kalerkantho


এশিয়া কাপ দলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ

ইকরামউজ্জমান

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



এশিয়া কাপ দলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ

ওয়ানডে বাংলাদেশ ভালো খেলে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সমীহ জানানো দল। নিজেদের দিনে যেকোনো দলকে পরাজয়ের সামর্থ্য রাখে। কিছুদিন আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে ওয়ানডে এবং টি-টোয়েন্টি সিরিজ জিতেছে। বিজয় সব সময় আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, আরো অনুপ্রাণিত ও উজ্জীবিত করে।

আজ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দুবাইয়ে এশিয়া কাপ ক্রিকেটের ১৪তম আসর শুরু হবে বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কার খেলার মধ্য দিয়ে। এশিয়া কাপ এবার ওয়ানডে ‘ফরম্যাটে’। খেলার ধরনটাও অন্যভাবে সাজানো হয়েছে। দুটি গ্রুপ থেকে সেরা দুটি দল করে মোট চারটি দল নিয়ে সুপার-৪ খেলা। এখানে একে অপরের বিপক্ষে খেলবে। রাউন্ড রবিন লিগ। শেষ পর্যন্ত সেরা দুটি দল খেলবে ২৮ সেপ্টেম্বর দুবাইয়ে ফাইনাল ম্যাচ।

ক্রিকেটীয় দৃষ্টিতে প্রতিপক্ষ দলগুলোর দলগত শক্তি, মাঠে খেলোয়াড়দের সফল ভূমিকা—এশিয়া কাপ বাংলাদেশ দলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ! বাস্তবতায় এখানে বড় স্বপ্ন দেখার সুযোগ তখনই হবে যখন গ্রুপ পর্যায়ে শ্রীলঙ্কা ও আফগানিস্তানের বিপক্ষে ‘মোমেন্টাম’ থেকে ভালো খেলে উতরাতে পারলে! এর জন্য নিজেদের সেরাটা দিতে হবে মাঠে। সুযোগ কাজে লাগাতে হবে, নতুবা সুপার-৪-এর সম্ভাবনার দরজা বন্ধ হয়ে যাবে।

এশিয়া কাপ আমাদের দলের জন্য একটি বড় সুযোগ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পারফরম্যান্সের মাধ্যমে দেশকে তুলে ধরার। তবে এ সব কিছুই নির্ভর করছে খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস, সাহস, মানসিক শক্তি, মাইন্ড সেট, ইতিবাচক মনোভাব ও মাঠে নিজেদের সামর্থ্য প্রয়োগের ওপর। সামর্থ্য আছে—বিশ্বাস করতে হবে সবাই মিলে ভালো খেললে, দায়িত্ব পালন করলে, দলে সাধ্যমতো অবদান রাখলে অবশ্যই প্রত্যাশা পূরণ সম্ভব। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ক্রমেই তীব্র প্রতিযোগিতামূলক হয়ে যাচ্ছে। এখানে  পারফর্ম এবং বিশ্বাসটাই জরুরি। ক্রিকেটে চাপ থাকবেই, কিভাবে ‘রিঅ্যাক্ট’ করতে হয়, এটা বোঝা ও শেখাটা গুরুত্বপূর্ণ। আত্মবিশ্বাসের আলো জ্বালিয়ে মুখ দিয়ে চ্যাম্পিয়ন হতে চাই বলার দিন শেষ হয়ে গেছে! এশিয়া কাপ নিয়ে এখনই অতি আত্মবিশ্বাসী হওয়ার কোনো কারণ নেই! আজ থেকে শুরু হওয়া এশিয়া কাপ রূঢ় বাস্তবতায় অনেক বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও শক্ত! এখানে হিসাব নির্ভর করবে মাঠে দলের পরিকল্পনা আর বাস্তবায়ন ও তীব্র ইচ্ছাশক্তির ওপর। আত্মপ্রত্যয়ী হওয়ার পাশাপাশি জয়ের ক্ষুধা।

এশিয়া কাপে ছয় দেশের মধ্যে (ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তান) পাঁচটি দেশ টেস্ট প্লেয়িং কান্ট্রি, একমাত্র হংকং ছাড়া। প্রতিটি দেশ খেলার মধ্য থেকে এবং প্রস্তুতি নিয়েই খেলতে এসেছে। ছন্দে থাকায় লড়াই হবে জমজমাট। এশিয়ার ক্রিকেটে প্রাধান্য প্রদর্শনের মঞ্চে গত ১৩ বারের মধ্যে ভারত শিরোপা জিতেছে ছয়বার, শ্রীলঙ্কা পাঁচবার আর পাকিস্তান দুইবার। বাংলাদেশ দুইবার ২০১২ ও ২০১৬ সালে রানার্স-আপ হয়েছে। ২০১৬ সালে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে খেলা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ঢাকায়।

