা বাংলা উইকিপিডিয়ায় অবদান রাখা শুরু করে। একই সময় উইকিপিডিয়া ফাউন্ডেশন তাদের অপারেশন শুরু করে এবং বাংলায় শিক্ষামূলক বিষয়বস্তু প্রচার করতে অক্টোবর ২০১১ সালে উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশন বাংলাদেশে একটি স্থানীয় শাখা ‘উইকিমিডিয়া বাংলাদেশ’ অনুমোদন দেয়। বর্তমানে বাংলা উইকিপিডিয়ায় বিভিন্ন বিষয়ের ওপর ৪৮ হাজারেরও বেশি নিবন্ধ রয়েছে। এখন সারা দেশ থেকে মানুষ নিয়মিত কর্মশালার আয়োজন করে এবং সক্রিয় উইকিপিডিয়ানদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করে।

মূলত উইকিপিডিয়ায় নতুন নিবন্ধ সৃষ্টি, সম্প্রসারণ ও ছবিযোগ ইত্যাদি কাজ করে থাকে উইকিপিডিয়ানরা (উইকিপিডিয়ার স্বেচ্ছাসেবক)। তাদের অবদানের মধ্য দিয়েই গড়ে উঠেছে মুক্ত এবং সম্পূর্ণ অলাভজনক এই জ্ঞানের মাধ্যম। কিন্তু বাংলা উইকিপিডিয়ায় তুলনামূলকভাবে অবদানকারীর সংখ্যাটা বেশ কম। তাই এর নিবন্ধসংখ্যা কম। উল্লেখযোগ্য যেকোনো বিষয়, যা সম্পর্কে মানুষ জানতে চায় তথা বিশ্বকোষে থাকার যোগ্য, সে রকমই কোনো বিষয়ের ওপরে নতুন নিবন্ধ (যা ইতিমধ্যে তৈরি হয়নি) তৈরি করা যেতে পারে। এ ছাড়া চাইলে বর্তমান যেকোনো নিবন্ধকে সম্প্রসারণও করা যেতে পারে। এরই সঙ্গে যেখান থেকে তথ্যটা নেওয়া হয়েছে (কোনো সংবাদপত্র কিংবা গ্রন্থ), তাকে তথ্যসূত্র হিসেবে যোগ করতে হবে। এখানে নিজের তোলা খ্যাতনামা স্থাপনা, বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব ইত্যাদি ছবিও আপলোড করা যায়। বস্তুত উইকিপিডিয়ায় কাজ করার জন্য প্রয়োজন শুধু নিজের ইচ্ছা আর একাগ্রতা।

 

উইকিপিডিয়া জিরো প্রকল্প

২০১৩ সালের ১৩ নভেম্বর বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে উইকিপিডিয়া জিরো প্রকল্প চালু হয়। এর মাধ্যমে শীর্ষ সব মোবাইল সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বিনা খরচে উইকিপিডিয়া ব্যবহারের সুযোগ চালু করে। ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি উইকিপিডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা জিমি ওয়েলস বাংলা উইকিপিডিয়ার দশম বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে বাংলাদেশে আসেন। মূল বক্তব্যে জিমি বলেন, নিবন্ধের গভীরতা অনুসারে বাংলা উইকিপিডিয়ার গভীরতা বেশ ভালো। এ ছাড়া উল্লেখ করা যায় যে কলকাতা, ভারতের বাংলা উইকিপিডিয়ানরা অনুরূপ একটি ইভেন্টের আয়োজন করেছিল এবং উভয় ইভেন্টে উভয় পক্ষ থেকে উইকিপিডিয়ানরা অংশগ্রহণ করেছিল।

বর্তমানে বাংলা উইকিপিডিয়া সমৃদ্ধকরণে অনলাইন ও অফলাইনে নানা ধরনের কার্যক্রম নিয়মিত পরিচালিত হচ্ছে। যেমন ১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে দুই মাসব্যাপী অনলাইন নিবন্ধ প্রতিযোগিতা। এ ছাড়া শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে নানা পেশাজীবী মানুষের উইকিপিডিয়ার সঙ্গে যুক্ত করতে নানা ধরনের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। চলতি বছর নারীদের বাংলা উইকিপিডিয়া আরো বেশি যুক্ত করাসহ নানা ধরনের উদ্যোগও আছে, যা ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করা হবে।

বাংলা ভাষা আমাদের চেতনার সঙ্গে জড়িত। প্রিয় এই ভাষাকে জ্ঞানের মাধ্যম হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে উইকিপিডিয়া গুরুত্বপূর্ণ এক পদক্ষেপ হিসেবে কাজ করতে পারে। বাংলা ভাষাকে ইন্টারনেটে উন্মুক্ত বিশ্বকোষের মাধ্যমে তুলে ধরতে উইকিপিডিয়া থেকে তথ্য জেনে নেওয়ার পাশাপাশি এখানে অবদান রাখতে হবে আমাদের সবাইকেই। এভাবে সবার সম্মিলিত চেষ্টার ফলে হয়তো একদিন সারা বিশ্ব দেখবে আমাদের ভাষার নামের পাশে জ্বলজ্বল করছে সব ভাষার চেয়ে বেশি নিবন্ধ সংখ্যা। সব মিলিয়ে সবার অংশগ্রহণেই গড়ে উঠতে পারে সমৃদ্ধ একটি তথ্যভাণ্ডার।

 


মন্তব্য