kalerkantho


সামাজিক মাধ্যমে নিজেকে চেনাই

ফেইসবুক, টুইটার, লিংকডইনের মতো সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে পেশাগত জীবনে অনেক সুবিধা পাওয়া যায়। কোন কৌশলে সুবিধাগুলো নেওয়া যাবে, তা জানাচ্ছেন তুহিন মাহমুদ ফেইসবুক, টুইটার, লিংকডইনের মতো সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে পেশাগত জীবনে অনেক সুবিধা পাওয়া যায়। কোন কৌশলে সুবিধাগুলো নেওয়া যাবে, তা জানাচ্ছেন তুহিন মাহমুদ

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



সামাজিক মাধ্যমে নিজেকে চেনাই

মডেল: ঐশী, জ্যোতি, নজরুল। ছবি: তারেক আজিজ নিশক

লিংকডইন

লিংকডইন (www.linkedin.com) মূলত পেশাজীবীদের জন্য বিশেষায়িত সাইট। এখানে ব্যবহারকারীর জীবনবৃত্তান্ত উপস্থাপন করা যায়।

চাকরিদাতারা লিংকডইন প্রোফাইলকে বেশ গুরুত্ব দেন। ইন্টারভিউ নেওয়ার আগে প্রার্থীর সম্পর্কে জানতে তার লিংকডইন প্রোফাইলে ঢুঁ মারেন অনেকে।

লিংকডইন যেভাবে কাজ করে : প্রার্থী সম্পর্কে আগেভাগে জানা থাকলে নিয়োগদাতার সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হয়। এতে প্রার্থীর দক্ষতা সম্পর্কে যেমন জানা যায়, তেমনি ইন্টারভিউ বোর্ডেও সঠিক প্রশ্ন করা যায়। সাইটটির বাম দিকে মানুষ, চাকরি, কম্পানি ইত্যাদি পছন্দ করে দেওয়া যাবে। তারপর ব্যবহারকারী তাঁর পছন্দের চাকরির জন্য কি-ওয়ার্ড প্রবেশ করিয়ে সার্চ করতে পারেন। ধরুন, লিংকডইনে সার্চ করে কালের কণ্ঠে লোক নেওয়া হচ্ছে—এমন ফলাফল পেলেন। এখন আপনি ওই চাকরির বিস্তারিত জানার সঙ্গে কালের কণ্ঠে কোন বিভাগে লোক নেওয়া হচ্ছে, তা দেখতে পারবেন। অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান একই ধরনের পদে লোক নিচ্ছে কি না তাও দেখা যাবে।

দেখা যাবে ব্যবহারকারীর পরিচিতদের কে, কিভাবে যুক্ত আছে তাও। পরিচিত কেউ থাকলে তার রেফারেন্স ব্যবহারের সুবিধা পাওয়া যাবে। ব্যবহারকারী তাঁর প্রোফাইলে কোথাও সেমিনারে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছেন, সম্মেলনে বক্তৃতা দিয়েছেন, ওয়ার্কশপ করেছেন কিংবা এ ধরনের আরো বিষয় তথ্য ও ছবিসহ অভিজ্ঞতার তালিকায় তুলে ধরতে পারেন।

লিংকডইন গ্রুপ : এক কোটি ৩০ লাখেরও বেশি লিংকডইন গ্রুপ রয়েছে। এগুলোতে যুক্ত হয়ে আলোচনায় অংশ নিয়ে নিজের গুরুত্ব প্রমাণ করতে পারেন। গ্রুপে শেয়ার হওয়া লেখা, ভিডিও বা দরকারি যেকোনো কিছু দেখতে পারেন, পড়তে পারেন। শেয়ার করতে পারেন নিজের চিন্তা, দর্শন ও অভিজ্ঞতা। অন্যদের প্রশ্নও করতে পারেন। ফেইসবুকের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্টের মতো লিংকডইনে অন্য ব্যবহারকারীদের কানেক্ট রিকোয়েস্ট পাঠানো যায়। ফলে অন্য প্রফেশনালদের সঙ্গে সংযুক্ত থাকা যায়। যোগাযোগ রক্ষার্থে মেসেজ পাঠানো যায়। এভাবে ব্যবহারকারীর যোগাযোগ বাড়তে থাকে। ব্যবহারকারী অন্যদের কাছ থেকে রিকমেন্ডেশন নিয়ে নিজের প্রোফাইল সমৃদ্ধ করতে পারেন। লিংকডইনের আরেক সুবিধা হচ্ছে নেটওয়ার্কিং ই-মেইল। লিংকডইন প্রিমিয়াম অ্যাকাউন্টে আপগ্রেড করলে প্রতিবছর ১০টি পর্যন্ত নেটওয়ার্ক ই-মেইল করা যায়।

