kalerkantho

গ্রাম থেকে ফিরে

মোফাজ্জল করিম

১৬ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০



গ্রাম থেকে ফিরে

ক’দিন পর পর রাজধানী ছেড়ে গ্রামমুখী না হলে, গ্রামীণ আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে মিলিত হতে না পারলে, কেমন অস্বস্তি লাগে। প্রাণটা আই-ঢাই করে। সরকারি চাকরি থেকে মুক্তি পাওয়ার পর থেকে গত দুই দশক ধরে প্রায় নিয়মিতই মাসে-দু’মাসে অন্তত একবার গ্রামের বাড়ি যাই। এতে করে আর কিছু না হোক জানটা ঢাকা শহরের কলকোলাহল, ধুলিবালি ও যানজট থেকে কিছুদিনের জন্য হলেও যেন প্যারোলে মুক্তি পায়। আর সেই সঙ্গে ‘উন্নয়নের জোয়ার’, সুশাসনের ভাটা, গ্রামের মানুষের হাসিকান্নার খবরও নেওয়া যায়।

এবার যখন গ্রামে গেলাম (মার্চ ২০১৯-এর প্রথম পক্ষ), তার মাস দুয়েক আগে শেষ হয়েছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আর আমাদের কুলাউড়া উপজেলায় উপজেলা নির্বাচন হবার কথা মার্চের ১৮ তারিখ। অর্থাৎ ভোটাভুটির ব্যাপারটা তখনো মোটামুটি তরতাজা থাকার কথা সবার মুখে মুখে। কিন্তু কার্যত যা দেখা গেল তা সাধারণ মানুষের এক ধরনের ঔদাসীন্য, কেমন যেন নির্লিপ্ততা ভোটের ব্যাপারে। জাতীয় সংসদ নির্বাচন যাও একটা উত্তেজনার সৃষ্টি করেছিল, (বিশেষ করে প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর পুরোপুরি ইউ-টার্ন করে অপ্রত্যাশিতভাবে দল পরিবর্তন ও মার্কা অদলবদলের কারণে), উপজেলা নির্বাচন নিয়ে কোথাও কোনো আলাপ-আলোচনাও নেই বললে চলে। এর প্রধান কারণ, উপজেলা নির্বাচনে দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপিসহ অন্য প্রায় সব দলের নির্বাচন বর্জন এবং ৩০ ডিসেম্বরের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও অন্য সব নির্বাচন নিয়ে নানা রকম অনিয়ম-অপকীর্তির ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। যদিও আমাদের এলাকায় তুলনামূলকভাবে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়েছে বলে সবাই মনে করেন এবং যদিও সরকারবিরোধী প্রার্থী সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদ প্রত্যাশিত বিজয়ী হিসেবে জয়লাভ করেন, তবু সারা দেশের নির্বাচনী চিত্রের নেতিবাচক প্রভাব আপামর জনসাধারণের ওপর পড়েছে–এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। ফলে আসন্ন উপজেলা নির্বাচন নিয়ে তাদের কোনো আগ্রহ নেই বললেই চলে। সবচেয়ে দুশ্চিন্তার যে বিষয় তা হচ্ছে, নির্বাচন থেকে মানুষের মুখ ফিরিয়ে নেওয়া। ‘উপজেলা নির্বাচন কবে, জানেন?’ এর উত্তরে বেশির ভাগ ভোটারের না-সূচক উত্তর এবং ‘ভোট দিয়ে কী হবে, কে পাশ করবে তা তো জানাই আছে’, ‘ভোট তো দিতে চাই, কিন্তু ভোট দিতে গিয়ে তো দেখব আমার ভোট আগেই দেওয়া হয়ে গেছে’, ‘১৮ তারিখের ভোট তো ১৭ তারিখ রাত্রেই দেওয়া হয়ে যাবে’–এসব মন্তব্য এখন সাধারণ মানুষের মুখে মুখে। এ থেকে যে হতাশাব্যঞ্জক চিত্র ফুটে উঠছে, তা আমাদের শিশু গণতন্ত্রের প্রবৃদ্ধির জন্য নিশ্চয়ই চিন্তার বিষয়।

