kalerkantho


সময়ের প্রতিধ্বনি

‘কোটা’র মতো মাদক ও দুর্নীতি ইস্যুতে ছাত্ররা কি মাঠে নামবে

মোস্তফা কামাল

২০ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



‘কোটা’র মতো মাদক ও দুর্নীতি ইস্যুতে ছাত্ররা কি মাঠে নামবে

কোটা সংস্কারের আন্দোলন নিয়ে নানাজনের নানা মত রয়েছে। কেউ বলছেন, এ আন্দোলনে জামায়াত-শিবির ঢুকে পড়েছে। কেউ বলছেন, তারেক রহমানের নির্দেশে বিএনপিপন্থী শিক্ষকরা আন্দোলনের নেপথ্যে ভূমিকা রেখেছেন। আবার কেউ বলছেন, ছাত্রলীগের একাংশ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকায় আন্দোলন ব্যাপকভাবে চাঙ্গা হয়েছে এবং সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।

অথচ আন্দোলনটা ছিল পুরোপুরি শাহবাগকেন্দ্রিক এবং সাধারণ শিক্ষার্থীরা এতে অংশ নিয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীরা সম্প্রতি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করে আন্দোলন শুরু করে। এর মধ্যে নানা মত ও পথের শিক্ষার্থী থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। তবে কমিটির আহ্বায়ক ও তিনজন যুগ্ম আহ্বায়ক সবাই ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। আহ্বায়ক হাসান আল মামুন ছাত্রলীগের মুহসীন হল শাখার সহসভাপতি। এ ছাড়া যুগ্ম আহ্বায়ক ফারুক হোসেন ও নুরুল হক নুরু ছাত্রলীগের আগের কমিটিতে ছিলেন। অপর যুগ্ম আহ্বায়ক রাশেদ খান কোনো কমিটিতে না থাকলেও ছাত্রলীগ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে আমাদের সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদক জানিয়েছেন।

তার পরও আমি মনে করি, আন্দোলনে সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পৃক্ততা ছিল না। শুরুতে সাধারণ শিক্ষার্থীরাই মাঠে নেমেছিল। পরে এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কিছু অনুপ্রবেশকারী আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ আছে। আন্দোলনরত একজন ছাত্র পুলিশের নির্যাতনে মারা গেছে বলে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খবর ছড়িয়ে দিয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করতে চেয়েছে একটি পক্ষ।

উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের কোটা সংস্কার আন্দোলনের ‘নেতা’দের সঙ্গে বৈঠক করেন। তিনি কোটা সংস্কারের ব্যাপারে আশ্বাস দেওয়ার পর তারা কিন্তু রাজপথ ছেড়ে দিয়েছিল। সন্ধ্যায় জাতীয় সংসদে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বক্তব্য দিলেন। তিনি বক্তব্যের একপর্যায়ে বললেন, ‘পৃথিবীর দেশে দেশে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যারা লড়াই করে, জীবন দেয়, জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করে, তাদের জন্য সুযোগ থাকে। তাদের ছেলে-মেয়েরা সুযোগ পায়। আর যারা জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধ করেছিল, তাদের ছেলে-মেয়েরা সুযোগ পাবে না! সুযোগ পাবে ওই রাজাকারের বাচ্চারা। তাদের জন্য মুক্তিযোদ্ধা কোটা সংকুচিত করতে হবে। মফস্বলের সেই কলিমুদ্দিন, ছলিমুদ্দিনের ছেলে-মেয়েরা যাতে ওপরে উঠতে না পারে, একটা স্তরের পর সে যাতে মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে; এভাবে রাজধানীকেন্দ্রিক, উঁচুতলাকেন্দ্রিক এলিট শ্রেণির সুপরিকল্পিত চক্রান্ত। কালকে রাতে তার মহড়া দেখলাম। একটা কথা পরিষ্কার বলতে চাই, মুক্তিযুদ্ধ করেছি। মুক্তিযুদ্ধ চলছে, চলবে। ওই রাজাকারের বাচ্চাদের আমরা দেখে নেব। কোটা সংস্কারের আন্দোলন নিয়ে যে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছে, তাদের নিয়ে আমার কোনো কথা নেই। যারা স্ট্যাটাস দিয়েছে, তারা তো ছাত্র না, অছাত্র। জামায়াত-শিবির স্বাধীনতাবিরোধীদের এজেন্ট। এদের ব্যাপারে কোনো শৈথিল্য দেখতে চাই না।’

