kalerkantho


অসাধারণ বিশ্বকাপের অপেক্ষায়

ইকরামউজ্জমান

১৪ জুন, ২০১৮ ০০:০০



অসাধারণ বিশ্বকাপের অপেক্ষায়

চার বছর পর মাসব্যাপী ফুটবল উপভোগের দিন আবার আজ শুরু হতে যাচ্ছে। রাশিয়া বিশ্বকাপ-২০১৮ ফুটবলের ২১তম উৎসব। ঘরে ঘরে আর বাইরে বৃহত্তর সমাজে অনেক কিছুকে ছাড়িয়ে ফুটবল প্রাধান্য পাবে। প্লাবিত হবে পুরো দেশ ফুটবলের ভালোবাসা আর উন্মাদনায়। বিরাট জনগোষ্ঠী ফুটবলের সঙ্গে নিজেকে মিশিয়ে ফেলে পাবেন সফলতা আর ব্যর্থতার স্বাদ! আনন্দ আর হাহাকার। এই যে ফুটবলের জালের মধ্যে ঢুকে পড়া, এই ফুটবলের সঙ্গে নিজের নাড়ির সম্পর্ক নেই জেনেও পরেরটা নিয়ে মেতে ওঠা তাদের আনন্দ-বেদনার ভাগিদার হওয়াটাই বাতাস ভর্তি গোলকপিণ্ডের প্রতি ভালোবাসা আর মায়ার বাস্তব প্রতিফলন। বাস্তববাদীরা হয়তো বলবেন, এটি স্রেফ একটি হুজুগ বা অসিলা! একটা মওকা পেয়ে জোয়ারে গা ভাসিয়ে দেওয়া। মানুষ যদি কিছুদিনের জন্য হলেও ফুটবল নিয়ে মেতে ওঠে, জীবনের অনেক কিছুকেই দূরে ঠেলে রাখতে পারে, এরও তো একটা মূল্য আছে—একঘেয়েমিতে ভরপুর, বৈচিত্র্যহীন, ক্লান্তিকর সাধারণ মহলের জীবনের দৌড়ে। বিশ্বকাপ মানেই বিশেষ কিছু!

অসাধারণ একটি বিশ্বকাপ আজ ১৪ জুন মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়ামে শুরু হয়ে এক মাস ধরে ১১ শহরের ১২ স্টেডিয়াম ঘুরে এই লুঝনিকিতেই শেষ হবে ১৫ জুলাই ফাইনাল খেলার মাধ্যমে। সাঙ্গ হবে হৃদয় কেড়ে নেওয়া ৬৪টি খেলার। টেলিভিশন আর জায়েন্ট স্ক্রিনের সামনে বসে ফুটবলশিল্পীদের পা ও মাথায় চোখ দুটিকে লেপ্টে রাখার অভিজ্ঞতার পরিসমাপ্তি ঘটবে। বিশ্বকাপ মানেই অন্য এক ধরনের আবেগ, অনুভূতি আর ভীষণ রোমাঞ্চ।

বিশ্বকাপ সর্ববৃহৎ ফুটবল উৎসব। ২০৮টি দেশ থেকে বাছাই হয়ে শীর্ষ ৩২টি দেশের ৭৩৬ জন আসাধারণ সেরা ফুটবলারের লড়াই। তবে তিনবারের বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন— পর পর (১৯৩৪ ও ১৯৩৮) দুবার-দুবার, একবার রানার্স-আপ, একবার তৃতীয় স্থান অধিকারী ইতালি ৬০ বছর পর বিশ্বকাপের আসরে নেই। রাশিয়ায় আসার জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে কোয়ালিফাই করতে পারেনি। এবার নেই ‘টোটাল ফুটবল’-এর জন্মস্থান নেদারল্যান্ডস। ডাচ্রা তো তিনবার বিশ্বকাপে রানার্স-আপ হয়েছে। নেই আরো কয়েকটি দেশ। বিশেষ করে ইতালি ও নেদারল্যান্ডসের অনুপস্থিতি অংশত হলেও কী নিষ্প্রভ করবে না বিশ্বকাপকে? এবার দুই নবাগত দেশ হলো আইসল্যান্ড ও পানামা। ২০১৪ সালে ব্রাজিল বিশ্বকাপে যে ৩২টি দেশ খেলেছিল এর মধ্যে এবার নেই ১২টি দেশ। বিশ্বকাপের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ২০টি দেশ এখন পর্যন্ত মাত্র একটি বিশ্বকাপ খেলেছে। ৩২টি দেশ প্রথম পর্বে খেলবে আটটি গ্রুপে ভাগ হয়ে। প্রতিটি গ্রুপ থেকে চ্যাম্পিযন ও রানার্স-আপ সুযোগ পাবে দ্বিতীয় রাউন্ডে। অর্থাৎ ১৬টি দেশ।

