kalerkantho


কাস্পিয়ান চুক্তি ও পরিবর্তমান ভূ-রাজনীতি

পিটার করজুন

৩১ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



কাস্পিয়ান সাগর দিবস পালিত হচ্ছে ২০০৭ সাল থেকে। তবে সুখবরটা এলো ১২ আগস্ট, ২০১৮। সেদিন আন্তর্জাতিক অঙ্গনের অন্যতম বিতর্কের ইতি ঘটাতে কাজাখস্তানে স্বাক্ষরিত হলো এক চুক্তি। রাশিয়া, ইরান, আজারবাইজান, কাজাখস্তান ও তুর্কমেনিস্তান ‘কাস্পিয়ান সি কনভেশন’ চুক্তি সই করে। এতে ওই সাগরের ব্যবহার সম্পর্কে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে দুই দশক ধরে চলা আন্তর্জাতিক বিতর্কের অবসান ঘটল। এ চুক্তি সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে উত্তেজনা নিরসন ও জ্বালানি খাতে ও উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আরো বেশি সামরিক সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করবে।

কাস্পিয়ান সাগরের তলদেশে পাঁচ হাজার কোটি ব্যারেল তেল আর প্রায় ৯ ট্রিলিয়ন ঘনমিটার প্রাকৃতিক গ্যাস রয়েছে। প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ এ সাগরতলের চূড়ান্ত সীমানা নির্ধারণের জন্য উপকূলীয় দেশগুলোকে আরো চুক্তি করতে হবে, যা এবারের চুক্তির সম্পূরক হিসেবে কাজ করবে।

চুক্তিতে বিশেষ আইনি ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রতিটি রাষ্ট্রের নিজস্ব জলসীমা নির্ধারণের অধিকার রাখা হয়েছে, তবে তা উপকূলরেখা থেকে ১৫ নটিক্যাল মাইলের বেশি হতে পারবে না। এর সঙ্গে আরো ১০ নটিক্যাল মাইলকে স্বতন্ত্র মৎস্য শিকার এলাকা অভিহিত করা হয়েছে। সাগরের বাকি অংশ সবার ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত। ঐকমত্যের ভিত্তিতে উপকূলীয় দেশগুলো তাদের জলসীমার বাইরের প্রান্ত থেকে ৫০০ মিটার পর্যন্ত নিরাপত্তা অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। চুক্তি স্বাক্ষরকারী পাঁচটি দেশ সম্মতির ভিত্তিতে সাগরের তলদেশ দিয়ে পাইপলাইন ও তার (কেবল) বসাতে পারবে। সাগরের তলদেশের সম্পদ আনুপাতিক হারে ভাগ হবে। চুক্তির নিরিখে দেশগুলো কাস্পিয়ান অর্থনৈতিক ফোরাম গঠন করবে।

কাস্পিয়ান অঞ্চলের বাইরের কোনো দেশ যেন এ সাগরে সামরিক শক্তি মোতায়েন করতে না পারে, সে বিষয়টিও চুক্তিতে রাখা হয়েছে। সামরিক নৌযানের উন্মুক্ত চলাচলের নিশ্চয়তা রাশিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়া তার দূরপাল্লার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ক্যালিবারবাহী রণতরিগুলো নির্দিষ্ট স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। তারা এই ক্ষেপণাস্ত্র আস্ত্রাখান থেকে তাদের সমুদ্রসীমার নিকটবর্তী দেরবেন্ত এলাকায় সরিয়ে নেবে। উল্লেখ্য, রণতরিতে ক্যালিবার ক্ষেপণাস্ত্র সংযোজনের পর রাশিয়ান কাস্পিয়ান ফ্লোটিলার কার্যক্রম বেড়েছে।

উপকূলীয় দেশগুলোর সমুদ্রাঞ্চল ও অর্থনৈতিক অঞ্চলে নৌবাহিনীর জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নিয়মাবলি মেনে চলার বিষয়টি কাস্পিয়ান চুক্তিতে রাখা হয়েছে। এ অঞ্চলে পাঁচটি নৌবাহিনী সক্রিয়। তাদের কার্যক্রম পরিচালনায় অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়ানো নিশ্চিত করা বিশেষ গুরুত্বের দাবিদার এবং এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে সমঝোতা হয়েছে। আগস্টের শুরুতে রাশিয়া, কাজাখস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও আজারবাইজান ‘টেনিজ-২০১৮ অনুসন্ধান ও উদ্ধার’ শীর্ষক নৌমহড়া চালিয়েছে। কাস্পিয়ান দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতেই এ অনুশীলন।

