kalerkantho


‘জ্যামের’ যন্ত্রণা থেকে নগরবাসী কবে মুক্তি পাবে

ইসহাক খান

৯ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



‘জ্যামের’ যন্ত্রণা থেকে নগরবাসী কবে মুক্তি পাবে

সাহিত্যের তুমুল আড্ডায় মগ্ন ছিলাম। হঠাৎ বাসা থেকে ফোন। বলল, ‘এখনই বাসায় চলে এসো। জরুরি দরকার।’ আমি জানতে চাইলাম, কী হয়েছে? ওপাশ থেকে বলল, ‘বাসায় এলেই জানতে পারবে। এখনই চলে এসো।’ আমি বন্ধুদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে শাহবাগে এসে বাস ধরলাম। স্বস্তি পাচ্ছিলাম না। এমন কী হলো যে জরুরি তলব। আমি নিজেই বাসায় ফোন করলাম। বললাম, ঘটনা কী?

আমার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করল, ‘তুমি এখন কোথায়?’ আমি বললাম, শাহবাগে, বাসে উঠেছি। এরপর ওপাশ থেকে বলল, ‘এসো, তারপর জানতে পারবে।’ বলেই ফোনের লাইন কেটে দিল। আমি প্রচণ্ড অস্থিরতার মধ্যে ডুবে যাচ্ছি। অনেকক্ষণ পর খেয়াল হলো, আমি যে বাসে চড়েছি সেটা সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে। ব্যাপার কী? ব্যাপারটা জানার জন্য আমি ঘাড় উঁচু করে সামনে তাকিয়ে হতাশ হয়ে ধপাস করে বসে পড়লাম। সামনে কঠিন জ্যামে গাড়িগুলো একটির সঙ্গে আরেকটি আটকে আছে। নট নড়নচড়ন। ঘণ্টাখানেক পর আবার ফোন। জিজ্ঞেস করল, ‘কতদূর?’ আমি বললাম, শাহবাগ। সে চমকে উঠল যেন, ‘এখনো শাহবাগ! সে তো এক ঘণ্টা আগে বলেছিলে।’ বললাম, এক ঘণ্টা আগে বলেছিলাম, এখনো তা-ই বলছি। এক ঘণ্টায় বাস শাহবাগ বাসস্ট্যান্ড থেকে শেরাটন হোটেল পর্যন্ত এগিয়েছে। কতক্ষণে পৌঁছতে পারব, বলা যাচ্ছে না। বাসায় পৌঁছতে পৌঁছতে রাত ১২টা বেজে গেল। এতক্ষণ ধরে আমি বাসের মধ্যে অস্থিরতায় হাবুডুবু খেয়েছি। বাসায় এসে জানতে পারলাম, যে কারণে আমাকে ডাকা হয়েছিল সেটা মিটে গেছে। আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেও আমার অস্থিরতা পুরোপুরি কাটছে না। এই যদি রাস্তার অবস্থা হয়, মানুষকে যদি ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় অকারণে সময় ব্যয় করতে হয়, তাহলে জরুরি প্রয়োজনে সে ছুটে আসবে কিভাবে?

হঠাৎ করে আমার ছোট মেয়েটি অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। আমার দেরি দেখে ওরাই মেয়েকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেছে। ভাবছিলাম, যদি তাকে দূরের কোনো হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন হতো, তাহলে কী করত ওরা? আমার মেয়েটি বিনা চিকিৎসায়...। আর ভাবতে পারছিলাম না আমি। অথচ যাদের ভাবার কথা, তারা কি এই দেশ নিয়ে এতটুকু ভাবে? মনে হয় না। সরকারি দল ব্যস্ত বিরোধী দলকে ঘায়েল করতে। আর বিরোধী দল ব্যস্ত গণতন্ত্র উদ্ধারের নামে নিজেদের ক্ষমতায় আসীন করতে। মাঝখান থেকে জনগণের নাভিশ্বাস অবস্থা।

