kalerkantho


ট্রাম্প কি অভিশংসনের পথেই হাঁটছেন

গাজীউল হাসান খান

২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



ট্রাম্প কি অভিশংসনের পথেই হাঁটছেন

পৃথিবীর প্রথম গণতান্ত্রিক নগররাষ্ট্র এথেন্সেই হয়তো কথাটা বলেছিলেন তিনি। প্রাচীনকালের সে সমাজ-চিন্তক ও দার্শনিক সক্রেটিস বলেছিলেন, ‘অপরীক্ষিত জীবন যাপনের উপযোগী নয়।’ তা ছাড়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শাসক নির্বাচিত হলেও তাঁর শাসন কল্যাণকামী না-ও হতে পারে। রাষ্ট্রের সুষ্ঠু ও সার্থক অগ্রগামিতা ও প্রশাসন পরিচালনার জন্য চাই অগ্রসর শ্রেণির নাগরিকদের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও চিন্তা-চেতনা। সে কালের অপর দার্শনিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্লুটোও সে ধ্যান-ধারণার সঙ্গে প্রায় একমত পোষণ করেছিলেন, তবে ভিন্নভাবে। রাজনৈতিক কিংবা প্রশাসনিক ক্ষেত্রে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাহীন বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচিত হয়েছিলেন তাঁর দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্বেতাঙ্গদের জনপ্রিয় ভোটে। কিন্তু সেই ব্যবসায়ী ট্রাম্প এখন রাষ্ট্র চালাতে পারছেন না তাঁর অভিজ্ঞতা, দক্ষতা এবং রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক চিন্তা-চেতনার ক্ষেত্রে দৈন্যের কারণে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে শ্বেত শ্রেষ্ঠত্ববাদী কিংবা বর্ণবাদীদের স্লোগান ক্রমেই এখন ফাঁকা বুলিতে পরিণত হচ্ছে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে জাতীয় আয় কিংবা কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে কিছুটা উন্নতি দেখা গেলেও বিশ্ববাণিজ্য, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বিশ্বব্যবস্থা ভেঙে দিয়ে ক্রমেই ট্রাম্প বিশ্বের অন্যতম প্রধান পরাশক্তি অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রকে একঘরে করে ফেলছেন। এতে মুক্তবিশ্বের নেতৃত্ব দানকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্র এখন কোন দিকে ধাবিত হচ্ছে আর মুক্তবিশ্বকেই বা কোথায় ঠেলে দিচ্ছে, তা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ইউরোপ ও আমেরিকায় উত্তর কোরিয়ার স্বৈরশাসক কিম জং উনের তুলনায় ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন অনেকের কাছে বেশি দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন। কারণ শুধু ব্যবসা-বাণিজ্য নয়, কূটনৈতিক, সামরিক ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দীর্ঘদিনব্যাপী গড়ে ওঠা একটি স্বীকৃত বিশ্বব্যবস্থা থেকেও ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছিলেন ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের অলীক স্বার্থচিন্তায় এ দেশকে তিনি অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলার প্রয়াস পেয়েছিলেন। তাঁর কথিত ‘একলা চলো’ নীতি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রীতিনীতি ও বিশ্বব্যবস্থাকে ভেঙে দিয়ে পর্যায়ক্রমে এক বিপর্যয় ও সুদূরপ্রসারী মন্দার দিকে সবাইকে ঠেলে দিতে শুরু করেছিল। সে অবস্থার এখনো অবসান ঘটেনি। তথ্যাভিজ্ঞ মহলের অনেকে মনে করেন, এ পরিস্থিতির পরিবর্তন এখন সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যক্তিগত অবস্থা কিংবা মনোভাব বদলের ওপর।