kalerkantho


শুধু একবার বলুন : আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি

মোফাজ্জল করিম

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



শুধু একবার বলুন : আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র তিন মাস-সাড়ে তিন মাস বাকি। এই সময়ে সারা দেশ নির্বাচনী হৈ-হুল্লোড়ে মুখরিত হয়ে ওঠার কথা। কিন্তু কই, বাংলাদেশের শহর-বন্দর-গ্রাম কি সেইভাবে মেতে উঠেছে? দেখে তো মনে হয় না। মিটিং-মিছিল, জয়-জিন্দাবাদ ইত্যাদির বন্যা হয়ত নির্বাচনী তফসিল ও প্রার্থিতা ঘোষণার পর শুরু হবে; কিন্তু এই মুহূর্তে রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচি শুধুমাত্র বক্তব্য-বিবৃতির তীর ছোড়াছুড়ির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে সেটাই বা কেমন কথা। সরকারি দল অবশ্য সুযোগ পেলেই সভা-সমাবেশ করছে এবং সেগুলোতে শীর্ষ নেতৃবৃন্দ, এমনকি কখনো কখনো দলীয় প্রধানও অংশগ্রহণ করছেন। দিন কয়েক আগে দলের সাধারণ সম্পাদক দলবল নিয়ে উত্তরবঙ্গে ট্রেন-সফরও করে এসেছেন। হয়ত শিগগিরই দেশের অন্যান্য অঞ্চলে এ ধরনের ট্রেন-সফর, লঞ্চ-সফর, বাস-সফরের আয়োজন করা হবে। সরকারি দলের সুবিধা হলো, এ ধরনের সফর বা সভা-সমিতির জন্য তাদের কোনো অনুমতি নিতে হয় না কোনো কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে। এমনকি, ঢাকা শহরেও যখন খুশি যেখানে খুশি তারা সভা-সমাবেশ করতে পারেন। কিন্তু যত বায়নাক্কা, যত আপত্তি প্রধান বিরোধী দলের বেলায়। মিটিং-মিছিলের জন্য তাদের অনুমতি নিতে হয়। সেই অনুমতি দিচ্ছি-দেবো করে প্রায় সব ক্ষেত্রে শেষ মুহূর্তে প্রত্যাখ্যান করা হয়। এটা শুধু এক যাত্রায় পৃথক ফল নয়, একেবারে উল্টো ফল। নির্বাচনের প্রস্তুতিকালে কর্তৃপক্ষের এহেন আচরণ দেখে মনে হয় যেন ঢাকায় খেলতে আসা কোনো বিদেশি ক্রিকেট দলকে অনুশীলনের জন্য একটা ছোটখাটো মাঠও বরাদ্দ না করে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড নিজেদের দলের জন্য মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামটি সার্বক্ষণিকভাবে বরাদ্দ দিয়ে রেখেছে। এটা আর যাই হোক ‘ফেয়ার প্লে’ হতে পারে না। দিস ইজ নট ক্রিকেট।

এর মধ্যে সেদিন একটা ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনা লক্ষ্য করা গেল। ৮ কিংবা ৯ সেপ্টেম্বর রাতে টিভিতে বিএনপি’র সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে বলতে শোনা গেল, তারা ১০ তারিখ জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করার জন্য কর্তৃপক্ষের ‘মৌখিক’ অনুমতি পেয়েছেন। শুনে অনেক হতাশাবাদী পাবলিক নিশ্চয়ই ভেবেছেন : ‘মৌখিক অনুমতি? ওটা তো একটা কথার কথা। এই মানববন্ধন আর হবে না।’ কিন্তু না। মেট্রপলিটন পুলিশ কর্তৃপক্ষ এবার ‘ফর অ্যা চেঞ্জ’ হলেও তাদের কথা রাখলেন। বিএনপি জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ১০ সেপ্টেম্বর বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত এক ঘণ্টা কর্মসূচী পালন করল। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও টিভির ছবি দেখে মনে হলো, নামে মানববন্ধন হলেও প্রকৃতপক্ষে এটা একটা মিনি মানবসাগরে পরিণত হয়েছিল। ঢাকা শহরের আনাচ-কানাচ থেকে সকাল হতে না হতেই বিএনপির নেতাকর্মীরা এসে যোগ দেন মানববন্ধনে। কোনো বিশৃঙ্খলা ছাড়াই যথাসময়ে শেষ হয় মানববন্ধন। এতে বিএনপি ও ২০-দলীয় জোটের অনেক শীর্ষনেতা বক্তৃতা করেন।