প্রোফাইল : লিংকডইন প্রোফাইল হচ্ছে ব্যবহারকারীর অনলাইন পরিচিতি। তাই সাধারণ সিভি বানিয়ে দিলেই চলবে না; বরং এটাকে সঠিকভাবে সাজিয়ে তুলতে হবে, যাতে ব্যবহারকারীর পেশাদারির বিষয়টি অন্যদের কাছে বিশেষ করে চাকরিদাতার কাছে পরিষ্কার হয়।

লিংকডইন অ্যাকাউন্টে নিজের ছবি ব্যবহার করতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে, যাতে মাথা ও মুখ সোজা থাকে। মডেলিং বা সেলফির মতো কোনো ছবি না দেওয়া ভালো। পশু-পাখি, ঝরনা, ফুল এসবের ছবি দিলে আপনার সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হবে। ব্যবহারকারী যেহেতু চাকরিপ্রত্যাশী, তাই ছবিটি যেন নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

লিংকডইন উন্নত মানের পেশাদার প্ল্যাটফর্ম। পেশাদার কর্মী খুঁজতে চাকরিদাতারা সাইটটিতে সার্চ করে থাকেন। তাই নিজেকে সার্চে তুলে আনতে এদিকে নজর দেওয়ার বিকল্প নেই। লিংকডইনে ১২০ অক্ষরের মধ্যে শিরোনামে নিজেকে প্রকাশ করতে হবে। শিরোনাম এমনভাবে দিতে হবে, যাতে ব্যবহারকারী যে বিষয়ে অভিজ্ঞ সেটি লিখে সার্চ করলে পাওয়া যায়। উদাহরণ হিসেবে এভাবে লেখা যেতে পারে : ‘Recruiter, HR, Talent Management Expert’; অথবা ‘Brand Marketing, PR, Communications Professional’.

ব্যবহারকারী তার সম্পর্কে ইউনিক কিছু কথা দিয়ে সাজাতে পারেন এ বিভাগ। সংক্ষেপে যুক্ত করতে পারেন অভিজ্ঞতা। নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে ইনফোগ্রাফিকস কিংবা ছবি যুক্ত করতে পারেন। মনে রাখতে হবে, কেউ সার্চ করে পাওয়ার পর তার চোখ এখানে পড়বে। তখন তিনি এটি পড়তে শুরু করবেন। সে জন্য খুব কম সময়ের মধ্যে পাঠককে আকৃষ্ট করার মতো কিছু যুক্ত করতে হবে। এখানে আকৃষ্ট হলে চাকরিদাতা প্রোফাইলের বাকি সেকশনগুলোতে যেতে আগ্রহী হবেন। মনে রাখতে হবে, এ সেকশনে যদি পাঠকের মধ্যে বিরক্তি আসে, তাহলে তিনি অন্য প্রোফাইলে চলে যাবেন। সে কারণে এখানে ব্যবহারকারীকে সৃজনশীল, নির্ভরযোগ্য এবং আত্মবিশ্বাসী করে তুলে ধরতে হবে।

এখানে অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে হবে। সিভিতে যা আছে সেগুলোই গুছিয়ে উপস্থাপন করতে হবে। কোন কাজে পারদর্শী উল্লেখ করতে হবে। কাজের ক্ষেত্র, পদবি, চাকরির বর্ণনা, কাজের সময়সীমা তুলে ধরতে হবে। সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশনের (সার্চে সহজেই ওপরে উঠে আসার উপায়) জন্য এ বিভাগে অনেকগুলো কি-ওয়ার্ড যুক্ত করা প্রয়োজন। প্রতিটি সেকশনে কিওয়ার্ডের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। যেমন—কেউ যদি অ্যানড্রয়েড ডেভেলপার হন, সে ক্ষেত্রে ডেভেলপিংয়ের কোন ক্ষেত্রে দখল বেশি সেগুলো তুলে ধরতে হবে।

একটি পরিপূর্ণ প্রোফাইল সার্চে ওপরের দিকে উঠে আসার সম্ভাবনা ৪০ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়। প্রোফাইল সম্পূর্ণ করতে নিজের প্রোফাইলে নিজের ছবি, সঠিকভাবে কাজের ক্ষেত্র, অফিস ও নিজের ঠিকানা দেওয়া এবং সেগুলো নিয়মিত আপডেট রাখা, আগের কাজের অন্তত দুটি ক্ষেত্র যুক্ত করা, নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা সঠিকভাবে তুলে ধরা, অন্তত তিনটি কাজের দক্ষতা তুলে ধরা ও অন্তত ৫০টির বেশি কানেকশন থাকতে হবে।

এসব ধাপে অনুসরণ করে ব্যবহারকারী তৈরি করতে পারেন নিজের চমৎকার একটি প্রোফাইল। গোছানো ও সম্পূর্ণ একটি প্রোফাইল ব্যবহারকারীকে এনে দিতে পারে দারুণ একটি ভবিষ্যৎ।

 

