kalerkantho


‘তালেবান খান’ এবং কানাডার ইসলামীকরণ

অঙ্কিত শ্রীবাস্তব

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



‘তালেবান খান’ এবং কানাডার ইসলামীকরণ

সাম্প্রতিক বিবাদের সূত্রে অটোয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে রিয়াদ। ভেতরের মারপ্যাঁচ না বুঝেই নতুন ইসলামপন্থী প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের নেতৃত্বে এ বিবাদে নাক গলিয়েছে পাকিস্তান। নিজেদের আন্তর্জাতিক কূটনীতির নতুন খেলোয়াড় ভাবছে তারা। কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টিয়া ফ্রিল্যান্ডের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অভিযোগ এনেছে পাকিস্তান। বাস্তবতা হলো, তারা কানাডার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করছে সে কাজ নিজেরাও করেছে। কানাডার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের পুরস্কারও পেয়ে গেছে তারা। আর্থিক সংকটে জর্জরিত পাকিস্তানকে ১০০ কোটি ডলারের সহায়তা দিয়েছে সৌদি আরব।

সম্প্রতি টরন্টোতে এক পাকিস্তানি কূটনীতিক পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত কানাডীয় সাংবাদিক তারেক ফাতাহকে ‘সুস্থ’ করে তোলার হুমকি দিয়েছেন। অর্থাৎ তাঁর মুখ বন্ধ করার ব্যবস্থা করা হবে। কানাডার গোয়েন্দা কার্যক্রম বিশেষজ্ঞ টম কুইগিন সম্প্রতি পাকিস্তানি হাইকমিশনার এবং নাম না জানা এক সাংবাদিকের টেলিফোন আলাপ ইউটিউবে প্রকাশ করেছেন। তিনি সিনেট এবং এয়ার ইন্ডিয়ার তদন্ত কমিটিতেও সাক্ষ্য দিয়েছেন। বিস্ময়করভাবে একজন বিদেশি কূটনীতিক কানাডার নাগরিককে শুধু অপমান করা নয়, দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের হুমকি দিলেন। এই কূটনীতিক ইলেকট্রনিক মিডিয়ার আরেক সাংবাদিকের ওপরও চড়াও হন। অন্যদিকে কানাডার পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত উদারপন্থী পার্লামেন্ট সদস্য ইকরা খালিদ ইসলামভীতি দূরীকরণ বিষয়ক বিল ‘এম১০৩’ নিয়ে তৎপর। ইসলামীকরণের বিরুদ্ধে নাগরিক অবস্থানকে পাশ কাটিয়ে ইসলামী প্রচারণা অব্যাহত রাখার ব্যবস্থা করাই এ বিলের উদ্দেশ্য। ইমরান খান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর পাকিস্তানের ‘মোল্লা-মিলিটারি মাফিয়া’ আরো শক্তিশালী হয়েছে। প্রসঙ্গত, ইসলামপন্থী ও জঙ্গিদের প্রতি দুর্বলতার কারণে ইমরান ‘তালেবান খান’ নামেই বেশি পরিচিত।

কানাডায় পাকিস্তানি কূটনীতিক ও পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত পার্লামেন্ট সদস্যদের রাজনৈতিক ইসলাম কায়েমে অতি উৎসাহের বিষয়টি এর মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কানাডীয়রা সত্যিকার অর্থেই নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। কারণ তাদের রাজনীতিকরা ধর্মনিরপেক্ষতা ও বহুজাতিক সংস্কৃতির আবরণে উগ্র রাজনৈতিক ইসলাম প্রবর্তনে সহায়তা করছে। ভিক্টোরিয়া থেকে স্যার জন ম্যাকডোনাল্ডের ভাস্কর্য অপসারণ এবং উইনিপেগের একটি পার্ক পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা জিন্নাহর নামে উৎসর্গ করায় কানাডীয়দের মরমে আঘাত লেগেছে।

