kalerkantho


শেখ হাসিনা ও ইন্দিরা গান্ধীর মিল-অমিল

আবদুল মান্নান

১৩ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



শেখ হাসিনা ও ইন্দিরা গান্ধীর মিল-অমিল

দশম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের চোখ-ধাঁধানো বিজয়ের পর অনেকে আওয়ামী লীগপ্রধান ও টানা তৃতীয়বারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তুলনা করতে শুরু করেছেন। এমন তুলনার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। কারণ দুজন ভিন্ন সময়ে ও ভিন্ন প্রেক্ষাপটে তাঁদের নিজ নিজ দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন। তবে এটা ঠিক, দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে অনেক কিছুর মিল আছে। ইন্দিরা গান্ধীর জন্ম এলাহাবাদে এক সম্ভ্রান্ত কাশ্মীরি ব্রাহ্মণ পরিবারে। ইন্দিরা গান্ধীর পিতামহ মতিলাল নেহরু তাঁর সময় একজন নামকরা আইনজীবী ছিলেন, আর বাবা জওয়াহেরলাল নেহরু আইনশাস্ত্রে অধ্যয়ন করলেও কখনো তেমন একটা আইন ব্যবসা করেননি। নেহরু পরিবার সব সময় আর্থিকভাবে সচ্ছল ছিল। পিতা-পুত্র দুজনই ভারতের স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন। নেহরু তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য তিন হাজার ২৫৯ দিন বা ৯ বছরের মতো কারাভোগ করেছেন।

শেখ হাসিনার পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের পিতা ছিলেন ফরিদপুর আদালতের একজন সেরেস্তাদার। পরিবারের কিছু জমিজমা ছিল। অর্থনৈতিক মানদণ্ডে বলা যেতে পারে মধ্যবিত্ত পরিবার। তরুণ শেখ মুজিবই হচ্ছেন পরিবারের প্রথম রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। নেহরুর মতো তিনিও প্রথম জীবনে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন করেছেন। নেহরু কারাজীবনে একটি অসাধারণ কাজ করেছেন। তিনি কারাগারে থাকা অবস্থায় তাঁর ১০ বছর বয়সী কন্যা ইন্দিরা গান্ধীকে নিয়মিত পত্র লিখতেন, যে পত্রগুলোতে তিনি তাঁর কন্যাকে বিশ্ব ইতিহাস, সভ্যতা, দর্শন, প্রকৃতি, ধর্ম ইত্যাদি বিষয় নিয়ে জ্ঞান দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তিনি জানতেন ওই বয়সে তাঁর কন্যা এ বিষয়গুলো হয়তো পড়তে পারবে না, কিন্তু তিনি লিখেছিলেন কন্যা একদিন বড় হলে তা পড়ে বুঝতে পারবে। পরবর্তীকালে এই পত্রগুলো নিয়ে দুটি অসাধারণ গ্রন্থ প্রকাশিত হয় Letters from Father to Daughter ও Glimpses of World History নামে। বঙ্গবন্ধু কারাগারের অভ্যন্তর থেকে দুটি অসামান্য সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন। একটি হচ্ছে তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ আর দ্বিতীয়টি ‘কারাগারের রোজনামচা’। এদিক দিয়ে ইন্দিরা গান্ধী আর শেখ হাসিনার জীবনে একটি মিল আছে। ইন্দিরা গান্ধী পিতার অবর্তমানে মায়ের কাছে বড় হয়েছেন। একইভাবে শেখ হাসিনারও শৈশব ও কৈশোর কেটেছে মায়ের সান্নিধ্যে। ইন্দিরা গান্ধী পরিবারের আর্থিক সংগতি ছিল বলে তিনি ভারতের ও ভারতের বাইরে অনেক নামিদামি স্কুল-কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন। তেমন ভাগ্য নিয়ে শেখ হাসিনা জন্ম নেননি। তিনি গোপালগঞ্জ ও ঢাকার স্কুলে ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেছেন।

