kalerkantho


ষড়যন্ত্রকারীরা আবার সক্রিয় হচ্ছে

মেজর জেনারেল এ কে মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.)

২৫ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



ষড়যন্ত্রকারীরা আবার সক্রিয় হচ্ছে

সরকারি চাকরির নিয়োগপ্রক্রিয়ায় কোটা পদ্ধতি থাকা, না থাকা বা সংস্কার ইস্যুতে সাধারণ ছাত্রদের আন্দোলনকে ভিন্ন দিকে নিয়ে যাওয়ার একটা ষড়যন্ত্র সবাই লক্ষ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসায় আক্রমণ, ভাঙচুর, আগুন দেওয়া, লুটপাট এবং মুখঢাকা একদল দুর্বৃত্তের অগ্রণী ভূমিকা এবং পুলিশের গুলিতে একজন ছাত্র নিহত হওয়ার মিথ্যা খবর সামাজিক মাধ্যমে প্রচার—এই ষড়যন্ত্রের সাক্ষ্য বহন করে। ষড়যন্ত্রকারীরা হয়তো ভেবেছিল, উপাচার্যের বাসায় এমন আক্রমণ চালালে পুলিশ গুলি চালাতে বাধ্য হবে এবং তাতে কয়েকটি লাশ পাওয়া গেলেই কেল্লাফতে। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দু-একটি লাশ ফেলে দেওয়ার ষড়যন্ত্রের কথা শোনা গিয়েছিল। তখন ঢাকায় অবস্থানরত একজন জাসদ-কাম-আওয়ামী লীগ নেতা ও লন্ডনে অবস্থানরত এক সাবেক মেয়রের এই প্রসঙ্গে ফোনালাপ ফাঁস হয়ে পড়ার পর মানুষ তা জানতে পেরেছিল। এখন আবার আরেকটি জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে নতুন করে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। তবে চাকরিতে কোটা পদ্ধতির সংস্কার আন্দোলনকে অবলম্বন করে ষড়যন্ত্রকারীদের অশুভ তৎপরতা প্রধানমন্ত্রীর বিচক্ষণতায় অন্তত এ যাত্রায় মাঠে মারা গেছে। কিন্তু দুঃখজনক হলো, এই ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ কখনো উন্মোচিত হবে না, যেমনভাবে মুখোশ উন্মোচিত হয়নি পিলখানা হত্যাকাণ্ডের মূল খলনায়কদের। তবে বর্তমান ও অতীতের এসব ষড়যন্ত্রের কোনোটাই বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, সবই একই সূত্রে গাঁথা। এদের আসল পরিচয় ও উদ্দেশ্য বুঝতে চাইলে ১৯৭৫ সালের পর থেকে আজ পর্যন্ত চলমান বাংলাদেশের মূল রাষ্ট্রীয় দর্শনের জায়গায় সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী দুটি রাজনৈতিক ধারার গতি-প্রকৃতি, বৈশিষ্ট্য ও কর্মকাণ্ডের নির্মোহ বিশ্লেষণের দিকে নিবিড় দৃষ্টিপাত প্রয়োজন।

