kalerkantho


জোরদার হচ্ছে নির্বাচনী দামামা

সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

১১ জুন, ২০১৮ ০০:০০



জোরদার হচ্ছে নির্বাচনী দামামা

আর কয়েক মাস পরেই ভারতের লোকসভা নির্বাচন। এরই মধ্যে একের বিরুদ্ধে এক প্রার্থী নিয়ে কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী একটি নতুন স্লোগান দিয়েছেন, ‘বৃদ্ধ নয়, নবীনতন্ত্র চাই।’ এর মধ্যে তিনি উত্তর প্রদেশে অখিলেশ যাদব, জয়ন্ত চৌধুরী, বিহারের তেজস্বী যাদব এবং হিন্দিবলয়ের চারটি রাজ্যের ক্ষমতা নবীনদের হাতে তুলে দিয়েছেন।

গুজরাট নির্বাচনের সময় রাহুল গান্ধী কচিকাঁচা নেতাদের নিয়েই বিজেপির বিরুদ্ধে ঘুঁটি সাজিয়েছিলেন। একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় সদ্য সমাপ্ত কর্ণাটক নির্বাচনে। আগামী নির্বাচনে ৫৪২টি আসনেই বিরোধী জোটের প্রার্থী দেওয়ার শলাপরামর্শ প্রায় শেষ পর্যায়ে। ডিসেম্বর মাসেই বিজেপি শাসিত চারটি রাজ্য মধ্য প্রদেশ, ছত্তিশগড়, রাজস্থান ও ঝাড়খণ্ডে বিধানসভার নির্বাচন হবে। এই রাজ্যগুলোতে সমাজবাদী পার্টি এবং বহুজন সমাজ পার্টির খুব একটা প্রভাব নেই। রাহুল গান্ধী নিজে ওই পার্টির নেতাদের সঙ্গে প্রাথমিক কথা সেরে নিয়েছেন অর্থাৎ কংগ্রেস সব দলকেই কিছু আসন ছাড়বে।

রাহুলের এ উদ্যোগকে সব দলই স্বাগত জানিয়েছে। অর্থাৎ রাহুল চাইছেন লোকসভা নির্বাচনে একের বিরুদ্ধে এক প্রার্থী দাঁড় করাতে। ২০১৮ সালে ভারতের লোকসভা নির্বাচনে সব বিরোধী দল মিলে ৬৯ শতাংশ ভোট পেয়েছে। আর মোদির গেরুয়া বাহিনী পেয়েছে মাত্র ২৯ শতাংশ ভোট। তাই কংগ্রেস সভাপতি জোটের ওপর জোর দিচ্ছেন। কারণ সম্মিলিতভাবে ৬৯ শতাংশ ভোট পেয়েও বিরোধী দল ২৯ শতাংশ ভোট পাওয়া দলের কাছে হেরে গেছে। এবার ভোট যাতে ভাগাভাগি না হয় সেটার জন্য বিরোধী দলগুলো ঝাঁপাচ্ছে; ব্যাপারটা যদিও কঠিন, তবু রাহুলের আশা বিজেপিবিরোধী জোট ‘ক্লিক’ করবে।

২৯ শতাংশ ভোট পেয়েও মোদি-শাহের দল গত চার বছরে ভারতকে অর্থনৈতিকভাবে খাদের কিনারায় দাঁঁড় করিয়ে দিয়েছে। সামাজিকভাবে ‘জাতপাতের’ নামে ‘বজ্জাতি’ চলছেই; যার ফল এখন ভোগ করতে হচ্ছে ১৩০ কোটি মানুষকে।

এই একের বিরুদ্ধে এক জোট যাতে না হয় সে জন্য আসরে নামানো হয়েছে দিদিকে। দিদির সঙ্গে বিজেপির সম্পর্ক ১৯৯৮ সাল থেকে, কখনো প্রকাশ্যে এসেছে সেই আঁতাত, কখনো বা আপাতভাবে গোপন থেকেছে। এবারও সারদা, নারদা, রোজ ভ্যালিসহ বহু দুর্নীতির জালে জড়ানো ‘দিদি’কে আপাতভাবে ছাড় দিয়ে মোদি-শাহ তৃতীয় ইউপিএ গঠনকে গোড়াতেই বিনষ্ট করতে চাইছেন।

সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের কয়েকজন প্রবীণ নেতা কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে তাঁর ১০ জনপথের বাসভবনে দেখা করেন। সোনিয়া তাঁদের বলেছেন, মমতার কীর্তিকলাপ তিনি সব জানেন। মমতার প্রস্তাবিত ‘ফেডারেল ফ্রন্ট’ খায় না মাথায় দেয়, তা-ই বিশেষজ্ঞরা বুঝতে পারছেন না। তাঁরা বলছেন কাদের নিয়ে এই ফ্রন্ট? কারণ এখন দেশের ভবিষ্যৎ ইউপিএ-তিন।

প্রথম ইউপিএতে নেতৃত্ব দেয় কংগ্রেস; যার চেয়ারপারসন ছিলেন সোনিয়া গান্ধী ও প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংহ। সেবার কংগ্রেসের আসন ছিল ১৪৪ আর ইউপিএ-দুইয়ে কংগ্রেস পায় ২৪২টি আসন। প্রথম ইউপিএ কাজকর্মের নিরিখেই এই ভালো ফল। তার দু-একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। গ্রামগঞ্জে ১০০ দিনের কাজ, তথ্য জানার অধিকার আইন, কৃষকদের ঋণ মকুব এবং কর্মসংস্থান।

কংগ্রেস সবাইকে নিয়ে চলতে পারে আর বিজেপি পারে না, তার ভূরি ভূরি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। বিজেপি শরিকদের টাকা দিয়ে কিনে গোয়া, মণিপুর, মেঘালয়ে সরকার গড়ল সংবিধানকে কলঙ্কিত করে। অন্যদিকে কংগ্রেস সংখ্যাগুরু হয়েও কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিল আঞ্চলিক দলকে।

সেই আঙ্গিকেই তৈরি হচ্ছে ইউপিএ-তিন; যেখানে জোট শরিকরা পাবে নিজেদের মর্যাদা। যদি তারা পরবর্তী লোকসভায় জিতে ক্ষমতায় আসে, তবে এক নতুন ইতিহাস গড়বে এই জোট সরকার রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে।

দিদি এই বিষয়ে তলে তলে মোদি-শাহের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। সম্প্রতি ভারতের ১০টি রাজ্যের চারটি লোকসভা এবং ১১টি বিধানসভার উপনির্বাচনে সিঁদুরে মেঘ দেখেছে বিজেপি। সেখানেও একটি বাদে বিজেপির সব আসন হাতছাড়া হয়েছে। ভোটও কমেছে। মানুষ দেখছে নোটবন্দি, গরু কাটার নামে মানুষ হত্যা, জাতপাতের নামে মেরুকরণ, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, দুর্নীতির পাহাড় আর একের পর এক নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ।

বাঙালি মুসলমানরা দিদির প্রলোভনে পা দেয়নি। প্রলোভনে পা দিয়েছে তারাই, যারা ছিল পাকিস্তানি সেনাদের দোসর। যারা স্বাধীন বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে এসেছিল। এখানে উল্লেখ্য, মমতা মন্ত্রিসভায় ছয় সংখ্যালঘু মন্ত্রীর মধ্যে কেউ বাঙালি মুসলমান নন।

সামগ্রিক পরিস্থিতি বিচারে দেখা যাচ্ছে পরবর্তী লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে বাম বা কংগ্রেস আলাদাভাবে বিশেষ সুবিধা করতে পারবে না। এ ব্যাপারে কংগ্রেস ও সিপিএম আলাপ-আলোচনা শুরু করেছে। সিপিএমের রাজ্য কমিটির সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র ও কংগ্রেসের রাজ্য সভাপতি অধীর চৌধুরী প্রকাশ্যে বলছেন, তাঁরা বিজেপি-তৃণমূলকে হারাতে বদ্ধপরিকর। যদিও এ ব্যাপারে দুই দলের রাজ্য নেতারা তাঁদের দিল্লির হাইকমান্ডের দিকে তাকিয়ে আছেন। যত দিন এগোবে ততই নির্বাচনী দামামা জোরদার হবে।

 

লেখক : পশ্চিমবঙ্গের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক



মন্তব্য