স্বাগতিক রাশিয়াকে প্রাথমিক পর্যায়ে খেলতে হয়নি। স্বাগতিক দেশের কথাই ধরা যাক, ফিফার সর্বশেষ র‍্যাংকিং তাদের অবস্থান ৫৫-তে! হ্যাঁ, র‍্যাংকিং মাঠে খেলায় জেতায় না, জেতায় সেরাটা ঢেলে দেওয়া খেলা। সোভিয়েত ইউনিয়ন যুগ ছিল ফুটবলের স্বর্ণযুগ। ১৯৯১ সালে এক দেশ ভেঙে ১৫টি দেশ হয়েছে! রাশিয়া তার দেশে কতটুকু এগোতে পারবে সেটাই দেখার বিষয়।

চমক অপ্রত্যাশিত ফলাফল আর ধারণার বাইরে ঘটনার জন্ম হওয়ার মধ্যেই আছে বিশ্বকাপের আসল আকর্ষণ। বিশ্বকাপ বড় বেশি হৃদয় নিয়ে খেলে স্বস্তি দেয় না। একটি বিশ্বকাপের সঙ্গে মেলানো যায় না আরেকটি বিশ্বকাপের হিসাব। ফুটবল পণ্ডিতরা বলেছেন, রাশিয়ার বিশ্বকাপে আক্রমণাত্মক ফুটবলের পাশাপাশি বিনোদনের ফুটবল দেখা যাবে। বিশ্বকাপ সব সময়ই বিস্ময় উপহার দেয়।

বিশ্বকাপের মাঠের খেলা চলে না নিয়মনীতি আর প্রথা মেনে। চার বছরে ফুটবলের পরিবর্তন সব সময়ই চোখে পড়বে। ব্রাজিল বিশ্বকাপে বিভিন্ন দলের হয়ে যেসব খেলোয়াড় লড়েছেন, তাঁদের মধ্যে ২০০ জন বিভিন্ন দলে আছেন। এই ২০০ জনের মধ্যে আছেন এমন কয়েকজন অভিজ্ঞ খেলোয়াড় গত বিশ্বকাপে না খেললেও এবার তাঁদের দলে স্থান হয়েছে। প্রতিভাবানরা সব সময় মানিয়ে নিতে পারেন বলেই বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। ফুটবল ভিন্ন ধরনের খেলা। এখানে দল হিসেবে কে কেমন খেলল এটিই গুরুত্বপূর্ণ। অবশ্যই তারকা খেলোয়াড় মেসি, রোনালদো ও নেইমারের মতো খেলোয়াড়রা মুহূর্তের ঝলকে ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারেন, তবে প্রতিপক্ষরা তো আর এর জন্য প্রস্তুতি নিতে পারেন না। দলের শক্তি-দুর্বলতা বিবেচনায় নিয়েই প্রস্তুতি নেওয়া হয়।

ক্লান্তিজনিত সমস্যা ও খেলোয়াড়দের চোট বিশ্বকাপের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। ২৩ জনের চূড়ান্ত স্কোয়াড ঘোষণা করার আগে বিভিন্ন লিগে বা টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণকারী খেলোয়াড়রা দেশের হয়ে খেলার আগে সত্যিকার অর্থে তিন সপ্তাহের বেশি কি বিশ্রাম নিতে পারেন। এর প্রভাব বিশ্বকাপের খেলায় পড়ে। তা সত্ত্বেও খেলোয়াড়রা চেষ্টা করেন সাধ্যমতো। ক্লাব ফুটবলের সঙ্গে জাতীয় দলের হয়ে খেলার মধ্যে পার্থক্য অনেক বেশি। প্রাথমিক দল ঘোষণার পর বা তার অনেক আগে থেকের চোটে পড়া খেলোয়াড়, যিনি দেশের জন্য অপরিহার্য, তিনি তো অনেক বড় দুশ্চিন্তা। এতে করে পরিকল্পনায় পরিবর্তন, বিভিন্ন ধরনের সংযোজন নিয়ে ভাবতে হচ্ছে কোচদের। আফ্রিকার মিসরের কথাই ধরা যাক। ২৮ বছর পর আবার বিশ্বকাপের চূড়ান্ত রাউন্ডে স্থান করে নিয়েছে। ফরোয়ার্ড মোহাম্মদ সালেহ তাঁর পায়ের জাদু দিয়ে রাশিয়াকে বড় আসরে সাহায্য করেছেন সবচেয়ে বেশি। বিশ্বকাপের চার সপ্তাহ আগে ক্লাবের ফুটবল খেলতে গিয়ে সালেহ চোটে পড়েছেন। শেষ পর্যন্ত কতটুকু সুস্থ হয়ে তিনি মাঠে নামতে পারবেন? বিশ্বকাপে বড় দল, ছোট দল বলেও কথা আছে। বড় দলগুলো যেমন— ব্রাজিল, জার্মানি, স্পেন, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, উরুগুয়ে, ইংল্যান্ড, ইতালি (এবার বিশ্বকাপে নেই) ট্রফি জিতে আর ছোট ও মধ্যখানের দলগুলো চেষ্টা করে নিজেদের তুলে ধরতে। এরা বিশ্বকাপে অঘটনও ঘটায়। বিশ্বকাপের মঞ্চ থেকে তারকার জন্ম হয়, আবার তারকার আলোও নিভতে দেখা যায়।