রাষ্ট্রের মৌলিক দর্শন নিয়ে এমন বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণেই রাজনীতিতে ষড়যন্ত্র একটা স্থায়ী রূপ পেয়েছে এবং ষড়যন্ত্রের হাত ধরেই রাজনীতিতে চরম প্রতিহিংসা স্থান করে নিয়েছে, সৃষ্টি হয়েছে পক্ষদ্বয়ের মধ্যে সীমাহীন অবিশ্বাস ও অনাস্থা। এই দুই রাজনৈতিক ধারার প্রথম পক্ষ রাষ্ট্রের মৌলিক আদর্শ হিসেবে রাখতে চায় এমন সব বৈশিষ্ট্য, যা পরস্ফুিটিত হয়েছে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ২৩ বছর দীর্ঘ সংগ্রামের ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে প্রাপ্ত গৌরবোজ্জ্বল সব অর্জনের ফল হিসেবে, যার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের মাধ্যমে এবং তার লিখিত স্বরূপ প্রোথিত হয় বাহাত্তরের সংবিধানে। যার মৌলিক কথা, রাষ্ট্র হবে পরিপূর্ণ অসাম্প্রদায়িক, যার রক্ষাকবচ হিসেবে রাষ্ট্রের মৌলিক আদর্শ হবে ধর্মনিরপেক্ষতা। এ পক্ষের চালিকাশক্তির মূল বাহন হচ্ছে বাঙালি সংস্কৃতি। অন্যদিকে দ্বিতীয় রাজনৈতিক পক্ষের আবির্ভাব ঘটে একাত্তরের পরাজিত রাষ্ট্র পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই ও তাদের তখনকার একান্ত সঙ্গী পরাশক্তি এবং তাদের এ দেশীয় দোসর জামায়াত-মুসলিম লীগের সম্মিলিত ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পরে। অর্থাৎ একটা বিশাল ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় পক্ষের জন্ম। এই দ্বিতীয় পক্ষ রাষ্ট্রের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে পাকিস্তানের মতো ধর্মতন্ত্র, ধর্মের অপব্যবহারই হয় তাদের মূল অবলম্বন, যার থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যই বাঙালি জাতি ২৩ বছর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে এবং একাত্তরে ৩০ লাখ মানুষের জীবন বিসর্জন দিয়েছে।

১৯৭৫ সালের পর দীর্ঘ ১৫ বছর পর পর দুজন সামরিক শাসক মার্শাল ল শক্তির বলে অস্ত্র, কালো টাকা, ধর্মের অপব্যবহারের মাধ্যমে ষড়যন্ত্র ও প্রতিহিংসার রাজনীতিকে বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে সক্ষম হন। ষড়যন্ত্র থেকেই প্রতিহিংসার জন্ম হয়। ১৯৭৫ সালের পর সেই শুরু থেকেই এ পক্ষ বুঝতে পারে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রামের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ও বাঙালি সংস্কৃতির অফুরন্ত সহজাত শক্তির প্রেরণা অবলম্বনকারী প্রথম পক্ষের রাজনীতিকে নিয়মতান্ত্রিক সহজ-সরল পথের রাজনীতির মাধ্যমে পরাজিত করা যাবে না, বৃহত্তর জনগণের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় থাকা অথবা যাওয়া যাবে না। সুতরাং ষড়যন্ত্র ও ধর্মের অপব্যাখাই হয়ে ওঠে দ্বিতীয় পক্ষের রাজনীতির মূল অবলম্বন। ষড়যন্ত্র থেকেই প্রতিহিংসার জন্ম হয়, যে কথা একটু আগেই উল্লেখ করেছি। ষড়যন্ত্র ও প্রতিহিংসায় ভরপুর ছিল দুই সামরিক শাসকের শাসনামল, যার চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটে ২০০১ থেকে ২০০৬ মেয়াদে ২০০৪ সালের ২১ আগস্টে, যখন তৎকালীন ক্ষমতাসীন দ্বিতীয় প্রতিভূ সরকারের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় স্মরণকালের ভয়াবহ গ্রেনেড আক্রমণ চালিয়ে প্রথম পক্ষের রাজনীতির ধারক দলের শীর্ষ নেতৃত্বসহ প্রথম সারির নেতাদের হত্যা করার চেষ্টা করা হয় কোনো সভ্য দেশে যা ভাবা যায় না। দ্বিতীয় পক্ষ কখনো সামরিক শাসকের পোশাকে, আবার কখনো একাত্তরের পরাজিত গোষ্ঠী জামায়াত-মুসলিম লীগকে সঙ্গে নিয়ে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থেকেছে। একটা বিষয় সব সময় দেখা গেছে, এরা ক্ষমতায় থেকে মেয়াদ শেষ হওয়ার পর স্বাভাবিক সুস্থ পন্থায় সুষ্ঠু নির্বাচনের পথকে কখনো সুগম করেনি, বরং বহুবিধ ষড়যন্ত্র করেছে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য। আবার বিরোধী দলে থাকার সময়ে ক্ষমতায় যাওয়া নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত নানা টালবাহানায় নির্বাচন বানচাল করার চেষ্টা করেছে, আর নয়তো নির্বাচন বর্জন করে তা প্রতিহত করার নামে নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা চালিয়েছে। যেগুলো আসলে ষড়যন্ত্রেরই বহিঃপ্রকাশ।

