kalerkantho


পার্বত্য চট্টগ্রামের অসহায় বাঙালিদের নিয়ে কিছু কথা

পারভেজ হায়দার

১৩ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



পার্বত্য চট্টগ্রামের অসহায় বাঙালিদের নিয়ে কিছু কথা

পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী বাঙালি। তুলনামূলকভাবে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া এই জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ গুচ্ছগ্রামগুলোতে যে কষ্টার্জিত জীবন বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে, তাতে রয়েছে শিক্ষার অভাব, কর্মসংস্থানের অভাব আর রয়েছে সীমাহীন দারিদ্র্য। পার্বত্য চট্টগ্রামে উপজাতিদের চারটি আঞ্চলিক দলের মধ্যে অন্তঃকলহ থাকলেও ভূমি অধিকারসহ অন্যান্য জাতিগত প্রশ্নে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাদের ঐকমত্য রয়েছে। উপজাতি আঞ্চলিক দলগুলোর নেতাদের অনেকেই জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলেও পাহাড়িদের জাতিগত স্বার্থের প্রয়োজনে তাঁরা গুরুত্বসহকারে সহযোগিতামূলক মনোভাব নিয়ে অংশগ্রহণ করে থাকেন। পক্ষান্তরে পার্বত্য চট্টগ্রামে আঞ্চলিক বাঙালি দলগুলো, যেমন—পার্বত্য নাগরিক ঐক্য পরিষদ, সমধিকার আন্দোলন, পার্বত্য বাঙালি ছাত্র পরিষদ প্রভৃতি দলের নেতৃত্বে সমন্বয়হীনতা দৃশ্যমান। এই দলগুলোর নেতারা ব্যক্তিগত স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার কারণে এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী উপজাতি ও বাঙালি ব্যক্তিদের লেজুড়বৃত্তির কারণে তারা তাদের মূল উদ্দেশ্য ও কার্যপরিধি থেকে দূরে সরে আসছে। বাঙালি এই দলগুলোর কর্মকাণ্ড বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অগোছালো। সম্ভবত তাদের নেতৃত্বে সুশিক্ষিত ও মেধাবী ব্যক্তিদের অনুপস্থিতি থাকায় স্বার্থান্বেষী মহল সহজেই তাদের অপব্যবহার করতে পারে। কোনো একটি কর্মকাণ্ডে বা সিদ্ধান্তে সুদূরপ্রসারী ফলাফল সম্পর্কে আগে অনুধাবন করতে সক্ষম না হওয়ায় বাঙালি নেতাদের কর্মকাণ্ড বিভিন্ন সময়ে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাধারণ জনগণের কাছে মনে হয়, তারা কোনো একটি বড় রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে মনে হয়, পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রভাবশালী পরিবারগুলোর ইচ্ছা পূরণ করছে। ফলে বাঙালিভিত্তিক আঞ্চলিক দলগুলো সাধারণ জনগণের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা হারাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্ধেক জনগোষ্ঠী বাঙালি ভবিষ্যতে তাদের ভূমি অধিকারসহ মৌলিক নাগরিক অধিকারগুলো সুরক্ষার বিষয়ে ন্যায্য দাবিগুলো কার্যকরীভাবে উপস্থাপন করার আন্দোলনের নেতৃত্ব খুঁজে পাবে না।

যেকোনো দলই নির্দিষ্ট কোনো উদ্দেশ্য সামনে রেখে একটি কমিটির সুচিন্তিত গবেষণার মাধ্যমে কর্মপন্থা ও কর্মপরিধি সুস্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ করে থাকে। এই কর্মপন্থার মধ্যে নেতৃত্ব নির্বাচন পদ্ধতি, বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের প্রক্রিয়া, নতুন সদস্য নিয়োগের পদ্ধতি, সদস্যদের কর্মকাণ্ডের সীমারেখা, আয়ের উৎস, ব্যয়ের জন্য নির্দিষ্ট খাতগুলো, ব্যয়ের সঠিকতা নির্ধারণের জন্য আলাদা কমিটি ইত্যাদি বিষয় ন্যূনতমভাবে থাকা বাঞ্ছনীয়। কিন্তু বাঙালিভিত্তিক আঞ্চলিক দলগুলোর অপরিকল্পিত ও অগোছালো কর্মকাণ্ডগুলো পর্যালোচনা করলে পার্টির শৃঙ্খলাজনিত বিষয়গুলোর অনুপস্থিতি অনুধাবন করা যায়। বাঙালিভিত্তিক দলগুলোর মেধাবী নেতৃত্বের স্বল্পতা ও শৃঙ্খলার অভাব এবং সর্বোপরি অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণে তাদের প্রভাবশালী কোনো দল বা ব্যক্তির ওপর নির্ভর করতে হয়। তাদের এই দুর্বলতা সাধারণ জনগণের কাছেও দৃশ্যমান হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে তারা বাঙালি স্বার্থের প্রশ্নে অনেক ন্যায্য দাবিও কার্যকরীভাবে উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়।