ফেইসবুক

চাকরি খোঁজা কিংবা কর্মী খেঁজাার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে এখন ফেইসবুকও ব্যবহার হচ্ছে। বছর দুয়েক আগেই সোশ্যাল রিক্রুট সার্ভে জানায়, বর্তমানে ৬৬ শতাংশ নিয়োগ ঘটেছে ফেইসবুকের মাধ্যমে। তাই আপনি যদি চাকরি খুঁজতে থাকেন, তাহলে ফেইসবুককে ব্যবহার করতে পারেন।

প্রোফাইল : গুগল বা অন্য সার্চ ইঞ্জিনে গিয়ে নিজের নাম সার্চ দিন। সার্চের পর প্রথম পেইজে যে ফলাফল আসবে নোট করে নিন। এ ক্ষেত্রে এমন লিংক আসবে যেখানে আপনার নাম রয়েছে। এখানে ফেইসবুক প্রোফাইলের ক্ষেত্রে যে লিংকটি আসবে তাতে ক্লিক করুন। ফেইসবুকে আপনার পোস্টটি যদি আপডেট দেখায়, তাহলে তা পাবলিক পোস্ট হিসেবে আপডেট করা আছে। অর্থাৎ এটা সবাই দেখবে এবং কমেন্ট করতে পারবে। এখানে ব্যক্তিগত বিষয় ছাড়া অন্যান্য পোস্ট যেন সবাই দেখতে পায় সে অপশন দিয়ে রাখুন।

ফেইসবুক ঘন ঘন প্রাইভেসি সেটিং বদলায়। যেকোনো মানুষ আপনাকে যদি ফেইসবুকে ই-মেইল বা ফোন নম্বর দিয়ে খুঁজে পেতে চান, তবে আপনার প্রাইভেসি সেটিংসয়ের Who can see my stuff’, ‘Who can contact me’ এবং ‘Who can look me up’ অংশে অপশন দিতে হবে। চাকরিদাতারা যেন আপনাকে সহজে খুঁজে পান তার ব্যবস্থা রাখতে হবে।

যদি ফেইসবুকের মাধ্যমে চাকরিদাতাদের নজরে পড়তে চান, তবে প্রোফাইলে আগের অভিজ্ঞতার তথ্য জুড়ে দিন। ‘অ্যাবাউট’ অংশে গিয়ে দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ইত্যাদি তথ্য যুক্ত করুন।

গ্রুপে চাকরি খোঁজা : ফেইসবুক চাকরির বিজ্ঞাপনদাতা সংস্থা নয়। তবে বিভিন্ন গ্রুপ রয়েছে যেখানে চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মী চেয়ে থাকে। এসব গ্রুপে যুক্ত থাকুন।

 

টুইটার

টুইটারে সাধারণত নিয়োগকর্তারা দেখেন আবেদনকারী কোন ব্র্যান্ডের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত কিংবা আগ্রহী। এ ছাড়া আবেদনকারীর করা বিভিন্ন টুইট দেখে রাজনৈতিক মতাদর্শ ও কাজের বিষয়ে ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করেন। আপনি যে প্রতিষ্ঠানে চাকরির জন্য চেষ্টা করছেন সে প্রতিষ্ঠানের ও উচ্চপর্যায়ের কর্মীদের টুইট পর্যবেক্ষণ করলে জানা সম্ভব হবে ঠিক কোন ধরনের কাজ প্রয়োজন হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটির। এ ক্ষেত্রে সব বিষয় জেনে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে পারে চাকরিপ্রার্থীরা। টুইটারে সরাসরি আলাপের মাধ্যমে আপনি খুব সহজেই চাকরিদাতা, সিভি লেখক এমনকি অন্যান্য চাকরিপ্রার্থীর কাছ থেকেও পরামর্শ পেতে পারেন। টুইটারে রয়েছে বেশ কিছু ফ্রি চ্যাটের সুযোগ, যেমন #JobHuntChat, #HFChat ও #TChat| এগুলো আপনি খুব সহজেই অনুসরণ বা ফলো করতে পারবেন। এগুলোর মাধ্যমে আপনি মানবসমপদ বিভাগের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি, নিয়োগদাতাসহ বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে চাকরিসংক্রান্ত পরামর্শ পেতে পারেন।

 

যা করবেন না

১. কোনো ছবি বা পোস্ট দেওয়ার আগে আরেকবার ভাবুন এটি আপনার সম্পর্কে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রভাব ফেলবে কি না।

২. অনেকেই অফিস ফাঁকি দিয়ে আড্ডা দিচ্ছেন কিংবা বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন সেটি সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করেন। এতে আপনার সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা হবে।

৩. সহকর্মী, ক্লায়েন্ট, ম্যানেজার বা প্রতিষ্ঠান সমপর্কে বাজে মন্তব্য বা পোস্ট দেবেন না।

৪. অনলাইনে কাউকে হুমকি-ধমকি বা বিরক্ত করবেন না।


মন্তব্য