১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ মেয়াদে এরা ক্ষমতায় থেকে সুষ্ঠু নির্বাচনের পথকে বাধাগ্রস্তের ষড়যন্ত্র করার কারণেই সব বিরোধী পক্ষ সেটি টের পেয়ে গেলে গণ-আন্দোলনের মুখে জনরোষের কবলে পড়ে তারা ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়। তারপর সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ সুগম হলেও মাঝখানে তাদের নিয়োগপ্রাপ্ত এক রাষ্ট্রপতি, যিনি একাত্তরের পাকিস্তানি বাহিনীর দোসর ছিলেন। তিনি ১৯৯৬ সালের মে মাসের মধ্যভাগে নির্বাচন বানচাল করার জন্য সেনাবাহিনীকে জড়িয়ে বিশাল ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা সফল হয় না। এই পক্ষ আবার ২০০১ থেকে ২০০৬ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকে। কিন্তু ক্ষমতায় থাকাকালীন পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে বহুবিধ ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নেয়। তাদের পছন্দের এক বিচারপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার জন্য অন্য সব সার্ভিস ক্যাডারকে বাদ দিয়ে শুধু বিচারপতিদের চাকরির বয়স দুই বছর বাড়িয়ে দেওয়া হয়। আজিজ মার্কা এক নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে এক কোটি ২৫ লাখ ভুয়া ভোটার সৃষ্টি করে। এসব প্রচেষ্টা জনবিক্ষোভের মুখে ব্যর্থ হওয়ার পর নিজেদের দলীয় অন্ধ ও মেরুদণ্ডহীন এক রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে চরম ষড়যন্ত্র শুরু করার কারণেই সে সময়ে নির্বাচন বানচাল হয়ে যায় এবং তার জের ধরেই দেশ দুই বছর জরুরি আইন ও আধা সামরিক শাসনের কবলে পড়ে। তারপর ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তারা চরমভাবে পরাজিত হয়। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের রাজনীতির প্রথম পক্ষ, অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তি। ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসে আবার নির্বাচন এলে সংবিধানের মূলমন্ত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিধায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি ব্যতিরেকে তাদের সব দাবি সরকার মেনে নিয়ে নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে রাজি হয়। কিন্তু তাদের সেই পুরনো স্বভাব জয়ী হওয়ার ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চিত না হয়ে তারা নির্বাচনে আসতে রাজি হয় না। ফলে তারা নির্বাচন বানচাল করার চেষ্টা করে। কিন্তু দেশি-বিদেশি শক্তি একসঙ্গে চক্রান্তে লিপ্ত হয়েও নির্বাচন বানচাল করতে পারে না। নির্বাচনকে অবৈধ প্রমাণের চেষ্টা করেও তারা ব্যর্থ হয়। আইন ও সংবিধান কোনো জায়গায়ই তারা সুবিধা করতে পারে না। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে জয়ী হওয়া দুজন সংসদ সদস্য বৈশ্বিক ফোরামে প্রতিযোগিতা করে আন্তর্জাতিক পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশন ও কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় ওই জাতীয় নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আর কোনো প্রশ্ন থাকে না। অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আরেকটি জাতীয় নির্বাচন আসন্ন। এ বছর ডিসেম্বর মাসেই সে নির্বাচন হবে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে তাদের, অর্থাৎ বাংলাদেশের রাজনীতির দ্বিতীয় পক্ষের বিজয়ী হওয়ার যতখানি সম্ভাবনা ছিল এ সময়ে এসে সেটি এখন আরো অনেক বেশি ম্রিয়মাণ। কথা আছে, ‘স্বভাব যায় না মলে’। সুতরাং নতুন করে ষড়যন্ত্রের অনেক আলামতই দেখা যাচ্ছে। যার একটি প্রচেষ্টা দেখা গেছে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের আন্দোলন ঘিরে। এতে বোঝা যায়, ষড়যন্ত্রকারীরা সক্রিয় হচ্ছে। ভবিষ্যতে হয়তো তারা আরো অনেক চেষ্টা চালাবে।

 

নিউ অরলিনস, ইউএসএ থেকে

লেখক : কলামিস্ট ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

sikder52@gmail.com


মন্তব্য