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের একগুঁয়ে স্বভাবের জন্য বিগত ১৮ মাসের মধ্যে হোয়াইট হাউস প্রশাসন থেকে বিদায় নিতে হয়েছে অনেক নবীন ও প্রবীণ কর্মকর্তাকে। বিদায় নিতে হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রধান কর্মকর্তা থেকে শুরু করে প্রেসসচিবকে। এমনকি পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসনের মতো ভদ্রলোককেও। কিন্তু তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী ও গণযোগাযোগপ্রধান অমারুসা নিউম্যানের পদত্যাগকে কেন্দ্র করে হোয়াইট হাউসের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করে ভয়াবহ অনৈক্য, অবিশ্বাস ও পেশাদারিহীনতার এক করুণ চিত্র। হোয়াইট হাউস থেকে বেরিয়ে আসার আগে অমারুসাই ছিলেন সেখানে কর্মরত একমাত্র কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা। হোয়াইট হাউসের বাইরে দীর্ঘদিন ট্রাম্পের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিল অমারুসার। তিনি বলেছেন, ট্রাম্প তাঁকে অন্যায়ভাবে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছেন। অমারুসা ট্রাম্পকে একজন অভিজ্ঞতা ও দিকদর্শনহীন ব্যক্তি বলে উল্লেখ করেছেন। বলেছেন, ‘এ ব্যক্তি প্রশাসনিক নিয়ম-কানুনের বাইরে তাঁর খেয়ালখুশি অনুযায়ী কাজ করে যাচ্ছেন।’ ট্রাম্প প্রশাসন ও বর্তমান হোয়াইট হাউসের সাম্প্রতিক অবস্থা তুলে ধরে ‘আনহিনজড’ শিরোনামে একটি বই প্রকাশ করেছেন অমারুসা, যা আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সেই বইয়ে প্রকাশিত হোয়াইট হাউসে সংঘটিত অনেক ঘটনায় আঁতকে উঠেছে অনেক মার্কিন নাগরিক। হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের মনগড়া প্রশাসন পরিচালনা, বিভিন্ন বিভাগের প্রবীণ কর্মকর্তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার এবং সর্বোপরি সাউথ ব্লকের বিভিন্ন কর্মকর্তার মধ্যে বিরাজিত পারস্পরিক বিবাদ ও অবিশ্বাস, হোয়াইট হাউসে গুরুত্বপূর্ণ কাজের পরিবেশ ধ্বংস করেছে বলে অমারুসা অভিযোগ করেছেন। সেই বইয়ের জন্য ব্যক্তিগতভাবে অমারুসার তীব্র সমালোচনা করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অমারুসাকে ব্যক্তি হিসেবে মিথ্যাবাদী ও তাঁর প্রকাশিত বইয়ে মিথ্যার বেসাতি কিংবা অনির্ভরযোগ্য তথ্য ছড়ানোর জন্য অপবাদ দিয়েছেন ট্রাম্প। কিন্তু তত দিনে অমারুসার বই যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বব্যাপী বিক্রি হয়ে গেছে মিলিয়নের ওপর। এর প্রায় এক মাসের ব্যবধানে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত হয়েছে হোয়াইট হাউস সংক্রান্ত আরেকটি বোমা ফাটানো প্রতিবেদন। নাম-পরিচয় গোপন করে হোয়াইট হাউসের একজন প্রবীণ কর্মকর্তার লিখিত সেই ঘটনাবলি পুরো যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনকে সমূলে নাড়া দেয়। প্রশাসন পরিচালনায় ট্রাম্প ও তাঁর কর্মকর্তাদের মধ্যে বিরাজিত অনৈক্য, অবিশ্বাস, ভীতি এবং নিয়ম-শৃঙ্খলার অভাব দ্য টাইমস বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রবল চাপের মুখেও তারা সেই প্রতিবেদনের লেখকের নাম প্রকাশ করেনি। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন প্রবীণ কর্মকর্তার লেখা বেনামি প্রতিবেদনের জন্য লেখকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনা হলেও এ পর্যন্ত সেই কর্মকর্তাকে শনাক্ত করা যায়নি।

