kalerkantho


ঐক্যফ্রন্টের অঙ্ক এবং পাগলাগারদের গল্প

৯ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



ঐক্যফ্রন্টের অঙ্ক এবং পাগলাগারদের গল্প

রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত কয়েকটা বাণী আছে খুব মজার। সবচেয়ে মজার বাণীটা হচ্ছে, ‘রাজনৈতিক বক্তব্য।’ ধরা যাক, একজন রাজনীতিক একটা মিথ্যা কথা বললেন, এরপর হাতেনাতে ধরা পড়লেন, একটুও বিব্রত না হয়ে অম্লানবদনে বলবেন, ‘ওটা ছিল রাজনৈতিক বক্তব্য।’ আর আশ্চর্য ব্যাপার, এই যুক্তিতে সবাই মেনেও নেয়; যার অর্থ মিথ্যা কথা বলা রাজনীতিতে পুরোদস্তুর জায়েজ।

দ্বিতীয় বাণীটা হলো, রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। আজ যাকে গাল দেবেন, কাল ওর সঙ্গে গলাগলি করতে আসবেন, কেউ কিছু বলতে এলে সামনে মেলে ধরবেন নির্লজ্জতার ঢাল, ‘রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই।’ শেষ কথা নেই বলে ওরা রং-তামাশা চালিয়েই যায়। আমরা সেই তামাশার দর্শক। তবু কিছু জিনিস হজম করা মুশকিল হয়। অনেকের কাছেই যেমন এটা হজম করা মুশকিল হচ্ছে যে ড. কামাল বিএনপির সঙ্গে মিলে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করবেন। ছোট্ট আরেকটা ব্যাপার হয়তো অনেকের চোখ এড়িয়ে গেছে। কিন্তু আমার ধারণা, সেটাই বরং বেশি বদহজমের। রাজনীতি থেকে স্বেচ্ছানির্বাসিত শমসের মবিন চৌধুরী বিকল্পধারায় যোগ দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায়। বেঁচে থাকলে তাঁর স্বপ্ন এবং চেতনার এই বহুগামিতা দেখে বঙ্গবন্ধু সম্ভবত ধাঁধায় পড়ে যেতেন।

এক নেতা বক্তৃতা দিচ্ছেন। ‘জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে...দেশের এই দুঃসময়ে...মানুষের এই দুর্বিপাকে...’ ইত্যাদি বলে বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলছেন। পাশ দিয়ে যেতে থাকা কৌতূহলী একজন জিজ্ঞেস করলেন, ‘আচ্ছা, উনি কতক্ষণ ধরে কথা বলছেন?’

‘তা প্রায় ঘণ্টাখানেক হবে।’

‘ঠিক কী বলতে চাইছেন?’

‘সেটা উনি এখনো পরিষ্কার করেননি।’

আমাদের নেতারা সম্ভবত এই গল্প জানেন না। জানলে কথাগুলো একটু ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে বলতেন। সংলাপ নিয়ে কথাবার্তা বলার সময় সরকারদলীয় লোকজন এমন স্পষ্টভাবে এর বিরোধিতা করেছেন যে ‘শেষ কথা নেই’ তত্ত্ব দিয়েও নিজেদের ঠিক আড়াল করা যাচ্ছে না। আগের দিন পর্যন্ত বড় বড় নেতা বললেন, ‘কিসের সংলাপ?’, ‘সংলাপে সময় নষ্ট করার সময়ই আমাদের নেই’ অথচ পরের দিন দেখা গেল, দলের নেত্রী সংলাপে মত দিয়েছেন। ওঁরা রাজনীতি করেন বলে কথাগুলো গিলতে পারলেন, অন্য কেউ হলে লজ্জায় মুখ ঢেকে ঘরে বসে থাকত।

জাভেদ ভাই একটু ভাবুকের মতো বলল, ‘এটা হচ্ছে ওয়ান-ইলেভেন ইফেক্ট।’

একটু বিরক্ত হয়ে বললাম, ‘এখানে আবার ওয়ান-ইলেভেন আসে কী করে? সেটা তো দূর অতীতের ব্যাপার।’

‘এই যে আগের দিন পর্যন্ত নেতারা সংলাপের বিরুদ্ধে বলে গেলেন, এর কারণ তাঁরা আসলে কিছুই জানতেন না। জানেনও না।’

‘বুঝলাম; কিন্তু এখানে ওয়ান-ইলেভেন আসে কী করে?’