১৯৬৪ সালে জওয়াহেরলাল নেহরুর হঠাৎ মৃত্যু হলে প্রধানমন্ত্রী হন লাল বাহাদুর শাস্ত্রী। তিনি ইন্দিরা গান্ধীকে তাঁর মন্ত্রিসভায় তথ্য ও বেতার যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেন। পিতা যখন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী, কন্যা ইন্দিরা তখন পিতার ব্যক্তিগত অবৈতনিক সহকারী হিসেবে কাজ করতেন। বস্তুতপক্ষে সেখান থেকেই ইন্দিরা গান্ধীর রাজনীতিতে হাতেখড়ি। অন্যদিকে শেখ হাসিনা ছাত্রজীবন থেকে ছাত্ররাজনীতি করে এসেছেন। ছাত্রলীগ থেকে তিনি ইডেন মহিলা কলেজ ছাত্রসংসদের সহসভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। বিভিন্ন সময় ছাত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছেন। ১৯৬৬ সালে ছয় দফা আন্দোলন ও ১৯৬৯ সালের গণ-আন্দোলনে রাজপথ কাঁপিয়েছেন। ১৯৬৬ সালে তাসখন্দে লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর মৃত্যু হলে কংগ্রেসের বর্ষীয়ান নেতা মোরারজি দেশাইকে বাদ দিয়ে ইন্দিরা গান্ধীকে দলের প্রধান নির্বাচিত করা হয়। আর এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন আরেক নেতা কে কামরাজ। কামরাজের ধারণা ছিল যেহেতু ইন্দিরা গান্ধী একজন মহিলা, সেহেতু তিনি হবেন একজন দুর্বল প্রধানমন্ত্রী, আর আসল ক্ষমতা থাকবে তাঁদের হাতে। এখানেই কংগ্রসের ঝানু নেতারা ভুল করেছিলেন। সেই ইন্দিরা গান্ধীই হয়ে উঠেন ভারতীয় রাজনীতিতে একজন লৌহমানবী। আওয়ামী লীগের ১৯৮১ সালের সম্মেলনে প্রশ্ন দেখা দেয় কে হবেন দলের সভাপতি। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর তাঁর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা নির্বাসিত জীবন যাপন করছেন। বড় শেখ হাসিনা ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর আশ্রয়ে আর ছোট শেখ রেহানা লন্ডনে। এ অবস্থায় দলের সভাপতি পদের দাবিদার একাধিক জন। দল অনেকটা ভাঙনের মুখে। দলের কিছু নেতা মনে করলেন এই ভাঙন রোধের একমাত্র উপায় বঙ্গবন্ধুর রক্তের উত্তরাধিকার শেখ হাসিনাকে দলের সভাপতি করা। এই চিন্তা যাঁদের মাথা থেকে এসেছে তাঁদের অনেকেই মনে করেছিলেন যেহেতু শেখ হাসিনা একজন মহিলা, তাই তিনি হবেন দলের সাক্ষীগোপাল প্রধান; আর আসল ছড়ি ঘোরাবেন তাঁরা। সেই চিন্তা থেকেই শেখ হাসিনাকে দলের সভাপতি বানিয়ে দিল্লি থেকে ঢাকায় নিয়ে আসা হলো। কিন্তু কংগ্রেস নেতাদের মতো তাঁদেরও ভুল ভাঙতে সময় লাগেনি। দ্রুততম সময়ে দল গোছানের কাজে নেমে গিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। ইন্দিরা গান্ধীকে যখন দলের প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী করা হয় তখন কংগ্রেস আওয়ামী লীগের মতো ছত্রভঙ্গ ছিল না। ইন্দিরা গান্ধীকে শেখ হাসিনার মতো এত চ্যালেঞ্জ নিতে হয়নি। শেখ হাসিনা যখন দলের দায়িত্ব নেন তখন বস্তুতপক্ষে বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করা নিষিদ্ধ ছিল। তিনি যখন বিদেশে তখন ঘাতকরা এক রাতেই (১৯৭৫ সালে ১৫ই আগস্ট) তাঁর পরিবারের সব সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। বাদ যায়নি ছোট ভাই ৯ বছরের রাসেলও। তাঁর পিতার হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে জড়িতরা সবাই তখন জীবিত। যেকোনো সময় তাঁর জীবনহানিও হতে পারে। আওয়ামী লীগের মতো একটি দল, যা দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতার বাইরে, তাকে আবার সংগঠিত করা সহজ নয় কিন্তু শেখ হাসিনা তা করেছেন। এটি তাঁর দূরদর্শিতা আর ধৈর্যের ফল।

১৯৬৬ সালে ইন্দিরা গান্ধী প্রথম ভারতের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। এই সময় কংগ্রেসের অনেক বর্ষীয়ান নেতা ইন্দিরা গান্ধী ভারতের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, তা সহজে মেনে নিতে পারছিলেন না। ভারতের মিডিয়াও তাঁর প্রতি খুব সদয় ছিল না। তাঁকে বলা হতো একজন খেলনা প্রধানমন্ত্রী। প্রশ্ন উঠল এত সিনিয়র নেতা থাকতে ইন্দিরা গান্ধী কেন তাদের প্রধানমন্ত্রী? ১৯৬৬ সাল থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত তিনি একটানা ১১ বছর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। সময়টা ছিল খুবই কঠিন। একদিকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং এর ফলে ভারতের অর্থনীতির ওপর চাপ, মুদ্রাস্ফীতি, দ্রব্যমূল্যেও লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি—সব মিলিয়ে ভারতজুড়ে এক চরম অরাজক অবস্থা। এরই মধ্যে এলাহাবাদ হাইকোর্ট ইন্দিরা গান্ধীর ১৯৭১ সালে তাঁর নির্বাচনে বিজয় লাভকে ১৯৭৫ সালে অবৈধ ঘোষণা করেন। তখন দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অবস্থা সামাল দিতে তিনি ১৯৭৫ সালে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেন। শুরু হয় ব্যাপক ধরপাকড়। এই সময় ইন্দিরা গান্ধীর বড় ছেলে সঞ্জয় গান্ধী রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এবং অনেকটা বেপরোয়া হয়ে ইন্দিরা গান্ধী সরকারের একটি সমান্তরাল সরকার চালু করেন; যা বাংলাদেশে খালেদা জিয়ার শাসনকালে তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমান করেছিলেন।