বর্তমান সময়ে একটি সংগঠনের কয়েকটি বিষয়ে একান্তভাবে পরিপূর্ণতা থাকা আবশ্যক, যেমন—দলীয় মূলনীতি ও কার্যপরিধি, শৃঙ্খলা, দলীয় অর্থনীতি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও মিডিয়ায় প্রচারণার জন্য মেধাবী কর্মী এবং ন্যায্য দাবিগুলো আইনগত ও কার্যকরীভাবে উপস্থাপনের জন্য উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সক্রিয় কর্মী ইত্যাদি। এ বিষয়গুলোর ঘাটতি থাকায় পার্বত্য চট্টগ্রামে আঞ্চলিক বাঙালি দলগুলো তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। ফলে সাধারণ অসহায় বাঙালি জনগোষ্ঠী ব্যাপকভাবে অধিকারবঞ্চিত হচ্ছে। খাগড়াছড়ি জেলার বাবুছড়ার নিকটস্থ সোনামিয়া টিলায় ৮১২ বাঙালি পরিবারের কাছে সরকার কর্তৃক প্রদত্ত বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও তারা নিজ জমিতে যেতে পারছে না। তারা কয়েক পুরুষ ধরে গুচ্ছগ্রামগুলোতে অত্যন্ত মানবেতর জীবন যাপন করছে। শিক্ষার অভাব ও বেকারত্বের কারণে গুচ্ছগ্রামে বসবাসরত বাঙালিরা বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হচ্ছে। সমাজে অবৈধ মাদক চোরাচালান স্থানান্তর, আঞ্চলিক উপজাতি দলগুলোর অস্ত্র ও গোলাবারুদ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তর, পাহাড়ি দলগুলোর জন্য অবৈধ চাঁদা উত্তোলনে সহায়তা এবং তা নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া, এমনকি নিরাপত্তা বাহিনীর চলাচল সম্পর্কিত তথ্য উপজাতি আঞ্চলিক দলগুলোর সশস্ত্র দলের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজেও বাঙালিরা ব্যবহূত হচ্ছে। কিন্তু ৮১২ বাঙালি পরিবারের এই জমি আইনগতভাবে পুনরুদ্ধারে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে বাঙালিভিত্তিক আঞ্চলিক দলগুলো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে সমর্থ হয়নি। তারা তাদের কর্মসূচি কয়েকটি মানববন্ধন ও মিছিলের মাধ্যমে সীমাবদ্ধ রেখেছে। অথচ এ বিষয়ে নিয়মতান্ত্রিকভাবে বিভিন্ন কর্মসূচির পাশাপাশি আইনগত পদক্ষেপও গ্রহণ করা যেতে পারত। প্রশাসন সাম্প্রদায়িক সংঘাত এড়াতে বাঙালি পরিবারগুলোকে সোনামিয়া টিলায় যেতে বাধা দিচ্ছে বলে জনশ্রুতি আছে। অথচ বাঙালিদের কাছে যদি সরকার প্রদত্ত সঠিক কাগজপত্র থাকে, তাহলে বাঙালি নেতারা প্রশাসন এবং আদালতের কাছে তাদের জমির দখল বুঝিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করার জন্য আবেদন করতে পারেন এবং একই সঙ্গে যেহেতু সাম্প্রদায়িক সংঘাতের আশঙ্কা রয়েছে, সেহেতু আদালতের কাছে বাঙালি নেতারা নিরাপত্তা চেয়ে আবেদন করতে পারেন। আদালতের নির্দেশক্রমে জেলা প্রশাসন তখন পাহাড়ি-বাঙালি উভয় সম্প্রদায়ের নেতাদের সঙ্গে আলোচনাক্রমে জমির কাগজপত্রের সঠিকতা বিশ্লেষণ করে ন্যায্যভাবে প্রাপ্য ব্যক্তিদের কাছে জমির দখল বুঝিয়ে দিতে পারে। আইনগত পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করার পরও প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা না নিলে বাঙালিরা তাদের অধিকার আদায়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য ঢাকা, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলাগুলোয় সংবাদ সম্মেলন, মানববন্ধন, স্মারকলিপি প্রদানসহ বিভিন্ন নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করতে পারে। এ ছাড়া বাঙালিদের অধিকার আদায়ে মেধাসম্পন্ন কর্মী বা ব্লগাররা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ইতিবাচক ব্যবহার করে আশানুরূপ ফলাফল নিয়ে আসতে পারে।

