kalerkantho


মঙ্গলের পথে আমাদের রোবট

আসছে জুনে যুক্তরাষ্ট্রের সাউদার্ন উটাহর মার্স ডেজার্ট রিসার্চ স্টেশনে হবে বিশ্ব রোবটিকসের অন্যতম সেরা আসর ‘ইউনিভার্সিটি রোভার চ্যালেঞ্জ’। এখানে মঙ্গল গ্রহে রোবটকে আরো ভালোভাবে কাজে লাগানোর উপায় বের করবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা। এ বছর বাংলাদেশের তিনটি দল প্রতিযোগিতার জন্য নির্বাচিত হয়েছে। জানাচ্ছেন নাদিম মজিদ

২ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



মঙ্গলের পথে আমাদের রোবট

ইন্টারপ্লানেটর

মঙ্গলের অমসৃণ পৃষ্ঠতল। এবড়োখেবড়ো পথ। পৃথিবী থেকে পাঠানো রোবট নেমেছে মঙ্গলে। খুঁজতে শুরু করেছে পানির অস্তিত্ব, জীবাণু আছে কতটা, বসবাসের জন্য কেমন উপযোগী ইত্যাদি তথ্য। রোবটের পাঠানো তথ্য পেয়ে বিজ্ঞানীদের চোখে খুশির ঝিলিক। অদূর ভবিষ্যতেই মঙ্গলে যাবে পৃথিবীর মানুষ! আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এমন খবর আসে মাঝেমধ্যেই।

আরো পাক্কা খবর চাই। রোবটগুলো চাই আরো কার্যকর। এই লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থীদের যুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়। সেরা মেধাবীদের বেছে নিতে আয়োজন করা হয় ‘ইউনিভার্সিটি রোভার চ্যালেঞ্জ’। প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার জন্য এ বছর ১২টি দেশের ৬৩টি দল নিবন্ধন করে। মঙ্গলে চলাচলের উপযোগী রোবট তৈরি করে ভিডিও পাঠাতে সক্ষম হয় ৫৪টি দল। ভিডিও থেকে রোবটের কার্যকারিতা বিচার করে বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, মিসর, ভারত, পোল্যান্ড ও দক্ষিণ কোরিয়ার ৩০টি দল নির্বাচিত হয় ২২ মার্চ। এর মধ্যে বাংলাদেশেরই তিনটি—বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইন্টারপ্লানেটার, ইসলামী ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির (আইইউটি) মার্স রোভার ও এআইইউবির রোবটিক ক্রু।

রোভারের কাজ

প্রথমত, রোবটটি মঙ্গলের পৃষ্ঠতলে চলাচলের উপযোগী হতে হবে। দ্বিতীয়ত, মহাকাশচারীকে সহযোগিতা, যেমন—ক্রু আনা-নেওয়া, সুইচ বা কল অন-অফ করা। তৃতীয়ত, বিভিন্ন ধরনের বৈজ্ঞানিক গবেষণা, যেমন— মঙ্গলের মাটিতে পানি ও জীবাণু আছে কি না তা দেখা। চতুর্থত, মঙ্গলে থাকা ত্রুটিপূর্ণ বিভিন্ন যন্ত্র মেরামত, যেমন—একটি নিউক্লিয়ার প্লান্টের কোনো অংশ নষ্ট হয়ে পড়ে আছে, তার ভোল্টেজ অন-অফ করে চালু করা।

 

