kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সময়ের দাবি ‘ডট বাংলা’

মোস্তাফা জব্বার   

৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



সময়ের দাবি ‘ডট বাংলা’

অলংকরণ : দেওয়ান আতিকুর রহমান

ইন্টারনেটে একটি রাষ্ট্রের জাতীয় পরিচয়ের স্বীকৃতি হিসেবে কাজ করে ডোমেইন নেইম। যেমন ‘ডট ইউএস’ ডোমেইন নেইমের কোনো ওয়েবসাইটে ঢুকলে বোঝা যায় সেটি যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালিত।

ডট বাংলা তেমনি ইউনিকোড দিয়ে স্বীকৃত বাংলাদেশি ডোমেইন। এই ডোমেইনটির ব্যাখ্যায় উইকিপিডিয়া বলছে, ডট বাংলা হচ্ছে বাংলাদেশের জন্য একটি দ্বিতীয় ইন্টারনেট কান্ট্রি কোড টপ লেভেল ডোমেইন (সিসিটিএলডি)। এই ডোমেইন বাংলা ভাষায় ওয়েব ঠিকানার জন্য বোঝানো হয়। ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় এ ডোমেইনের মালিক। মন্ত্রণালয়ের পক্ষে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন কম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল) ডট বিডি ডোমেইন ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করে।

 

হতাশার খবর

খবরটি অনেক পুরনো। বাংলাদেশ রাষ্ট্র ইন্টারনেটের ডোমেইন নেইম হিসেবে দুটি শব্দ ব্যবহারের অনুমতি পেয়েছিল। একটি ‘ডট বিডি’ (.নফ), যা এখন আমরা ব্যবহার করতে পারি। আরেকটি ‘ডট বাংলা’। ডট বিডি আমরা রোমান হরফে ব্যবহার করি। রোমান হরফে ডোমেইন নেইম লিখে তার সঙ্গে নিজের দেশের ডোমেইন নেইমের পরিচিতি হিসেবে ডট বিডি ব্যবহার করতে পারি। যেসব দেশের ভাষায় রোমান হরফ ব্যবহূত হয়, তাদের জন্য এটি কোনো সংকট নয়। কিন্তু এই ব্যবস্থায় বাংলা ভাষায় বাংলা হরফে ডোমেইন নেইম ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ডট বাংলা দিয়ে আমরা ইন্টারনেটের নামে আমাদের রাষ্ট্রভাষা বাংলায় বা দুনিয়ার অন্য কোনো ভাষায় বাংলা হরফে ব্যবহার করতে পারব।

 

আছে অবহেলা

২০১২ সালে বাংলাদেশ ডট বাংলা ব্যবহারের আবেদন করে। সে সময়ে ভারত সরকারও পশ্চিমবঙ্গের জন্য ডট বাংলা ডোমেইন নেইম দাবি করে আবেদন করেছিল। বাংলা ভাষাভাষী হিসেবে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যও ডট বাংলা পেতে পারত। পশ্চিমবঙ্গের দাবি থাকার পরও বাংলাদেশকে ডট বাংলা ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়। সংগত কারণেই প্রত্যাশা করা হয়, সরকার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেবে এবং ডট বাংলা ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু ২০১৫ সালের জুন মাসে এসে জানা যায়, সরকার ডট বাংলার হেফাজত করার জন্য কাউকে দায়িত্ব না দেওয়ায় তিন বছরে ডট বাংলার কোনো অগ্রগতি হয়নি। গণমাধ্যমে বিষয়টি ব্যাপক আলোড়ন তুললে মুখ্য সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় কাজটি করার জন্য বিটিসিএলকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। বিটিসিএল এ জন্য সার্ভার স্থাপনসহ সব ব্যবস্থা গ্রহণ করে আইকনকে জানায়। তারপর  আট মাস পেরিয়ে গেলেও আমরা এখনো ডট বাংলা ব্যবহার করতে পারছি না। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে বিষয়টি কেবল একটি বোর্ড মিটিংয়ের অপেক্ষায় রয়েছে। বিষয়টি নাকি কেবল আনুষ্ঠানিকতার।  