বাস্তবতা হলো, এশিয়া কাপে আমাদের দল থেকে আরো ভালো দল আছে। তবে দলগত শক্তির পাল্লায় ব্যবধান খুব বেশি নয়। এ ক্ষেত্রে ভালো দায়িত্বশীল ক্রিকেট খেলতে পারলে, সিনিয়র-জুনিয়র (এই তরুণরা কেউ কেউ তিন-চার বছর ধরে ক্রিকেট খেলছেন) সবাই মিলে মাঠে ব্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিংয়ে যথাযথ ‘কন্ট্রিবিউট’ করতে পারলে এই পার্থক্য কমিয়ে আনা অবশ্যই সম্ভব। আর এতে সম্ভব হবে অনেক কিছুই। এশিয়া কাপে যারা খেলবে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাকে তো বাংলাদেশ একাধিকবার ওয়ানডে ক্রিকেটে পরাজিত করেছে দাপটের সঙ্গে। এশিয়া কাপে বড় দলের বিপক্ষে জয় হবে দারুণ অর্জন।

ভারত খুব ভালো দল। বিরাট কোহলি বিশ্রামে গেলেও ওয়ানডে দলের অন্য খেলোয়াড়রা আছেন। রোহিত শর্মার নেতৃত্বে দলটিকে ‘নিটোল দল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন বিশ্বকাপ জয়ী অধিনায়ক কপিল দেব। ব্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিং কোনো ক্ষেত্রেই ঘাটতি নেই। পেস ও স্পিন আক্রমণ খুবই শক্তিশালী। দলের ‘রিস্ট স্পিনার’ খুবই কার্যকরী। পাকিস্তানের পেস আক্রমণ খুবই শক্তিশালী। দলে ‘রিস্ট স্পিনার’ আছেন। আলোচনা হচ্ছে পাকিস্তান দলে ছয়জন পেস বোলার অন্তর্ভুক্তি নিয়ে। তাহলে কি দুবাই ও আবুধাবি উইকেট ‘ফ্ল্যান্টের’ পরিবর্তে এবার স্লোটি উইকেট হচ্ছে। দক্ষিণ আফ্রিকা ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ পরাজয়ের পর ভারতের লক্ষ্য এশিয়া কাপ জয়। পাকিস্তানের ১৬ জনের স্কোয়াডে এবার মোহাম্মদ হাফিজ ও ইমাদ ওয়াসিমের (ফিটনেসের অভাবে) জায়গা হয়নি। পাকিস্তান আগামীর চিন্তা মাথায় রেখে স্কোয়াড তৈরি করেছে।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে আজকের ম্যাচটি। আজ জিততে পারলে আগামী ২০ সেপ্টেম্বর (আবুধাবিতে) আফগানিস্তানের বিপক্ষে নির্ভার ক্রিকেট খেলা সম্ভব হবে! নতুবা মাঠের ক্রিকেট অনেক শক্ত মনে হবে। মনঃসংযোগ ধরে রাখার পাশাপাশি খেলা উপভোগ খুবই জরুরি। বিদেশের মাটিতে জিততে হলে ভালো ব্যাটিং ও কার্যকরী পেস বোলিং বড় প্রয়োজন।

অধিনায়ক অ্যাঞ্জেলা ম্যাথুসের শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে জিততে হলে পেস ও স্পিনের বৈচিত্র্যপূর্ণ আক্রমণকে সামাল দিয়েই জিততে হবে। দলে অভিজ্ঞ ফাস্ট বোলার লাসিথ মালিঙ্গাকে নেওয়া হয়েছে। ফিরেছেন দিলরুয়ান পেরেরা। আরো ফিরেছেন দানুস্কা গুলাতিলঙ্কাও। তবে শেষ পর্যন্ত টেস্ট দলের আফগানিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিতীয় খেলা ২০ সেপ্টেম্বর আবুধাবিতে। আফগানিস্তানের বড় শক্তি হলো তাদের স্পিনার রশিদ খান, মুজিব ও মোহাম্মদ নবী এবং খেলোয়াড়দের ভয়ডরহীন খেলা। এইতো কয়েক মাস আগেই ভারতের দেরাদুনে আফগানিস্তানের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজ ভীষণ বাজেভাবে হেরেছে বাংলাদেশ দল। এবার অবশ্য অন্য ফরম্যাটের খেলা। এখানে স্পিনারদের পরখ করে খেলার সুযোগ আছে। ‘রিস্ট স্পিন’ আফগানদের বোলিংকে সমৃদ্ধ করেছে। এশিয়া কাপে সব দেশেই ভালো রিস্ট স্পিনার আছেন। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে। সাকিব ও মেহেদী হলেন ফিঙ্গার স্পিনার। মোট কথা, বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের এশিয়া কাপে রিস্ট স্পিনারদের বুঝেশুনেই খেলতে হবে। প্রস্তুতি পর্বে বিষয়টি মাথায় নিয়ে কিছু কাজও করা হয়েছে।