বিগত ২০টি বিশ্বকাপ শিরোপার মধ্যে ১১ বার জিতেছে ইউরোপিয়ান দেশ আর ৯ বার লাতিন আমেরিকার দেশ। এদিকে আটটি দেশের [উরুগুয়ে, ইতালি (এবার বিশ্বকাপে নেই), জার্মানি, ব্রাজিল, ইংল্যান্ড, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স ও স্পেন] মধ্যেই সীমাবদ্ধ আছে। ইতিহাস আর ঐতিহ্যের অধিকারী দেশের বাইরে ফুটবল শিরোপা যায়নি। এবার বলা হচ্ছে, এই আট দেশের বাইরে শিরোপা যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। ২০০৬ সালের পর এই প্রথম কোনো সাবেক চ্যাম্পিয়ন (ইতালি) নেই বিশ্বকাপে। বিশ্বকাপে যে দলগুলো লড়বে এখানে পরিষ্কার ফেভারিট বলতে যা বোঝায় তা নেই। জার্মানি, স্পেন, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, পর্তুগালের সামর্থ্য (পর্তুগাল ২০১৬ সালে ইউরো জিতেছে) আছে বিশ্বকাপ জয়ের। বড় দলগুলোর মধ্যে ব্যবধান তো খুব বেশি নয়। যেকোনো দল যেকোনো দলকে হারাতে পারে। বিশ্বকাপে তো সাধারণত এমনই হয়। এবারের বিশ্বকাপ অনেকেই বলছেন, ইউরোপিয়ান দেশ শিরোপা জেতার লড়াইয়ে এগিয়ে থাকবে। ব্রাজিল বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ফাইনাল, সবচেয়ে বেশি সেমিফাইনাল খেলেছে এবং সবচেয়ে বেশি গোল দিয়েছে সেই দলের ১১ জনই তারকা। একে অপরের সঙ্গে আছেন এই বিশ্বাসে বিশ্বাসী দল কি পারবে রাশিয়া থেকে শিরোপা জিতে পর পর দুবার শিরোপা বিজয়ী দেশ ইতালি ও ব্রাজিলের পক্ষে নাম লেখাতে। গত তিনটি বিশ্বকাপ শিরোপা তো ইউরোপিয়ান দেশগুলো জিতেছে। ব্রাজিল সবচেয়ে বেশি পাঁচবার শিরোপা জিতেছে। গত তিনটি বিশ্বকাপ থেকে ব্রাজিল বিশ্বকাপ বিজয়ের স্বাদ পায়নি। ব্রাজিল গত বিশ্বকাপে ধাক্কা খাওয়ার পর এখন অনেক পরিণত দল, নেইমারকে পাওয়াতে দলের শক্তি অনেক বেড়ে গেছে। শিরোপা ছাড়া তারা আর কিছু ভাবতে পারছে না। আর্জেন্টিনা সেই ১৯৯০ থেকে শিরোপাবঞ্চিত। ২০১৪ বিশ্বকাপে শিরোপার খুব কাছে গিয়েও স্বপ্ন ভঙ্গ হয়েছে। আর্জেন্টিনার তারকা লিওনেল মেসির এটা চতুর্থ বিশ্বকাপ। হয়তো বা এটা তাঁর শেষ বিশ্বকাপ হতে পারে। মেসি অন্য গ্রহের ফুটবলার—আর তাই তাঁকে নিয়ে শেষ কিছু বলা মুশকিল। তবে মেসি তো আর একা কাপ জেতাতে পারবেন না, জিততে হলে তাঁর সতীর্থদের সমর্থন ও সহযোগিতা লাগবে। ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনা অনেকটা একাই বিশ্বকাপ উপহার দিয়েছিলেন আর্জেন্টিনাকে—ফুটবলে সেই সময় তো এখন আর নেই। ফুটবল শুধু পাল্টে যায়নি। ফুটবল নিয়ে আগাম কিছু বলার সুযোগ বড় বেশি কমে গেছে।

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক



মন্তব্য