kalerkantho


ঈদে ঘরমুখো মানুষের ভোগান্তি

ইসহাক খান

১৩ জুন, ২০১৮ ০০:০০



ঈদে ঘরমুখো মানুষের ভোগান্তি

মা-বাবা যত দিন জীবিত ছিলেন তত দিন শত বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে ঈদের ছুটিতে বাড়ি ছুটে গেছি। মা পথ চেয়ে থাকতেন। আমাকে দেখে কী যে মধুর হাসি হেসে আমাকে জড়িয়ে ধরতেন সে দৃশ্য দেখার মতো। কোটি টাকা দিয়েও সে হাসি কেনা সম্ভব না। এখন দুজনই আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। এখন পথের হুজ্জতের কথা মনে করে আর কষ্ট করতে ইচ্ছা করে না। বছর চারেক আগে মেজো ভাই ফোন করে জানালেন, পালের বড় বলদ কোরবানি করার নিয়ত করেছেন। আমরা বাড়ি গেলে ভালো হয়।

বাসার সবাইকে বললাম, যেতেই হবে। অনেক কষ্টে ঈদের আগের দিনের টিকিট পাওয়া গেল। দুপুর ১২টায় বাস। এক ঘণ্টা হাতে রেখে গাবতলী গিয়ে পৌঁছলাম। গিয়ে দেখি হাজারে হাজারে মানুষ। ঢাকা শহরের সব মানুষ যেন গাবতলীতে জমায়েত হয়েছে। ভিড় আর গরমে অস্থির হয়ে পড়লাম। কাউন্টারে গাড়ির খবর নিতে গিয়ে যা শুনলাম, তাতে আমার আক্কেল গুড়ুম। ১১টা ও সাড়ে ১১টার গাড়ি এখনো উত্তরবঙ্গ থেকে ঢাকায় ফিরে আসেনি। ১২টার গাড়ি কখন আসবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করার পর ফিরে আসার কথা ভাবতেই এলাকার কয়েকজন তরুণের সঙ্গে দেখা। ওরাও ১২টার গাড়ির যাত্রী। ওদের সঙ্গে আড্ডায় সময় দ্রুতই কেটে গেল। ১২টার গাড়ি ছাড়ল সন্ধ্যা নাগাদ। তারপর পথের জ্যামে হাঁ মুখে বসে থাকতে হলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা। সাভার গিয়ে বাস আর নড়ে না। বাড়িতে পৌঁছলাম পরের দিন সকাল ১১টায়। ঈদের জামাত ততক্ষণে শেষ। এমনকি পশু কোরবানিও শেষ হয়ে গেছে।

আমাদের দেখে মেজো ভাই-ভাবি ছুটে এসে আমার মেয়েদের জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, ‘ফোনে বললি ১২টায় বাস। তারপর আর খবর নাই। চার ঘণ্টার পথ এলি ২৪ ঘণ্টায়। এতক্ষণ লাগল কেন?’

আমরা তখন বিধ্বস্ত। কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছি। কোনোমতে বললাম, জ্যাম।

‘তোর মোবাইল বন্ধ কেন?’ বললাম, চার্জ নাই।

পথের এই ভয়াবহ কষ্টের কথা চিন্তা করে ঠিক করেছি, ঈদের সময় ঢাকার বাইরে আর নো যাওয়াযাওয়ি। মনে মনে কান ধরে প্রতিজ্ঞা করেছি। কিন্তু যাদের মা-বাবা বেঁচে আছেন, সংসার আছে, স্ত্রী ছেলে-মেয়ে আছে, তারা বাবার জন্য পথ চেয়ে থাকবে। বাবা না গেলে তাদের ঈদ হবে না। তাঁরা কি না গিয়ে পারবেন?