‘এখানেই তো মজাটা। ওয়ান-ইলেভেনের সময় এই সব নেতার অনেকেই দলের নেত্রীর বিরোধিতা করে সংস্কারের চেষ্টা করেছিলেন। দুই দলের ক্ষেত্রেই কথাটা সত্য। কিন্তু দেখা গেল, অত বড় বড় নেতার পক্ষে কোনো সমর্থক নেই। তাতে প্রমাণিত হলো, আওয়ামী লীগ মানে শুধুই শেখ হাসিনা। বিএনপি মানে শুধুই খালেদা জিয়া। এর আগ পর্যন্ত এসব নেতার একটা শক্তি-সমর্থন আছে বলে বিশ্বাস করা হতো। নেত্রীরাও হয়তো তা-ই মনে করতেন। কিন্তু ওয়ান-ইলেভেনে প্রচণ্ড দুঃসময় কাটালেও তাঁরা বুঝলেন যে তাঁদের দলটা শুধুই তাঁদের। নেতাটেতা কোনো ব্যাপার না। সেই শিক্ষা নিয়ে এরপর নেতাদের আর তাঁরা বিশেষ গুরুত্ব দেন না। যা সিদ্ধান্ত নিজেরাই নেন। নেতাদের সেই অর্থে গুরুত্বই নাই।’

যুক্তি কিছুটা মানলাম। ওয়ান-ইলেভেন চেয়েছিল নেত্রীদের মাইনাস করতে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত আসলে ওদের আরো শক্তিশালী করে দিয়ে গেছে।

প্রসঙ্গ পাল্টে বললাম, ‘এসব বাদ দিয়ে আসল কথা বলো। এই যে ঐক্যফ্রন্ট, জোট—এটাকে তুমি কিভাবে দেখছ? অদ্ভুত না! ড. কামাল, কাদের সিদ্দিকী, মান্না, সুলতান মনসুরের মতো মানুষরা আজ বিএনপির সঙ্গে, আওয়ামী লীগের বিপক্ষে।’

‘হুঁ। এখানেও তো সেই ওয়ান-ইলেভেন! আওয়ামী লীগের বঞ্চিতরাই আজ বিএনপির হাল ধরছেন। কিন্তু যা-ই বলো, আমি কিন্তু দারুণ আশাবাদী। আমার কাছে মনে হচ্ছে, এই ঐক্যফ্রন্ট আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং এমনকি সত্যি বললে দেশের জন্যও দারুণ মঙ্গলজনক।’

‘কী!’ চমকে গিয়ে বলি, ‘অন্য সব বলো; কিন্তু দেশের জন্য ভালো—এটা বোলো না। এই দেশের কোনো রাজনৈতিক প্রক্রিয়া দেশের জন্য ভালো হবে—এটা শুনলেও হাসি পায়।’

‘তাহলে একটু বুঝিয়ে বলি।’

‘বলো, কিন্তু আমার ধারণা তুমি বোঝাতে ব্যর্থ হবে।’

‘আওয়ামী লীগের লাভ হচ্ছে, বিএনপির মিটিংয়ে এখন বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের কথা বলা হচ্ছে এবং বিএনপির সমর্থকরা সেটা একরকম মেনে নিচ্ছে। ভাবা যায়, সুলতান মনসুর মুজিব কোট পরে বিএনপির সমাবেশে বক্তৃতা দিচ্ছেন। জয় বাংলা স্লোগান হচ্ছে সেখানে। এটা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক জয়, বিএনপিকে তারা এখানে নিয়ে আসতে পেরেছে।’

‘তা-ই যদি হয়, তাহলে বিএনপির লাভটা কী?’

