kalerkantho


ষড়যন্ত্রের শেষ কোথায়

মেজর জেনারেল এ কে মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.)

২০ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



ষড়যন্ত্রের শেষ কোথায়

আগস্ট মাস চলছে। কয়েক দিন আগেই গেল জাতীয় শোক দিবস। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে খন্দকার মোশতাক গং সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তির মাধ্যমে পাকিস্তানের সঙ্গে একটি আপসরফা এবং মুক্তিযুদ্ধ পরিত্যাগ করে আবার আগের মতো এক পাকিস্তানে ফিরে যাওয়ার ষড়যন্ত্র করেছিলেন। কিন্তু সময়মতো ষড়যন্ত্র প্রকাশ হয়ে পড়ায় মোশতাক গং সেটি বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হয়। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও দর্শনসংবলিত বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের শুরুটা সেখান থেকে, যা আজও অব্যাহত আছে। দেশ স্বাধীন হলো, বঙ্গবন্ধু ফিরে এলেন এবং রাষ্ট্র  পরিচালনার দায়িত্ব নিলেন। ওই সময়ে পিছু হটলেও মোশতাক গংদের ষড়যন্ত্র যে কখনোই থেমে ছিল না সেটি তো এখন সবার কাছেই পরিষ্কার। কিন্তু যখন বোঝার দরকার ছিল তখন বুঝতে ব্যর্থ হওয়ায় যে সর্বনাশ হয়ে যায় তার পরিণতি থেকে তো রাষ্ট্র এখনো বের হতে পারছে না। ঈশান কোণে কালো মেঘের ঘনঘটা ও গর্জন শুনেও কেউ কিছু করলেন না। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট পর্যন্ত এই ষড়যন্ত্রকারীরা একের পর এক যেভাবে মুজিব হত্যার ক্ষেত্র তৈরি করল, তখন রাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্তরা কেউ দেখলেন না, বুঝতে পারলেন না, তা কী করে বিশ্বাস করা যায়। জুলিয়াস সিজার থেকে শুরু করে ট্রটস্কি, গান্ধী, কেনেডির হত্যা ষড়যন্ত্রের ইতিহাসের শিক্ষা সবার সামনে থাকা সত্ত্বেও দায়িত্বপ্রাপ্তরা সতর্ক হলেন না।

হ্যাঁ, বঙ্গবন্ধুকে সতর্ক করা হয়েছিল, তাঁকে ৩২ নম্বর ছেড়ে গণভবনে বসবাসের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধু অন্য রকম নেতা ছিলেন। তিনি জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চাননি। কারণ তিনি জানতেন জনগণ থেকে একবার বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে তিনি তাঁর সারা জীবনের আকাঙ্ক্ষা সোনার বাংলা গড়তে পারবেন না, সত্যিকার অর্থে জনগণের মুক্তি আনা যাবে না। এ জন্যই হয়তো তিনি ৩২ নম্বর ছাড়তে চাননি। কিন্তু রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্তরা যদি চাইতেন এবং যথাযথ দায়িত্ব পালন করতেন, তাহলে ৩২ নম্বরেই বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মোটেও অসম্ভব ছিল না। বিশ্বের পরাশক্তি শতাধিকবার চেষ্টা করেও তাদের দোরগোড়ায় বসে থাকা ফিদেল কাস্ত্রোকে তো হত্যা করতে পারেনি। তাই প্রশ্ন ওঠে, তখন নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর দায়িত্বে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা কি অথর্ব, অযোগ্য ছিলেন, নাকি সব দেখেও না দেখার ভান করেছেন। এই প্রশ্নটি ওঠার সংগত কারণ রয়েছে। রাষ্ট্রের প্রধান গোয়েন্দা সংস্থা হচ্ছে ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স (এনএসআই)। তখন এর প্রধান ছিলেন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা এ বি এম সফদার। জানা যায়, এই সফদার সাহেব পাকিস্তান রাষ্ট্রের আদর্শের প্রতি অত্যন্ত অনুগত, অর্থাৎ পশ্চিম পাকিস্তানিদের চেয়েও বেশি পাকিস্তানি ছিলেন। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত পুরো মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ঢাকায় কর্তব্যরত থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সব হত্যাযজ্ঞ ও অপকর্মের সহযোগী ছিলেন। অথচ ১৬ ডিসেম্বরের পর নতুন বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হওয়ার স্বল্প দিনের মাথায় তিনিই হয়ে গেলেন রাষ্ট্রের সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা। দ্বিতীয়ত, সামরিক বাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের প্রধান ছিলেন পাকিস্তান থেকে প্রত্যাগত সামরিক কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার আবদুর রউফ। পাকিস্তান থেকে ফেরত এসেই তিনি এই দায়িত্ব পেয়ে গেলেন। নিরাপত্তা বিষয়ের মৌলিক একটা শিক্ষা হলো শত্রুর বন্দিদশা থেকে ফেরত আসার পর অন্তত একটা যৌক্তিক  সময় পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ না করে কাউকে রাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে অধিষ্ঠিত না করা। তৃতীয়ত, পুলিশের গোয়েন্দা সংস্থা স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) প্রধান ছিলেন ই এ চৌধুরী। তিনিও ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকায় কর্তব্যরত থেকে পাকিস্তানিদের সহযোগিতা করেছেন।

অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের লেখা, ‘বাংলাদেশ, এ  লিগেসি অব ব্লাড’ বইয়ে চট্টগ্রামের হালিশহরে ওই সময়ে অবস্থানরত একজন বিহারি অন্ধ হাফেজ সম্পর্কে বিস্তর বর্ণনা আছে। তখন প্রচার ছিল তিনি নাকি একজন কামেল পীর, ভূত-ভবিষ্যৎ বলতে পারেন। ১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট খুনি ফারুক রহমানের স্ত্রী ফরিদা রহমান হালিশহরে ওই অন্ধ হাফেজের কাছে যান এবং ফারুকরা যে আসন্ন রাতেই কাজ সম্পন্ন করতে চাচ্ছেন সে সম্পর্কে পরামর্শ চান। এটা তো এখন পরিষ্কার বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই জড়িত। আর এই অন্ধ হাফেজ ছদ্মবেশে যে আইএসআইয়ের প্লান্টেড লোক ছিল সেটা তো বোঝা যায় যখন সে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার জন্য ফাইনাল গ্রিন সিগন্যাল দেয় খুনি ফারুকের স্ত্রী ফরিদা রহমানের মাধ্যমে। উল্লিখিত বইয়ের বর্ণনায় আছে, ফারুকের স্ত্রীর পরামর্শ চাওয়ার প্রতিউত্তরে অন্ধ হাফেজ অতিসত্বর কাজ সেরে ফেলার পরামর্শ দেন। ওই অন্ধ হাফেজ, তথাকথিত পীর  দু-তিন বছর ধরে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষে বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত থাকলেন, কিন্তু তার কোনো কিছুই আমাদের গোয়েন্দা সংস্থা জানতে পারল না। এটাকে কী বলা যাবে। তারপর ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টে যা হওয়ার তা-ই হয়ে গেল। এত দিনে এটা এখন প্রতিষ্ঠিত সত্য, দেশি-বিদেশি বিশাল শক্তিশালী নেটওয়ার্ক বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার জন্য বাংলাদেশের যাত্রার শুরু থেকেই ষড়যন্ত্র করে আসছিল।

