kalerkantho


সড়কের শৃঙ্খলায় শক্ত আইন জরুরি

হাসান আজিজুল হক

৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



সড়কের শৃঙ্খলায় শক্ত আইন জরুরি

এক হিসাবে এটা বলতে পারা যায় যে অবিবেচনার কাজটি করা হয়েছে ঢাকা শহরে—ঢাকা ছিল ছোট্ট শহর। সুন্দর এবং সাজানো-গোছানো। অল্প বাড়িঘর ছিল। আর সেগুলো ছিল অত্যন্ত পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন। কিন্তু মোটামুটিভাবে গত ৫০-৬০ বছরে ঢাকায় ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক গুণ বেশি ঘরবাড়ি তৈরি হয়েছে। বিপুল পরিমাণে ঘরবাড়ি তৈরি করার কারণে রাস্তার ওপরও প্রভাব পড়েছে। রাস্তাঘাট নতুন করে খুব একটা বাড়েনি। আবার বাড়িঘরের ফলে রাস্তাও সরু হয়ে এসেছে। একই সঙ্গে ঢাকায় মানুষও বেড়েছে। একটি মহানগরীর রাস্তা যেভাবে হওয়া দরকার, সেভাবে হতে পারেনি। কিছু বড় বা প্রশস্ত রাস্তা রয়েছে। কিন্তু শহরের ভেতরে বেশির ভাগ ছোট রাস্তা। বাকি বড় রাস্তাগুলো শহরের উপকণ্ঠে রয়েছে। আবার সরকারিভাবে পরিকল্পিত জনপরিবহন সেভাবে না হওয়ায় যে যেমন করে পারছে, যাত্রী বহন করছে। বাসের সেবা যেগুলো আছে, তা না থাকার মতোই। সরকারিভাবে বা সুনিয়ন্ত্রিতভাবে গণপরিবহন নামিয়ে অন্য সব পরিবহন যদি বন্ধ করে দেওয়া হতো, ভালো ফল পাওয়া যেত বলে মনে হয়। এ ছাড়া স্কুটার ও সিএনজির পরিমাণ এত বেশি এবং ঢাকার লোকসংখ্যা—সব মিলিয়ে সংখ্যাটা এত বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে, সাভাবিকভাবে এটা অনিবার্য হয়ে উঠেছে যে পথেঘাটে অহরহ দুর্ঘটনা ঘটবেই। এবং ঘটছেও। সে জন্যই দুর্ঘটনা এত ঘটে চলেছে। সে জন্য সাবধান হতে হবে। সতর্ক হয়ে পথ চলতে হবে। এবং আমাদের সরকার থেকে তো এ বিষয়ে কঠোরভাবে পুলিশ বাহিনীকে বলেও দিয়েছে, মামলা ও জরিমানা হচ্ছে। যারা দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছে, চালক ও তাদের সহযোগীরা কিংবা লাইসেন্স না পাওয়া চালকরা, যারা অনুমোদন না পেয়েও গাড়ি চালায়, তাদের ব্যাপারেও কঠোর আইনের কথা বলা আছে। কিন্তু এর কোনোটাই কেন যেন কার্যকর হচ্ছে না।

শুধু ঢাকা শহরে নয়, পত্রিকা খুললেই দেখছি—প্রতিদিন কোনো না কোনো জায়গায় মানুষ মারা যাচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনায়। কিন্তু সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে এত আইনের কথা শুনি, কোথাও আইনের প্রয়োগ খুব একটা দেখি না। কোথাও শক্ত শাস্তি নিশ্চিত হচ্ছে না। এইতো কয়েক দিন আগেই দেখলাম, পাঁচ-ছয়জন লোক একসঙ্গে মারা গেল বাস উল্টে। এভাবে যোগাযোগব্যবস্থা আধুনিক করতে গিয়ে, কাজকর্ম দ্রুত করতে গিয়ে সড়কে গাড়ির গতিও বেড়েছে, সঙ্গে দুর্ঘটনাও বেড়েছে। এই যে ব্যবস্থাটা হয়ে গেছে, এর লাগাম কিছুতেই টানা যাচ্ছে না।

এসব এক দিনে সমাধান করা সম্ভব হবে না। এ জন্য সরকারকে কঠিন আইন করতে হবে। আর কঠিন আইনের প্রয়োগ করতে হবে। আর এসব বাস্তবায়নের জন্য যেটা এখনই করতে হবে, তা হচ্ছে যতটা পারা যায় রাস্তাঘাটকে প্রসারিত করতে হবে। এ জন্য কিছু কঠিন ও নির্দয় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এ জন্য যদি কিছু বাড়িঘর ভাঙতে হয়, ভাঙতে হবে। না ভেঙে তো উপায় নেই। কাজেই এ ছাড়া কী আর করা যাবে। কারণ উপায় তো নেই। যতদূর পারা যায়, রাস্তাগুলোকে উন্নত এবং সুনিয়ন্ত্রিত করা।

সকালে বাবার হাত ধরে বা বাবার পাশে হেঁটে স্কুলে যাচ্ছিল মেয়েটি। সঙ্গে তার মা-ও ছিলেন। রাস্তা পার হবেন বলে তাঁরা চেষ্টা করেন এবং রাস্তা পার হওয়ার সময় দ্রুতগতির মাইক্রোবাস ধাক্কা দেয় শিশুটিকে। বাবার হাত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ছিটকে রাস্তায় পড়ে সে। এর পরের বর্ণনাগুলো পত্রিকায় পড়ার পর মাথার ভেতরে যে ক্রিয়া হচ্ছিল, সেটা এখন আবার জেগে উঠল। চালক মেয়েটিকে প্রায় চাপা দিয়ে পালিয়ে গেল। মাথাটা ঠিক স্বাভাবিক থাকার কথা নয়। একজন বাবার জন্য এমন অমানবিক দৃশ্য আর কী হতে পারে। কিছুক্ষণ পরপরই ঘটনা ও ছবির কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। এ কোন দেশে আমরা বাস করছি, যেখানে বাবার হাতে থাকা সন্তানও নিরাপদ নয়। কল্পনা করা যায়? চালককে আমার জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছা হয়, এমন ঘটনা তোমার নিজের মেয়ের সঙ্গে ঘটলে তুমি কী করতে? তোমার কেমন বোধ হতো?

লেখক : কথাশিল্পী ও সাবেক অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

অনুলিখন : মাসউদ আহমাদ



মন্তব্য