দুবাই ও আবুধাবিতে উইকেটের আচরণ কেমন হবে? অতীতের পাল্লায় কিন্তু ফ্ল্যাট উইকেটের ভার বেশি! আর সেটাই যদি হয়, তাহলে কি একটা পর্যায়ে থেকে স্পিনাররা দাপট দেখাবেন! বাংলাদেশের গেম আক্রমণে মাশরাফি এখনো অপরিহার্য এবং সেরা। রুবেল ও মুস্তাফিজ আছেন। মুস্তাফিজ ধীরে ধীরে তাঁর পুরনো ফর্মে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। মুস্তাফিজ ছন্দ ফিরে পেলে বাংলাদেশের জন্য মাঠের কাজ সহজ হবে। পেস আক্রমণ থেকে বাংলাদেশ দলের স্পিন আক্রমণ অনেক বেশি কার্যকরী এবং ফলদায়ক। বিদেশে জেতার জন্য প্রয়োজন ভালো ব্যাটিং। ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ভালো গেম প্লেয়িং। গেম আক্রমণ বাংলাদেশ দলের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় দুর্বলতা! এ ক্ষেত্রে গত দুই বছরে কী করা হয়েছে সেটা দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না।

ভালো প্রস্তুতির কোনো বিকল্প নেই। প্রস্তুতি আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। নির্ভার হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামা সম্ভব হয়। সেরা খেলোয়াড় আর সাধারণ খেলোয়াড় সবার জন্য প্রস্তুতি অনুশীলন জরুরি। এ ক্ষেত্রে টিম ম্যানেজমেন্টের উচিত নয় কারো ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধার কথা চিন্তা করা।

১৬ সদস্যের স্কোয়াডে মমিনুলকে ‘ব্যাকআপ’ খেলোয়াড় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যদি ইনজুরির কারণে তামিম বা নাজমুল খেলতে না পারেন। ১৬ জনের সেরা স্কোয়াডই নির্বাচকরা দিয়েছেন। এ ছাড়া আর খেলোয়াড় কোথায়? যেকোনো স্কোয়াড নিয়ে কথা হতেই পারে। দলে বেশ কিছু সমস্যা তো এখনো আছে। তামিমের সঙ্গে ওপেনিংয়ে এখনো একজন জুতসই কাউকে সেট করা সম্ভব হয়নি। তিন নম্বরে আপাতত সাকিব খেলছেন। ভালোই খেলছেন। তিনি বলেছেন এই স্থানে খেলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। ছয়ে, সাতে এখনো নড়বড়ে অবস্থা। ‘টেল এন্ডাররা’ ব্যাটিংয়ে যতটুকু অবদান রাখার কথা, সেটা তাঁরা পারছেন না। এটা একটা বড় সমস্যা। নির্বাচকরা যখন স্কোয়াড তৈরি করেন তখন প্রতিপক্ষের অবস্থান এবং অনেক কিছু ভেবেই সিদ্ধান্ত নেন। এ ক্ষেত্রে প্রত্যেকের অবস্থান থেকে পারফরম্যান্স আশা করা হয়।

অভিজ্ঞ ও তরুণ খেলোয়াড়দের সংমিশ্রণেই বাংলাদেশ জাতীয় দল। ক্রিকেট দলীয় খেলা—সবার অবদান দলের জন্য প্রয়োজনীয়। এটা ভাবা উচিত নয়, অভিজ্ঞ পাঁচজন খেলোয়াড় খেলে পার করে দেবেন। দলের জন্য সবার দায়বদ্ধতা আছে। প্রত্যেককে মাঠে দায়িত্ব নিতে হবে। তা ছাড়া অভিজ্ঞ সিনিয়র খেলোয়াড়রা যে প্রতিটি খেলায় মাঠে জ্বলে উঠবেন এই গ্যারান্টি তো নেই। তাই সবাই মিলে খেলতে হবে, চেষ্টা করতে হবে। দলের কথা ভাবতে হবে। ক্রিকেট আশাবাদী মানুষদের খেলা। আমরা আশাবাদী মন নিয়ে তাকিয়ে থাকব দুবাই ও আবুধাবির মাঠের দিকে।

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক



মন্তব্য