প্রতিযোগিতায় দুই পর্ব

প্রতিযোগিতার বাছাই পর্ব হবে ২ জুন। মঙ্গলের মাটির মতো করে এই পর্বে মাটি তৈরি করা হবে। এই পর্বে বিভিন্ন দলের রোবট চলাচল করতে পারছে কি না তা দেখা হবে। পারলে চূড়ান্ত পর্বে উঠে যাবে রোবট। ৩ ও ৪ জুন হবে পরবর্তী পর্ব। এই পর্বেও প্রতিযোগিতার গ্রাউন্ড তৈরি হবে মঙ্গলের মতো মাটি ও আবহাওয়া দিয়ে। ৩০টি দলের ১৫টি লড়বে চূড়ান্ত পর্বে। বাকি ১৫ দল ‘আন-অফিশিয়ালি’ নিজেদের মধ্যে লড়বে। এ লড়াই অনেকটা তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচের মতো। তাদের জয়-পরাজয় চূড়ান্ত পর্বে ওঠা দলকে প্রভাবিত করে না। প্রতিযোগিতায় প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় হওয়া দলের সদস্যদের প্রাইজ মানি, চূড়ান্ত পর্বে লড়া সবাইকে বিশেষ সার্টিফিকেট, বিভিন্ন ধরনের ডিভাইস পুরস্কার ও বড় কম্পানিগুলোতে ইন্টার্নশিপের অফার দেওয়া হয়ে থাকে। চূড়ান্ত পর্বে উঠতে না পারা দলের সদস্যদের অংশগ্রহণ সার্টিফিকেট দেওয়া হয়।

বিশ্ব রোবটিকসের সম্মানজনক এই প্রতিযোগিতায় ভালো করলে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মেলে। ভালো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মাস্টার্স করার সুযোগ হয়। বিশ্বের নামকরা প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুযোগ হয়।

 

দেশের তিন দল

ইন্টারপ্লানেটর, বুয়েট

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী খালেদ বিন মঈনুদ্দিনের নেতৃত্বে টিম ইন্টারপ্লানেটর দলের সদস্য ১১ জন। প্রকল্পটির পেছনে দলটি কাজ করছে সাত মাস ধরে। প্রথম চার মাস গেছে পরিকল্পনা আর নকশা করা নিয়ে। এ ধরনের রোবট বানাতে প্রচুর টাকা লাগে। খরচ কমানোর জন্য পাটুয়াটুলী, ধোলাইখাল ও নবাবগঞ্জের বিভিন্ন জায়গায় গেছে তারা। সেখানে রোবটের যেসব অংশ সহজে পাওয়া যায়, তা নথিবদ্ধ করেছে। সেগুলো মাথায় রেখে রোবটের নকশা করেছে। পরীক্ষা আর ক্লাসের পাশাপাশি বর্তমান রোবটটি বানাতে তাদের সময় লেগেছে দুই মাস। দলের সদস্য আবুল আল আরাবী বলে, ‘গত বছর ইউরোপিয়ান রোভার চ্যালেঞ্জে অংশ নিয়েছি। সেখানকার অনেকে বাংলাদেশের নামই শোনেনি। আমরাও দারুণ রোবট তৈরি করতে পারি দেখে অনেকে বিস্মিত হয়েছে। এবারের প্রতিযোগিতায় আমরা সেরা দশে থাকতে চাই। ’

দলের অন্য সদস্যরা হলো ফজলে এলাহী খান, ইরফান মোহাম্মদ আল হাসিব, আশরাফুল আলম, কুমার দীপায়ন তূর্য, নওয়াব মো. আমিনুল হক, শায়াক ইবনে ফারুকী, নবী বিন হোসাইন, সংকলন বড়ুয়া ও সাব্বির পারভেজ।

রোবটটি তৈরি করতে এ পর্যন্ত প্রায় এক লাখ টাকা খরচ হয়েছে। প্রতিযোগিতায় ভালো করতে হলে রোবটের মোটর, হুইল ও কয়েকটি সেন্সর বাইরে থেকে আনতে হবে। প্রতিযোগিতায় রোবটটিকে এক কিলোমিটার দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সে জন্য প্রয়োজন হবে আরো দুটি কমিউনিকেশন ডিভাইস। এসব দেশে পাওয়া যায় না। আমদানি করতে খরচ পড়বে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা। কমপক্ষে আট সদস্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এ প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে চায় টিম ইন্টারপ্লানেটর। এখন চলছে তারই জোগাড়যন্ত্র।