এভাবেই যদি শেষ হয়ে যেত পুরো অনুষ্ঠান তা হলে সরকার ও পুলিশ প্রশাসনকে ‘ফুল মার্কস’ দিয়ে আমরা বলতে পারতাম, মৌলিক অধিকার ও গণতন্ত্রে বিশ্বাসী কর্তৃপক্ষ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগে একটি সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টির জন্য বোধ হয় আন্তরিক। কিন্তু হা হতোস্মি! যেখানে এই একটি সমাবেশ নির্বিঘ্নে করতে দিয়ে সরকার জিপিএ-৫ পেতে পারত, সেখানে অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে কিছু সাদা পোশাকধারী পুলিশ হঠাৎই জোশে এসে গিয়ে টপাটপ বেশ কিছু বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীকে আটক করে নিয়ে যায়। বিএনপি ঢাকায় আটককৃত ১৩৬ জনের নাম-পদবীসংবলিত তালিকাও সরবরাহ করেছে গণমাধ্যমকর্মীদের। দলটির অভিযোগ, সারা দেশে দুই শ’রও বেশি নেতাকর্মীকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে মানববন্ধন কর্মসূচী পালনকালে। আর ডিএমপি বলেছে, সুনির্দিষ্ট মামলার ৫৩ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে তারা। আটককৃত অনেককে নাকি যাচাই-বাছাই শেষে ছেড়ে দেওয়া হয়। আমাদের বক্তব্য হচ্ছে, এত সুন্দর সুশৃঙ্খল একটি অনুষ্ঠানের সফল সমাপ্তির জন্য তো পুলিশ প্রশাসন তথা সরকার অতি সহজেই বাহবা কুড়াতে পারত, বলতে পারত, কে বলেছে আমরা মিটিং-মিছিল করতে দেই না? কে বলেছে আমরা ধর-পাকড় করে দেশে একটা শ্বাসরুদ্ধকর, ভীতিপ্রদ পরিস্থিতি সৃষ্টি করছি? এই দেখুন, মানববন্ধন করতে এসে বিএনপি কেমন হাজার হাজার লোকের সভা-সমাবেশ করে ফেলল, আমরা তাদের গায়ে একটি টোকাও দিলাম না। কিন্তু না, এই অনাবশ্যক আস্ফাালন দেখাতে গিয়ে, এবং সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী দেশের অনেক স্থানে মানববন্ধন করতে না দিয়ে, সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার একটি ভালো সুযোগ বিনষ্ট করল পুলিশ। কেন রে বাপু, এই তথাকথিত ‘সুনির্দিষ্ট মামলায় অভিযুক্ত’ আসামিদের ওই সমাবেশ থেকেই গ্রেপ্তার করতে হবে কেন? এক দিন আগে বা এক দিন পরে করলেই তো দশ কেজি দুধে এই এক ফোঁটা গো-চোনা নিক্ষিপ্ত হয় না। বরং অশুদ্ধ মহাভারত আরো শুদ্ধভাবে লেখা যেত।

নাকি ১০ সেপ্টেম্বরে বিএনপি কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই প্রেস ক্লাবের সামনে যে মানববন্ধনরূপী শোডাউন করে এক ধরনের সামর্থ্য প্রদর্শন করল, তা দেখে কর্তৃপক্ষের ‘নার্ভাস সিনড্রম’ কিংবা জলাতঙ্ক দেখা দিল। তারা কি ভাবল, একে আর বাড়তে দেওয়া ঠিক হবে না। খবরদার! সমাবেশে গেছ কি মরেছ। শক্তি-সামর্থ্য দেখাতে চাও, দেখাও, তবে এখন না। আগে নির্বাচনটা পার হয়ে যাক ভালোয়-ভালোয়, তারপর যত খুশি নর্তন-কুর্দন কর। এখন বাঘের বাচ্চা হতে যেয়ো না, মার্জার শাবক হয়ে পল্টনের অফিসে ও প্রেস ক্লাবের সভাকক্ষে যেভাবে মিউ মিউ করছ, করতে থাক।