বাবুছড়ার সোনামিয়া টিলা ছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় বাঙালিদের রয়েছে অবহেলা, বঞ্চনা ও অধিকার হারানোর গল্প। রামগড়ে গত দুই বছরে অন্তত ৮-৯টি স্থানে ভূমিসংক্রান্ত বিষয়ে বাঙালিরা অধিকারবঞ্চিত হয়েছে। ইউপিডিএফ (প্রসীতপন্থী) দলের সন্ত্রাসীরা জোরপূর্বক বাঙালিদের জমি দখল করে বিভিন্ন স্থান থেকে পাহাড়িদের এনে পুনর্বাসিত করেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাঙালিদের জমি অবৈধভাবে দখল করে বিভিন্ন স্থাপনা তৈরি করেছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে পাহাড়ি বাঙালিদের ‘সাম্প্রদায়িক সংঘাত’ হয়েছে। এমন অপপ্রচার করে এবং উল্লিখিত বিষয়ে বাঙালিদের এককভাবে দায়ী করে আঞ্চলিক উপজাতি দলগুলোর অনুগত ব্লগাররা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক অপপ্রচার করেছে। এ প্রসঙ্গে একটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়, উপজাতি আঞ্চলিক সংগঠনগুলো ‘কল্পনা চাকমা’ ইস্যুটি দেশে-বিদেশে তথা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপকভাবে প্রচার করে এটিকে দীর্ঘমেয়াদি আলোচনার বিষয় হিসেবে সৃষ্টি করতে সমর্থ হয়েছে। এ ছাড়া নারী ও ভূমি সংক্রান্ত বিষয়গুলোকে উপজাতি সংগঠনগুলো এমন হৃদয়স্পর্শী এবং আকর্ষণমূলকভাবে উপস্থাপন করে প্রচারণা করে যে তা সহজেই দেশে-বিদেশে অবস্থানরত সাধারণ মানুষের বিবেককে নাড়া দেয়। পক্ষান্তরে বাঙালিভিত্তিক আঞ্চলিক সংগঠনগুলো মেধাবী নেতৃত্ব, কর্মী ও ব্লগারদের অপ্রতুলতা থাকায় এ বিষয়ে নিবেদিতপ্রাণ হয়ে কাজ করার মতো ক্ষেত্র এখনো গড়ে তুলতে পারেনি। রাঙামাটির ভূষণছড়ায় ব্যাপক হারে বাঙালি গণহত্যা, ১৮ বাঙালি কাঠুরিয়া হত্যা এবং অগণিত নিরীহ বাঙালি হত্যার ঘটনাগুলো আজও জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে উল্লেখযোগ্য প্রচার পায়নি। সামগ্রিকভাবে বিষয়টি পরিষ্কার যে ন্যায্য ইস্যু থাকা সত্ত্বেও বাঙালিভিত্তিক সংগঠনগুলো উপজাতি সংগঠনগুলোর মতো কোনো ক্ষেত্রেই কার্যকরীভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। তবে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি জেলা সদরের কিছু বিষয়ে বাঙালি নেতাদের পদচারণ দেখা গেলেও উপজেলাভিত্তিক সংশ্লিষ্ট বিষয়, যেমন—রামগড়ের ঘটনাবলির বিষয়ে আঞ্চলিক বাঙালি দলগুলোকে এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো ভূমিকা নিতে দেখা যায়নি। ফলে রামগড়ের সাধারণ বাঙালিরা বাধ্য হয়ে তাদের ভূমি অধিকার রক্ষার দাবিগুলো হাতে লেখা পোস্টারে প্রচার করতে বাধ্য হয়েছে। অথচ বাঙালিদের এই ন্যায্য দাবির বিষয়ে বাঙালিভিত্তিক আঞ্চলিক দলগুলো কার্যকরীভাবে সোচ্চার হলে পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা জাতীয় পর্যায়ে এ বিষয়ে ব্যাপকভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করা সম্ভব হতো।

একটি দলের সুশৃঙ্খল ও পেশাদার আচরণ সংশ্লিষ্ট সবার কাছে গ্রহণযোগ্যতা সৃষ্টি করে। দলের নেতাদের ব্যক্তিগত আচরণ সাধারণ জনগণ ও কর্মীদের কাছে উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারে। নেতা যখন কোনো নির্দিষ্ট দলের কিংবা কোনো প্রভাবশালী পরিবারের লেজুড়বৃত্তি করতে গিয়ে স্বার্থান্বেষী আচরণ করেন, সাধারণ জনগণের কাছে তাঁরা তাঁদের গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে ফেলেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ অসহায় বাঙালিদের ন্যায্য দাবির বাস্তবায়ন রাষ্ট্রের স্বার্থে অত্যন্ত জরুরি। দারিদ্র্য ও বেকারত্বের মধ্যে বেড়ে ওঠা এই বিশাল বাঙালি জনগোষ্ঠীকে সঠিকভাবে পরিচালিত করা সম্ভব না হলে ভবিষ্যতে তারা মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালি সম্প্রদায়ের জাতিগত অস্তিত্বের প্রশ্নে এবং দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখার মতো কার্যকরী ও মেধাবী জনগোষ্ঠী সৃষ্টিতে প্রশাসনের পাশাপাশি বাঙালি আঞ্চলিক দলগুলোকে গভীরভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। আর এই দায়িত্ব পালনে আঞ্চলিক বাঙালি দলগুলোর মধ্যে সংস্কার, পুনর্গঠন ও আত্মসমালোচনার ভিত্তিতে সমাধান এখন সময়ের দাবি।

লেখক : পার্বত্য এলাকার উন্নয়নকর্মী



মন্তব্য