অনেকে পরামর্শ দিলেন ট্রেনে ভ্রমণ করতে। ট্রেনে জ্যামের ভয় নেই। ছাড়লে আর থামবে না। সোজা গন্তব্যে পৌঁছে দেবে। কথা ঠিক। কারণ সড়কপথের বেহাল রাস্তার কারণে জ্যাম লেগে থাকে। ঈদ উপলক্ষে রাস্তা মেরামতের যে হাল দেখা গেল তা দেখলে দেশের প্রতি মায়া বেড়ে যায়। ইটের সুরকি ফেলা হচ্ছে কাদার মধ্যে। তার ওপর পিচ ঢালা হবে। হয়ে গেল পাকা সড়ক, যার আয়ুষ্কাল মাত্র সাত দিন। ঈদের পর ঢাকা ফেরত মানুষের আসা পর্যন্ত। এই যে অপচয়, এর নামই ‘সরকার কা মাল দরিয়া মে ঢাল’। ফলে রাস্তা সারা মাসই খানাখন্দে ভরা থাকে। ঈদের সময় সেই খানাখন্দ আরো বেড়ে যায়। গাড়ির চাপে সেই ঢালাই সুরকি বেশিক্ষণ টিকতে পারে না। রাত না পোহাতেই ক্ষত নিয়ে হাঁ হয়ে তাকিয়ে থাকে সুরকি ওঠা পথ। আমাদের দুর্ভাগ্য এই অপচয় রোধ করার কোনো মহৎ মানুষ আমরা পাচ্ছি না, যিনি কঠিনহস্তে এই অপচয় বন্ধ করবেন।

ফলে সড়কপথের দুর্ভোগ ছেড়ে মানুষ ছুটছে রেলপথে। আর দ্বিগুণ চাপ এসে পড়েছে রেলপথে। সবাই ট্রেনের টিকিটের জন্য মরিয়া।

সেখানে আরো তেলেসমাতি কাণ্ড। টিকিট ছাড়ার পরই টিকিট শেষ। হাজার হাজার মানুষ সারা রাত জেগে লাইন দিয়ে গরমে সিদ্ধ হয়ে ঘামের উৎকট গন্ধ সয়ে টিকিটের জন্য লাইন দিয়েও তা পাচ্ছে না। পরে চিপাচাপায় সেই টিকিট চড়া দামে পাওয়া যায় ব্ল্যাকে।

এই ব্ল্যাকের টিকিটের ব্যাপারটি প্রথম জানতে পারি বাংলা সিনেমার স্বর্ণযুগে। তখন ঈদে একমাত্র বিনোদন ছিল ঈদ উপলক্ষে মুক্তিপ্রাপ্ত নতুন বাংলা সিনেমা। সিনেমা দেখতে গিয়ে কাউন্টারে টিকিট না পেয়ে প্রচণ্ড হতাশ। একজন বলল ব্ল্যাকে পাওয়া যাবে। ব্ল্যাক মানে? আমি জানতে চাইলে সে আমাকে নিয়ে গেল সিনেমা হলের পেছনে। কিছুদূর যেতেই রিয়াল-রিয়াল ডিসি-ডিসি বলে অদ্ভুত আওয়াজে কিছু লোক আশপাশে ঘুরঘুর করতে লাগল। আমার সেই বন্ধু বুঝিয়ে বলল, এদের কাছে টিকিট আছে। বেশি দাম দিলে টিকিট পাওয়া যাবে। আমরা তখন সিনেমা দেখার জন্য ভীষণ উন্মুখ। না দেখলে চলবে না। বাধ্য হয়ে বেশি দাম দিয়ে টিকিট কিনে সিনেমা দেখলাম। আর শিখলাম ব্ল্যাকে কিভাবে টিকিট কিনতে হয়। সেই ধারা এসে পৌঁছেছে ঈদ উপলক্ষে ট্রেনে। স্টেশনের কাউন্টারে টিকিট পাওয়া না গেলেও সেখানকার আশপাশে টিকিট পাওয়া যাবে। এই ব্যাপারটা খবরের কাগজের সুবাদে দেশবাসী সবাই জানে। শুধু জানেন না রেলমন্ত্রী, সড়কমন্ত্রী, রেলসচিব এবং রেলের কর্মকর্তারা। তাঁদেরই বা দোষ দিয়ে কী লাভ, সরকারি সব কর্মকর্তা সবাই কোটিপতি হওয়ার দৌড়ে পাল্লা দিয়ে ছুটছেন। রেলের কর্মকর্তারাই বা কেন পিছিয়ে থাকবেন। তাঁদেরও কোটিপতি হওয়ার অধিকার আছে। কারণ তাঁরাও সরকারি কর্মকর্তা। তাঁরা কোটিপতি হতে না পারলে সেটা তাঁদের বিরাট লজ্জা।