১৯৭৫ সালের পর দুই সামরিক শাসক ও তাদের বর্তমান প্রতিভূদের রাজনীতি, কর্মকাণ্ড এবং কীর্তিকলাপ দেখলে সহজেই বোঝা যায় সেই থেকে তারা নিরন্তর ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে বাংলাদেশকে হত্যা করার জন্য, যে বাংলাদেশ আমরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রাম ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম। ১৯৭৫ সালের পর ৪৩ বছর কেটে গেছে। এর মধ্যে ষড়যন্ত্র কি কখনো থেমেছিল, না এখন থেমে আছে? বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা রাষ্ট্রব্যবস্থার সর্বত্র মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করে যাচ্ছেন ১৯৮১ সাল থেকে। তাঁকে ১৯ বার হত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে। এর মধ্যে এসে গেল ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট। শেখ হাসিনাসহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাকে এক আক্রমণে শেষ করে দেওয়ার জন্য দিনে-দুপুরে শত শত পুলিশের উপস্থিতিতে গ্রেনেড আক্রমণ চালিয়ে আক্রমণকারীরা নিরাপদে সটকে পড়তে পারল। ষড়যন্ত্রের স্বরূপ বাংলাদেশের মানুষ আরেকবার প্রকাশ্যে দেখত পেল, সারা বিশ্বের মানুষ দেখল। এটা এখন দিনের মতো পরিষ্কার, ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের হত্যাকাণ্ড আর ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড আক্রমণ একই সূত্রে গাঁথা। ষড়যন্ত্রকারীরা ভিন্ন মানুষ হলেও একই পথের অনুসারী এবং দুই হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্যও এক ও অভিন্ন। আর তা হলো মুক্তিযুদ্ধের দর্শন ও আদর্শকে বাংলাদেশ থেকে চিরদিনের জন্য বিদায় করে দেওয়া। পাকিস্তানসম আরেকটি রাষ্ট্র এখানে তৈরি করা।

মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে সেই যে ষড়যন্ত্রের শুরু, তার যে শেষ কোথায় সেটি কেউ বলতে পারছে না। কারণ পঁচাত্তরের রক্তের ওপর পা রেখে যে রাজনৈতিক শক্তির জন্ম হলো এবং তাদের হাত ধরে একাত্তরের পরাজিত শক্তির উত্থান—এই দুই অপশক্তি প্রবল প্রতাপে এখনো সর্বত্র বিরাজমান। এর মধ্যে আছে বড় মিডিয়া হাউস, করপোরেট হাউস, ব্যাংক-বীমা, এনজিও, শিক্ষাঙ্গন, প্রশাসন—কোথায় তারা নেই। এই সম্মিলিত গোষ্ঠীর কয়েকটি ষড়যন্ত্রের নতুন রূপ সাম্প্রতিক সময়ে সবাই দেখেছেন। কিছুদিন আগে চাকরিতে কোটা পদ্ধতির বিরুদ্ধে একটি আন্দোলন এবং এই আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে স্কুলের কোমলমতি ছাত্রদের একটা মহৎ জনকল্যাণের আন্দোলনকে অবলম্বন করে গোপনে ছাত্রবেশে দলীয় ক্যাডার বাহিনী ও সন্ত্রাসীদের রাস্তায় নামিয়ে দেয়। ছাত্রদের এই নির্মোহ অরাজনৈতিক আন্দোলনকে সরকার উৎখাতের আন্দোলনে পরিণত করার জন্য রাস্তায় নেমে সংঘাত, সংঘর্ষ ও গোলাগুলি শুরু করে। জননিরাপত্তা ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তাকে হুমকির মধ্যে ফেলার চেষ্টা চালায়। ভয়ংকর উসকানি ও সীমাহীন মিথ্যাচার সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে থাকে। কিন্তু কথায় আছে ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। ষড়যন্ত্রটি মানুষের কাছে ধরা পড়ে যায় যখন মানুষ বুঝতে পারে তথাকথিত নায়িকা নওশাবার প্রচার করা নারী ধর্ষণ ও ছাত্রহত্যার খবরটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট। মানুষের বদ্ধমূল ধারণা হয়, ষড়যন্ত্রকারীদের টাকার কাছে ওই অভিনেত্রী বিক্রি হয়ে মিথ্যাচারের খবরসহ নিজের অভিনব মায়াকান্নার দৃশ্যটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। তরুণসমাজ ও সাধারণ মানুষ চটজলদি সচেতন হওয়ায় ষড়যন্ত্রকারীদের উদ্দেশ্য এবারও ব্যর্থ হয়। কিন্তু এতে বোঝা গেল পুরনো ষড়যন্ত্রকারীদের দেশীয় উত্তরসূরি ও আন্তর্জাতিকচক্র বসে নেই। আগামী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে তারা আরো বড় ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হবে। তাই বলা যায়, ষড়যন্ত্রের শেষ সহজে হচ্ছে না। সবাইকে সচেতন ও সতর্ক হতে হবে।

লেখক : কলামিস্ট ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

sikder52@gmail.com



মন্তব্য