kalerkantho


সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রতিরক্ষা বাজেট

মেজর জেনারেল এ কে মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.)

১১ জুন, ২০১৮ ০০:০০



সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রতিরক্ষা বাজেট

৭ জুন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জন্য বাংলাদেশের ইতিহাসে এযাবৎকালের সর্ববৃহৎ বাজেট প্রস্তাব করেছেন। বর্তমান সরকার ২০০৯ সাল থেকে পর পর দুই মেয়াদে ক্ষমতায় আছে। এই সরকারের প্রথম মেয়াদে যাত্রার শুরুর অব্যবহিত আগের বছর অর্থাৎ ২০০৮-০৯ অর্থবছরে মোট বাজেট ছিল প্রায় এক লাখ কোটি টাকা আর উন্নয়ন বাজেটের পরিমাণ ছিল মাত্র সাড়ে ২২ হাজার কোটি টাকা। এবার ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জন্য মোট বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে চার লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা আর উন্নয়ন বাজেট প্রায় এক লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। এতে গত ১০ বছরে সার্বিক বাজেট বৃদ্ধি ঘটেছে শতকরা হিসাবে প্রায় ৩০৮ শতাংশ আর উন্নয়ন বাজেট বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৮০০ শতাংশ। এতে এ সরকারের দুই মেয়াদে সার্বিক বাজেট বৃদ্ধি হয়েছে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৩১ শতাংশ এবং উন্নয়ন বাজেট প্রায় ৮০ শতাংশ। এ সংখ্যাগুলোই বলে দেয় গত ১০ বছরে উন্নয়নের গতি ও মাত্রা কেমন ছিল। এই হারে বাজেট বৃদ্ধি খুব কম দেশেই ঘটেছে। উন্নয়ন বাজেট এত বিশালভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে বলেই বাংলাদেশের মানুষের সার্বিক অর্থনৈতিক অবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। সরকারের ব্যয় মানে হলো জনগণের আয়। বাংলাদেশের উন্নয়নের এই মডেলের দৃশ্য বিশ্বের বড় বড় অর্থনীতিবিদ প্রবল আগ্রহ নিয়ে লক্ষ করছেন। এ বিষয়ে আমার নিজের সাম্প্রতিক সময়ের একটা অভিজ্ঞতার কথা বলি। প্রায় চার মাস আমেরিকায় থাকার পর সপ্তাহ তিনেক হলো আমি দেশে ফিরেছি। লুজিয়ানা রাজ্যের নিউ অরলিন্স শহরে মিসিসিপি নদীর তীরে পর্যটকদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি রিভার ওয়াক শপিং মল দেখতে গিয়েছিলাম দেশে ফেরার কয়েক দিন আগে। শপিং মলের দুই পাশে বড় বড় দোকানের মাঝখানে হাঁটাচলার জন্য অনেক চওড়া স্পেস, যেখানে আবার স্বল্প পরিসরে চক্রাকারের তাকের ওপর ছোট ছোট শোপিস, মোবাইল, ঘড়ি, নানা পদের অরনামেন্ট ইত্যাদি নিয়ে পসরা সাজিয়ে পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টায়রত উঠতি বয়সের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েরা। পড়াশোনার ফাঁকে অতিরিক্ত কিছু আয় করাই তাদের লক্ষ্য। আমরা ওই সব খুচরা দোকানের পাশ দিয়েই হাঁটছিলাম। এ রকম একটা দোকানের পাশ দিয়ে যেতেই দোকানের মেয়েটি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য একটু এগিয়ে এসে জানতে চাইল আমরা কোন দেশ থেকে এসেছি। বাংলাদেশ বলতেই যেন বিক্রেতা মেয়েটির আগ্রহ বেড়ে গেল। সে প্রশ্নের সুরে বলল, তোমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কেমন আছেন।

আমি প্রথমে একটু আশ্চর্যই হলাম। কারণ আমেরিকায় এই বয়সের ছেলে-মেয়েদের মধ্যে বাংলাদেশ সম্পর্কে জানা বা আগ্রহ থাকাটা সচরাচর দেখা যায় না। তারা নিজেদের নিয়েই মশগুল থাকতে ভালোবাসে। আরেকটু আলাপচারিতার পর মেয়েটির বাংলাদেশ সম্পর্কে আগ্রহের আসল কারণটি জানতে পারলাম। সে স্থানীয় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নয়ন অর্থনীতির ওপর গ্র্যাজুয়েশন করছে। তার অধ্যাপক তাকে বলেছেন, একটি স্বল্পোন্নত দেশ কিভাবে স্বল্প সময়ের মধ্যে উন্নয়নের ম্যাজিক সৃষ্টি করতে পারে তা নিজ চোখে দেখতে চাইলে তাকে বাংলাদেশে যেতে হবে। অধ্যাপক তাকে আরো বলেছেন, উন্নয়নের যে গতি ও ধারায় বাংলাদেশ উঠে এসেছে, তা অব্যাহত থাকলে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে অর্থনীতির ছাত্রদের ভবিষ্যতে বাংলাদেশের এই উত্থানপর্বের ইতিহাস পড়তে হবে। অধ্যাপকের উৎসাহে আমেরিকার তরুণী, উন্নয়ন অর্থনীতির ওই ছাত্রী নিজ চোখে উন্নয়নের চিত্র দেখা ও জানার জন্য আগামী বছর গ্রীষ্মের ছুটিতে বাংলাদেশে আসবে। বিশ্বব্যাংকের রেটিং অনুসারে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের প্রায় ২০০ রাষ্ট্রের মধ্যে ৪২তম অর্থনৈতিক অবস্থানে আছে। এই অবস্থান ২০৩০ সালে হবে ২৯তম। তখন বাংলাদেশ মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুরকে ছাড়িয়ে যাবে, এমন প্রিডিকশনই করছে বিশ্বের সব নামকরা অর্থনীতিবিদ এবং বড় বড় গবেষণা প্রতিষ্ঠান।