এসব কারণে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে এর মধ্যেই তাঁর ভাবমূর্তি হারিয়েছেন। কোনো কোনো সময় বিশ্বাস করতে অসুবিধা হয় যে একদিন এ গৌরবময় দেশের প্রেসিডেন্ট ছিলেন টমাস জেফারসন, আব্রাহাম লিংকন, রুজভেল্ট ও জন এফ কেনেডির মতো উঁচু মাপের শক্তিশালী নেতারা। গ্রামের অশিক্ষিত বদ মাতব্বরদের মতো দেশ পরিচালনা করছেন ট্রাম্প। এ অভিযোগ বিভিন্ন নেতৃস্থানীয় কর্মকর্তার। তাঁদের মতে, গায়ের জোর কিংবা নিজের স্বেচ্ছাচারিতামূলক খেয়ালখুশি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিশ্বের অন্যতম প্রধান পরাশক্তিকে পরিচালনা করতে যাওয়ার অর্থ হবে অত্যন্ত বিপর্যয়মূলক। কারণ বিশ্ববাণিজ্য, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিশ্বের এক নম্বর শক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত দুর্বল অর্থনীতি কিংবা উন্নয়নশীল দেশের ওপর অধিক কর চাপিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কিছুটা আয় বৃদ্ধি দেখানোয় কোনো কৃতিত্ব নেই। কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কিছু উন্নয়নশীল দেশকে টেনে ওপরে তোলার জন্য। বিশ্বকে ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও নিরক্ষরতামুক্ত করার জন্য। অথচ ডোনাল্ড ট্রাম্প চাচ্ছেন বহুপক্ষীয় বাণিজ্য, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডাব্লিউটিও), পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো এবং বিভিন্ন নেতৃস্থানীয় আন্তর্জাতিক সংস্থা ভেঙে দিতে। তাঁর ধারণা, এগুলোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে প্রচুর অর্থ বরাদ্দ কিংবা ব্যয় করতে হয়। সে কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্বেতাঙ্গ সম্প্রদায়ের বাহবা কুড়াতে গিয়ে তিনি তাদের ক্রমেই বর্ণবিদ্বেষী করে তুলছেন। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষ্ণাঙ্গ সম্প্রদায়ের নাগরিক অধিকার আন্দোলন থেকে শুরু করে বর্ণসাম্য আদায়ের ক্ষেত্রে যত অর্জন, তাতে ট্রাম্প বিশ্বাস করেন না। তাঁর ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্বেতাঙ্গ সঙ্গে থাকলে তাঁকে কেউ ক্ষমতাচ্যুত করতে পারবে না। সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি বলেছেন, ট্রাম্প গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের অর্থ বোঝেন না। যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টি আসলে কী, তা-ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের জানা নেই। অথচ তিনিই নির্বাচিত হয়ে গেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রকৃত গণতন্ত্র ও নাগরিক অধিকার আছে বলেই যে সেটি সম্ভব হয়েছে, তা ট্রাম্পের জানা উচিত—এ বক্তব্য এখন অনেকের।