কুলাউড়াতে (জাতীয় সংসদের মৌলভীবাজার-২ আসন) অবশ্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে মুখরোচক আলোচ্য বিষয় সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদের বিএনপি-র ধানের শীষ নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপি গয়রহ সবার আপত্তি সত্ত্বেও সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ এবং তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী এম এম শাহীনের মুহুর্মুহু দলত্যাগের রেকর্ড। এলাকার এই দুই মুখ্য রাজনৈতিক নেতার সাম্প্রতিককালের আচরণে কুলাউড়াবাসী ঠিক হিসাব মেলাতে পারছেন না। তাঁরা কেমন ধন্দে পড়ে গেছেন বললে বোধ হয় ভুল হবে না। তাঁদের কাছে যদি মনে হয় রাজনীতিতে নীতি-ফিতি কিছু নয়, ‘রাজা’ হওয়াটাই বড় কথা, তা হলে তাঁদের খুব একটা দোষ দেওয়া যাবে না বোধ হয়।

দুই.

রাজনীতির উচ্চগ্রামের আলাপচারিতা থেকে আসুন এবার সাধারণ মানুষের রুটি-রুজির খবর নেই। একটা জিনিস লক্ষণীয়, আমাদের দেশে গ্রামের মানুষের মধ্যে শহরের তুলনায় অর্থনৈতিক বৈষম্যটা অনেক কম। শহরে চোখ বুজে বলা যায়, শতকরা দুই ভাগ মানুষ বাস করেন স্বর্গের কাছাকাছি, তাঁরা নিচতলার মানুষের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে অনেক ওপরে। তাঁদের জীবন-যাপন প্রণালী কেমন তা নিচতলার মানুষ কল্পনাও করতে পারবে না। তার পরের স্তরে আছেন আরো শতকরা দশ বা বিশজন। তাঁরাও বিত্তশালী–গাড়ি-বাড়িসহ আরামে দিন যাপনের সব উপকরণই তাঁদের আছে। আহার-বাসস্থান-উচ্চশিক্ষা-উন্নতমানের চিকিৎসা ইত্যাদি জীবনধারণের সব উপকরণই তাঁদের নাগালের ভেতর। এঁরাও ধনী, তবে দেশের অর্থনীতিকে এঁরা সমাজের সবচেয়ে ওপরের তলার শতকরা দুইজনের মত হয়ত নিয়ন্ত্রণ করেন না। এর পরে নামতে নামতে শহরের মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত ইত্যাদি স্তর পার হতে হতে একেবারে ভূমিতে গিয়ে ঠেকলে পাওয়া যাবে লক্ষ লক্ষ বস্তিবাসী দিনমজুর, হতদরিদ্র শ্রেণীর মানুষদের, যারা নগর-জীবনের অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখতে পথে-ঘাটে কলে-কারখানায় শুধু দু’বেলা দু’টো গ্রাসাচ্ছাদনের জন্য নামমাত্র মূল্যে তাদের রক্তজল করা শ্রম বিক্রয় করে। ইংরেজিতে এদেরকেই বলা হয় ‘টিমিং মিলিয়নস’। এদের জ্ঞাতিভাই, যারা কেবল এই শ্রমটুকুকে সম্বল করে এখনো গ্রামে বাস করে, তারা গ্রামের ভূমিহীন কৃষক, দিনমজুর, হাভাতে মানুষ। গ্রামীণ সমাজব্যবস্থায় এদের অবস্থান সর্বনিম্নে, আর বিত্তশালী ক্ষমতাশালীরা–যাদের মধ্যে অনেক ‘পেশীমানবও’ আছেন–থাকেন সমাজবৃক্ষের মগডালে। তবে একটি এলাকায় এইসব কেষ্ট-বিষ্টুদের সংখ্যা হাতে গোনা কয়েকজন। এক শ পরিবারের একটি গ্রামে হয়ত পাঁচটি পরিবার। এদের বাড়িটি চোখে পড়ার মত, তাদের চালচলন, বেশভূষা অন্যদের থেকে আলাদা। সার্বিক বিবেচনায় গ্রামীণ সমাজে তিন কিসিমের মানুষের দেখা পাওয়া যায় : এক. ওই ‘মগডালবাসী’ শতকরা পাঁচজন বা তারও কম; দুই. একেবারে তলানিতে পড়ে থাকা ‘অন্নচিন্তা চমৎকারা’ শ্রেণীর দারিদ্র্যক্লিষ্ট মানুষ। সমাজের উচ্ছিষ্টপুষ্ট এই শ্রেণীর মানুষ হবে শতকরা বিশ-পঁচিশজন; তিন. বাকি থাকল যে সত্তর-পঁচাত্তরজন, এরাই গ্রামের মোটামুটি এক সমতলে অবস্থানকারী সংখ্যাগরিষ্ঠ মধ্যবিত্ত সমাজ। এদের জমি-জিরাত, বিত্ত-বেসাতের পরিমাণ খুব একটা ঈর্ষণীয় না হলেও এসব পরিবারকে অসচ্ছল বলা চলে না।