 

এখন এটা দাবি

আমরা বাংলা ভাষার নামে দেশটা তৈরি করেছি। বাংলা ভাষার সঙ্গে সাহিত্য ও সংস্কৃতি মিলে এই জাতির নিজস্ব সত্তা তৈরি হয়েছে। সেই সত্তাকে স্বাধীনতা-পূর্বকালে যেমনি আঘাত করা হয়েছে, তেমনি এটি এখনো অব্যাহত রয়েছে। এ দেশে বেসরকারি বড় ব্যবসা, ব্যাংকসহ বাণিজ্যে বাংলা ভাষা ব্যবহার করা হয় না। উচ্চ শিক্ষায় বাংলা ভাষা নেই বললেই চলে। ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে শিশুরাও মাতৃভাষায় কথা বলতে পারে না। উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষা নেই। এমনকি ডিজিটাল রূপান্তরের নামে বাংলা ভাষার পাশাপাশি বাংলা হরফকেও বিদায় করা হয়েছে। সরকারের কেউ কেউ রোমান হরফে বাংলা লেখাকে উৎসাহিত করে।

ইউনিকোডে বাংলার সমর্থন থাকায় আমরা এখন সব অপারেটিং সিস্টেম ও ডিজিটাল ডিভাইসে বাংলা লিখতে পারি। তবে ইন্টারনেট বাংলার চর্চা কতটা হয়, সেটি ফেইসবুক-টুইটার-গুগল প্লাস দেখলে বোঝা যায়। সরকারি সাইটগুলোতে বাংলা অবহেলিত ভাষা হিসেবে ব্যবহূত হয়। সরকারি ফরম ইত্যাদিতে এখন ডিজিটাল রূপান্তরের নামে ইংরেজি ব্যবহূত হয়। যদি আমাদের ডট বাংলা ডোমেইন আসে, তবে আমি আমার নিজের ওয়েবসাইটটাকে বাংলায় প্রকাশ করে এই ভাষার যে মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে পারতাম, সেটি সম্ভবত সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল অনুভব করেনি।

ধরা যাক ‘বিজয়’ একটি প্রকাশনার নাম। ইন্টারনেটে এখন রোমান করফে নামটি লিখতে হয়। কিন্তু ডট বাংলা ডোমেইন থাকলে বাংলা হরফেই নামটা প্রকাশ করা যেত।

 

আছে আবেগী ইতিহাস

যে জাতি পাকিস্তান আমলে আরবি হরফে বাংলা লিখতে রাজি হয়নি বা রোমান হরফকে বাংলা ভাষার বাহন হতে দেয়নি, সেই দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ইন্টারনেটের নামটাকে বাংলা করার সুযোগ পেয়েও ব্যবহার করতে পারছে না। সংবিধানের ৩ নম্বর ধারার আলোকে বাংলা ব্যবহার না করা অসাংবিধানিক। জাতিকে বাংলা ব্যবহারের সুযোগ করে দেওয়ায় অবহেলা করা রাষ্ট্রদ্রোহিতা—কারণ রাষ্ট্রটাই বাংলার ওপর দাঁড়ানো। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত ডট বাংলা ব্যবহার করতে পারার সুযোগের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি সবার।

 

সমস্যা ডোমেইন ব্যবস্থাপনায়ও

ডট বাংলা ডোমেইনের ব্যবস্থাপনা মানসম্পন্ন নয়। চাইলেও ডট বিডি ডোমেইন সহজে নিবন্ধন করা যায় না। বিটিসিএল এটিকে এমন জটিলতায় বেঁধে রেখেছে যে হয়রানির জন্য কেউ বাংলাদেশের পরিচয়ে ডোমেইন না নিয়ে আমেরিকার ডোমেইন গ্রহণ করে। ডট বাংলাকে ইউএস ডোমেইন নিবন্ধন ও হোস্ট করার মতো সহজ করা দরকার সময়ের প্রয়োজনেই।


মন্তব্য