অন্য এক অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বললেন, কোটা সংস্কারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে বাজেটের পর। ব্যস, আগুনে ঘি ঢালার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো। শিক্ষার্থীরা আবার রাস্তায় নেমে এলো। শুরু হলো ব্যাপক আন্দোলন।

যদিও মতিয়া চৌধুরীর বক্তব্যটি দূষণীয় ছিল না। (তবে সময়টা খারাপ ছিল।) কিন্তু শিক্ষার্থীদের একটি অংশ সেই বক্তব্যের উল্টো ব্যাখ্যা করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিষ ছড়িয়ে দিল। শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ ‘আমরা রাজাকারের বাচ্চা’ ব্যানার-ফেস্টুনে লিখে মিছিল, সমাবেশ করেছে। এই কাজ নিশ্চয়ই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী কোনো ছেলে-মেয়ে করেনি! এরা কারা, সেটা কি আমরা খতিয়ে দেখেছি!

পুলিশ আরো ধৈর্য ধরতে পারত। তা না করে উল্টো তারা টিয়ার শেল, গরম পানি নিক্ষেপ করেও শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চাঙ্গা করে দেয়। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করে রাস্তায় নেমে আসে। ঢাকা একসময় অচল হয়ে পড়ে।

এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য মন্ত্রিসভার দু-একজন সদস্যের বেফাঁস মন্তব্য এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শৈথিল্যকে দায়ী বলে মনে করি। কোন পরিস্থিতিতে কোন কথা বলতে হয়, সে মাত্রাজ্ঞান কারো কারো মধ্যে নেই। অনেক সত্য কথাও সব সময় বলা যায় না। ধৈর্য ধরে সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। আবার সেই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া যা হয়েছে, সেটিও মানা যায় না। সমাজে যে গলদ রয়ে গেছে এবং তার বিস্তার ঘটছে, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে আমাদের।

এবার উপাচার্যের বাড়িতে ন্যক্কারজনক হামলার প্রসঙ্গে আসি। কোটা আন্দোলনের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কোনো সম্পৃক্ততা না থাকলেও তাঁর বাসভবনে পুলিশ বাহিনীর নিরাপত্তা দেওয়া উচিত ছিল। কারণ কোটা আন্দোলনের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই জড়িত। তারা ওই রাতে ক্যাম্পাসে আন্দোলনের মুডে ছিল। সেখান থেকে উপাচার্যের বাড়ি কতদূর? পুলিশ কেন সেখানে নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিল না? কেন তছনছ করা হলো উপাচার্যের বাড়ি? কারা করল? সরকারের গোয়েন্দা বিভাগ তাহলে কী করল? এসব প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক। 

অবশেষে যা ঘটার তা-ই ঘটল। পরিস্থিতি দ্রুতই পাল্টে গেল। ক্ষুদ্র পরিসরের আন্দোলন ঢাকায় এবং ঢাকার বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও ছড়িয়ে পড়ল। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোটা বাতিল করার ঘোষণা দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি শান্ত হয়ে গেল এবং শিক্ষার্থীরা রাজপথ ছেড়ে বাড়ি চলে গেল। কোটা সংস্কার আন্দোলনের এটাই হচ্ছে প্রাপ্তি।

একটি বড় রাজনৈতিক দলও যা করতে পারে না, তা সাধারণ শিক্ষার্থীরা করে দেখিয়ে দিয়েছে। এ আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য একটি বড় বার্তা বলে মনে করি। আর এ আন্দোলন থেকে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর শিক্ষা নেওয়ার আছে।

কিভাবে একটি অতি সাধারণ আন্দোলন অসাধারণ করে তোলা যায়, তা সাধারণ শিক্ষার্থীরা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। সেই সঙ্গে তারা তাদের দাবি আদায় করে নিয়েছে। বাস্তবায়িত হতে হয়তো কিছুটা সময় লাগবে। তবে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে যেহেতু ঘোষণা এসেছে, সেহেতু আমরা ধরে নিতে পারি, সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবি বাস্তবায়িত হবে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কোটা সম্পূর্ণভাবে বাতিল করা হবে? বাতিল হলে মুক্তিযোদ্ধা, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী, জেলা ও নারী কোটার কী হবে? এ ক্ষেত্রে তো সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে! সংবিধানেই মুক্তিযোদ্ধা, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী, জেলা ও নারী কোটা নির্ধারণ করা আছে। বিশ্বের সব দেশেই এ ধরনের কোটা বলবৎ রয়েছে। তবে এত বেশি মাত্রায় নয়, একটা নির্দিষ্ট মাত্রায়।