কালেক্টিভ সিকিউরিটি ট্রিটি অর্গানাইজেশনের (সিএসটিও) সদস্য না হওয়ায় তুর্কমেনিস্তানকে নিরাপত্তা ইস্যু নিয়ে বেশ বিপাকে পড়তে হচ্ছে। বিশেষ করে আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলে ইসলামিক স্টেট (আইএস) আরো সক্রিয় হয়ে ওঠায় এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এ হুমকি মোকাবেলার জন্য কাস্পিয়ান উপকূলবর্তী অন্য দেশগুলোর কাছাকাছি হওয়া তুর্কমেনিস্তানের জন্য জরুরি হয়ে উঠেছে। কাজাখস্তানে চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে কাস্পিয়ান অঞ্চলের সার্বিক নিরাপত্তা নীতি প্রণয়নের একটি কর্মপরিকল্পনা দাঁড় করানো গেছে। কাস্পিয়ান সাগর মধ্যপ্রাচ্যের খুব কাছে এবং আফগানিস্তানের অস্থিতিশীলতা পাঁচ কাস্পিয়ান দেশের যৌথ নিরাপত্তা প্রয়াসকে শীর্ষ এজেন্ডায় পরিণত করেছে।

অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত স্বার্থ পাঁচ উপকূলীয় দেশকে এক স্থানে হাজির করেছে। চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে সম্ভবত নতুন এক আন্তর্জাতিক ফোরামের সূচনা হলো। যেসব প্রকল্প আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে, সেগুলো নিয়ে তারা নিশ্চিতভাবে একসময় সামনে এগোবে। এ চুক্তিতে তাদের বিনিয়োগের স্বার্থও আছে বটে। কাস্পিয়ান চুক্তির সঙ্গে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) আশু সংযোগ থাকায় চীনও এর থেকে লাভবান হতে যাচ্ছে।

কাস্পিয়ান সাগর সম্ভবত বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য উদীয়মান এক অঞ্চল হয়ে উঠতে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার চাপে জেরবার ইরানেরও স্বার্থ রয়েছে। মে মাসে ইরান ও ইউরেশিয়ান ইকোনমিক ইউনিয়ন (ইএইইউ) মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল (এফটিএ) বিষয়ক চুক্তি সই করেছে। রাশিয়া ও কাজাখস্তানও ইএইইউর সদস্য। সংস্থাটির সঙ্গে চীনেরও চুক্তি আছে। বলে রাখা ভালো, সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) মাধ্যমে ইরানের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠিত। কাস্পিয়ান সাগরের অধিকার নিয়ে সমস্যা মিটে গেলে রাশিয়া-ইরান অর্থনৈতিক সহযোগিতার সম্পর্কও এগোতে শুরু করবে। উভয় দেশই যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত।

খুব গুরুত্বপূর্ণ এক ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। অসীম সম্পদে সমৃদ্ধ এ অঞ্চলের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের কৌতূহল থাকবে,

সেটা খুবই স্বাভাবিক। কাস্পিয়ান রাষ্ট্রগুলোর বিভেদ কাজে লাগিয়ে এ অঞ্চলের অনুপ্রবেশের চেষ্টা তারা করেছে। সদ্য সম্পাদিত চুক্তি কাস্পিয়ান সাগরে বাইরের দেশগুলোর সামরিক উপস্থিতি নাকচ করে দিয়েছে। ফলে ন্যাটোকে দূরেই থাকতে হবে। কাস্পিয়ান হতে যাচ্ছে এক শান্তির সাগর।

 

লেখক : যুদ্ধ ও সংঘাতবিষয়ক বিশেষজ্ঞ

সূত্র : স্ট্র্যাটেজিক কালচার

জার্নাল (অনলাইন)

ভাষান্তর : শামসুন নাহার



মন্তব্য