kalerkantho


সংসদে যোগদানের সিদ্ধান্তই হওয়া উচিত বিএনপির পুনরুত্থানের প্রথম ব্রত

গাজীউল হাসান খান

৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



সংসদে যোগদানের সিদ্ধান্তই হওয়া উচিত বিএনপির পুনরুত্থানের প্রথম ব্রত

গণতন্ত্রের ধ্বজাধারী পশ্চিমা দেশগুলো একে একে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আবার নির্বাচিত হওয়ার জন্য অভিনন্দন জানিয়েছে। কিছুটা বিলম্বে হলেও জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভবিষ্যতে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। এর পাশাপাশি ভারত, চীন এবং রাশিয়াও নির্বাচনের ফলাফল জানার পরপরই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানাতে দ্বিধা বোধ করেনি। বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত একাদশ সংসদ নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি হয়েছে এবং গ্রামগঞ্জের বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে সাধারণ মানুষ অবাধে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা। ফ্রন্টের প্রধান শরিক দল বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং আরো কয়েকটি পশ্চিমা দেশের প্রভাবশালী রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে সে ব্যাপারে আলোচনা করেছেন। আলোচনায় ফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেনসহ সবাই নির্বাচনের আগে বিএনপিসহ ফ্রন্টের বহু নেতাকর্মী ও প্রার্থীকে গ্রেপ্তার করা কিংবা মামলা-হামলার কথাও রাষ্ট্রদূতদের জানিয়েছেন। তাঁদের মূল অভিযোগ ছিল, নির্বাচনের জন্য কাঙ্ক্ষিত ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ কিংবা সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়নি। কিন্তু ঘটনা যা-ই হোক, ফ্রন্ট নেতাদের আলোচনায় তেমন বিশেষ ফল দাঁড়ায়নি। শেষ পর্যন্ত সবার অংশগ্রহণমূলক একটি নির্বাচন হওয়ায় বিদেশি রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানরা নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট নেত্রী শেখ হাসিনাকে। এতে দৃশ্যত মনঃক্ষুণ্ন হয়েছেন বিএনপি নেতা মির্জা আলমগীর ও অন্য জোট নেতারা। তাঁদের ধারণা ছিল, তাঁরা যেহেতু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন অগণতান্ত্রিক ঘটনাবলির কথা ঢাকাস্থ রাষ্ট্রদূতদের জানিয়েছেন, তাতে একটা বিহিত হতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুই হয়নি। অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিতে হয়েছে তাঁদের। এ ব্যাপারে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) রিপোর্ট কিংবা বিশ্বের প্রভাবশালী দৈনিক দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের সম্পাদকীয়তে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত একাদশ সংসদ নির্বাচনের সময় ঘটে যাওয়া বিভিন্ন অনিয়ম ও কারচুপি নিয়েও যথেষ্ট যুক্তিগ্রাহ্য কথা বলা হয়েছে। এটিই আপাতদৃষ্টিতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সান্ত্বনা বলে মনে হচ্ছে।

