kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


‘দেশ ডাকলে অবশ্যই আসব’

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি ব্র্যান্ড আসুস। তাইওয়ানের এই পণ্যের প্রসার দেড় শতাধিক দেশে। প্রতিষ্ঠানটির সাব-রিজিওনাল ডিরেক্টর বাংলাদেশের মহিউদ্দিন খসরু। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের ১২টি দেশের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কথা বলেছেন মুহম্মদ খানের সঙ্গে

৮ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



‘দেশ ডাকলে অবশ্যই আসব’

মহিউদ্দিন খসরু

আসুসের আঞ্চলিক কেন্দ্রীয় কার্যালয় সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে। এখান থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর কার্যক্রম দেখভাল করা হয়।

তুরস্ক, গ্রিসসহ ইউরোপের কিছু অঞ্চলও এই কার্যালয়ের অধীনে। আঞ্চলিক প্রধান হিসেবে মহিউদ্দিন খসরুর ভিজিটিং কার্ডে দুবাই অফিসের ঠিকানা ও ফোন নম্বর দেওয়া। এখানেই তাঁর বসার কথা। কিন্তু দুবাইয়ের নম্বরে ফোন করে তাঁকে পাওয়া মুশকিল! মাসের অর্ধেক সময় তাঁকে থাকতে হয় ‘অন-ফ্লাইট’। সকালে দুবাই তো দুপুরে ইরান। পরদিন হয়তো বা বাহরাইনে বিজনেস মিটিং। তাই ক্রমাগত চেষ্টা চালিয়ে চতুর্থ দিন তাঁকে ধরা গেল ইরানে। তাঁকে পাওয়ার জন্য চার দিনের এই চেষ্টা বা অপেক্ষায় খারাপ লাগার বদলে বরং ভালো লাগা কাজ করল। আমাদের দেশের ছেলের কাঁধে এত বড় দায়িত্ব! তা-ও আসুসের মতো বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় এক প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানের! তাঁর সঙ্গে কথা বলার জন্য এটুকু অপেক্ষা তো করতেই হবে।

আমার অপেক্ষার গল্প শুনে খুব লজ্জা পেলেন মহিউদ্দিন খসরু! জানালেন তাঁর কাজের কথা, দায়িত্বের কথা।

 

এখন তো অনেক দায়িত্ব?

হ্যাঁ, অনেকই। দিন দিন দায়িত্ব বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব দেশে আসুসের ব্যবসা দেখতে হচ্ছে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হয়। বিলিয়ন ডলারের ব্যবসার দায়িত্ব যখন থাকে, একটু চাপ থাকবেই। তবে এই চাপটা উপভোগ করি। এখনো ক্লান্তি বোধ করি না!

 

আসুসের সঙ্গে কতটা পথ পেরোলেন?

শুরু তো ২০০৪ সালে। তখন অবশ্য সরাসরি আসুসের কর্মী ছিলাম না। দেশি প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ব্র্যান্ডের ব্যবসায় উন্নয়ন বিভাগের দায়িত্ব ছিল কাঁধে। বেশ কয়েকটি পণ্যের মধ্যে আসুসের ব্যবসার কিছু অংশ দেখতে হতো। এভাবে প্রায় চার বছর আসুসের পণ্য বাজারজাত নিয়ে কাজ করি। সরাসরি আসুসের কর্মী হওয়ার সুযোগ হয় ২০০৮-এ। কান্ট্রি প্রোডাক্ট ম্যানেজার হিসেবে সে বছর বাংলাদেশ ও নেপালের দায়িত্ব পাই। এভাবেই শুরু।

 

এরপর দেশ ছাড়লেন?

শুরুটা বেশ ভালো ছিল। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর এখানকার ব্যবসায় বেশ ভালো করল আসুস। আস্থা তৈরি হলো। পরের বছরই দায়িত্ব বাড়ল। যুক্ত হলো পাকিস্তান আর ভুটানও। এক বছরের ব্যবধানে দুই দেশ থেকে চার দেশের দায়িত্ব। এর মধ্যে পাকিস্তানের বাজার বেশ বড়। কাজের চাপ বাড়তে শুরু করল। পরে সাউথ এশিয়া ও সাউথইস্ট এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশে কাজ করতে হয়েছে।

 

এখন তো একসঙ্গে অনেক দেশের দায়িত্ব?

মধ্যপ্রাচ্যের বেশির ভাগ দেশই দেখতে হয়। আসলে দেশের দায়িত্বের পাশাপাশি এখন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের কাজের অংশও দেখতে হয়।

 

টয়োটা, স্যামসাংয়ের মতো জাপানি বা কোরীয় প্রতিষ্ঠানে দেখা যায় উচ্চপদে সাধারণত সে দেশের নাগরিকরাই থাকেন। আপনার ক্ষেত্রে এমন পদে আসা কিভাবে সম্ভব হলো?

