kalerkantho


পাকিস্তান ওরাশিয়ার যুগলনৃত্য

উম্মে ফারওয়া আজিমি

১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



পাকিস্তান ওরাশিয়ার যুগলনৃত্য

বিশ্বরাজনীতি এক দারুণ সময়ে উপনীত—ক্রমেই বাড়ছে বহুত্ববাদ, যা রাষ্ট্রগুলোর একক স্বার্থ উদ্ধারের রণকৌশলে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে ভূ-অর্থনৈতিক স্বার্থ ভাগাভাগির নতুন পথ উন্মোচিত হয়েছে। এ পরিস্থিতি দেশগুলোকে তাদের পররাষ্ট্রনীতি পরিবর্তনে বাধ্য করেছে।

এই পরিবর্তনের কারণে বহু জোটের উদ্ভব হয়েছে, যা পরস্পরের সমান্তরালে বিদ্যমান। জোট গড়ে উঠছে রাশিয়া, চীন ও পাকিস্তানের। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই), আফগানিস্তানে শান্তি ও স্থিতি আনার জন্য তৈরি হয়েছে এ জোট। রাশিয়া-ভারত-চীনের মধ্যেও ত্রিমুখী জোট গড়ে উঠছে। আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংযোগ গড়ে তোলার জন্য রাশিয়া, ভারত এবং ইরানও পরস্পরকে সহযোগিতা করছে।

এমন পরিস্থিতিতে পাকিস্তান-রাশিয়া সম্পর্ক কী করে প্রাসঙ্গিক হতে পারে? আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে যাওয়া পাকিস্তান ও রাশিয়াকে স্বার্থগত কারণে বেশ কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। বেইজিংয়ের ঘনিষ্ঠ হওয়ার পাশাপাশি ইসলামাবাদ মস্কোর কৌশলগত মিত্র হিসেবে একটি বিশেষ স্থানে রয়েছে। আফগানিস্তান বিষয়ে পাকিস্তান, রাশিয়া ও চীন তিনটি ত্রিমুখী বৈঠকের আয়োজন করে। প্রথমটি হয় বেইজিংয়ে। দ্বিতীয়টি ইসলামাবাদে এবং তৃতীয়টি মস্কোয়। আফগানিস্তান থেকে ন্যাটো সেনাদের প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের মধ্যেই এগুলো অনুষ্ঠিত হয়।

আফগানিস্তানে আইএসের উপস্থিতি পাকিস্তান ও রাশিয়া কারো জন্যই শুভ নয়। এ কারণেই যৌথ সামরিক মহড়া আয়োজনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়, যাতে সন্ত্রাসের মোকাবেলা করা সম্ভব হয়। পাকিস্তান-রাশিয়ার এই সংযোগ শুধু নিরাপত্তা ও রাজনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও সম্প্রসারিত হয়েছে।

২০১৫ সালের অক্টোবরে পাকিস্তানের সিন্ধু ও পাঞ্জাবের এলএনজি টার্মিনালগুলোকে এক হাজার ১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ গ্যাস পাইপলাইন দিয়ে সংযুক্ত করার বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। রুশ কম্পানি আরটি গ্লোবাল রিসোর্সের নেতৃত্বে প্রকল্পটি গত বছরই পাকিস্তানের কাছে হস্তান্তর করার কথা ছিল। রাশিয়ার আরেকটি তেল-গ্যাস কনসোর্টিয়াম ইন্টার আরএও ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড হিম্যাশ-অ্যাপারেট খাইবার পাখতুনখোয়ার তেল ও গ্যাস কম্পানি লিমিটেডের সঙ্গে কোহাটে একটি তেল শোধনাগার নির্মাণের ব্যাপারেও সমঝোতা স্মারকে সই করেছে। রাশিয়ার কয়েকটি কম্পানি মুজাফফরগড়ে তেল ও গ্যাস চালিত এবং পাঞ্জাবে কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণেও একমত হয়েছে।