দেশের সম্পদ ও সম্ভাবনা বৃদ্ধির সঙ্গে স্বাভাবিক কারণেই তার প্রতি বহির্দেশের নজর পড়বে এবং বড় শক্তিশালী দেশের সঙ্গে লেনদেন বৃদ্ধি পাবে। সম্পদ বাড়ার সঙ্গে একই হারে রাষ্ট্রের স্বার্থের পরিধিও বাড়তে থাকে। ২০৩০ সালে আমাদের সম্পদ ও স্বার্থের পরিধি যে জায়গায় পৌঁছবে তার সুরক্ষায় তখনকার জন্য সময়োপযোগী সক্ষম ও শক্তিশালী একটি সশস্ত্র বাহিনী থাকা একান্ত অপরিহার্য। সম্পদ বৃদ্ধি ও উন্নয়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যদি সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি না হয়, তাহলে পরিণতি কেমন হতে পারে তার জ্বলন্ত উদাহরণ আমাদের নিকট প্রতিবেশী শ্রীলঙ্কার দিকে তাকালে দেখা যায়। ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত সশস্ত্র বাহিনীর দিকে কোনো নজর না দিয়ে তারা অর্থনৈতিক ও সামজিক খাতে ব্যাপক উন্নয়ন করেছিল। কিন্তু ১৯৮৩ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সশস্ত্র আন্দোলনের ফলে সব অর্জনই বিনষ্ট হয়ে যায়। ২০০৯ সালে এসে সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সামাল দিতে পারলেও তার ক্রিয়া-প্রক্রিয়ায় যা ঘটেছে, তাতে শ্রীলঙ্কার সার্বভৌমত্ব আজ চীন ও ভারতের কাছে বন্ধক রাখতে হয়েছে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এই সময়ে এসে একটা আধুনিক সেনাবাহিনীর মহাসড়কে উঠে পড়েছে। এই মহাসড়কে যাত্রী ২০৩০ সালের মধ্যে সম্পন্ন করার জন্য ফোর্সেস গোল ২০৩০ অনুসারে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সেনাবাহিনীতে সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে আধুনিক ট্যাংক, গোলন্দাজ বাহিনীর কামান, ট্যাংক বিধ্বংসী মিসাইল, হেলিকপ্টারসহ অন্যান্য উন্নত মানের সরঞ্জাম। কাঠামোগতভাবে পদ্মা সেতুর নিরাপত্তার জন্য গঠিত হয়েছে নতুন কম্পোজিট ব্রিগেড। সিলেট ও রামুতে আরো নতুন দুটি পদাতিক ডিভিশন গঠন করা হয়েছে। নৌবাহিনীতে যুক্ত হয়েছে আধুনিক ফ্রিগেট মিসাইল ও হেলিকপ্টার। সম্প্রতি সাবমেরিন যুক্ত হওয়ায় নৌবাহিনী এখন ত্রিমাত্রিক বাহিনীর রূপ নিয়েছে। বিমানবাহিনীতে যোগ হয়েছে নতুন যুদ্ধবিমান ও আধুনিক রাডার। একটি আধুনিক সেনাবাহিনীর জন্য যত প্রকার এবং যতটি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট থাকা দরকার তার সবই বাংলাদেশের রয়েছে। এসব প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের মান বিশ্বের অন্য যেকোনো সমপর্যায়ের প্রতিষ্ঠানের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। এই অভিযাত্রাকে শক্তিশালী করার জন্য সম্প্রতি প্রতিরক্ষা নীতিমালা চূড়ান্ত করা হয়েছে। সুতরাং প্রতিরক্ষা নীতিমালা ও ফোর্সেস গোল ২০৩০-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতিরক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ করা প্রয়োজন।

