kalerkantho

দিল্লির চিঠি

বিকল্প নেতা কে? মহাজোট কোথায়?

জয়ন্ত ঘোষাল

২৫ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বিকল্প নেতা কে? মহাজোট কোথায়?

একজন সাংবাদিক কি শুধুই সংবাদ সংগ্রহ করেন?

না, আসলে যে সমকালের চঞ্চল এক স্রোতের মধ্যে আমরা প্রতিনিয়ত বসবাস করছি, সেই ইতিহাসের নির্মাণের সাক্ষ্য পাঠকের কাছে আমরা সাংবাদিকরা তুলে ধরার চেষ্টা করি। টুকরাটাকরা ঘটনা। কিন্তু সেসব ঘটনাপ্রবাহ ভবিষ্যতের ইতিহাসের স্রষ্টা।

তাই সাংবাদিকের কাঁধে আছে এক গুরুদায়িত্ব। সাংবাদিকতা এক বিস্তৃত প্রত্যয়। এই কাজের জন্য যে মেধা ও যোগ্যতা প্রয়োজন, তার কতটা আছে আমার আমি নিজেও নিশ্চিত নই। তবে এটা বুঝতে পারছি, ভারতের মতো এই বিশাল দেশে ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে গণতন্ত্রের পরীক্ষা এই মুহূর্তে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ আকর।

একদিকে নরেন্দ্র মোদি আর অন্যদিকে ‘মহাগঠ বন্ধন’, যাকে আমরা ইংরেজিতে বলছি মত্ধহফ ধষষরধহপব, আর বাংলায় বলতে পারি ‘মহাজোট’। মূল প্রশ্ন হলো, এই তথাকথিত মহাজোটের ভবিষ্যৎ কী? এই তথাকথিত জোটে রাহুল গান্ধীও আছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও আছেন, আবার ভারতীয় কমিউনিস্ট নেতারাও আছেন। কিন্তু মহাজোট কি সত্যই নির্মিত হয়েছে? যদি ভোটের আগে এখনো জাতীয় স্তরে কোনো প্রাক-নির্বাচনী আসন সমঝোতা না হয়, যদি বিরোধী দলগুলো একত্র হয়ে কোনো অভিন্ন কর্মসূচি তৈরি করতে না পারে, তাহলে সেই মহাজোটে কতটা লাভ হবে।

ভারতের রাজনীতির ইতিহাস সততই বহতা খরস্রোতা। ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওয়াহেরলাল নেহরু যখন দেশের মুখ্যমন্ত্রীদের নিয়মিত চিঠি লিখতেন, সেখানে তিনি বারবার বলতেন, এই বিশাল ভারত নামক দেশটিকে একত্রে বেঁধে রাখতে গেলে প্রতিটি পৃথক প্রদেশের নিজস্বতা, তার উন্নয়ন বিশেষভাবে প্রয়োজন, যাকে বলা হয় যুক্ত রাষ্ট্রীয় ঐক্য বা  federalism। সে সময়টাতে কংগ্রেসই সবচেয়ে বড় এবং কার্যত একক দল। রাজনীতিবিজ্ঞানী রজনী কোঠারি সে সময়ের কংগ্রেসের নাম দিয়েছিলেন Congress System। বলা হতো, তৎকালীন বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থাটি ছিল one party dominant multi party system। অর্থাৎ এক দলের আধিপত্যে থাকা বহুদলীয় ব্যবস্থা। নেহরুর মৃত্যু হয় ১৯৬৪ সালে। এরপর ১৯৬৭ সালে প্রথম কংগ্রেসের প্রতিপত্তি ধাক্কার মুখে পড়ে। বহু রাজ্যে কংগ্রেস ধরাশায়ী হয়। তার মানে স্বাধীনতার ঠিক ২০ বছর পর। ইন্দিরা গান্ধী প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় থেকেই কংগ্রেসের নেতৃত্ব থেকে আমজনতা বিচ্ছিন্ন হতে থাকে। একটা সময় ছিল, যখন গোটা দেশের নানা জাতি, নানা ধর্ম, নানা আঞ্চলিক স্বাতন্ত্র্য—সব কিছুরই প্রতিনিধিত্ব করত কংগ্রেস। কংগ্রেস তো স্বাধীনতার আগে ছিল সাম্রাজ্যবাদবিরোধী এক মঞ্চ। তার মধ্যেই ছিল দক্ষিণপন্থী শক্তি আবার তার মধ্যেই ছিল বামপন্থী শক্তি।

