kalerkantho


আগামী সংসদ নির্বাচন ও স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী

গাজীউল হাসান খান

৯ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



আগামী সংসদ নির্বাচন ও স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী

বিগত নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন জোটের বিরুদ্ধে যত সমালোচনাই থাকুক, তাদের আছে উন্নয়নের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য। সে সাফল্য বিদ্যুৎ, কৃষি, শিল্প, শিক্ষা, যোগাযোগব্যবস্থাসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে দৃশ্যমান। আর সে সময়ে আন্দোলনের ক্ষেত্রে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের যত ব্যর্থতাই থাকুক, তাদের সঙ্গে আছে জনগণের সহানুভূতি ও ক্ষেত্রবিশেষে অর্জিত নীরব সমর্থন। উন্নয়ন জনমানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের বিকল্প হতে পারে না। ক্ষমতাসীন নেতা-নেত্রী ও সমর্থকদের অসহনীয় দুর্নীতি, বিরোধীদের বিরুদ্ধে হুমকি-ধমকি, হামলা-মামলা ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন এবং মত প্রকাশের ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক অধিকারের ব্যত্যয় জনমনে এক চাপা ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন জনসভায় উপস্থিতির পরিমাণ দিয়ে তা নির্ণয় করা যায় না। তার সত্যিকার বহিঃপ্রকাশ ঘটে বিভিন্ন নির্বাচনের ফলাফলে। অবশ্যই সেগুলো যদি অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়। সত্তরের নির্বাচনের বহু আগে থেকে এ দেশের গণমাধ্যমের সঙ্গে যাঁরা পেশাগতভাবে জড়িত রয়েছেন, এ সত্য উপলব্ধি করতে তাঁদের আর কিছু বাকি নেই। আজকের বিরোধী দল বা জোট ক্ষমতাসীন অবস্থায় দুর্নীতি করেনি কিংবা গণতান্ত্রিক ও মানবিক অধিকারের ব্যত্যয় ঘটিয়ে চরম স্বেচ্ছাচারিতা প্রতিষ্ঠা করেনি, এমন নয়। যখনই সুযোগ পেয়েছে, বিভিন্ন নির্বাচনে মানুষ তার ক্ষোভ প্রকাশ করে সেসবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে। মানুষ অন্যায়, অবিচার, দুর্নীতি, অপশাসন, শোষণ ও সব স্বেচ্ছাচারিতার অবসান চেয়েছে। চেয়েছে একটি জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা। উন্নয়নের নামে বিভিন্ন পর্যায়ে লুটপাট ও দুর্নীতির অবসান ঘটিয়ে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করতে চেয়েছে। সে কারণেই রাজনীতি ও সমাজ সচেতন বিচলিত মানুষ কখনো বিএনপি কিংবা কখনো আওয়ামী লীগ বা তাদের নেতৃত্বাধীন জোটকে ভোট দিয়েছে। বারবার একটি দল বা জোটকে ভোট দেয়নি। এতে ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে। কিন্তু তাতেও বিভিন্ন দল বা জোটগুলোর পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক শিক্ষা হয়নি। বারবার প্রায় একই ভুলের পুনরাবৃত্তি হতে দেখা গেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিভিন্ন দলের কাছে খাতা-কলমে এক রকম আর বাস্তবে আরেক রকম। কেউ কেউ নিজেদের শাসনক্ষমতাকে স্থায়ী করার জন্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনার যে ব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন; অপরের কাছে তা ভিন্ন। আবার কেউ কেউ দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে রক্ষা এবং অপরের আধিপত্যকে ঠেকানোর জন্য ধর্মীয় মূল্যবোধকে ব্যবহার করতেও পিছ পা হন না। একটি দুর্নীতি ও শোষণমুক্ত বাংলাদেশ, যেখানে মানুষের গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকার হবে নিশ্চিত এবং ধর্মের নামে চলবে না বিভেদ ও অবিচার—সেটিই কি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নয়? সে চেতনার আলোকে দেশ পরিচালিত না হলে সাধারণ মানুষ তো বিক্ষুব্ধ হবেই।

