kalerkantho


খাদের কিনারা থেকে সরল যুক্তরাষ্ট্র

জিল অ্যামব্রামসন

৯ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



খাদের কিনারা থেকে সরল যুক্তরাষ্ট্র

রাতটা ডেমোক্র্যাটদের জন্য খুব সুন্দর ছিল। অনেকেই আশা করেছিল, উদারপন্থীদের ‘নীল তরঙ্গ’ উদ্বেলিত হবে। তেমন কিছু অবশ্য ঘটেনি। এটা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভাগ্যনির্ধারণী নির্বাচন ছিল না, যদিও এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তাঁর কর্তৃত্বপরায়ণ ক্ষমতায় একটি লাগাম পরানো সম্ভব হয়েছে।

হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের নিয়ন্ত্রণ দখল বড় ধরনের বিজয়। শিল্প-কারখানাসমৃদ্ধ রাজ্যগুলোতে এর আগে ভালো ফল করেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এবার এগিয়ে ডেমোক্র্যাটশিবির। ক্ষমতাসীন দল শাসিত রাজ্যগুলোর ক্ষেত্রেও একই বক্তব্য প্রযোজ্য। বিশেষ করে কানসাসে, যেখানে ট্রাম্পের ঘৃণ্য নীতিগুলোর কট্টর সমর্থক ক্রিস কোবাচ বিস্ময়করভাবে বড় ব্যবধানে ডেমোক্র্যাট লরা কেলির কাছে পরাজিত হয়েছেন।

এই ফলাফল থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট, প্রেসিডেন্টের সংকট সন্নিকটে। মুলারের প্রতিবেদন প্রকাশ পেতে যাচ্ছে। এবং এখন নিশ্চিতভাবেই বলে দেওয়া যায়, হাউস কমিটিগুলোর চেয়ারম্যানরা দুর্নীতির নানা অভিযোগের তদন্তের ওপর নজরদারি করবেন। এরই মধ্যে গত মঙ্গলবারই ডেমোক্র্যাটরা জানান দিয়েছে, তারা প্রেসিডেন্টের কর রেকর্ডের বিষয়ে জানতে আগ্রহী। অর্থাৎ হোয়াইট হাউসের সঙ্গে সংঘাতে জড়ানো এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

তবে ডেমোক্র্যাটদের অবশ্যই চতুর হতে হবে। প্রেসিডেন্টের মাঠে খেলতে যাওয়া ভুল হবে। ডেমোক্র্যাটরা নির্বাচনী প্রচারের সময় যেভাবে স্বাস্থ্যসেবার ওপর জোর দিয়েছে, সুশৃঙ্খল ও ঐক্যবদ্ধভাবে প্রচার চালিয়েছে, তা তাদের ধরে রাখতে হবে। তাদের সামনের দিকে তাকিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।

এদিকে ২০১৬ সালে ‘বার্নি বনাম হিলারি’ ইস্যুতে ডেমোক্রেটিক পার্টির ভেতরে এখনো ভয়াবহ বিভাজন রয়েছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা নির্বাচনী প্রচারে শরিক হয়েছিলেন, তবে তা বেশ দেরিতে, যদিও তাত্ক্ষণিকভাবে তাতে কাজ হয়েছে। সমস্যা হচ্ছে, এ দলের স্পষ্টভাবে কোনো ভবিষ্যৎ নেতা নেই।

নিশ্চিতভাবেই আগামীবার হাউসের স্পিকার হতে চলেছেন ন্যান্সি পেলোসি। গত মঙ্গলবার রাতে বিজয় ভাষণে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, ‘আগামীকাল যুক্তরাষ্ট্রে একটি নতুন দিনের সূচনা হতে যাচ্ছে।’ তবে যখন তিনি ভাষণ দিচ্ছিলেন তখন তাঁর চারপাশ ঘিরে ছিল দলের বয়োজ্যেষ্ঠ নেতারা। এর থেকেই বোঝা যায়, যে প্রতিশ্রুতি তিনি দিলেন, তা পূরণ করা তাঁর জন্য কতটা কঠিন। এ মুহূর্তে তাঁর সামনে থাকা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটি হচ্ছে, নতুন প্রজন্মের ডেমোক্র্যাট নেতা তৈরি করা (ধারণা করা হচ্ছে, জো বাইডেন বা হিলারি ক্লিনটনের মতো বয়স্ক নেতারা আবারও প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করতে আগ্রহী)। ডেমোক্র্যাটরা যদি পেলোসির মতো নেতাকে বসিয়ে দিতে চায়, তাহলে তা নির্বোধের পদক্ষেপ হবে। তাঁর কারণেই ওবামাকেয়ার পাস হয়। দুর্দান্ত ভোট গণনা করতে পারেন তিনি! তবে নতুন নেতৃত্ব খোঁজার কোনো বিকল্প নেই।