দারিদ্র্য, অশিক্ষা, কুশিক্ষা, ধর্মান্ধতা রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য এখন বড় হুমকি। রাষ্ট্রের টেরিটোরি বা সীমান্ত রক্ষা করা সশস্ত্র বাহিনীর একটি অন্যতম কাজ হলেও এখন আর এই কাজকে মুখ্য দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করা হয় না। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের সেই ধ্রুপদি সংজ্ঞাও আজ সময়োপযোগিতা হারিয়েছে। এখন বিশ্বায়নের যুগ। ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগের এখন আর সীমানা নেই। এক দেশ আরেক দেশের অভ্যন্তরে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করছে। এক দেশের হাজার-লাখো মানুষ ব্যবসা-বাণিজ্য ও অন্যান্য কর্মে নিজ দেশের বাইরে অন্য দেশে নিয়োজিত আছে। সুতরাং এক দেশের স্বার্থ সীমানা পেরিয়ে অন্য দেশের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়েছে। এক দেশের স্বার্থ যখন অন্য দেশের ভেতরে ঢুকে যায় তখন কোনো না কোনো সময়ে স্বার্থের দ্বন্দ্ব বাধা অস্বাভাবিক নয়। সেই দ্বন্দ্ব কোন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছবে, তা বহু ফ্যাক্টরের ওপর নির্ভরশীল। দ্বন্দ্ব মেটাতে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা যদি ব্যর্থ হয়, তাহলে সেটি সামরিক দ্বন্দ্বে রূপ নেওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। তবে নিজ দেশের সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা যদি সময়োপযোগী হয়, তাহলে অন্য দেশ যত বড় বা শক্তিশালী হোক না কেন, তারা সামরিক দ্বন্দ্বের পথ এড়িয়ে কূটনৈতিক পথে দুই পক্ষের জন্য উইন উইন বা সমান সুযোগ প্রাপ্তির সমাধান খোঁজার চেষ্টা করবে। একেই বলে নিজ দেশেই ডেটারেন্ট ক্ষমতা বা নিবারক শক্তি। এই বিষয়গুলো বিবেচনায় এনে প্রতিরক্ষা বাজেট বরাদ্দের চিন্তা করলে তার যৌক্তিকতা পাওয়া সহজ হবে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার, যাদের সঙ্গে আমাদের প্রায় ২৪০ কিলোমিটারের মতো স্থলসীমান্ত ও বিস্তীর্ণ সমুদ্র সীমান্ত রয়েছে। তাদের সেনাবাহিনীর আকার প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখের ঊর্ধ্বে। সংখ্যানুসারে বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম সেনাবাহিনী। তাদের লোকসংখ্যা প্রায় ছয় কোটি। আমাদের এক-তৃতীয়াংশ। তবে আয়তনে আমাদের থেকে ছয় গুণ বড় দেশ। তাদের প্রতিরক্ষা বাজেট মোট ব্যয়ের প্রায় ১৩-১৪ শতাংশ। শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড প্রতিরক্ষা বাজেটে তাদের মোট ব্যয়ের ১২ থেকে ১৪ শতাংশ বরাদ্দ রাখে। পাকিস্তান এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি, ১৮ শতাংশ। চীন ও ভারতের কথা এখানে উল্লেখ করা নিষ্প্রয়োজন। গত শতকের নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিশ্বের সব বিশ্লেষক ধারণা করেছিলেন, ভবিষ্যতে হয়তো অস্ত্র ব্যবসা হ্রাস পাবে, প্রতিরক্ষা ব্যয় কমে যাবে এবং সেই টাকা মানবতার অভিশাপ—দারিদ্র্য দূরীকরণে ব্যয় হবে। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের প্রায় তিন দশক পর সেই প্রতিরক্ষা ব্যয় কমানোর কথা এখন আর কেউ বলে না। সব দেশ সমানতালে প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি করে চলেছে। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে প্রাচ্যের সুইজারল্যান্ড করতে চেয়েছিলেন। তাঁর স্বপ্নের পরস্ফুিটন আমরা দেখতে পেলাম না। তবে তিনি মর্যাদাশীল ও আধুনিক একটি সেনাবাহিনীর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন; যার ফলে তিনি মিলিটারি একাডেমি প্রতিষ্ঠা করলেন। সশস্ত্র বাহিনীর জন্য ট্যাংক, যুদ্ধবিমান আনলেন। মুক্তিযুদ্ধের পর ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনৈতিক অবস্থা সত্ত্বেও সেনাবাহিনীকে পুনর্গঠন করে ব্রিগেড পর্যায়ে উন্নত করলেন। বঙ্গবন্ধু বুঝেছিলেন, একসময়ে ভূ-রাজনীতির বিবেচনায় বাংলাদেশ এতদঞ্চলের ফ্রন্ট লাইন স্টেট হবে। এখন আমরা তার প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছি। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগর এলাকায় আমেরিকার সামরিক গুরুত্ব বৃদ্ধি এবং চীন-ভারতের সূক্ষ্ম প্রতিযোগিতার ফলে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। তাই বাংলাদেশের অপার সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার যে যাত্রা শুরু হয়েছে, সেই যাত্রাপথের নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে বাংলাদেশে সেনাবাহিনীর শক্তিশালীকরণের প্রক্রিয়াকে চলমান রাখা প্রয়োজন।

 

লেখক : কলামিস্ট ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক



মন্তব্য