আফগানিস্তান একটি জটিল সমস্যা। সংযুক্ত আরব আমিরাতে যুক্তরাষ্ট্র-তালেবান আলোচনা হওয়ার পর রাশিয়া নয়াদিল্লিতে ভারতীয় কূটনীতিকদের সঙ্গে আলোচনার আয়োজন করে। স্পুিনকের প্রতিবেদন অনুসারে যুক্তরাষ্ট্র-তালেবান বৈঠকের মধ্যেই রাশিয়া ও ভারত আলোচনায় বসেছিল। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আফগান শান্তি প্রক্রিয়ায় পাকিস্তান ও রাশিয়ার স্বার্থ আছে। ভারতের ভূমিকার বিষয়ে বলা হয়, ভারত ও পাকিস্তানের এসসিওতে (সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা) অন্তর্ভুক্তি এসসিও-আফগান সংযোগ গ্রুপে গতিশীলতা সঞ্চারিত করবে।

ভারত বরাবরই রাশিয়া-পাকিস্তান সম্পর্ক নিয়ে অসন্তুষ্ট। যৌথ মহড়ার বিষয়েও তাদের আপত্তি রয়েছে। এ বিষয়ে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দ্বিতীয় এশিয়া বিভাগের পরিচালক জামির কুবুলভ বলেছেন, এই সামরিক মহড়া নিয়ে ভারতের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। কারণ বিতর্কিত এলাকাগুলোতে এর আয়োজন করা হয় না।

মস্কো ও ইসলামাবাদের মধ্যে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক বিবাদ রয়েছে, যা অর্থনৈতিক সম্পর্কের উন্নয়নের পথে বড় অন্তরায়। এ সংকটের কারণেই রাশিয়ার সম্পদ (১২ কোটি ডলারের) জব্দ করে ইসলামাবাদ। এ সংকট কাটানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। উত্তর-দক্ষিণ গ্যাস সংযোগ ২০১৮ সালের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। প্রকল্পটি ঝুলে গেছে। যাতায়াত শুল্ক নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে বিলম্বিত হচ্ছে গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্পের বাস্তবায়ন।

এই ত্রিদেশীয় সম্পর্কের মধ্যে রাশিয়া ও চীনের মধ্যে যে প্রতিযোগিতা চলছে সেটিও একটি বড় সংকট। অর্থনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেই এ প্রতিযোগিতা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। সরকারি ভাষ্য অনুসারে রাশিয়া বিআরআই ও চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরকে (সিপিইসি) অনুমোদন করেছে।

তবে তারা পাকিস্তানের জ্বালানি খাতে নিজেদের অবস্থান তৈরি করে নিতে চায়। প্রথম প্রকল্পটি হচ্ছে উত্তর-দক্ষিণ গ্যাস সংযোগ। এটি মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় বিআরআইয়ের সমান্তরালে কাজ করবে। কোহাটের প্রকল্পটিও দ্বিপক্ষীয়। তবে এখনো সিপিইসির সমান্তরালে রাশিয়ার কোনো প্রকল্প নেই। এ প্রকল্পে রাশিয়া ও চীনের অংশগ্রহণের মাত্রা ঠিক না করা পর্যন্ত পাকিস্তানের জ্বালানি খাতে রাশিয়ার বিনিয়োগ হুমকির মুখে থাকবে।

অদূর ভবিষ্যতে জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় রাশিয়া তাদের বহুস্তরীয় ও জটিল নীতি অব্যাহত রাখবে। কারণ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় কাঠামোগত যে পরিবর্তন এসেছে এবং তার যে প্রভাব আঞ্চলিক পর্যায়ে পড়েছে, তাতে মস্কো ও ইসলামাবাদের অভিন্ন স্বার্থ আরো স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

 

লেখক : ইসলামাবাদের ইনস্টিটিউট অব স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের রিসার্চ ফেলো ও সহসম্পাদক

সূত্র : এশিয়া টাইমস (অনলাইন)

ভাষান্তর : তামান্না মিনহাজ                                   

 



মন্তব্য