কংগ্রেসের বয়স যতই বাড়তে লাগল, নানা ধরনের আঞ্চলিক দলের জন্ম হতে থাকে। কংগ্রেসের এই পর্যায়কে অনেকে বলেছে end of innocence। ১৯৮৯ সালে কংগ্রেসবিরোধী হাওয়া তীব্র হয় এবং সে সময় থেকে শুধু কংগ্রেসবিরোধী সেন্ট্রিস্ট শক্তি নয়, মানে শুধু জনতা দল নয়, বিজেপি নামক দলটিও দ্রুত বিকশিত হতে থাকে।

১৯৭৭ সালে কংগ্রেসবিরোধী হাওয়া ভারতীয়রা দেখেছিল। তখন মূলত জরুরি অবস্থার প্রতিবাদে জয়প্রকাশ নারায়ণের আন্দোলনের ফলে এক সাংঘাতিক কংগ্রেসবিরোধী ক্ষোভ তৈরিও হয়; কিন্তু মোরারজি দেশাই দিল্লির মসনদে প্রথম কংগ্রেসবিরোধী সরকার গঠন করলেও ইন্দিরা গান্ধীর চতুরতায় তা স্থায়ী রূপ নিতে পারেনি। মোরারজি দেশাইয়ের সরকারের পতন হলো। চরণ সিংহের সরকার গঠিত হলো; কিন্তু তা-ও টিকল না। এরপর আবার ইন্দিরা গান্ধী ক্ষমতাসীন হলেন মহাভৈরবে। ১৯৮৯ সালে বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংয়ের (ভিপি সিং) সরকার গঠিত হলো; কিন্তু সেই কোয়ালিশানও টেকেনি। কারণ একদিকে বাম আর অন্যদিকে বিজেপি—দুই স্ববিরোধী দল বাইরে থেকে সরকারকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। কিন্তু এমন ভয়াবহ মতপার্থক্য নিয়ে কি সরকারকে স্থায়ী করা যায়?

একটা গল্প শোনাই আপনাদের। বিশ্বনাথ প্রতাপ বাম ও বিজেপি দুই পক্ষকে ডেকে বলেছিলেন, নিজেদের ভেতরের মতপার্থক্য বাইরে যাতে না আসে তার জন্য প্রতি সপ্তাহের প্রথম দিনই আমরা একটা নৈশভোজ করব, আলোচনা করব, যাতে সরকার পাঁচ বছর টেকানো যায়। নৈশভোজ হতো। প্রতিদিনের নৈশভোজের একদিকে থাকত আমিষ খাবার আর অন্যদিকে থাকত নিরামিষ। লালকৃষ্ণ আদবানি নিরামিষ লাইনে থাকতেন আর আমিষ লাইনে থাকতেন সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের মতো কমিউনিস্ট নেতারা। খাওয়াদাওয়া হতো। রাজনৈতিক মতপার্থক্য একই জায়গায় থাকত। এরপর কমিউনিস্টদের কথা ছাড়ুন, ভিপি সিংয়ের সঙ্গেই বিজেপির কী ভয়ংকর সংঘাত হলো, তা তো ইতিহাসে এককথায় বলা হয় মণ্ডল আর কমণ্ডলের ইতিহাস।

ভিপি সিংয়ের পরও ভারতের ইতিহাসে চন্দ্রশেখর, দেবগৌড়া ও গুজরালের জোট সরকার আমরা দেখেছি; এবং সেগুলোরও অকালমৃত্যু হয়। তাই আজ ২০১৯ সালে লোকসভা নির্বাচনের আগে প্রশ্ন উঠেছে—আজ যে মহাজোট গঠনের চেষ্টা হচ্ছে, তা-ও কতটা বাস্তবসম্মত?

