kalerkantho


আনন্দময় বেঁচে থাকার বারতা চাই

গোলাম কবির

১৩ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



আনন্দময় বেঁচে থাকার বারতা চাই

অতীতচারী মানুষ ফেলে আসা অনেক কিছুকে অতুল ভাবে। বাস্তবে এই বোধের এপিঠ-ওপিঠ আছে। ভালো যেমন ছিল, তেমনি জীবনসংহারীও ছিল অতীতের অনেক কিছু। ইংরেজ অধিকারের পর কলকাতার যাপিত জীবনের নানা খণ্ডচিত্রের অন্যতম প্রধান হলো : ‘রাতে মশা দিনে মাছি, এই নিয়ে কলকেতায় আছি’র মতো দুঃসহ পরিবেশ। এ অবস্থার কথা স্মরণে এনে শিবনাথ শাস্ত্রী তাঁর ‘রামতুল লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ’ গ্রন্থে লিখেছেন : ‘এখন (উনিশ শতকে) মফস্বল হইতে পীড়িত হইয়া লোকে সুস্থ হইবার জন্য কলিকাতা আগমন করে; তখন (ইংরেজ অধিকারের অব্যবহিত পরে) কলিকাতাতে মাস দুই থাকিলেই শরীর ভগ্ন হইত এবং কলিকাতা হইতে বাহির হইলে তৎপর দিনই শরীর সুস্থ হইতে আরম্ভ হইত।’ “কেউ আসে না কারো বাড়ি—রংচিত্র আঁকতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ নগর কোলকাতার সামাজিক নিষ্প্রাণতাকে ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দের মে মাসের শেষের দিকে অর্থাৎ ১১ই জ্যৈষ্ঠ ‘বধূ’ কবিতায় লিখলেন: ‘ইটের পরে ইট মাঝে মানুষ কীট, নাইকো ভালোবাসা নাইকো খেলা।” জীবনানন্দ দাশ একালের কলকাতার ভাবিরূপ কল্পনা করে লিখেছিলেন : ‘কলকাতা একদিন কল্লোলিনী তিলোত্তমা হবে।’ (সুচেতনা, বনলতা সেন) হয়তো হয়েছেও। তবে রবীন্দ্র কথিত জীবন জুড়ানো ‘গঙ্গার তীর স্নিগ্ধ সমীর’ আছে কি না জানি না।

৪০০ বছরেরও বেশি বয়সী ঢাকা শহর প্রাচীনত্বের দিক থেকে কলকাতার চেয়ে কম বনেদি নয়। এর বিবর্তন এবং ব্যক্তি পরম্পরার চিত্র বিভিন্ন গ্রন্থে লিপিবদ্ধ আছে। তবে জনস্বাস্থ্য কতখানি জীবনবান্ধব ছিল, তার বিবরণ তেমন নেই। অনেকের দেখা পুরান ঢাকার পর নদীবেষ্টিত ঢাকা ছিল শ্যামল, উন্মুক্ত। তখন বোধকরি ঢাকা এবং বাংলাদেশের অন্যান্য শহর তেমন স্বাস্থ্যহানিকর ছিল না। বরং কিছু সময় ঢাকায় অবস্থান করলে শরীর মনের পরিবর্তন হতো। গায়ের রংও উজ্জ্বল হতো। গত শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত ঢাকা শহরে খুব বেশি মশার উপদ্রব ছিল না। ওই সময়ে মতিঝিলের খালে ডিঙি নৌকা চলাচল করত। পুরানা পল্টনের পর মালিবাগ-শান্তিবাগ ও তত্সংলগ্ন এলাকা ছিল খাল-ডোবা আর বনস্পতিতে ভরা। সেখানে মাঝেমধ্যে টিনের ঘর, কোথাও আবার বাঁশের বেড়া এবং খড়ের চালের বাড়ি। কৌতূহলী পাঠক ঢাকার নিজস্ব সম্পদ এবং বাংলাদেশের প্রধান কবি শামসুর রাহমানের আত্মকথন ‘কালের ধুলায় লেখা’ গ্রন্থে এসবের প্রাণবন্ত সন্ধান পাবেন। তা ছাড়া মুনতাসীর মামুনের ঢাকাকেন্দ্রিক গ্রন্থাবলি তো আছেই।