বিগত নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্ট দেশে পুনর্নির্বাচন দাবি করেছে। কিন্তু সে ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী সরাসরি কোনো মন্তব্য না করলেও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের একে ‘মামাবাড়ির আবদার’ বলে উল্লেখ করেছেন। এ অবস্থায় বিএনপির নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্ট মনে করে, গত নির্বাচনে সামান্য যে কয়টি আসন তারা পেয়েছে, তা সংসদে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণে তেমন কোনো প্রভাব ফেলতে পারবে না। তাই সংসদে না যাওয়া কিংবা বর্জন করাই হবে তাদের জন্য একটি অধিক কার্যকরী রাজনৈতিক কৌশল। কিন্তু জনপ্রতিনিধিত্ব কিংবা গণতান্ত্রিক নীতিমালা সে কথা বলে না। কারণ জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে শেষ পর্যন্ত যে কয়জন প্রার্থীই নির্বাচনে জয়লাভ করেছেন, তাঁদের উচিত হবে সংসদে তাঁদের ভোটারদের প্রতিনিধিত্ব করা। জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হয়ে তাঁদের নির্বাচনী এলাকার মানুষের প্রতিনিধিত্ব না করা একটি অনৈতিক কাজ। সে অধিকার তাঁদের কেউ দেয়নি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ না নিলে সাংবিধানিকভাবেই তাঁদের সদস্য পদ চলে যাবে। তাঁরা তখন শূন্য আসনে নির্বাচন না করলে অন্যরা বিজয়ী হয়ে সংসদে আসবেন। এতে তাঁদের লাভ হবে কতটুকু? দেশব্যাপী গ্রামগঞ্জের মানুষ ভালো করেই জানে বিগত নির্বাচনকালে কোথায় কতটুকু কারচুপি হয়েছে। এটি একটি অলিখিত ইতিহাস হয়ে থাকবে। একদিন এর জন্য হয়তো বা কঠিন মূল্য দিতে হবে। কারণ সাধারণ মানুষ মুখে কিছু না বললেও এসব ঘটনার কথা কখনো ভোলে না। সময় ও সুযোগ পেলে নিশ্চয়ই তারা যথাযথ প্রতিদান দেবে। কিন্তু আপাতত সংসদে গিয়ে সদস্য হিসেবে শপথ নিয়ে বিভিন্ন অধিবেশনে যোগ দেওয়া তাঁদের একটি মৌলিক দায়িত্ব। যে কয়জনই হোক না কেন, সংসদে গিয়ে সময়মতো বিগত নির্বাচনে সংঘটিত অনিয়ম ও কারচুপির কথা তাঁরা প্রাণ খুলে বলতে পারবেন। কিন্তু সংসদে না গেলে ক্রমে ক্রমে তাঁরা তাঁদের জনভিত্তিটুকুই হারিয়ে ফেলতে পারেন। সংসদে উপস্থিত হয়ে তাঁরা কী বলছেন দেশবাসী এবং এমনকি বিশ্ববাসীও তা গুরুত্বের সঙ্গে অনুধাবন করার চেষ্টা করবে। তখন একজন নির্বাচিত সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন না করার অপবাদ তাঁদের থাকবে না।

গত ৩১ জানুয়ারি জাতীয় সংসদের একাদশ অধিবেশনে উদ্বোধনী ভাষণ দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। রাষ্ট্রপতি তাঁর ভাষণে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট থেকে নির্বাচিত সদস্যদের শপথ নিয়ে সংসদ অধিবেশনে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি অত্যন্ত জোর দিয়ে বলেছেন যে বিরোধীদলীয় ঐক্যফ্রন্ট থেকে যে কয়জনই নির্বাচিত হয়ে থাকুন না কেন, তাঁদের সংসদে কথা বলার জন্য যথেষ্ট সময় ও সুযোগ দেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে সংখ্যা কোনো প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করবে না বলে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি তাঁর ভাষণে দেশ গঠনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার অনুরোধ জানিয়েছেন। দেশ গঠন, বিশেষ করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি অর্জনের ব্যাপারে তাগিদ দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। তিনি শিল্পায়ন ও চাহিদা অনুযায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপরও বিশেষভাবে জোর দিয়েছেন। ঐক্যবদ্ধভাবে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ করে দেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব আরোপ করেছেন তিনি। এ অবস্থায় প্রয়োজন হলে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনাও করতে পারেন। সংসদীয় পদ্ধতিতে রাজনীতি করার একটি বিশেষ প্রক্রিয়া রয়েছে। সংসদীয় পদ্ধতিতে জাতীয় সংসদই হচ্ছে সব কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র। আক্ষরিক অর্থে তাকে বাস্তবে রূপায়িত করতে হলেও বিরোধী দলকে প্রাণপণে তাদের প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। নতুবা জাতীয় সংসদ বাদ দিয়ে কিংবা তাকে পাশ কাটিয়ে রাজপথে আন্দোলন করে বর্তমান জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের পতন ঘটাবে, তেমন সম্ভাবনা মোটেও দেখা যাচ্ছে না। সংসদ বাদ দিয়ে গণ-আন্দোলনে যাবে, তার জন্য তেমনভাবে সংগঠিত নয় বিএনপির নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্টের নেতাকর্মীরা।