মার্স রোভার, আইইউটি

রায়হান ইসলামের নেতৃত্বে গাজীপুরের ইসলামী ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির আইইউটি মার্স রোভার দলের সদস্যসংখ্যা ২০।

মার্স রোভার বানানোর কাজ শুরু হয় অক্টোবরে। আইডিবি ভবন থেকে রোবটের বিভিন্ন অংশ কিনেছে। কয়েকটি অংশ আমদানি করেছে চীন থেকে। এর মধ্যেই খরচ হয়েছে দুই লাখ টাকা। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দেওয়া পকেটমানি ও কয়েকজন বড় ভাইয়ের দেওয়া সহযোগিতায় এ পর্যন্ত এসেছে।

প্রতিযোগিতায় ভালো করতে রোবটে ভালো মোটর ও সেন্সর প্রয়োজন, জানায় দলের সদস্য মির্জা মুনতাসির নিশাত। সে বলে, ‘গত বছর আমরা ইউরোপিয়ান রোভার চ্যালেঞ্জে গিয়েছিলাম। সেখানে অবস্থান ছিল ১৬তম। এবার চূড়ান্ত পর্বে লড়তে চাই। তাই রোবটে আরো ভালো মোটর ও সেন্সর ব্যবহার করতে হবে। এসব সেন্সর বিদেশ থেকে নিয়ে এসে কাস্টমাইজ করতে হবে। ’

দলের বাকি সদস্যরা হলো মিনহাজ-উস-সালেকীন, মুশফিকুর রহমান, উসামা ইসলাম, জীবন মাহমুদ হাসান, আবদুল্লাহ আল জোহা, ইন্তিসার নূর, মাহমুদুল আলম,  চৌধুরী সাদিদ আলম, আহমেদ ইউসুফ সানিন, কাজী ফাহিম ফয়সাল, ইশরাক হায়াত, ফাহরিয়ার আলম, তানভির ফাহাদ হক, আসিফ ইকবাল, সামি ইরফান, সাখাওয়াত হুসেইন, রায়হানুল ইসলাম ও সানিয়াত তাহসিন।

কমপক্ষে ১০ জন সদস্য নিয়ে প্রতিযোগিতায় যেতে চায় দলটি।

রোবটিক ক্রু, এআইইউবি

মাহফুজুর রহমানের নেতৃত্বে এআইইউবি রোবটিক ক্রুর সদস্যসংখ্যা ১৭। প্রকল্পটি নিয়ে এ দল কাজ শুরু করেছে গত এপ্রিলে। এরই মধ্যে কানাডা থেকে মোটর ও চীন থেকে মোটর ড্রাইভার আনা হয়েছে। বাকি যন্ত্র বাংলাদেশ থেকে সংগ্রহ করে রোবট বানিয়েছে।

এরই মধ্যে খরচ হয়েছে ছয় লাখ টাকা। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও নিজেদের অংশগ্রহণে এ পর্যন্ত এসেছে তারা। আরো ভালো করতে মোটর ও আরো কয়েকটি সেন্সর যুক্ত করতে হবে। দলনেতা মাহফুজুর রহমান বলে, ‘আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এটি আমাদের প্রথম প্রতিযোগিতা। আমরা ভালো করতে চাই। ইচ্ছা আছে দলের সবাইকে নিয়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নেব। ’

দলের বাকি সদস্যরা হলো আশিক সরকার, আবির হোসেন, ফারহান মামুন, চৌধুরী মিফতাহ মাহমুদ, নিসার সরকার, নাজিমউদ্দৌলা, জসিম উদ্দিন, সোহানুজ্জামান জিম, এইচ এম আতা-ই-রাব্বী, জিসান আহমেদ, শাবাব ইকবাল, মিনার মাহমুদ, সিফাত নূর অরণি, শশাঙ্ক কুমার প্রামাণিক, কামরুল হাসান ও মিজানুর রহমান।


মন্তব্য