বর্তমান সরকার জ্যাম থেকে জনগণকে মুক্তি দিতে কোটি কোটি টাকা খরচ করে সারা ঢাকা শহরে উড়াল সেতু নির্মাণ করেছে। অথচ নগরবিদরা বলছেন, এই অপরিকল্পিত উড়াল সেতুই যত জ্যামের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাহলে কারা করল এই পরিকল্পনা? কাদের উর্বর মস্তিষ্ক থেকে এই জ্ঞানগর্ভ পরিকল্পনা বের হলো? প্রতিদিন শত শত কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে রাস্তায়। এভাবে যদি ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় নষ্ট হয়, তাহলে যত উন্নত হোক দেশ, তাতে জনগণের কোনো লাভ হবে না। সরকার জ্যামের হাত থেকে জনগণকে উদ্ধার করতে মেট্রো রেল প্রকল্প হাতে নিয়েছে। সেই মেট্রো রেল নতুন যন্ত্রণা হয়ে দেখা দিয়েছে জনগণের সামনে। রাস্তা সরু হয়ে আরো বেশি জ্যামের সৃষ্টি করছে। এর জন্য সরকারের তরফ থেকে জনগণকে ধৈর্য ধারণের কথা বলা হয়েছে। কত দিন পর্যন্ত ধৈর্য ধরবে জনগণ? ধৈর্য ধরলেই তারা জ্যামের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবে, সেই নিশ্চয়তা কোথায়?

একজন নগরবিদ জানালেন, রাস্তায় যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং বন্ধ করলে জ্যাম অর্ধেক কমে যাবে। সেটা নিয়েও সরকারের বা প্রশাসনের কোনো মাথাব্যথা নেই। অফিস সময় মতিঝিলে গেলে দেখা যায় রাস্তার তিন ভাগজুড়ে গাড়ি পার্ক করে রাখা। বাকি এক ভাগ দিয়ে বাস, মিনিবাস, রিকশা ধুঁকে ধুঁকে চলছে। যদি রাস্তায় গাড়ি পার্কিং বন্ধ করা যেত, তাহলে প্রশস্ত রাস্তা দিয়ে গাড়িগুলো অনায়াসে গন্তব্যে পৌঁছতে পারত। সেই কাজটি করবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কিন্তু তাদের এ ধরনের কাজে কোনো উৎসাহ নেই। উল্টো দেখা যায়, রাস্তায় ইট, বালু, সিমেন্ট স্তূপ করে রাখা আছে। গ্যারেজের মালিক রাস্তায় গাড়ি ঠিক করছে। জনগণ ফুটপাত ধরে হাঁটতে পারছে না। এসব দেখার কেউ নেই। বাধা দেওয়ারও কেউ নেই। পাবলিক এ নিয়ে কথা বললে উল্টো তার মার খাওয়ার আশঙ্কা। পাবলিক তাই মুখ বুজে মানে মানে মূল রাস্তা দিয়ে হাঁটতে থাকে। কিন্তু তারা যদি একযোগে খেপে যায়, তাহলে ওই রাস্তা দখলকারীদের দোকানপাটের অস্তিত্ব থাকবে না। আমরা সেটা চাচ্ছি না। আমরা চাই, সব কিছু নিয়মমাফিক চলুক। কিন্তু এ দেশে কোনো কিছু নিয়মমাফিক চলে না। হাইকোর্ট আদেশ দিয়েছেন মোটরসাইকেল ফুটপাত দিয়ে চলতে পারবে না। হাইড্রোলিক হর্ন নিষিদ্ধ। কিন্তু কে শোনে হাইকোর্টের এই আদেশ। হাইকোর্ট তো আদেশ দিয়েই খালাস। কিন্তু সেই আদেশ বাস্তবায়ন করবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কিন্তু কোথায় তাদের বাস্তবায়ন? এখনো হাইড্রোলিক হর্ন বন্ধ হয়নি। রাস্তায় মোটরসাইকেল পাল্লা দিয়ে চলছে। কেউ সেটা বাধা দিচ্ছে না। দিনে দিনে ঢাকা শহর একটি আবর্জনার শহরে পরিণত হচ্ছে। কথা ছিল দখল করা খাল-নালা, সরকারি জায়গা-জমি প্রভাবশালীরা দখল করে রেখেছে, সেগুলো সরকার উদ্ধার করবে। সে ব্যাপারে সরকারে কোনো উদ্যোগ আছে বলে আমরা বাস্তবে দেখিনি। শুধু বক্তৃতা আর ভাষণ দিয়ে মানুষের সেবা করা যায় না। সেবার জন্য জনগণের কাজ করতে হয়। অথচ তার কোনো নমুনা আমরা দেখতে পাচ্ছি না। সরকারের ওপর মহলের কর্তারা কি ভেবে দেখেছেন, জ্যামে আটকে থেকে পাবলিক কী ধরনের কথা বলে থাকে? তারা কিন্তু সরকারের নেতাদের ভাষণের প্রশংসা করে না। অপ্রিয় হলেও সত্যি, তারা তখন সরকারের চৌদ্দ গুষ্টি উদ্ধার করে। সরকারের যত উন্নয়ন, তখন তারা সহজেই তুচ্ছ বলে উড়িয়ে দেয়। তাদের খিস্তিখেউড় শুনলে কানে তালা দিতে ইচ্ছা করে। কিন্তু সেসব সরকারের কান পর্যন্ত পৌঁছে না। সেটা পৌঁছবে ভোটের সময়। ভুলে গেলে চলবে না যে জনগণই সব ক্ষমতার উৎস।