অটোয়ার পাকিস্তানি হাইকমিশন এক উন্মুক্ত ই-মেইলে পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত কানাডীয়দের বলেছে যে কানাডার এক জাতীয়তাবাদী পার্লামেন্ট সদস্য দেশটির ‘বৈচিত্র্য ও বহুজাতিক সংস্কৃতি’র জন্য হুমকি হয়ে উঠেছেন। ইসলামপন্থীরা যখন কাশ্মীর থেকে নির্দয়ভাবে পণ্ডিতদের বের করে দেয় এবং পাকিস্তান এতে সমর্থন জোগায় তখন তাদের এই বহুজাতিকতা কোথায় থাকে? হাজার বছর ধরেই কি কাশ্মীর বহুজাতিক সংস্কৃতির আবাস নয়? ভারতে নিযুক্ত পাকিস্তানের সাবেক হাইকমিশনার বাসিত আলী প্রকাশ্যে কাশ্মীরি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিতেন, তাদের তহবিলের জোগান দিতেন। গণতান্ত্রিক অধিকারের সুযোগ নিয়ে এসব অপকর্ম করেছেন তিনি। এখন পাকিস্তান নসিহত করছে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার জন্য।

রাস্তার বখাটেদের মতো আচরণ করছে পাকিস্তান। একটি ভদ্রসমাজে বসবাসের উপযুক্ত আচরণ অবশ্যই পাকিস্তানকে শিখতে হবে; এটি অপরিহার্য। জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের প্রতি পাকিস্তানের অব্যাহত সমর্থনে হতাশ হয়ে সম্প্রতি ওয়াশিংটন তাদের ‘জোট সমর্থন তহবিল’ থেকে ইসলামাবাদের জন্য বরাদ্দ করা প্রায় ৩০ কোটি ডলার প্রত্যাহার করেছে। উদার গণতন্ত্রের ধারক ও বাহক হিসেবে জাস্টিন ট্রুডো হয়তো খুবই গর্ববোধ করছেন। তবে কানাডাকে একসময় এ গর্বের জন্য মূল্য দিতে হবে। একসময় ইউরোপীয়রাও এমন নীতি অনুসরণ করেছিল। তাদের চরম বিপর্যয় মেনে নিতে হয়েছে। ইসলামপন্থী জিহাদিদের দংশনে তারা কঠিন শিক্ষা পেয়েছে; এবার কানাডার পালা। ইউরোপের অভিজ্ঞতার তিক্ত স্বাদ নেবে কানাডা।

ভারতীয় উপমহাদেশের কট্টরপন্থী মুসলমানরা অমুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি দেশে বাস করাকে ঠিক ইসলামসম্মত মনে করে না। তারা সেখান থেকে একটি ‘নিজস্ব মুসলিম রাষ্ট্র’ কেটে বের করতে চায়। তাহলে কেন তারা পাকিস্তান ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্র বা কানাডার মতো খ্রিস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে আরাম-আয়েশের জন্য ছোটে?

শুধু আলোকিত সমাজেই উদারপন্থী গণতন্ত্রের চর্চা সম্ভব।

যখন ধর্ম সমাজকে শাসন করে, তখন মানুষ শতাব্দী-প্রাচীন এক সময়কে আঁকড়ে পড়ে থাকে। তারা সময়ের সঙ্গে বেড়ে উঠতে পারে না, সমসাময়িকতার সঙ্গে নিজেদের খাপ খাওয়াতে পারে না। উদারপন্থা শুধু নিজের সন্তানদেরই অর্থাৎ উদারপন্থীদের জীবন-জীবিকার উপকরণ জোগায়, অন্য কাউকে নয়। ইউরোপে যা ঘটে গেছে তা থেকে স্পষ্ট, উদারপন্থা কট্টরপন্থী মুসলমানদের সঙ্গে সহাবস্থান করতে পারে না। কারণ উদারপন্থাকে গিলে ফেলে ইসলামী কট্টরপন্থা।

কানাডার কয়েক দশক লেগে যাবে এই তিক্ত সত্য অনুধাবন করতে। পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, তত দিনে অনেক দেরি হয়ে যাবে। তাহলে কি আমরা ‘কানাডা ইসলামী প্রজাতন্ত্র’ শিরোনামের একটি উম্মাহ প্রকল্পের প্রত্যক্ষদর্শী হতে যাচ্ছি?

লেখক : এডিটর-ইন-চিফ, নিউ দিল্লি টাইমস

সূত্র : নিউ দিল্লি টাইমস

ভাষান্তর : তামান্না মিনহাজ



মন্তব্য