আসলে জাপান, কোরিয়া, চীন বা তাইওয়ান—এরা কাছাকাছি সংস্কৃতির। এদের ব্যবসায়িক সংস্কৃতিও অনেক দেশের তুলনায় ভিন্ন। সংস্কৃতির পার্থক্য ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কায় থাকে এরা। এ জন্যই এমন চর্চা। তবে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসছে। কারো ওপর শতভাগ আস্থা রাখা যায়—এমনটা হলে দায়িত্ব পাচ্ছেন ভিনদেশি কেউ কেউ। সম্ভবত সে কারণেই আমাকে বড় দায়িত্ব দিতে তাদের বাধেনি।

 

আসুসে কি আপনি একাই বাংলাদেশি?

আসুসে এখন সব মিলে ১১ জন বাংলাদেশি কাজ করছেন। তাঁরা বিভিন্ন বিভাগে দায়িত্ব পালন করেন।

 

আসুসের আরঅ্যান্ডডি (গবেষণা উন্নয়ন কেন্দ্র) সেন্টার তো বিশ্বের অন্যতম সেরা? এখানে কি বাংলাদেশি কোনো প্রকৌশলী কাজ করেন?

আসুসের আরঅ্যান্ডডি সেন্টারে বিভিন্ন দেশের পাঁচ হাজারের বেশি কর্মী রয়েছে। তবে বাংলাদেশি কেউ নেই।

 

সমস্যাটা কি যোগ্যতায়?

এটা যোগ্যতার প্রশ্ন নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশিরা তাঁদের যোগ্যতার প্রমাণ রাখছেন। সিলিকন ভ্যালিতেও বাংলাদেশি প্রকৌশলীরা কাজ করছেন। যতটুকু জেনেছি, আসুসের আরঅ্যান্ডডি সেন্টারে বাংলাদেশিরা আবেদন করেন কম। এখানে আবেদন করলে সুযোগ না পাওয়ার কোনো কারণ নেই।

 

আবেদনের উপায়?

আসুসের ওয়েবসাইটে গেলেই যোগাযোগের সূত্র রয়েছে। এ ছাড়া লিংকডইনে আসুসের অফিশিয়াল পেইজ রয়েছে। সেখানেও আবেদন করা যায়।

 

আসুসের ল্যাপটপ আর জেনফোন আমাদের বেশি চেনা? আরো কী কী পণ্য তৈরি করে?

আসুসের পণ্যের তালিকা দীর্ঘ। কম্পিউটার ও স্মার্টফোনসংশ্লিষ্ট সব পণ্যই তৈরি করে আসুস। এখন রোবট তৈরিতেও হাত দিয়েছে। ‘জেনবো’ নামে গৃহস্থালি কাজে পটু রোবট তৈরি করে বেশ নাম কুড়িয়েছে।

 

বাংলাদেশের বাজারের দায়িত্ব তো ছেড়েছেন বেশ আগে। নিশ্চয়ই অগ্রগতির খোঁজ রাখেন?

গত সাত-আট বছরে বাংলাদেশের প্রযুক্তি বাজারের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। আসুসসহ বিশ্বের সব ব্র্যান্ডই বাংলাদেশের বাজার গুরুত্বসহকারে নিয়েছে। শুধু হার্ডওয়্যার নয়, সার্বিক প্রযুক্তিগত দিক থেকে বাংলাদেশের উন্নতি নিয়ে এখন উন্নত বিশ্বে আলোচনা হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা কিন্তু কেনিয়া সফরে গিয়ে তাদের বাংলাদেশকে অনুসরণ করতে বলেছেন। এটা খুবই গর্বের বিষয়।

বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে কম্পিউটার হার্ডওয়্যার পণ্য উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে ওয়ালটন দেশি ল্যাপটপ বাজারজাত শুরু করেছে।

 

আপনাকে যদি দেশে ফিরে এ ধরনের কোনো দায়িত্ব নিতে বলা হয়?

আমি দেশমুখী মানুষ। আমার পড়াশোনার একটা অংশ এবং চাকরিজীবনের শুরু কিন্তু সিঙ্গাপুরে। এরপর আমি দেশে ফিরে আসি। এখনো প্রতিবছর তিন থেকে চারবার স্বল্প সময়ের জন্য হলেও দেশে আসি। সুযোগ পেলেই দেশের প্রযুক্তিবাজার ঘুরে দেখি। কেউ চাইলে পরামর্শ দিই। তাই দেশ ডাকলে অবশ্যই আসব। প্রয়োজনে কিছুটা ত্যাগ স্বীকার করে হলেও।

 

আমরা সেদিনের প্রতীক্ষায় রইলাম। ভালো থাকবেন।

আপনিও ভালো থাকবেন। বাংলাদেশের সবাই খুব ভালো থাকবেন।


মন্তব্য