চলমান পরিস্থিতিতে আগুনে আরো ঘৃতাহুতি দিয়েছেন ওয়াটারগেট-খ্যাত দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের সাংবাদিক বব উডওয়ার্ড। তাঁর সদ্য প্রকাশিত ‘FEAR : Trump in The White House’ বইটি। এই বই প্রকাশিত হওয়ার আগেই যুক্তরাষ্ট্রব্যাপী টেলিভিশন, পত্রপত্রিকাসহ বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে প্রবহমান ঝড়ের মাত্রা আরো বেড়ে যায়। হোয়াইট হাউস প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে কথোপকথনের ভিত্তিতে রচিত হয়েছে এই বই। এতে হোয়াইট হাউসে বিরাজমান পরিস্থিতির যে ভয়াবহ সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, সেটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন ও ভাবমূর্তির জন্য মোটেও স্বস্তিমূলক নয়। সেখানে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কন্যা ইভানকা ট্রাম্প ও তাঁর স্বামী জ্যারেড কুশনারের অপ্রত্যাশিত দাপট থেকে শুরু করে প্রশাসনিক ক্ষেত্রে বিরাজমান অপেশাদারি ও অবিশ্বাস এক ভয়াবহ পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত বেনামি প্রতিবেদনের জন্য এখন একে-অপরকে সন্দেহ করে যাচ্ছেন ক্রমাগতভাবে। ডোনাল্ড ট্রাম্প বব উডওয়ার্ডের মতো সাংবাদিকের প্রকাশিত বইয়ের বিভিন্ন তথ্যকেও মিথ্যা ও বানোয়াট বলে অভিহিত করেছেন। এতে সদ্য প্রকাশিত বইটির কাটতি আরো বেড়ে যাচ্ছে। বড় বড় বইয়ের দোকান এবং শপিং মলে এখন জনপ্রিয় পাঠ্য হিসেবে শোভা পাচ্ছে বব উডওয়ার্ড ও অমারুসা নিউম্যানের বই দুটি। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে অন্যদের প্রকাশিত ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্পর্কিত আরো কিছু বইপত্র। বব উডওয়ার্ড ও তাঁর সহকর্মী সাংবাদিক কার্ল বার্নস্টাইন সত্তরের দশকে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিক্সনের বিরুদ্ধে ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি উদ্ঘাটন করেছিলেন দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট দৈনিকে। আমেরিকার ৯ জন প্রেসিডেন্টের ওপর বই প্রকাশ করেছেন সাংবাদিক বব উডওয়ার্ড। তাঁর প্রকাশিত ১৯টি বইয়ের মধ্যে সর্বশেষ ‘FEAR : Trump in the White House’ ইতিমধ্যে যথেষ্ট জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। উডওয়ার্ড তাঁর বইয়ের একপর্যায়ে হোয়াইট হাউসের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে প্রেসিডেন্টের টেবিল থেকে ডকুমেন্ট চুরি হয়ে যাওয়ার ঘটনার উল্লেখ করেছেন। এতে দেখা যায়, হোয়াইট হাউসের স্টাফ সেক্রেটারি রব পোর্টার প্রেসিডেন্টের টেবিল থেকে ডকুমেন্ট গায়েব করেছেন। এর সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের সাবেক প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা গ্যারিকোনও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার উল্লেখ করেছেন। সার্লটভিলের সাম্প্রতিক বর্ণবাদবিরোধী সমাবেশে ডোনাল্ড ট্রাম্প বর্ণবিদ্বেষী নিউ নািসদের সমর্থন করার প্রতিবাদে গ্যারিকোন পদত্যাগ করেছিলেন। কোন ও পোর্টার বলেছেন, অনেক ক্ষতিকর ঘটনা রোধ করার জন্যই ট্রাম্পের টেবিল থেকে ডকুমেন্ট সরানো হয়েছিল। তা ছাড়া দাবি করা হয়, একবার সিরিয়ার স্বৈরশাসক বাশার আল আসাদকে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। কিন্তু সেই বিষয়টি নিরাপত্তার প্রশ্নে সামাল দিয়েছিলেন প্রতিরক্ষাসচিব জিম মাতিস। ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনাকাঙ্ক্ষিত অনেক সিদ্ধান্তকে অকার্যকর করতে সম্প্রতি প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা বিভিন্ন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিয়েছেন বলে বব উডওয়ার্ডের বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্টের পদ থেকে অপসারিত করার ব্যাপারে বিচার বিভাগীয় তদন্ত এবং যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস একটি বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে। বর্তমানে ট্রাম্পের ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাশিয়ার অবৈধ সাইবার হস্তক্ষেপ ও সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রবীণ আইনজীবী বরার্ট মুলারের বিশেষ কাউন্সিলে যে তদন্ত চলছে, তা প্রায় সমাপ্তির পথে। বর্তমানে ট্রাম্পের নির্বাচনকালীন প্রধান পল মানাফোর্টের দ্বিতীয়বারের মতো শুনানি শুরু হয়েছে মুলারের কাউন্সিলে। এতেও মানাফোর্ট দুটি বিষয়ে এরই মধ্যে দোষ স্বীকার করেছেন। আরো রয়েছে অনেক বিষয়। সেসব ব্যাপারে মানাফোর্ট কাউন্সিলের সঙ্গে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। এতে তাঁর সাজার পরিমাণ কমানোর আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। অন্যান্যের মধ্যে রুশ কূটনীতিকদের সঙ্গে নির্বাচন প্রচারাভিযানকালীন নিউ ইয়র্কের ট্রাম্প টাওয়ারে ট্রাম্পপুত্র ডোনাল্ড জুনিয়র ও জামাতা জ্যারেড কুশনারের বৈঠকের কথা ডোনাল্ড ট্রাম্প জানতেন কি না, ইউক্রেন থেকে মানাফোর্টের পাচার করা অর্থ নির্বাচনে ব্যয় হয়েছে কি না এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প কোনো আইনগত কাজে বাধা দিয়েছেন কি না সেসব ব্যাপারে এখন জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তবে ট্রাম্পের বিবাহবহির্ভূত অবৈধ সম্পর্কের ব্যাপারে মুখ বন্ধ করার জন্য যে দুজন নারীকে তাঁর সাবেক আইনজীবী মাইকেল কোহেন যে বিশাল অঙ্কের অর্থ প্রদান করেছেন, তা নির্বাচনী তহবিল থেকে বেআইনিভাবে দেওয়া হয়েছে বলে কোহেন স্বীকার করেছেন। এবং সে ব্যাপারে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য একজন নারী (স্টর্মি) তাঁর প্রস্তুতির কথা আগেই উল্লেখ করেছেন। বিশেষ কাউন্সিলে শুনানির এ পর্যায়ে অলৌকিকভাবে অনেক তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে, যা ট্রাম্পের বিরুদ্ধে সাংবিধানিকভাবে আইনগত ব্যবস্থা বা অভিশংসনের পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। কংগ্রেসে অভিশংসনের ব্যবস্থা নিতে হলে ট্রাম্পবিরোধী ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকতে হবে। তবে আশার কথা, পরিস্থিতি বর্তমানে যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডোমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করার সম্ভাবনা রয়েছে। আরেকটি হতে পারে, পরিস্থিতির চাপে ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করা। তবে সেটি ট্রাম্প করবেন কি না, তাতে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