শেখ হাসিনাকে ইন্দিরা গান্ধীর অনুরূপ পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হয়নি। তিনি এরশাদবিরোধী আন্দোলন করেছেন। গৃহবন্দি হয়েছেন। অবস্থা খারাপের দিকে গেলে ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭৭ সালে নির্বাচন ঘোষণা করেন এবং সেই নির্বাচনে তিনি ও তাঁর দল পরাজিত হয়। শুরু হয় কংগ্রেসের ভাঙাগড়া। দলে তিনি অনেকটা কোণঠাসা হয়ে পড়েন। এমন পরিস্থিতি শেখ হাসিনাকে মোকাবেলা করতে হয়নি। কারণ দলের ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ নিরঙ্কুশ। ১৯৭৭ সালে নির্বাচনে ভারতীয় জনতা দল ক্ষমতায় এলেও বেশিদিন থাকতে পারেনি। তাদের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল ইন্দিরা গান্ধী ও সঞ্জয় গান্ধীকে গ্রেপ্তার করা। ভারতের রাজনীতি আবার টালমাটাল হয়ে পড়ে আর তার প্রেক্ষাপটে ১৯৮০ সালে আরেকটি সাধারণ নির্বাচনে আবার ইন্দিরা গান্ধী সমর্থিত কংগ্রেস বিজয় লাভ করে। আর তিনি তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। এই নির্বাচনে ভারতের মুসলমানরা কংগ্রেসকে নিঃশর্ত সমর্থন দেয়।

এরশাদ পতনের পর শেখ হাসিনা আর তাঁর দল ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করবে তা অনেকটা নিশ্চিত ছিল। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি মূলত তিনটি কারণে। প্রথমটি মহিউদ্দিন আহম্মদ আর আবদুর রাজ্জাক বাকশালের ব্যানারে পৃথকভাবে নির্বাচন করা। দ্বিতীয়ত, বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের অলিখিত নির্বাচনী আঁতাত। তৃতীয়ত, পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের বিএনপিকে খোলামেলা সমর্থন ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল আওয়ামী লীগ বিরোধী দল হিসেবে সংসদে বসেছে এবং তাদের ভূমিকা পালন করেছে।

১৯৮৪ সালের ৩০ অক্টোবর ইন্দিরা গান্ধীকে তাঁর দেহরক্ষীরা হত্যা করে। শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পর একাধিকবার তাঁর জীবননাশের চেষ্টা করা হয়। সবচেয়ে ভয়ংকর ছিল ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট তাঁর সমাবেশে গ্রেনেড হামলা। শেখ হাসিনা প্রথম ক্ষমতায় আসেন ১৯৯৬ সালে। তাঁর এই মেয়াদে সরকার পরিচালনায় তিনি পদে পদে বাধাগ্রস্ত হন বিএনপি-জামায়াতের কর্মকাণ্ড দ্বারা। এই মেয়াদে তিনি একটি ভয়াবহ বন্যা ও অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবেলা করেন। আবার তিনি ক্ষমতায় আসেন ২০০৯ সালে। এরপর তিনি একটানা তিনবার ক্ষমতায় আছেন, যা ইন্দিরা গান্ধীর ভাগ্যে জোটেনি। ইন্দিরা গান্ধীকে বিএনপির মতো হঠকারী রাজনৈতিক দল ও তাদের ভয়ংকর সব সন্ত্রাস মোকাবেলা করতে হয়নি। শুনতে হয়নি আন্তর্জাতিক একাধিক শক্তির অযাচিত পরামর্শ ও হুমকি। মুখোমুখি হতে হয়নি বিশ্বব্যাংকের। দুই প্রধানমন্ত্রীকে ভিন্ন রকমের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়েছে। তবে নির্মোহভাবে বিচার করলে শেখ হাসিনার সামনে চ্যালেঞ্জগুলো ইন্দিরা গান্ধীর চেয়ে অনেক কঠিন ছিল। একমাত্র তাঁর সাহস, দৃঢ়তা, ধৈর্য আর দূরদৃষ্টি তাঁকে এত দূর আসতে সহায়তা করেছে। তবে দুজনই পিতার আশীর্বাদে সিক্ত। একবার আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে একান্ত আলাপে জানতে চেয়েছিলাম, তিনি কিভাবে এত চতুর্মুখী চাপ মোকাবেলা করেন? তিনি তাঁর মাথার ওপর টাঙানো বঙ্গবন্ধুর ছবির দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, যখন বেশি চাপ অনুভব করি, ফিরে যাই বাবার কাছে। মনে হয় তিনি মাথায় হাত দিয়ে বলছেন, ‘আমি আছি তো মা’। তবে দুই প্রধানমন্ত্রীই তাঁদের দেশের ইতিহাসে নিজের জন্য জায়গা করে নিয়েছেন।

লেখক : বিশ্লেষক ও গবেষক



মন্তব্য