কৃষিনির্ভর গ্রামের অর্থনীতিতে সেই আদ্যিকাল থেকে কৃষিকাজই গ্রামের মানুষের বলতে গেলে একমাত্র পেশা। অন্তত আমাদের এলাকায়। আজ থেকে ৬০-৭০ বছর আগে পরিবারের ছেলেবুড়ো সব পুরুষ সদস্যকে উদয়াস্ত ক্ষেতে-খামারে কাজ করতে হতো। কখনো নিজের জমিতে, কখনো বর্গা জমিতে। তখন অপরিকল্পিত যৌথ পরিবারে সদস্যসংখ্যাও ছিল বেশি। ভোর না হতেই পরিবারের পিতা-পুত্র সবাই নেমে পড়ত মাঠে। লেখাপড়া, স্কুল ইত্যাদির ব্যাপারটা ছিল গৌণ। ক্ষেতের কাজ করে ফুরসত পেলে বা অনেক সন্তানের মধ্যে ব্যতিক্রমী কাউকে স্কুলে পাঠানোর যোগ্য মনে করলে তখনই কেবল বিদ্যাশিক্ষার কথা বিবেচনা করা হতো। ফলে ব্রিটিশ আমল (১৯৪৭ পূর্বকাল) বা পাকিস্তানি আমলে (১৯৪৭-৭১) এ দেশে শিক্ষার হার কখনোই তিরিশের কোঠা পার হয়নি। কৃষক অভিভাবকেরা ছেলেকে ক্ষেতের কাজে লাগাতে পারলে মনে করতেন, তাঁদের আরো একজন কর্মীর হাত বাড়ল। অর্থনৈতিকভাবে মাঠের কাজ স্কুলের ‘অর্থহীন’ কালক্ষেপণের চেয়ে তাঁদের কাছে ছিল অধিক লাভজনক। স্বাধীনতার পর নব্বইয়ের দশক থেকে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে, শিক্ষার হার বাড়ানোর লক্ষ্যে নানাবিধ পদক্ষেপ নেওয়া হয়। যেমন শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচী, উপবৃত্তি, বিনা বেতনে লেখাপড়া, বিনা মূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ ইত্যাদি। এর ফলে সারা দেশে প্রাথমিক শিক্ষাক্ষেত্রে যা ঘটেছে, তাকে এক কথায় শিক্ষা-বিপ্লব বলা যেতে পারে। সেই পকিস্তান আমলের ২০-২৫% থেকে শিক্ষার হার বেড়ে এখন সত্তর ছাড়িয়ে গেছে। সবচেয়ে চমক লাগানো সাফল্য এসেছে নারীশিক্ষার ক্ষেত্রে। আমাদের ছেলেবেলায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোনো শ্রেণীতে চার-পাঁচজন মেয়ে শিক্ষার্থীর দেখা পাওয়া ছিল ভাগ্যের ব্যাপার। এখন সেখানে ছেলেমেয়ের উপস্থিতি সমান সমান। কোথাও কোথাও মেয়েদের সংখ্যা বেশি। সকালবেলা বা স্কুল ছুটির পর গ্রামের রাস্তায় স্কুল ইউনিফর্ম পরা সারিবদ্ধ মেয়েদের কলকাকলিমুখর চলাচল দেখলে মনে হয়, গ্রাম সত্যি জেগে উঠেছে, গ্রামকে আর পেছনে ফেলে রাখা যাবে না। সবচেয়ে বড় কথা, শিক্ষার আলো শুধু যে ওপরতলা, মধ্যম তলাতে ছড়িয়ে পড়েছে তা নয়, নিচতলার বিত্তহীন-বেসাতহীন মানুষেরাও এতে সমানতালে অংশগ্রহণ করছে। শিক্ষাক্ষেত্রে এই রেনেসাঁকে এগিয়ে নিয়ে জাতিগঠনের কাজে লাগাতে এখন চাই রাজনৈতিক সহমত্য, সদিচ্ছা ও কলুষমুক্ত সঠিক নেতৃত্ব।