জানি না কর্তৃপক্ষের প্ল্যান-প্রোগ্রাম কী। তবে রূপকথার দৈত্যকেও অনন্তকাল বোতলবন্দি করে রাখা যায় না। দৈববলেই হোক আর ‘অদৃশ্য শক্তির মদদেই’ হোক দৈত্য বেরিয়ে পড়লেই বিপদ। আর যেকোনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আমরা দৈত্য মনে করতে যাব কেন? তারা বড়জোর একটি পরাশক্তি হতে পারে; কিন্তু নিশ্চয়ই কোনো অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন কেউ নয় যে ময়দানে নামার আগেই তারা যুদ্ধে জয়লাভ করবে। আর রাজনীতির যুদ্ধে জয়-পরাজয়ের নিয়ামক আসলে কে? যতই পেশীশক্তির প্রদর্শনী, অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি ও কালো টাকার রমরমানি থাকুক না কেন, জনগণ সঙ্গে না থাকলে সব ফক্কা। আর ভোটের খেলায় জনগণই তো মেসি, রোনালদো এবং নেইমার। তবে হ্যাঁ, তাদের খেলতে দিতে হবে। তাদের সাইড-লাইনে বসিয়ে রাখলে চলবে না। অথবা নানা ছুতা-নাতায় খেলার নিয়ম-কানুন বদলালে, মাঠে অহেতুক গোলযোগ সৃষ্টি করলে চলবে না। খেলা হতে হবে সত্যিকার অর্থে একটি ‘ফেয়ার প্লে’।

দুই.

২০১৩-১৪ সালের সম্পূর্ণ অনভিপ্রেত অভিজ্ঞতার পর এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে সব মহলই সতর্ক। ৫ জানুয়ারি ২০১৪ সালের নির্বাচন যে একটি অগ্রহণযোগ্য নির্বাচন ছিল, তা আজ সর্বজনস্বীকৃত। ওই নির্বাচনে দেশ একটি জাতীয় সংসদ পেয়েছিল ঠিকই; কিন্তু সেই সংসদে দেশের সব মানুষ তাদের পছন্দের প্রতিনিধি প্রেরণ করতে পারেনি। সংসদের অধিকাংশ আসনে ভোটই হয়নি। ফলে ওই নির্বাচন বিধিসম্মত হলেও নৈতিকতার মানদণ্ডে তা ছিল ত্রুটিপূর্ণ। এর জন্য কে দায়ী, কে দেশের অর্ধেকেরও বেশি ভোটারকে তাদের ভোট প্রদানের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করল, এর ফলে কাদের কারণে দেশের ভাবমূর্তি বিনষ্ট হলো–এসব তর্ক গত চার বছরের অধিককাল ধরে অনেক হয়েছে। ওসব কাসুন্দি আপাতত আর না ঘেঁটে একটা সর্বজনস্বীকৃত সত্যের উল্লেখ করে আমরা আগামী নির্বাচনটি যাতে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়, সে ব্যাপারে সচেষ্ট হতে সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের তাছে সবিনয় আবেদন রাখব। আর সেই সত্য কথাটি—যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও সরাসরি না হলেও পরোক্ষভাবে স্বীকার করেছেন—হচ্ছে এই : ২০১৪ সালের নির্বাচন ছিল একটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই বলেও জাতিকে আশ্বস্ত করেছেন যে আগামীতে আর ওই ধরনের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন হতে দেওয়া হবে না। আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কথায় সম্পূর্ণ আস্থা রাখতে চাই। আর সেই সঙ্গে তাঁর আশ্বাসের প্রতিফলন দেখতে চাই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে।