নিজ দলকে সঠিক নেতৃত্ব দিয়ে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ করতে হলে যে ধরনের বলিষ্ঠ ও যুগোপযোগী তরুণ নেতৃত্ব প্রয়োজন, তা এখন বিএনপির মধ্যে মোটেও নেই। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দলনেত্রী খালেদা জিয়া এখন কারাগারে। এবং তাঁর অবর্তমানে ভারপ্রাপ্ত দলনেতা তারেক রহমানও দণ্ড মাথায় নিয়ে লন্ডনে অবস্থান করছেন। হাজার হাজার মাইল দূরে বসে বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁর পক্ষে রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেওয়া মোটেও সম্ভব নয়। রাজপথে আন্দোলন ও সর্বক্ষেত্রে গণজাগরণ সৃষ্টি করতে দলের সব নেতা-নেত্রীকে সামনে থাকতে হবে। দূর থেকে শুধু বিভিন্ন পরামর্শ দেওয়া সম্ভব, কোনো গণ-আন্দোলনে সরাসরি অবদান রাখা সম্ভব নয়। বিএনপির যাঁরা নব্বইয়ের দশকের প্রারম্ভে তৎকালীন স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে খালেদা জিয়ার রাজপথে আপসহীন গণ-আন্দোলন দেখেছেন, একমাত্র তাঁরাই জানেন কী কারণে তিনি (খালেদা) সফল হয়েছিলেন। কেন জনগণ তাঁর ডাকে সাড়া দিয়েছিল আর কেনই বা তাঁকে আপসহীন নেত্রী বলে আখ্যায়িত করা হয়েছিল। তবে গত ২০ বছরে রাজপথে গণ-আন্দোলনের ধারাও পাল্টে গেছে। জীবন-জীবিকা ও পেশাগত কারণে এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে শিল্প-কারখানায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা উৎপাদনের একটি পূর্বশর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন আগের মতো অনির্দিষ্টকালের জন্য হরতাল কিংবা অবরোধ আর সম্ভব নয়। রাজনীতি করতে হবে দলীয়ভাবে এবং জাতীয় সংসদে। এর জন্যও সুশিক্ষিত, পরিশীলিত ও মেধাসম্পন্ন নেতৃত্ব গড়ে তোলা প্রয়োজন।

বিএনপিতে অনেক অরাজনৈতিক মানুষ নেতৃত্বে রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তাঁরা বোঝেন না যে সংসদে না গেলে খালেদা জিয়ার মুক্তির ব্যাপারেও সরকারের সঙ্গে কথাবার্তা বলা সম্ভব হবে না। তা ছাড়া যেসব নেতাকর্মী জেলে রয়েছে তাদের দ্রুত বের করে আনাও দুষ্কর হবে। রাজনৈতিক হামলা-মামলা ও পুলিশি জুলুম বা নির্যাতনের অবসান ঘটবে না। উল্লিখিত বিষয়গুলোর যুক্তিসংগত সমাধান খুঁজতে হলেও সরকারের সঙ্গে কাজ করার মতো একটা সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। নবনির্বাচিত সদস্যদের শপথ নিয়ে অবিলম্বে সংসদে যাওয়ার ব্যাপারে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের একটি জরুরি সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। কারণ বিএনপির নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্টের জন্য বর্তমানে হাতের নাগালের মধ্যে কিছুই নেই। তারা এখন এক দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্যে পড়ে গেছে। সব কিছু তাদের ধীরে ধীরে অত্যন্ত কৌশলের সঙ্গে অর্জন করতে হবে। সুতরাং এখন দলের জন্য (বিএনপি) একটি সময়োপযোগী বিকল্প নেতৃত্ব গড়ে তোলা অত্যন্ত আবশ্যক বলে মনে করি। এবং জামায়াতে ইসলামীকে তার নিজস্ব পথে চলতে দেওয়া উচিত বলে বিএনপির অনেকে মনে করে। স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি হিসেবে বিএনপিকে এখন মূলধারার রাজনীতিতে ফিরে আসতে হবে। জামায়াতের কারণে বিএনপিকে এরই মধ্যে অনেক খেসারত দিতে হয়েছে, আর নয়। বিএনপির নেতাদের উচিত হবে এ মুহূর্তে একবার তাঁদের দলের অতীতের দিকে ফিরে তাকানো। নতুবা সঠিক সিদ্ধান্ত, রণনীতি ও রণকৌশলের অভাবে দলটি ক্রমে ক্রমে তার রাজনৈতিক উপযোগিতা ও অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলতে পারে। একসময় ভারতের কর্তৃত্ব ও আধিপত্য রোধকল্পে বিএনপির যে জাতীয়তাবাদী রাজনীতি ছিল, এখন তা অনেকটাই নিষ্ক্রিয় হয়েছে। কারণ ভারত এখন শুধু আমাদের নিকট প্রতিবেশী নয়, আমাদের ব্যাপক উন্নয়ন কার্যক্রমের অংশীদারও। ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন ও সরকারের সঙ্গে বিএনপির তাই একযোগে কাজ করার মতো একটি সম্পর্কও গড়ে তুলতে হবে। এসব বিবেচনা করে সংসদে যোগদানের সিদ্ধান্তই হওয়া উচিত বিএনপির পুনরুত্থানের প্রথম ব্রত।

লেখক : বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক gaziulhkhan@gmail.com



মন্তব্য