kalerkantho


ইয়েমেন যুদ্ধ যুদ্ধাপরাধ ও যুক্তরাষ্ট্র

জারেড কিয়েল

৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আইনে লিপিবদ্ধ যুদ্ধনীতি বা দেশটি যেসব আন্তর্জাতিক চুক্তিতে সই করেছে, সেগুলো মেনে চলার বাধ্যবাধকতা যদি থাকত তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে তারা ইয়েমেনে সৌদি জোটের অভিযানকে সমর্থন দেওয়া বন্ধ করে দিত। ২০১৫ সাল থেকে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও তাদের মিত্ররা এবং যুক্তরাষ্ট্র হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই সংঘাতকে ‘ভুলে যাওয়া যুদ্ধ’ আখ্যা দিয়েছে। কারণ এর ভয়াবহতা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বা সরকারগুলোর ঘুম ভাঙাতে ব্যর্থ হয়েছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে ইয়েমেনে চলমান যুদ্ধাপরাধ ও মানবিক বিপর্যয়ে জড়িয়ে ফেলেছেন।

জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিল গত ২৮ আগস্ট এই যুদ্ধের নৃশংসতার বিবরণ দিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। গত জুন পর্যন্ত এতে অন্তত ছয় হাজার ৪৭৫ বেসামরিক ব্যক্তি নিহত এবং ১০ সহস্রাধিক লোক আহত হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে।’ ধারণা করা হচ্ছে, এই সংঘাতে জড়িত সব পক্ষই সম্ভবত আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে। বেসামরিক হতাহতের জন্য সৌদি জোটের বিমান হামলাই দায়ী। তারা বেসামরিক আবাসিক এলাকা, হাসপাতাল, বাজার, বিয়ে ও শেষকৃত্যের মতো সামাজিক অনুষ্ঠান, এমনকি স্কুলবাসেও বিমান হামলা চালিয়েছে। ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক ব্যক্তিদের ওপর হামলা যুদ্ধাপরাধের শামিল।

সৌদি জোটকে লক্ষ্যবস্তু নির্দিষ্ট করতে গোয়েন্দা-তথ্য দিয়ে এবং আকাশে সৌদি যুদ্ধবিমানকে রিফুয়েলিং সহায়তা দিয়ে ইয়েমেনে বিমান হামলা অব্যাহত রাখতে সাহায্য করেছে যুক্তরাষ্ট্র। সৌদি আরবের কাছে শতকোটি ডলারের অস্ত্রও বিক্রি করেছে তারা। এসবের মধ্যে ক্লাস্টার বোমাও রয়েছে। এটি জাতিসংঘের চুক্তিতে এবং বেশির ভাগ দেশেই নিষিদ্ধ। ইয়েমেনি বেসামরিক জনগোষ্ঠীর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের তৎপরতা প্রাণঘাতী হয়ে দাঁড়িয়েছে। সর্বশেষ প্রমাণ হিসেবে বলা যায়, গত আগস্টে একটি স্কুলবাসে সৌদি বিমান হামলায় যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি বোমা ব্যবহার করে ৪০ শিশু ও আরো কয়েকজন আরোহীকে হত্যা করা হয়।

স্থল ভাগের পরিস্থিতিও ভয়াবহ। জাতিসংঘ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউএই পরিচালিত বিভিন্ন কারাগারে বিধিবহির্ভূত আটক ও নির্যাতনের ঘটনা নির্বিচারে ঘটছে। সরকারি নিরাপত্তা বাহিনী অর্থ আদায়ের জন্য অপহরণ ও ধষর্েণর ঘটনা অহরহ ঘটাচ্ছে। সৌদি আরব, ইউএই এবং ইয়েমেন সরকার ধর্ষণ ও নির্যাতনের মতো যুদ্ধাপরাধ ঘটিয়েছে বলে বিশ্বাস করার ‘যৌক্তিক কারণ’ আছে। সৌদি জোট ইয়েমেনে খাদ্য ও প্রাণ রক্ষাকারী ওষুধের সরবরাহ বন্ধ করতে দেশটির আকাশসীমা অবরুদ্ধ করে রেখেছে। ফলে ইয়েমেনের ৮৪ লাখ মানুষ গত এপ্রিল থেকে দুর্ভিক্ষের মুখে রয়েছে। অবরোধের কারণে স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো ভেঙে পড়ায় কলেরা ছড়িয়ে পড়ে, যা আধুনিক কালের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা। এতে প্রায় ১০ লাখ লোক আক্রান্ত হয়।