একজন সারা রাত টিকিটের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে টিকিট না পেয়ে খেদোক্তি করলেন এই বলে যে রেল কর্মকর্তারা ব্ল্যাকে টিকিট বিক্রি না করলে লাইনে যাঁরা দাঁড়িয়েছিলেন তাঁদের বেশির ভাগই টিকিট পেতেন। এমনকি তিনিও পেতেন।

ওই যে বললাম, রেলের কর্মকর্তাদেরও কোটিপতি হতে হবে। জনগণ বেঘোরে মরুক তাতে তাঁদের কী এসে যায়। তাঁদের কোটিপতি হতে হবে। তা না হলে তাঁরা ভীষণ লজ্জায় পড়ে যাবেন। বড়কর্তারা কি তাঁদের লজ্জায় ফেলতে পারেন? এতটা নির্দয় তাঁরা কেন হবেন? তাঁরাও যে একই গোয়ালের বাসিন্দা। সম্ভবত সেই ভাগ তাঁদের পকেটেও যায়।

একই নাটক দেশবাসী প্রতিবছরই দেখে। দেখে দেখে তারা অভ্যস্ত। তারা জেনে গেছে, এই ব্ল্যাকের কারবার চলবেই। এই দুঃখ নিয়েই তাদের টিকিটের জন্য যুদ্ধ করতে হবে। টিকিট পেলে হাতে চাঁদ পেল, না পেলে ভাগ্যকে দায়ী করে নিজের কপাল নিজে চাপড়াবে। কিন্তু তারা জানতে পারবে না, টিকিটের সবটাই ব্ল্যাকে যায় না। এর একটি বড় অংশ অর্থাৎ মোট টিকিটের ৩৫ শতাংশ বরাদ্দ থাকে ভিআইপি ও রেলের কর্মকর্তাদের জন্য। আমজনতার জন্য কোনো কোটা নেই। কোনো বরাদ্দ নেই। তারা ভাসমান পানা। ভাসতে ভাসতে যেখানে গিয়ে থামবে, সেখানেই তাদের গন্তব্য।

তাদের জন্য বরাদ্দ আছে কাগজে-কলমে। বাস্তবে তাদের বরাদ্দকৃত টিকিট চলে যায় ব্ল্যাকারদের কাছে। সেখান থেকে চড়া মূল্যে তাদের টিকিট খরিদ করতে হবে। না পারলে দেশে গিয়ে আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে পারবে না। বাধ্য হয়ে অনেকে ব্ল্যাকে টিকিট কেনে। সেই ছোটবেলায় সিনেমা দেখার মতো। হলে এসে সিনেমা না দেখে ফিরে যাওয়া যে কী ভয়াবহ কষ্ট, একমাত্র ভুক্তভোগীরাই তা বুঝতে পারে।

এই যে বছরের পর বছর এমন অনিয়ম চলে আসছে, এসব কি আমাদের রেলের কর্তাব্যক্তিরা জানেন না? জানলে তাঁরা নাকে তেল দিয়ে ঘুমিয়ে আছেন কেন? কেন তাঁরা এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছেন না? এমনিতে মানুষের চাপ ক্রমেই বাড়ছে। ছোট্ট এই ভূখণ্ডে ১৬ কোটি মানুষ। আবার ঈদ উৎসবে একসঙ্গে এক কোটি মানুষ রাজধানী ছেড়ে যাচ্ছে। সেই চাপ সহ্য করার অবকাঠামো কি আমরা তৈরি করতে পেরেছি? এমনিতেই আমাদের রেল মৃতপ্রায়। কোনোভাবে কোরামিন দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। সেই মৃতপ্রায় রেল এত চাপ বহন করবে কিভাবে? রেল কর্তৃপক্ষ কি ব্যাপারটি নিয়ে একটু ভাববেন?

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, গল্পকার, টিভিনাট্যকার



মন্তব্য