দিল্লির একটা একক রাজ্য সরকার আছে। সেই সরকারের শাসকদল আম আদমি পার্টি। মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়াল। কংগ্রেস এবং সেই কেজরিওয়ালের দলের মধ্যে কিছুতেই আসন সমঝোতা হচ্ছে না। দুই পক্ষই দুই পক্ষকে গালাগাল করে চলছে।

উত্তর প্রদেশ নামক বৃহৎ রাজ্যটিতে দুই আঞ্চলিক নেতা অখিলেশ যাদব (সমাজবাদী পার্টি) ও মায়াবতী (বহুজন সমাজবাদী পার্টি) ঐক্যবদ্ধ হলেও যেই কংগ্রেস সে হাটে আসতে চাইছে, সঙ্গে সঙ্গে মায়াবতী এর তীব্র বিরোধিতা করছেন। পশ্চিমবঙ্গেও কংগ্রেস ও সিপিএমের জোট হলো না। ভোটের আগে এত বিরোধ, তারপর ভোটের পর যদি ক্ষমতাসীন হওয়ার জন্য বোঝাপড়াও হয়, তাহলেও কি সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে এ রকম বিচিত্র জগাখিচুড়ি এবং বিশাল দেশে স্থায়ী সরকার দিতে পারবে যদি বিজেপির মতো একটা শক্তিশালী দল বিরোধী দল হয়?

অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক অবশ্য বলেন যে ভারতের মতো যুক্ত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় এ ধরনের আঞ্চলিক দলে জোট ভালো। এ ধরনের জোট আসলে ভারতের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে। নরেন্দ্র মোদি ২৮২টি আসন নিয়ে বিজেপির একক শাসন কায়েম করেছিলেন ২০১৪ সালে। কিন্তু এই শক্তিশালী একক দলের রাষ্ট্রীয় আধিপত্যকামিতায় অনেক সময় গণতন্ত্রের কণ্ঠস্বর অবলুপ্ত হয়ে যায়; মোদি যেমন বিজেপির শাসনে নিজেদের শরিক আকালি-শিবসেনাদের পর্যন্ত যথেষ্ট মর্যাদা দেননি।

এই বক্তব্য মূলত বামপন্থী ও উদারবাদী তাত্ত্বিকদের। কিন্তু এখনো মূল প্রশ্নটি হলো, জোটের একজন সুনির্দিষ্ট কাণ্ডারি থাকা প্রয়োজন। জরুরি অবস্থার প্রতিবাদে জয়প্রকাশ নারায়ণ নামক এক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। ১৯৮৯ সালে বিশ্বনাথ প্রতাপ প্রধান কাণ্ডারি ছিলেন। এখন কাণ্ডারি কে? রাহুল গান্ধী? তাঁর নেতৃত্ব মমতা অথবা শারদ পাওয়ার মানতে রাজি নন। আর কংগ্রেস যদি তুলনামূলকভাবে খারাপ ফল করে, যেসব রাজ্যে মূল লড়াই বিজেপি বনাম কংগ্রেস, যেমন—রাজস্থান, মধ্য প্রদেশ ও ছত্তিশগড়ের মতো রাজ্যে, তাহলে তো আরো বিপদ। ইঞ্জিন রেলের অন্য বগিগুলো টেনে নিয়ে যাবে, নাকি বগিগুলো ইঞ্জিনকে টেনে নিয়ে যাবে? পাঁচমিশালি জোট গঠন করলেই তাই যুক্ত রাষ্ট্রীয় ঐক্য সাধিত হয় না। সেটা একটা ভ্রান্ত ধারণা। তাহলে তো ভারতের অতীত ইতিহাসে জোট সরকারগুলোই সবচেয়ে স্থায়ী ও সুষ্ঠু প্রশাসন দিতে পারত। বাস্তব কিন্তু এর বিপরীত।

তাই মানছি, ২০১৪ সালের নরেন্দ্র মোদি আর ২০১৯ সালের নরেন্দ্র মোদি এক নয়। মানুষের অসন্তোষ ক্রমবর্ধমান। প্রত্যাশা ছিল গগনমুখী। এখন তার অনেকটাই অপূর্ণ। কিন্তু বিকল্পটা কী? বিকল্প নেতা কে? মহাজোট কোথায়?

লেখক : বিশেষ প্রতিনিধি, কালের কণ্ঠ, নয়াদিল্লি

 

মন্তব্য