ইয়েমেন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ মানবসৃষ্ট। সৌদি জোট ও যুক্তরাষ্ট্র লাখ লাখ বেসামরিক লোকের অসহনীয় দুর্ভোগের কারণ। গত মার্চে মার্কিন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স, মাইক লি ও ক্রিস মারফি ইয়েমেন যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন তুলে নেওয়ার ব্যাপার একটি প্রস্তাব তোলেন। সেটি ৫৫-৪৪ ভোটে বাতিল হয়ে যায়। ভোটের আগে সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের (রিপাবলিকান) নেতা মিচ ম্যাককেনল বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন তুলে নেওয়ার অর্থ হচ্ছে বেসামরিক জনগণকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া। তাঁর এই বক্তব্য বিশ্বাসযোগ্য নয়। কারণ সৌদি জোটের কারণেই ইয়েমেনে বেসামরিক হতাহতের ঘটনা বেশি ঘটছে। ম্যাককেনল যদি এতটাই উদ্বিগ্ন হয়ে থাকেন, তাহলে তাঁর উচিত ছিল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে চাপ দেওয়া, যাতে তিনি সংঘাতে জড়িত সব পক্ষকে আলোচনায় বসতে বাধ্য করেন।

সংঘাত বন্ধ ও শান্তি আলোচনা শুরু করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের উচিত দ্রুত কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করা। একই সঙ্গে তাদের উচিত যেসব দেশ ও সংগঠন যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে জড়িত তাদের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করা। সৌদি আরব নিয়মিতই যুদ্ধের আইন লঙ্ঘন করছে। যুক্তরাষ্ট্র তাদের সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। তাদের অবশ্যই সৌদি যুদ্ধবিমানের রিফুয়েলিং এবং লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে গোয়েন্দা-তথ্য সরবরাহ বন্ধ করতে হবে। জড়িত পক্ষগুলোর কাছে কোনো দেশ যাতে অস্ত্র বিক্রি করতে না পারে সে ব্যবস্থাও করতে হবে তাদের। যুক্তরাষ্ট্রের নেতারা যদি দাবি করেন তাঁরা ইয়েমেনের বেসামরিক জনগণের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন, তাহলে তাদের উচিত ইয়েমেনিদের জন্য মানবিক সহায়তা বাড়ানো। ইয়েমেনিদের দুর্ভোগের অন্যতম প্রধান কারণ যুক্তরাষ্ট্র। বাস্তুচ্যুত ইয়েমেনিদের জন্য পুনর্বাসন প্রকল্পও চালু করতে হবে তাদের।

২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১৬ সালের শেষ পর্যন্ত ওমাবা প্রশাসন এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। ট্রাম্প এ ধরনের উদ্যোগ নেবেন—এ আশা আরো কম। এখন এ দায়িত্ব মার্কিন নাগরিকদের। তারাই পারে তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের চাপ দিতে। যুক্তরাষ্ট্র যদি মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়, তাহলে আমরা ইয়েমেনে যাতে যুদ্ধাপরাধ না হয় সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারি।

লেখক : যুক্তরাষ্ট্রে শরণার্থী পুনর্বাসনবিষয়ক গবেষক

সূত্র : কাউন্টারপাঞ্চ অনলাইন

ভাষান্তর : তামান্না মিনহাজ



মন্তব্য