এখানে প্রাসঙ্গিক বলেই উল্লেখ করা বাঞ্ছনীয় যে বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও সামাজিক দিক দিয়ে নজরকাড়া উন্নতি লাভ করেছে। যে বাংলাদেশকে ১৯৭১ সালে জন্মের পর থেকেই ঠাট্টা-তামাশা ও বিদ্রূপের কশাঘাত সহ্য করতে হয়েছে, হেনরি কিসিঞ্জারের মত এক দাম্ভিক মার্কিন মন্ত্রী যুদ্ধবিধ্বস্ত যে দেশটিকে আখ্যা দিয়েছিলেন ‘তলাহীন ঝুড়ি’, সেই বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের রোল মডেল। আজ যখনই দারিদ্র্যক্লিষ্ট জনগণের ভাগ্যোন্নয়নের কথা ওঠে, সমস্যাসঙ্কুল অর্থনীতিতে উত্তরণের পথ খোঁজেন বিশ্বের তাবড় তাবড় অর্থনীতিবিদরা, তখনই উদাহরণ হয়ে সামনে আসে বাংলাদেশের নাম। আজ যে আমাদের এই অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিস্ময় সৃষ্টিকারী অগ্রযাত্রা, তা এক দিনে সাধিত হয়নি; স্বীকার করতে হবে, স্বাধীনতার পর থেকে অনেক বাধা-বিপত্তি পার হয়ে, অনেক প্রতিকূলতা জয় করে ক্রমে ক্রমে আমরা এগিয়ে গিয়েছি আমাদের অগণিত কৃষক-শ্রমিক-মজুর ও সৎ, নিষ্ঠাবান কর্মীবাহিনীর কারণে। তারা মাঠে-ময়দানে, কলে-কারখানায়, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিরলসভাবে তাদের শ্রম দিয়ে গেছেন বলেই আজ বাংলাদেশ একটি সম্মানজনক অবস্থানে পৌঁছতে পেরেছে। লাখ লাখ তরুণ কর্মী বিদেশের প্রতিকূল পরিবেশে জীবন বাজি রেখে কাজ করছেন শুধু নিজেদের আর্থিক উন্নতির জন্য নয়, দেশকে অর্থনৈতিকভাবে উন্নত করার জন্যও বটে। আর রাজনৈতিক নেতৃত্ব? অবশ্যই অনেক সীমাবদ্ধতা, অনেক দুর্বলতা সত্ত্বেও কমবেশি সব সরকার বিভিন্ন সময়ে নানা সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছেন বলেই কৃষি-শিল্প-বাণিজ্য যোগাযোগ প্রভৃতি উন্নয়ন খাতে দ্রুত অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে। তবে চাঁদে যেমন কলঙ্ক আছে আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বে তেমনি দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, লোভ-লালসা ও কলহপ্রিয়তার কালিমা যে যথেষ্টই আছে তা অনস্বীকার্য। এগুলো উন্নত-অনুন্নত সব দেশের রাজনীতিতেই অল্প-বিস্তর আছে, এগুলো থাকবেই, কারণ মানুষ তো আর ফেরেশতা নয় যে সে পাপের পথে একেবারেই পা বাড়াবে না। তবে আমাদের এই অনুন্নত গরিব দেশে এর মাত্রাটা একটু বেশি, এটাই দুঃখ।

তিন.

এখন একটা কথা সবাই স্বীকার করেন, আমরা অর্থনৈতিকভাবে যতটা এগিয়েছি বা এগিয়ে যাচ্ছি, রাজনৈতিকভাবে দিন দিন ততটা বা তার চেয়ে বেশি পিছিয়ে যাচ্ছি। স্বাধীনতার প্রায় অর্ধ শতাব্দী পার হতে চলল, এখনো আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে অস্থিরতা গেল না। বরং নানা ইস্যুতে-নন ইস্যুতে প্রতিনিয়ত আমাদের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অস্থিতিশীলতা বাড়ছে। এর একটা প্রধান কারণ বোধ হয় আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর নিজেদের দলীয় ও ব্যক্তিগত অগ্রাধিকারগুলোকে (স্বার্থ শব্দটি ব্যবহার করলাম না, ওটা কিছুটা গালমন্দের মত শোনায়) জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া। আমরা একটি হরতাল ডাকা, গাড়ি পোড়ানো, কোনো নির্মাণকাজ বা কোনো পদে লোক নিয়োগের বেলায় জাতীয় বা রাষ্ট্রীয় উচিত-অনুচিত বিচার না করে এতে রাজনৈতিক ফায়দা বা ব্যক্তিগত লাভ-লোকসানের কথা আগে ভাবি। তেমনি আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোনো ঐকমত্যের ক্ষেত্রও নেই বললেই চলে। ‘ক’ দল যদি বলে সূর্য পূর্ব দিকে ওঠে, ‘খ’ দলকে যেন বলতেই হবে, না, সূর্য পশ্চিম দিকে ওঠে। সেই সঙ্গে পরমতসহিষ্ণুতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, অতি সামান্য সৌজন্য ও বিনয় প্রকাশ যেন দিন দিন নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল হয়ে যাচ্ছে। আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এসব বৈশিষ্ট্য কি আরো প্রকট হয়ে উঠবে আমাদের রাজনীতিতে? ভাবেসাবে তো তাই মনে হয়।