তিন.

সামগ্রিকভাবে যে গ্রামের মানুষের অর্থনৈতিক উন্নতি হয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। পাকিস্তানি আমলে বা স্বাধীনতার পর গ্রামে গেলে দেখা যেত, শহর থেকে আগত একটি মোটরগাড়ি বা লঞ্চ দেখার জন্য অসংখ্য শিশু-কিশোরের ভিড়। এরা বেশির ভাগই ছিল অপুষ্টির শিকার, পেটমোটা, হাড় জিরজিরে এবং উলঙ্গ অথবা অর্ধ-উলঙ্গ। পথেঘাটে গ্রামের বেশির ভাগ মানুষকে দেখা যেত ঊর্ধ্বাঙ্গ নগ্ন অথবা একটা ছেঁড়াখোঁড়া ময়লা গেঞ্জি গায়ে। আর নগ্নপদ তো বটেই। এখন, অর্থাৎ স্বাধীনতার প্রায় অর্ধশতাব্দী পর, গ্রামের প্রায় সব মানুষের গায়ে শার্ট, পায়ে সস্তা স্যান্ডেল। চেহারা-সুরতে খুব একটা খোলতাই দেখা না গেলেও আগের সেই পোড়-খাওয়া ভাব নেই। আর পাঁচ দশকে এটুকু উন্নতি হয়েছে দেখেই আমাদের অনেক এলেমদার ব্যক্তি ও নেতা-পেতারা আহ্লাদে আটখানা! তাঁরা প্রায়শই ১৯৭২-৭৩-এর গ্রামবাংলার কথা উল্লেখ করে বোঝাতে চান, গ্রামের মানুষ কত সুখে আছে, তাদের কত উন্নতি হয়েছে। গায়ের গেঞ্জিটা আর পায়ের স্পঞ্জের স্যান্ডেলটা যেন তাদের অনুদান, যা দিয়ে তাঁরা মগডালে না হলেও কাছাকাছি তুলে দিয়েছেন মানুষগুলোকে। উন্নয়নের জোয়ারে ভাসল বলে তারা!

সবিনয়ে উল্লেখ করতে চাই, গত পঞ্চাশ বছরে আপনাদের অনেকের চেহারার যে আমূল পরিবর্তন হয়েছে, তা কি ভুলে গেছেন? আট আনা রিকশাভাড়া যাদের জুটত না, তারা তো মাশাআল্লাহ! এখন গাড়ি-বাড়ি অগাধ সয়-সম্পত্তির মালিক হয়েছেন। আপনাদের অনেকে যে ষোলো আনার জায়গায় আঠারো আনা সুবিধা নিয়েছেন রাষ্ট্রের কাছ থেকে, ব্যাংকের ঋণ শোধ না করে শত শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন, সুইস ব্যাংকে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করেছেন, সব সরকারের আমলে যে বাজেট-সুবিধা নিয়েছেন, প্রশাসনকে দুর্নীতিগ্রস্ত করে হাতের মুঠোর নিয়ে যা খুশি তাই করেছেন সব আমলে, সেগুলোর এক কণাভাগও যদি এইসব নিরন্ন-নিবস্ত্র মানুষগুলো পেত, তা হলে তারাও আরো উন্নত জীবন যাপন করতে পারত। তাদের জন্য গ্রামে কর্মসংস্থানের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় তারা আজ সাতপুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে শহরে এসে আপনাদের পদসেবা করে জীবন কাটায় রেললাইনের ধারে নোংরা বস্তিতে আশ্রয় নিয়ে। আজ পঞ্চাশ বছর পর তাদের সন্তান স্কুলে যেতে শুরু করেছে, আর তাতেই আপনারা ভাবছেন, অনেক কিছু করে ফেলেছেন তাদের জন্য।