আগামী সংসদ নির্বাচনের এখনো প্রায় ৯ মাস বাকি রয়েছে। এ সময়ের মধ্যে সাধারণ মানুষের দুর্নীতিসহ বিভিন্ন ক্ষোভের উপশম ঘটানোর জন্য ক্ষমতাসীন জোট সরকার বিভিন্ন ব্যবস্থা নিতে সক্ষম। যে সরকার বিগত বছরগুলোতে এ দেশকে হাজার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দিতে পেরেছে এবং কৃষি খাতে অর্থাৎ ধান উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে, তার পক্ষে কিছু মানুষের অবাধ লুটপাট ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিরাজিত দুর্নীতি প্রতিরোধ করে একটি সহনশীল পর্যায়ে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে না—এমন নয়। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অতীতে দুর্নীতি ও বিদেশে প্রভাবশালীদের অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে যেমন ব্যবস্থা নিয়েছে, তেমনি যারা বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে সরকারি ব্যাংকগুলোর হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করেছে, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে সক্ষম। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন সরকারের সদিচ্ছা। নতুবা আগামী নির্বাচনে তার জন্য খেসারত দিতে হবে। সাধারণ মানুষ দুর্নীতি, অনিয়ম, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অব্যবস্থাপনা, বিদেশে অর্থপাচার ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে দলীয় লুটপাটের কথা সহজে ভুলে যায় না। তার বিরুদ্ধে তাদের হাতে শুধু একটি মোক্ষম অস্ত্রই আছে। আর সেটি হলো একটি ভোট। মনে রাখতে হবে, সেটি প্রয়োগ করতে অতীতে তারা কখনো ভুল করেনি। এ দেশের মানুষ সরকারের কোনো সাহসী পদক্ষেপ কিংবা ভালো কাজের প্রশংসা করতে কখনো কার্পণ্য করে না। পদ্মা সেতু নির্মাণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ পদক্ষেপে তারা যেমন অকুণ্ঠ প্রশংসা ও সমর্থন জানিয়েছে, তেমনি গ্রামে-গঞ্জে কাঙ্ক্ষিত বিদ্যুৎ পেয়ে তারা যেন শুধু একটি সাধারণ সেবা নয়, দারিদ্র্য বিমোচনের একটি হাতিয়ার খুঁজে পেয়েছে। রাশিয়ায় মহামতি লেনিন একসময় বলেছিলেন, ‘তোমরা আমাকে বিদ্যুৎ দাও, আমি তোমাদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিপ্লব উপহার দেব।’ আমাদের কৃষি, শিল্প, শিক্ষা ও নানা রকম উন্নয়নের জন্যও বিদ্যুৎ একটি অপরিহার্য উপাদান, যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশবাসীকে দিয়ে চলেছেন। কিন্তু দুর্নীতি, অনিয়ম ও লুটপাট সে সাফল্যকে ম্লান করে দিক, দেশের সাধারণ মানুষ তা চায় না। কোনো সরকার তো চাইতেই পারে না।

প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশের মতো বাংলাদেশের মানুষও চায় তাদের দেশে সবার অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক। একটি গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বের দরবারে তার সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে মাথা তুলে দাঁড়াক। কেউই ৫ জানুয়ারির মতো নির্বাচন চায় না, যাতে ১৫৩ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। সে নির্বাচনকে বিশ্বের কেউই জনপ্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচন হিসেবে মেনে নেয়নি। সে ক্ষেত্রে দেশের উন্নয়ন যত গুরুত্বপূর্ণই হোক, দেশে গণতন্ত্র না থাকলে তো কোনো সরকারের প্রশ্নাতীত বৈধতা, বৈশিষ্ট্য ও জবাবদিহিই থাকে না। সে কারণে দেশের আগামী সংসদ নির্বাচনটিও যদি কোনো কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে গণতান্ত্রিক বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি পুরোপুরি বিনষ্ট হতে বাধ্য। এতে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক দিক থেকে কতটা উন্নত হলো, তা যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা বয়ে আনবে না। স্বৈরশাসকের অধীনে অতীতে সিঙ্গাপুর কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ায় যে অসামান্য অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে, তাতে বিশ্বসভা কিংবা গণতান্ত্রিক বিশ্বের মানুষ তাদের (স্বৈরশাসকদের) তেমন বিশেষ কৃতিত্ব দেবে না। শেখ হাসিনাও তেমন কৃতিত্ব চান না। সে কারণেই তিনি সংবিধান অনুযায়ী যথাসময়ে নির্বাচন দিতে যাচ্ছেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে তাঁর (শেখ হাসিনা) পক্ষে কি সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে? ‘জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট’ দুর্নীতির মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পাঁচ বছর সাজা হয়েছে। সে সাজার কারণে শেষ পর্যন্ত যদি আসন্ন নির্বাচনে তাঁর অংশগ্রহণ সম্ভব না হয়, তাহলে বিএনপি নির্বাচন বর্জন করতে পারে বলে শোনা যাচ্ছে। এতে নির্বাচন কমিশনে তাদের রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন বাতিল হতে পারে। কিন্তু তাতে বিএনপির কোনো পরোয়া আছে বলে মনে হয় না। এ ব্যাপারে বিএনপির কিছু প্রবীণ নেতার বক্তব্য হচ্ছে, নিম্ন আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়ে উচ্চ আদালতে সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে পতিত স্বৈরাচারী হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ যদি অতীতে সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারেন, তবে খালেদা জিয়া পারবেন না কেন? তা ছাড়া খালেদা জিয়ার জামিন নিয়েও চলছে নানা টালবাহানা—এ অভিযোগ বিএনপি নেতাদের। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ নেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলছেন, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের মামলা ১০ বছর ধরে চলেছে। এতে এতিমদের অর্থ আত্মসাতের দায়ে খালেদা জিয়া, তাঁর ছেলে ও অন্যদের সাজা হয়েছে। এটি আদালতের ব্যাপার। এখন উচ্চ আদালত তাঁর আপিল শুনে তিনি নির্বাচন করতে পারবেন কি না সে সিদ্ধান্ত দেবেন। প্রতিটি মামলার বিবেচ্য বিষয়েই কিছু পার্থক্য থাকে। সে ক্ষেত্রে খালেদা জিয়া যদি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না পারেন, তাহলে একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি কেন নির্বাচনে যাবে না? বিএনপি নেতাদের মধ্যে আরো কয়েকজনের বিরুদ্ধেও নির্দিষ্ট দুর্নীতির মামলা রয়েছে। সেসব মামলায় তাঁদেরও সশ্রম কারাদণ্ড হতে পারে। সে ক্ষেত্রে তাঁদেরও নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। বিএনপি একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে নির্বাচনে অংশ না নিলে সাজাপ্রাপ্ত কিংবা অভিযুক্তরা খালাস পেয়ে যাবেন, এমন তো নয়। সে ক্ষেত্রে বিএনপির উচিত হবে একটি দল হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা। আর ক্ষমতাসীন সরকারের উচিত হবে নির্বাচনে বিরোধী দলের প্রার্থীদের অংশগ্রহণকে যথাসাধ্য সহজ করে তোলা। নতুবা গণতন্ত্র ও নির্বাচনের প্রক্রিয়া দুটিই ব্যাহত হবে। বিতর্কিত হয়ে পড়বে সব কিছু।

আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখে গণমাধ্যমের কল্যাণে এরই মধ্যে বহু দুর্নীতির চিত্র সাধারণ মানুষের সামনে প্রকাশিত হয়েছে। এতে আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব দলের কাছেই দেশ থেকে দুর্নীতি উচ্ছেদের বিষয়টি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে আবির্ভূত হওয়া উচিত। তা ছাড়া রয়েছে বিভিন্ন দলের মধ্যে অভ্যন্তরীণভাবে গণতন্ত্রচর্চার বিষয়টি। বাংলাদেশে বর্তমানে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দলের মধ্যে গণসংগঠনের কোনো চরিত্র বা বৈশিষ্ট্য তেমনভাবে কাজ করে বলে মনে হয় না। তাই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ক্রমে ক্রমে ব্যক্তিতন্ত্র বা পরিবারতন্ত্রে পরিণত হচ্ছে। সেখানে গণতন্ত্রের চর্চা হয় না বলেই ধরে নেওয়া হচ্ছে। আমাদের সম্পর্কে এ অভিযোগ পাশ্চাত্যের বিভিন্ন গণমাধ্যমের। এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনা নিয়ে। সব ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনাই জঙ্গিবাদী নয়। জার্মানির ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক দলের মতো বিশ্বের বহু দেশেই ধর্মীয় ভাবধারায় পরিচালিত বেশ কিছু রাজনৈতিক দল রয়েছে। বাংলাদেশেও ধর্মভিত্তিক বা ধর্মীয় ভাবধারায় গঠিত রাজনৈতিক দল থাকতে পারে। ভারতেও রয়েছে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে তারা দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাস করে কি না এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে তারা কতটুকু ধর্মীয় বিভেদ ও সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে? আমাদের দেশে কোনো একটি রাজনৈতিক দলকে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী এবং বিশেষ করে আমাদের স্বাধীনতার শত্রু বলে উল্লেখ করা হয়ে থাকে। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে সেটিকে এখনো নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়নি। তবে নির্বাচন কমিশন জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের নিবন্ধন বাতিল করেছে। নির্বাচনের আগে এ বিষয়ে সব দ্বন্দ্ব ও বিভ্রান্তির অবসান হওয়া উচিত বলে দেশবাসী মনে করে। যে যত ধর্মীয় ভাবধারার রাজনীতিই করুক না কেন, তাদের প্রত্যেককে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও স্বাধীনতায় বিশ্বাস করতে হবে। বিষয়টি নিশ্চিত করা আমাদের একটি অন্যতম জাতীয় দায়িত্ব বলে আমরা মনে করি। এ ব্যাপারে জনগণের রাজনৈতিক সচেতনতাই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে প্রভাবান্বিত করতে পারে বলে অনেকের বিশ্বাস। আর আগামী তিন বছরের মাথায় আমরা আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালন করতে যাচ্ছি, অথচ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও স্বাধীনতার প্রশ্নে এখনো আমাদের অনেকের বিভিন্ন ঘোর কাটেনি। এ মানসিক অবস্থা নিয়ে সত্যিকার অর্থে দেশপ্রেমিক হওয়া যেমন কঠিন, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ধরে রাখাও প্রশ্নসাপেক্ষ। সে কারণে আগামী সাধারণ নির্বাচনে যাঁরাই বিভিন্ন দল থেকে প্রার্থী হবেন বা মনোনয়ন চাইবেন, তাঁদের সবাইকে প্রথমেই একটি প্রশ্ন করা উচিত হবে—মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলতে আপনি কী বোঝেন? তাঁদের প্রত্যেকের প্রদত্ত উত্তর থেকেই তখন বেরিয়ে আসবে তাঁরা অপশাসন, শোষণ ও দুর্নীতি রোধে কতটা প্রস্তুত এবং কতটা দেশপ্রেমিক। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তাঁরা কতটুকু প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাঁদের সত্যি কোনো রাজনৈতিক আদর্শ আছে, নাকি লুটপাটের লক্ষ্য নিয়ে তাঁরা রাজনীতিতে এসেছেন।