ট্রাম্প তাঁর অভিষেকের দিনই পুনর্নির্বাচন করার খায়েশের কথা জানিয়েছেন। পেলোসিকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পেলেও তিনি নির্বাচন করবেন। তবে ভবিষ্যতে তাঁর প্রতিবন্ধকতাগুলো অনেক বেশি কঠিন হবে।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচন থেকে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত রিপাবলিকানদের মুখ থেকে বাগাড়ম্বর প্রচুর বের হয়েছে। ট্রাম্পীয় টোন বহু ভোটারকেই আহত করে। তবে শেষ পর্যন্ত রিপাবলিকান ঘাঁটি এসব হজম করতে পেরেছে। যদিও শেষ দিকের জনসভাগুলোতে ট্রাম্প যেভাবে মিথ্যাচার করেছেন, তা ভুলতে মানুষের বহু সময় লেগে যাবে। এসব মিথ্যাচারে তাঁর যোগ্য সংগত করেছেন রুশ লিম্বাহ ও সিন হ্যানিটি। যুক্তরাষ্ট্রের দিকে যাওয়া অভিবাসনপ্রত্যাশী দলকে ‘দখলদারদের ক্যারাভ্যান’ হিসেবে অভিহিত করে তিনি দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তে হাজারো সেনা পাঠানোর হুমকি দেন, যদিও এ আশঙ্কার কোনো ভিত্তি নেই।

উটাহর সিনেটর মিট রমনি ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় জোর গলায় ট্রাম্পের প্রতিবাদ করেছিলেন। এবারও কি তিনি সেই ‘বিবেকের’ ভূমিকায় অবতীর্ণ হবেন? এই মধ্যবর্তী নির্বাচনের সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক অংশটি হচ্ছে, যে ধরনের কংগ্রেস প্রত্যাশিত, এটি ঠিক সেটিই দিতে সক্ষম হয়েছে। বহু নারী নির্বাচিত হয়েছেন, যদিও সিনেটে হেইডি হেইটক্যাম্প ও ক্লেইরে ম্যাকাস্কিল হেরে গেছেন। নিউ ইয়র্ক টাইমসের দেওয়া হিসাব অনুসারে, এবার রেকর্ডসংখ্যক নারী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। তাঁদের মধ্যে ৮৪ জন কৃষ্ণাঙ্গ। কলোরাডোর ভোটাররা জারেড পোলিসকে নির্বাচিত করেছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম স্বঘোষিত সমকামী গভর্নর।

সম্প্রতি নিউ ইয়র্ক রিভিউ অব বুকসে ক্রিস্টোফার ব্রোয়িং অসাধারণ ও দুশ্চিন্তা উদ্রেককারী একটি মন্তব্য করেন। তাঁর প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘গণতন্ত্রের ভাঙন : ১৯৩৩ বনাম ২০১৮’। সেখানে তিনি প্রশ্ন তোলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের তৈরি রাজনৈতিক সংকটের কারণে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ধ্বংস হয়ে যাবে কি না। গত মঙ্গলবারের পর এ প্রশ্নের জবাব সামনে আসতে শুরু করেছে, তেমন কিছু ঘটবে না।

 

লেখক : যুক্তরাষ্ট্রের লেখক ও সাংবাদিক। গার্ডিয়ানের কলামিস্ট

সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান

ভাষান্তর : তামান্না মিনহাজ



মন্তব্য