আমরা আমাদের অর্থনৈতিক উন্নতিতে, জিডিপি-র প্রবৃদ্ধিতে, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধিতে দারুণ উল্লসিত। বিশ্ববাসী আমাদের উন্নয়নের রোল মডেলের তকমা পরিয়ে দিয়েছে; কিন্তু তারা জানে না, আমাদের দেশের শতকরা ৮০ জন মানুষের আয় কিন্তু কোনো রকমে দিন গুজরানের মত। মাথাপিছু আয়ের যে হিসাব, তা তো এক বিরাট তামাশা। ওই আয় দেশের মাত্র ১০-১৫ ভাগ অতিমানবের আয় দ্বারা প্রভাবিত; বাকি ৮০-৯০ ভাগ মানুষ, যারা শহর ও গ্রামে কোনো রকমে পেটে-ভাতে টিকে আছে, তাদের সঙ্গে অতিমাত্রায় সুবিধাভোগীদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য আসমান-জমিন। অর্থনৈতিক উন্নতি হয়েছে, ইনশাআল্লাহ আরো হবে; কিন্তু সৌভাগ্যের বরপুত্রদের সঙ্গে ‘টিমিং মিলিয়নস’-এর বৈষম্যের ফারাকটি আদৌ কমবে কি? নাকি দিন দিন আরো বাড়বে?

হ্যাঁ, কমবে, যদি উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে সুশাসন, ন্যায়বিচার, সবার সম-অধিকার, আইনের প্রয়োগ ইত্যাদি নিশ্চিত করা যায়, যদি এখন থেকে সব অর্থনৈতিক উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে সমাজের অনগ্রসর শতকরা ৮০ জন মানুষকে আনা যায়।

আর সর্বোপরি যদি বঙ্গবন্ধু বহুকাল আগে যে ‘চাটাদের’ কথা বলেছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করা হয়।

চার.

এবার গ্রামে গিয়ে গ্রামবাসীদের কাছ থেকে যা শুনলাম, যা দেখলাম, তারই আলোকে এবারকার নিবন্ধের কথাগুলো তুলে ধরলাম। আগেও হয়েছে, তবে এবার আবারও নতুন করে উপলব্ধি হয়েছে, গ্রামের মানুষ কিছু দেখে না, কিচ্ছু বোঝে না—এমনটি মনে করার মত বড় বোকামি আর কিছু নেই। তারা জানে, যুগ যুগ ধরে তারা শুধু বঞ্চিতই নয়, প্রবঞ্চিতও হয়ে আসছে। তবে তাদেরও এখন চোখমুখ খুলে যাচ্ছে, আর বেশিদিন বোধ হয় তাদের ঠকানো যাবে না, ঠেকানো যাবে না, বিশেষ করে নতুন প্রজন্মকে, যারা আর গোল্লাছুট ডাংগুলি খেলে না, ক্রিকেট খেলে, লুঙ্গি নয়—জিনসের প্যান্ট-শার্ট পরে হিল্লি-দিল্লী চষে বেড়ায়। তাদের ঘরে এখন টেলিভিশন। ছেলেমেয়ে সবার হাতে মোবাইল ফোন। অতএব? অতএব, গ্রাম সম্বন্ধে নতুন করে ভাবুন! ভাবতেই হবে। আর ধাপ্পা দেওয়া, ব্লাফ দেওয়া ছাড়ুন।

লেখক : সাবেক সচিব, কবি

mkarim06@yahoo.com



মন্তব্য