‘খালি চোখে ওদের লাভ হলো, সংলাপ হচ্ছে। সরকার তাদের দাবির বিষয়ে আর হিংস্র নয়। নির্বাচনে লড়ার একটা জায়গা পাচ্ছে আর তাদের যে জনপ্রিয়তা আছে, তাতে নির্বাচনে চমক দেখিয়ে ফেলাটাও সম্ভব। কিন্তু এর বাইরেও বড় একটা লাভ আছে ওদের। বিএনপির এই যে বঙ্গবন্ধুবিরোধিতা, মুক্তিযুদ্ধসহ অনেক মৌলিক বিষয়ে ওদের অস্পষ্ট অবস্থান—এগুলো দিয়ে পরের প্রজন্মের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়া যাবে না। গায়ে লেগে থাকা কাদাগুলো ঝেড়ে ফেলার একটা দারুণ সুযোগ। ড. কামাল-কাদের সিদ্দিকীরা সঙ্গে থাকলে জামায়াতকে ওদের ছাড়তেই হবে। আর বিএনপির এই শুদ্ধি করার কার্যক্রম ওদের ভবিষ্যতের জন্য লাভজনক।’

‘তা-ও যদি মেনে নিই, তাহলে দেশের কী লাভ?’

‘লাভ হলো—দুই বড় দল যদি মৌলিক বিষয়গুলোর ব্যাপারে একমত হয়ে যায়, তাহলে রাজনীতিতে অতীতনির্ভরতা কমবে। ধরো, বঙ্গবন্ধুর বিষয়টা বিএনপি মেনে নিলে, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে অবস্থান বদলে ফেললে সেটা নিয়ে আর আওয়ামী লীগ বা অন্য কেউ রাজনীতি করতে পারবে না। ইতিহাস নিয়ে কপচাকপচি বন্ধ হবে। তখন রাজনীতি হবে বর্তমান আর কর্মসূচিভিত্তিক। দেশের লাভ এটাই।’

‘কিন্তু ব্রাদার, বিএনপি তো এখন বিপদে বলে ড. কামালকে মানছে। নির্বাচনে জিতে গেলে তো এদের ঝেড়ে ফেলতে সময় নেবে না।’

জাভেদ ভাই রহস্য করে হাসে, ‘ব্রাদার! অঙ্কটা এত সহজ হবে না। অপেক্ষা করো, অনেক চমক আছে। খেলা এবার হবে অন্য রকম।’

অন্য রকম! ঠিক ভরসা পাই না। এ সব কিছুই তো হচ্ছে নির্বাচন ঘিরে। নির্বাচনে জেতার জন্য। এবং দুই দলের ২৫ বছরের শাসন দেখে নিশ্চিত হয়ে গেছি, এই ধারার নির্বাচনে ক্ষমতার মানুষ হয়তো বদলাবে, মানুষের ভাগ্য একফোঁটাও বদলাবে না।

ভোটের প্রচার চলছে একটা শহরে। নেতারা ‘আমি আপনাদের বাড়িতে আইফেল টাওয়ার বানিয়ে দেব’, ‘আমি সবাইকে আমেরিকার গ্রিনকার্ড পাইয়ে দেব’—এজাতীয় অবাস্তব সব প্রস্তাব দিয়ে দশ দিগন্ত মাত করে ফেলেছেন। তো যা-ই হোক, প্রচারাভিযানে একটা বড় বাড়িতে ঢুকতেই সবাই বেরিয়ে এলো। ‘এই যে ভোটের লোক এসে গেছে’ বলে তুমুল আলোড়ন। বক্তৃতায় মিনিটে মিনিটে হাততালি পড়ল। কিন্তু নেতা খেয়াল করলেন, কয়েকজন এর মধ্যেও চুপ করে বসে। একবারও হাততালি দেয়নি। নির্ঘাত এরা বিপক্ষের লোক। বক্তৃতা শেষে তিনি ধরলেন ওদের, ‘এই তোমরা হাততালি দিলে না কেন? তোমাদের কী লাগবে বলো?’

‘আমাদের কিছু লাগবে না।’

‘তোমরা তাহলে বিরোধী পক্ষের লোক?’

‘জি, না। কোনো পক্ষেরই না। আপনি যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন, সেটা হচ্ছে একটা পাগলাগারদ। যারা এতক্ষণ হাততালি দিল, এরা সব পাগল। আর আমরা হচ্ছি এই পাগলাগারদের প্রহরী। আমরা তো আর পাগল না যে ভোটের লোকের কথা শুনে হাততালি দেব। ভোট হচ্ছে পাগলদের জিনিস।’

আর আমরা এমনই পাগল যে ভোট এলে সব ভুলে জীবন দিয়ে দিই। এক পাগলাগারদেই আছি বটে!

লেখক : সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক



মন্তব্য