উল্লিখিত ঘটনাবলির পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রবীণ আইন বিশেষজ্ঞ এবং নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র রুডি জুলিয়ানি বিশেষ আইন কাউন্সিলের প্রধান রবার্ট মুলারকে বারবার চাপ দিয়ে যাচ্ছেন, নভেম্বরের আগে যেন বর্তমানে চলমান সব তদন্ত শেষ করে দেওয়া হয়। কিন্তু রবার্ট মুলার সেই চাপের কাছে কতটুকু নতি স্বীকার করবেন সে সম্পর্কে বর্তমান অ্যাটর্নি জেনারেল জেফ সেশনস যথেষ্ট আশাবাদী নন। সুতরাং যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষ আশাবাদী যে বর্তমানে চলমান বিশেষ কাউন্সিলের তদন্তের মধ্য দিয়ে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে। বিশ্বের অন্যান্য শান্তিকামী এবং প্রগতিমনা মানুষের মতো যুক্তরাষ্ট্রের সভ্য সমাজও চায় ট্রাম্পের রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে অবিলম্বে বিদায়। কিন্তু সেটি শেষ পর্যন্ত কিভাবে সম্ভব হবে সেই অপেক্ষায় এখন সবাই।

লেখক : বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং ওয়াশিংটনস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের সাবেক মিনিস্টার

gaziulhkhan@gmail.com



মন্তব্য