এত সব কাসুন্দি ঘাঁটা আর কেতাবি গৌরচন্দ্রিকার উদ্দেশ্য হলো আমাদের সাধের ঢাকা নাকি সারা বিশ্বের বসবাস অনুপযোগী শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম। শুধু ঢাকা নয়, বাংলাদেশের অন্যান্য শহরের পরিণতি সেদিকেই গড়াচ্ছে। নিশ্চয়ই এটা বিধিলিপি নয়। নিজের আবাসস্থলকে সেখানকার অধিবাসী ও নিয়ামকরাই আবিলতায় ভরে তুলছে। হয়তো বলা হবে জনসংখ্যার প্রবল চাপ এমনটি হতে বাধ্য করেছে। অতিরিক্ত জনসংখ্যা আমাদের এক ফোঁটা জন্মভূমির জন্য অনেকটা হুমকি হলেও আশীর্বাদও। এই যে প্রয়োজনীয় বিদেশি মুদ্রা আমরা পেয়ে যাচ্ছি, তা তো বাড়তি জনসংখ্যার সুবাদেই। সেটা আপাতত সুখের দিক। মনে রাখা দরকার, আমাদের দেশের ভূমির পরিমাণ এত সীমাবদ্ধ যে তা কোনো কোনো দেশের একটি প্রদেশের সমানও নয়। এরই মধ্যে আমাদের পরিকল্পনায় আনতে হবে, কিভাবে স্বাস্থ্যোজ্জ্বল নগরী গড়ে তোলা যায়। বাংলাদেশের সব শহর বাড়ছে পরিকল্পনাহীনভাবে। যাঁরা নগর পরিকল্পনায় আছেন, তাঁদের অনেকে মানুষের মুখের পানে না চেয়ে পকেটের দিকে তাকান। ভাবেন নিজে বাঁচলেই হলো। তাই ঊর্ধ্বমুখী ভবন পাশের জনজীবনকে নরককুণ্ডে পরিণত করছে। চলাচলের সংকীর্ণ পথে যান্ত্রিক গাড়ির সংখ্যা স্ফীততর। এসবের দেখভালের দরকার।

গৃহনির্মাণের প্রকট বিলাসিতা, যান্ত্রিক যানবাহনের প্রাচুর্য, খাল-বিলের অস্তিত্ব বিলোপ, নদী-নালার কণ্ঠরোধ, বৃক্ষরাজির নিধনযজ্ঞ—সব মিলিয়ে শুধু ঢাকা মহানগরই নয়, নতুন নগর পদবাচ্য শহরগুলোর অবস্থা তথৈবচ। বায়ুদূষণে ভরে উঠেছে চারপাশ। অনেকে মনে করেন, এ দুঃসহ অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়া খুব কঠিন নয়। দেশটা সবার জন্য। গুটিকয় মানুষের পয়সা আর গায়ের জোরে নগরবাসীর শান্তি বিনষ্ট করার সংস্কৃতি প্রতিহত করা দরকার।

‘সবার কথা কইলে এবার নিজের কথা কহ’ বলেছিলেন জাতীয় কবি নজরুল তাঁর একটি গানে। আমরাও তাঁর কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে বলতে চেষ্টা করি : ষাট বছরেরও আগে যে রাজশাহী শহর অনেকের স্মৃতিতে ভাস্বর, সেই ছোট ছোট লাল ইটের সাগর পাড়া-বোসপাড়ার বাড়ির চিত্র অনেকাংশে পরিবর্তিত হয়েছে। বাহারি দালান-কোঠা কম হয়নি, অনেক রাস্তা প্রশস্ত হয়েছে, নতুন নতুন রাস্তাও বেড়েছে। পদ্মা তীরবর্তী প্রায় ভাগাড়ে পরিণত হওয়া পরিবেশকে নান্দনিক সৌন্দর্যে পূর্ণ করার চেষ্টার অবধি নেই। তবুও নাকাল কমেনি। জনগণের মধ্যে নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি পেলে পরিবর্তন আসবে।

লেখক : সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ



মন্তব্য