kalerkantho


গবেষণায় সাফল্য, রক্ষায় ব্যর্থতা!

ড. হারুন রশীদ

১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



গবেষণায় সাফল্য, রক্ষায় ব্যর্থতা!

ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ। স্বাদে-গন্ধে অতুলনীয় এই মাছ নিয়ে তাই বাঙালির রয়েছে দুর্নিবার এক আকর্ষণ। ইলিশ শুধু রসনাই তৃপ্ত করছে না। ইলিশ নিয়ে হচ্ছে বিস্তর গবেষণাও। বাংলাদেশে গবেষণার ক্ষেত্রটি সুবিস্তৃত নয়। তবু সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে বাংলাদেশি গবেষক ও বিজ্ঞানীরা দেশে-বিদেশে নানা ক্ষেত্রে অবদান রাখছেন। পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দসহ আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা গেলে নতুন নতুন উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে তারা যে আরো কৃতিত্বের প্রমাণ দিতে পারবেন তার প্রমাণ এরই মধ্যে পাওয়া গেছে।

এবার ইলিশের জীবনরহস্য উদ্ভাবন করে বাংলাদেশি বিজ্ঞানীরা ইলিশ গবেষণায় অনেক দূর এগিয়ে গেলেন। চারদিক থেকে যখন নানামুখী দুঃসংবাদ আর নেতিবাচক ঘটনার সমারোহ তখন ইলিশের জিনরহস্য উদ্ভাবনের বিষয়টি নিঃসন্দেহে দেশবাসীর জন্য একটি বড় সুসংবাদ। এর আগে তোষা পাটের জীবনরহস্য উন্মোচনের পর দেশীয় পাটের জীবনরহস্যও উদ্ভাবন করেছেন আমাদের দেশের এক দল মেধাবী বিজ্ঞানী। বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলম ও তাঁর দল তোষা পাটের জীবনরহস্য উন্মোচন করে ২০১০ সালে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১২ সালে উন্মোচন করে ছত্রাকের জীবনরহস্য।

পাটের এই জিন নকশা (জিনোম সিকোয়েন্সি) উদ্ভাবনের ফলে এসংক্রান্ত গবেষণায় পূর্ণতা পেয়েছে বাংলাদেশ।

পাটের পর এবার ইলিশ গবেষণায়ও সাফল্য পেলেন বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) ফিশারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিকস বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সামছুল আলমের নেতৃত্বে এ গবেষণা করা হয়। আর এ গবেষণায় বিশ্বে প্রথমবারের মতো উন্মোচিত হয়েছে ইলিশ মাছের পূর্ণাঙ্গ জীবনরহস্য।

৮ সেপ্টেম্বর শনিবার গবেষকদলের প্রধান অধ্যাপক ড. মো. সামছুল আলম গণমাধ্যমকে বলেন, ২০১৫ সালের ডিসেম্বর থেকে দুই বছর গবেষণার পর এ সাফল্য পেয়েছেন তাঁরা। প্রথমে দেশের বঙ্গোপসাগর ও মেঘনা থেকে পূর্ণবয়স্ক ইলিশ মাছ সংগ্রহ করেন। এরপর বাকৃবি ফিশ জেনেটিকস অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি এবং পোল্ট্রি বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জিনোমি ল্যাবরেটরি থেকে সংগৃহীত ইলিশের উচ্চ গুণগত মানের জিনোমিক ডিএনএ প্রস্তুত করা হয়।

পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের জিনউইজ জিনোম সিকোয়েন্সিং সেন্টার থেকে সংগৃহীত ইলিশের পৃথকভাবে প্রাথমিক জিনোম তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সার্ভার কম্পিউটারে বিভিন্ন বায়োইনফরম্যাটিকস প্রগ্রাম ব্যবহার করে সংগৃহীত প্রাথমিক তথ্য থেকে ইলিশের পূর্ণাঙ্গ ডি-নোভো জিনোম সিকোয়েন্স বা জীবনরহস্য আবিষ্কার করা হয়।

‘জিনোম’ হচ্ছে কোনো জীব প্রজাতির সব বৈশিষ্ট্যের নিয়ন্ত্রক। অন্য কথায় জিনোম হচ্ছে কোনো জীবের পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। জীবের অঙ্গসংস্থান, জন্ম, বৃদ্ধি, প্রজনন এবং পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াসহ সব জৈবিক কার্যক্রম পরিচালিত হয় এর জিনোমে সংরক্ষিত নির্দেশনা দ্বারা। পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্সিং হচ্ছে কোনো জীবের জিনোমে সব নিউক্লিওটাইড কিভাবে বিন্যস্ত রয়েছে, তা নিরূপণ করা। একটি জীবের জিনোমে সর্বমোট জিনের সংখ্যা, বৈশিষ্ট্য এবং তাদের কাজ পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্স থেকেই জানা যায়।

বছরে দুইবার ইলিশ প্রজনন করে থাকে। জিনোম সিকোয়েন্সের মাধ্যমে এই দুই সময়ের ইলিশ জিনগতভাবে পৃথক কি না, তা জানা যাবে। এমনকি কোনো নির্দিষ্ট নদীতে জন্ম নেওয়া পোনা সাগরে যাওয়ার পর বড় হয়ে প্রজননের জন্য আবার একই নদীতেই ফিরে আসে কি না, সেসব তথ্যও জানা যাবে এই জিনোম সিকোয়েন্সের মাধ্যমে।

দুই.

