kalerkantho


রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, যানজট ও জনদুর্ভোগ

ড. হারুন রশীদ

২৭ মে, ২০১৮ ০০:০০



রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, যানজট ও জনদুর্ভোগ

রমজান এলেই নিত্যপণ্যের বাজারে আগুন দেখা দেয়। রমজানে অপরিহার্য এমন অনেক পণ্যের দাম আকাশচুম্বী হয়ে যায় কোনো কারণ ছাড়াই। এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী মুনাফার লোভে কারসাজি করে জিনিসপত্রের দাম বাড়ায়, যা রমজানের চেতনার পরিপন্থী। অন্যদিকে এই সংযমের মাসেই দেখা যায় বিত্তশালীদের বাড়াবাড়ি। তাঁরা খাদ্যের অপচয় করেন। অথচ অনাহারী ও অভাবক্লিষ্টরা কত কষ্টে থাকে। তাদের প্রতি দায়িত্ব পালন করাও রমজানের শিক্ষা। এ ছাড়া রমজানে রাজধানীর অন্যতম সমস্যা যানজট আরো তীব্র আকার ধারণ করে। এসব দিকে নজর দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

রমজানে জনভোগান্তি দূর করার জন্য সব সময়ই দাবি থাকে। কিন্তু দেখা যায় এই সময়ে নানা ক্ষেত্রে ভোগান্তি আরো বেড়ে যায়। বিশেষ করে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, যানজট তীব্র আকার ধারণ করা, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি সংকট দেখা দেওয়া, ভেজালের সমারোহ বৃদ্ধি ইত্যাকার নানা সমস্যায় জর্জরিত থাকে মানুষজন। সব কিছু মিলে এক অরাজক অবস্থা। অথচ সংযমের মাস পবিত্র রমজানে সব ক্ষেত্রেই দায়িত্বশীলতা ও নীতি-নৈতিকতার উন্মেষ ঘটার কথা।

যে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে পণ্যের দাম বাড়ান, তিনি অন্তত রমজানে তা করবেন না; যারা খাদ্যে ভেজাল মেশান, তারা তা থেকে বিরত থাকবেন, যানজট দূর করতে আগের থেকেও সক্রিয় হবে পুলিশ—এভাবে সব ক্ষেত্রেই একটি ইতিবাচক পরিবর্তন দেখতে চায় মানুষ। কিন্তু রোজার প্রথম ধাক্কাটা লাগে পণ্যের বাজারে। এবারও বেগুনের দাম হয়েছে বাজারভেদে ৮০ থেকে ১০০ টাকা। ছোলা ৯০ থেকে ১০০ টাকা। বেসনের মূল্যও বৃদ্ধি পেয়েছে অস্বাভাবিকভাবে। অথচ অন্য দেশে কোনো উৎসব-পার্বণে জিনিসপত্রের দাম কমিয়ে দেওয়া হয়, যাতে ভালোভাবে সবাই সেই উৎসবে অংশ নিতে পারে। আমাদের দেশে এর উল্টো চিত্র। এ ব্যাপারে অনেক কথা হলেও কাজের কাজ খুব কমই হয়। এবারও রমজানের শুরুতেই প্রয়োজনীয় অনেক নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে গেছে। দেখার যেন কেউ নেই। ভোক্তাদের পকেট কাটা যাবে আর প্রশাসনযন্ত্র তাকিয়ে তাকিয়ে দেখবে এটা হতে পারে না। এ ব্যাপারে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, যাতে ন্যায্য মূল্যে ভোক্তারা পণ্য পায়।

রমজানে টিসিবির কার্যক্রম আরো জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ বাজারে সমান্তরাল একটি সরবরাহব্যবস্থা থাকলে কোনো সিন্ডিকেটই খুব বেশি সুবিধা করতে পারবে না। তা ছাড়া নিম্ন আয়ের লোকজন যেন অল্প দামে জিনিসপত্র কিনতে পারে, সেই ব্যবস্থাও চালু রাখা প্রয়োজন। এ জন্য শুধু নামে কার্যক্রম চালালেই হবে না, যথেষ্ট পণ্য যেন মজুদ থাকে সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। পণ্যের গুণগত মান বজায় রাখাও জরুরি। আর টিসিবির পণ্য যেন সব জায়গায়ই পাওয়া যায়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। এ ব্যাপারে ব্যাপক প্রচারণাও চালাতে হবে।

অন্যদিকে রমজান মাসের শুরুতেই যানজট তীব্র আকার ধারণ করেছে। অফিসগামী ও অফিসফেরতদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে। শুধু ব্যবস্থাগত ত্রুটি ও অনেক ক্ষেত্রে অবহেলার কারণে যানজট এত তীব্র আকার ধারণ করে। কিন্তু যানজট দূর করতে বাড়তি কোনো তৎপরতা চোখে পড়ছে না। যানবাহনগুলো নিয়ম মেনে না চললেও সেগুলো দেখার কেউ নেই। কিন্তু এ অবস্থা চলতে পারে না। রমজানে অফিস সময় কমিয়ে দেওয়া হয়, যাতে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সবাই মিলে ইফতার করতে পারে। কিন্তু সে সময় যদি রাস্তায়ই নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে এর চেয়ে দুঃখজনক আর কী থাকতে পারে।

দুঃখজনক হচ্ছে, রমজানে যানজট নিরসনে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উন্নতিতে নানা কৌশল নির্ধারণের কথা থাকলেও তা টিকছে না। স্থবির রাস্তায় অস্বস্তি আর ভোগান্তি নিয়ে যানবাহনে দীর্ঘ সময় বসে থাকতে হয়েছে অফিসগামী মানুষকে। খোঁড়াখুঁড়ির কারণে রাস্তায় যানজট হচ্ছে। কয়েক মাস ধরে চলা যানজটের ধারাবাহিকতায় রমজানেও তার প্রভাব পড়েছে। মেট্রো রেলের জন্য উন্নয়নকাজ চলায় মিরপুরে খোঁড়াখুঁড়ি চলছে অনেক দিন ধরে। রমজানেও তা থেমে নেই। এর ফলে এক লেনে দুটির বেশি গাড়ি যেতে পারছে না। ফলে দেখা দিচ্ছে তীব্র যানজট।

রমজানের সময় খোঁড়াখুঁড়ি বন্ধ রাখার দাবি থাকলেও তা হয়নি। অথচ রোজাদাররা বাড়িতে গিয়ে যাতে সময়মতো ইফতার করতে পারেন সে জন্য কর্মঘণ্টা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। সে সময় যদি যানজটে পড়ে রাস্তায়ই নষ্ট হয়ে যায় এর চেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে। প্রতিদিনই রাস্তায় নামছে অসংখ্য গাড়ি। কিন্তু সে অনুযায়ী রাস্তাঘাট কি বাড়ছে? অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা কি নিশ্চিত হচ্ছে? ট্রাফিক ব্যবস্থা কি আধুনিকায়ন হচ্ছে?

রমজানে যানজট দূর করতে ট্রাফিক বিভাগকে আরো কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। যেখানে খোঁড়াখুঁড়ি চলছে সেখানে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা জোরদার করতে হবে। যানজট দূর করা, দ্রব্যমূল্য স্বাভাবিক রাখা, ভেজাল বন্ধ করা, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহ ঠিক রেখে জনভোগান্তি দূর করাই হবে এ মুহূর্তের করণীয়।

 

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট

harun_press@yahoo.com

 



মন্তব্য