ইদানীং আরেক রোগ হয়েছে পাবলিকের। তারা কোনো দাবি আদায়ের জন্য প্রেস ক্লাবের সামনের রাস্তা বেছে নেয়। তারা ধরে নেয়, এখানে সব সাংবাদিকের আড্ডা। এখানে অবস্থান বা আমরণ অনশন করলে তাদের খবরটি খবরের কাগজে বড় করে লেখা হবে। তাই তারা প্রেস ক্লাব বা তার আশপাশেই অবস্থান ধর্মঘট অথবা আমরণ অনশন পালনের কর্মসূচি ঘোষণা করে থাকে। এর ফলে প্রেস ক্লাবের এক পাশের রাস্তা ব্লক হয়ে থাকে। বাকি থাকে আরেক পাশ। সেই অন্য পাশ দিয়ে গাড়ি আসা-যাওয়া করায় সারাক্ষণ কঠিন জ্যাম লেগে থাকে।

বিষয়টি এমন সেনসেটিভ যে সরকার সব বুঝেও নীরব হয়ে থাকে। পুলিশ অবস্থানকারীদের পাহারা দেয়। প্রতিদিন প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন বা অবস্থান ধর্মঘট লেগেই থাকে। আর তাতে জ্যামের মাত্রাও বাড়তে থাকে পাল্লা দিয়ে।

এ ছাড়া রয়েছে ভিভিআইপিদের রাস্তায় আসা-যাওয়া। একবার রাস্তা বন্ধ করার পর আবার যখন খুলে দেওয়া হয় তখন সব গাড়ি এক জায়গায় এসে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়ে। আর সেই জ্যাম থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। সেই অবর্ণনীয় অবস্থায় যাঁরা পড়েছেন তাঁরা বুঝেছেন জ্যাম কাকে বলে, কয় প্রকার ও কী কী।

৭ই মার্চের উৎসব পালন করতে গিয়ে সরকার নিজেই ঢাকাবাসীকে অবরুদ্ধ করে রেখেছিল। সেদিন মানুষ কোথাও বের হতে পারেনি। যারা বেরিয়েছিল তারাও ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে জ্যাম কাকে বলে প্রত্যক্ষ করেছে। এভাবে চললে মানুষ যেমন ঠায় দাঁড়িয়ে থাকবে, তেমনি দেশও একই জায়গায় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকবে। অচল হয়ে যাবে সব কিছু। এই অচলায়তন ভাঙার প্রত্যাশা করছি আমরা।  

লেখক : গল্পকার, টিভি নাট্যকার


মন্তব্য