বাংলাদেশেও কোটা সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা সবাই অনুভব করেছে। বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও তাঁদের নাতি-নাতনিদের জন্য ৩০ শতাংশ কোটা রয়েছে। যদিও বিগত তিনটি বিসিএসে দেখা গেছে, ৫ থেকে ৬ শতাংশের বেশি মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি হয়নি। বাকি শূন্যপদ মেধাবীদের দিয়েই পূরণ করা হয়। বর্তমান বাস্তবতায় মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ১০ শতাংশ রাখা যেতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। তাঁরা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী, নারী ও জেলা কোটাও কমিয়ে আনার প্রস্তাব করেছেন। তবে পুরোপুরি বাতিল কেউ-ই চান না; কোটা আন্দোলনের শিক্ষার্থীরাও চায়নি। দেশের সামগ্রিক স্বার্থেই সরকার আরো ১০-১৫ বছর ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কোটা রাখতে পারে।

কোটা বাতিল কিংবা সংস্কার যা-ই করা হোক, এ ক্ষেত্রে সংবিধানের কিছু ধারা পরিবর্তন করতে হবে। এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ কাজ করছে বলে জেনেছি। প্রধানমন্ত্রী দেশে ফেরার পর কোটা পুরোপুরি বাতিল, না সংস্কার—সে বিষয়ে দিকনির্দেশনা পাওয়া যাবে। এর পরই হয়তো এসংক্রান্ত দাপ্তরিক কাজ শুরু হবে। তবে সবাইকে মনে রাখতে হবে, রাতারাতি সব কিছু ওলটপালট করা যায় না। সময়ের প্রয়োজন রয়েছে। রাগের মাথায় রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা এ দেশেরই সন্তান। তারা নিশ্চয়ই সীমাবদ্ধতার বিষয়টিও বিবেচনা করবে।

এদিকে সংসদে প্রধানমন্ত্রী কোটা বাতিলের ঘোষণা দেওয়ার পরপরই মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা বিবৃতি দিয়েছে। তারা কোটা বাতিলের প্রতিবাদ জানিয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা কোটা রাখার দাবিতে মুক্তিযোদ্ধারা ঢাকায় মহাসমাবেশের ডাক দিয়েছেন। কোটা নিয়ে যাতে দুই পক্ষ রাস্তায় মুখোমুখি না হয় সেদিকেও লক্ষ রাখতে হবে। আবার এ পরিস্থিতিকে ঘোলাটে করতে একটি মহল মরিয়া হয়ে উঠেছে। কেউ যাতে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে না পারে সেদিকে সরকারের নজর রাখতে হবে।

কোটা আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী তিন যুগ্ম আহ্বায়ককে চোখ বেঁধে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়ার কারণ কী? এ ধরনের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত কে নিল? কেন নিল? বিষয়টি খতিয়ে দেখা দরকার। প্রধানমন্ত্রী এখন দেশে নেই। এখন যদি কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় তার দায় কে নেবে?

পরিশেষে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলতে চাই, কোটার আন্দোলন তো সফল হওয়ার পথে। এবার মাদক ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে রাস্তায় নামুন। এ মুহূর্তে দেশে সবচেয়ে বড় সামাজিক সমস্যা হচ্ছে মাদক ও দুর্নীতি। মাদকের ছোবলে আমাদের তরুণ-যুব সমাজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। অনেক সামাজিক সমস্যার মূল কারণ হচ্ছে মাদক। মাদকের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে হলে এখনই সামাজিক আন্দোলন দরকার।

একই সঙ্গে দুর্নীতির বিরুদ্ধেও সবাইকে রুখে দাঁড়াতে হবে। দুর্নীতি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে। দুর্নীতির কারণে দেশের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অবিলম্বে দুর্নীতির মূলোৎপাটন করতে না পারলে অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে না। দুর্নীতিবাজরাই সমাজে প্রভাব বিস্তার করবে। দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করতে তরুণসমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। এ জন্য একটি বড় ধরনের আন্দোলন জরুরি হয়ে পড়েছে। 

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

mostofakamalbd@yahoo.com



মন্তব্য