দেশের গবেষণাক্ষেত্রটি এখনো অনেকটাই সীমিত। গবেষণা খাতে বরাদ্দও কম। এর পরও সীমিত সাধ্যের মধ্যেই বিজ্ঞানীরা যে সাফল্য দেখাচ্ছেন সেটি অবশ্যই সাধুবাদযোগ্য। বিজ্ঞানের নব নব আবিষ্কারে এ যুগে সারা বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে আমাদেরও গবেষণাক্ষেত্র আরো বাড়াতে হবে। সে ক্ষেত্রে ইলিশ গবেষণায় বাংলাদেশ যে সাফল্য দেখিয়েছে সেটিকে আরো এগিয়ে নিতে হবে। আমাদের অর্থের কমতি থাকতে পারে; কিন্তু মেধাবী এবং দেশের জন্য কাজ করার মানুষের যে অভাব নেই সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না।

তিন.

ইলিশ আমাদের জাতীয় সম্পদ। এই সম্পদ রক্ষায় এগিয়ে আসা অত্যন্ত জরুরি। ইলিশের সহনশীল উৎপাদন বজায় রাখার লক্ষ্যে ডিমওয়ালা মা ইলিশ রক্ষায় এবং জাটকা নিধনে বছরে নির্দিষ্ট সময় অভ্যন্তরীণ নদ-নদীর ১১ হাজার বর্গকিলোমিটার জলসীমায় ইলিশ শিকার নিষিদ্ধ করে মৎস্য বিভাগ। এই সময়ে ইলিশ আহরণ, সংরক্ষণ, পরিবহন, ক্রয়-বিক্রয় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে দেশে ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধিতে সর্বসাধারণ, বিশেষ করে জেলে, মৎস্যজীবী সম্প্রদায় ও ইলিশের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যবসায়ী, আড়তদার, বরফকল মালিক, বোট মালিক, দাদনদার, ভোক্তাসহ সবাইকে সচেতন ও উদ্বুদ্ধকরণ। একই সঙ্গে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে বিষয়টিকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়া। বলা বাহুল্য এই নিষেধাজ্ঞা সাময়িক। এবং দেশ ও জাতির স্বার্থে এটা অবশ্যই মেনে চলার কথা বলা হয়। কিন্তু দুঃখজনক হচ্ছে এর ব্যত্যয় ঘটে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশ।

মনে রাখা প্রয়োজন, ইলিশ শুধু জাতীয় মাছ ও সম্পদই নয়। বহু মানুষের জীবন-জীবিকা নির্ভর করে ইলিশের ওপর। অর্থনীতিতেও রয়েছে বিরাট অবদান। পরিসংখ্যান মতে, দেশের মোট মাছ উৎপাদনের ১৩ শতাংশ (যার আনুমানিক অর্থমূল্য আট হাজার ১২৫ কোটি টাকা) আসে ইলিশ মাছ থেকে। জিডিপিতে ইলিশ মাছের অবদান প্রায় ২ শতাংশ। প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ ইলিশ আহরণে সরাসরি এবং ২০ লাখ থেকে ২৫ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। পৃথিবীর সব দেশেই এই মাছের চাহিদা রয়েছে। প্রতিবছর ইলিশ মাছ রপ্তানি করে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় হচ্ছে। যদি প্রজনন মৌসুমে ইলিশ ধরা ও জাটকা নিধন বন্ধ থাকে, তাহলে ২১ হাজার থেকে ২৪ হাজার কোটি নতুন পরিপক্ব ইলিশ পাওয়া যাবে। এতে বছরে সাত হাজার কোটি টাকা মূল্যের ইলিশের বাজার সৃষ্টি সম্ভব হবে বাংলাদেশে।

দুঃখজনক হচ্ছে, ইলিশ ধরার ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা মানা হয় না। কিন্তু এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সম্ভাবনার ইলিশকে তাই রক্ষা করতে হবে যেকোনো মূল্যে। এটি করতে হবে নিজেদের স্বার্থেই। যারা ইলিশের ওপর জীবিকা নির্বাহ করে থাকে, তাদের জন্য ইলিশ ধরা বন্ধ মৌসুমে সরকার আর্থিক সহায়তা দিয়ে আসছে। ইলিশ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে এমন ১৫টি জেলার দুই লাখ ২৪ হাজার ১০২ জন জেলেকে পরিচয়পত্র দিয়ে তাদের বছরে তিন মাস সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আর্থিক সহায়তা দিয়ে আসছে সরকার।

এটা খুবই কার্যকর একটি পন্থা। ভবিষ্যতে এর আওতা আরো বাড়ানো যায় কি না সেটি নিয়ে ভাবতে হবে। তবে জেলেদের দায়িত্ব হচ্ছে নগদ প্রাপ্তির লোভ ছেড়ে দিয়ে ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে মা ইলিশ না ধরা। যদি সরকারি নির্দেশ উপেক্ষা করে মা ইলিশ ধরা হয়, সেটি হবে আত্মঘাতী। জাতীয় স্বার্থে ডিমওয়ালা মা ইলিশ ও জাটকা না কেনাটাও দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। এসংক্রান্ত সরকারি নির্দেশনা অবশ্যই মেনে চলতে হবে। যারা মানবে না তাদের জন্য কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ কিছুসংখ্যক স্বার্থান্বেষী মানুষের কাছে জাতীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। গবেষণায় সাফল্য এসেছে, ইলিশ রক্ষায় ব্যর্থতার পরিচয় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট

harun_press@yahoo.com



মন্তব্য