আমাদের নির্বাচনে পরাজয় বলে কোনো কিছু থাকতে পারবে না—এটাই যেন বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মূলমন্ত্র। এতে ‘মারি অরি (শত্রু) পারি যে কৌশলে’, ‘এভরিথিং ইজ ফেয়ার ইন লাভ অ্যান্ড ওয়ার,’ ‘বাই মিনস্ ফেয়ার অর ফাউল’—এসব কথাই যেন শেষ কথা। অতএব, নির্বাচনে জিততে হলে সর্বাগ্রে চাই ৫০টি হোন্ডা ও ১০০টি গুণ্ডা, আর সেই সঙ্গে এক বস্তা কালো-ধলো টাকা। নির্বাচনের এই সনাতনী ফর্মুলা আগেও ছিল, এখনো আছে। এবং যত দিন সব খোল-নলচে পাল্টে সুশাসন, মানবাধিকার ও সাধারণ মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত না হচ্ছে, তত দিন বোধ হয় এই ফর্মুলার বাইরে যাবে না নির্বাচন।

চার.

নিবন্ধটি এমন হতাশার সুর দিয়ে শেষ করতে চাই না। কারণ আমি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি, আমাদের যেসব রাজনৈতিক নেতা-নেত্রী দেশকে আজ অর্থনৈতিক উন্নতির শিখরে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছেন, তাঁরা আন্তরিকভাবে চাইলেই রাজনৈতিক বিপর্যয় থেকে দেশকে রক্ষা করতে পারেন। আর এটা তাঁদের করতে হবে দেশের ১৭ কোটি মানুষের মুখের দিকে তাকিয়ে, আমাদের সবার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা ভেবে। ২০২১ কিংবা ২০৩০, ২০৪১ ইত্যাদি নিয়ে আপনারা জাতিকে অনেক স্বপ্ন দেখাচ্ছেন, তার জন্য আপনাদের অসংখ্য ধন্যবাদ। আল্লাহ আপনাদের সহায় হোন। কিন্তু অদূর ভবিষ্যতে যদি জাতি শতধাবিভক্ত হয়ে পড়ে, যদি আমরা একজন আরেকজনের বুকে ছুরি মারার খেলায় মেতে উঠি, তাহলে কোথায় যাবে সব স্বপ্ন, সব সাধ-আহ্লাদ? তখন তো কবরে গিয়েও আপনি-আমি শান্তিতে থাকতে পারব না। হয়ত আক্ষেপ করব, হায়, কেন সময় থাকতে আমরা এই সোনার দেশটার পতন ঠেকানোর উদ্যোগ নিলাম না!

তাই বলি, এখনো সময় আছে, আপনারা যাঁরা জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে ১৭ কোটির ভাগ্যনিয়ন্তা হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে, তাঁরা আপনাদের নিজেদের মঙ্গলের জন্য, জাতির মঙ্গলের জন্য, সর্বোপরি ভবিষ্যতের বাংলাদেশের কথা ভেবে দুর্যোগ প্রতিরোধের প্রত্যয় নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসুন, বলুন, যে কোনো মূল্যে আমরা ওই ঈশান কোণে ঘনিয়ে আসা প্রলয়কে ঠেকাবই, ১৭ কোটি মানুষের মন থেকে সব শঙ্কা দূর করবই। কারণ আমরা রাজনীতিবিদ, আমরা রাজনীতি করি মানুষকে স্বস্তি দেওয়ার জন্য, শান্তি দেওয়ার জন্য বা তাদের মনে শঙ্কা সৃষ্টি করার জন্য নয়, তাদের জীবনে অশান্তির দাবানল সৃষ্টি করার জন্য নয়।

আপনাদের মুখ থেকে দেশবাসী শুনতে চায়, আপনারা দয়া করে বলুন : আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে শান্তিপূর্ণ, অবাধ, সুষ্ঠু, সুন্দর ও সবার অংশগ্রহণমূলক। দেশবাসী আপনারা নিশ্চিন্ত থাকুন, আমরা আমাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবই। কারণ, আমরা আপনাদের ভালোবাসি, যেমন ভালোবাসি এই দেশকে। ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’—এটা শুধু আমাদের কণ্ঠনিঃসৃত সঙ্গীতই নয়, এটা আমাদের অন্তরের প্রার্থনা।

লেখক : সাবেক সচিব, কবি

mkarim06@yahoo.com



মন্তব্য