স্বাধীনতার অব্যবহিত পর থেকে এ দেশে যে দুর্নীতি জন্ম নিয়েছে, তা এখন ক্রমে ক্রমে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। জাতীয় জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে এই দুর্নীতির প্রবণতা রোধ করতে না পারলে কোনো উন্নয়নই সত্যিকার দেশপ্রেমিক মানুষ তৈরি করতে পারবে না। সে কারণেই দল ক্ষমতায় না থাকলে আর বিশাল কর্মী বাহিনী খুঁজে পাওয়া যায় না। দলের নেতা-নেত্রীরা দুর্নীতিবাজ হলে কর্মীরা কিভাবে ত্যাগী ও আদর্শবাদী হবে? দারিদ্র্য দুর্নীতিগ্রস্ত সমাজ তৈরি করে—এ কথা সত্যি নয়। প্রকৃত শিক্ষা ও মূল্যবোধের অভাবই মানুষকে স্বার্থপর, লোভী ও দুর্নীতিগ্রস্ত করে তোলে। এর বিরুদ্ধে এখনই রুখে না দাঁড়ালে আমাদের সামগ্রিক অবক্ষয়কে কোনোভাবেই ঠেকানো যাবে না। তাই স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী সামনে রেখে চক্রান্তের রাজনীতি বন্ধ করে সব দলের উচিত হবে আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা। সব দলেরই উচিত হবে নির্বাচন সামনে রেখে একটি রাজনৈতিক শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করা। দুর্নীতিবাজদের চিহ্নিত করে সত্যিকার ত্যাগী নেতাকর্মীদের খুঁজে বের করা এবং দলে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চালু করা। ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে না থেকে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের নেওয়া যৌথ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত করা।

বিশ্বের সব গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র চায় বাংলাদেশে সব দলের অংশগ্রহণমূলক একটি নির্বাচন হোক। তারা এখন সেদিকে তাকিয়ে রয়েছে এবং সব রকম সাহায্য-সহযোগিতা দিতেও তাদের প্রস্তুতির কথা বারবার ঘোষণা করেছে। নির্বাচনের সময় সব দলের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি অর্থাৎ একটি ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করার ব্যাপারে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তা ছাড়া নির্বাচনকালীন সংবিধান অনুযায়ী তাঁর নেতৃত্বে দেশের বড় দলগুলো থেকে প্রতিনিধি নিয়ে একটি ক্ষুদ্র অথচ দায়িত্বশীল সরকার গঠন করা যেতে পারে। এ ধরনের একটি প্রস্তাব বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নিজেই অতীতে দিয়েছিলেন; কিন্তু তা গ্রাহ্য হয়নি। এতে ব্যক্তিগতভাবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ক্ষতিগ্রস্ত হননি। অন্যদিকে দেশের একটি বড় রাজনৈতিক দল বিভিন্ন অজুহাতে সে নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকে। এতে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নিজেরাই। নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার কারণে সংসদের ভেতরে ও বাইরে তারা বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। বিভিন্ন কারণে হুমকির মুখে পড়েছিল তাদের দলীয় অস্তিত্ব। আজ আবার খালেদা জিয়ার কারাদণ্ড হওয়ার কারণে তাদের দলীয় শক্তি অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে বলে নেতারা উল্লেখ করেছেন। তাহলে তাঁরা খালেদা জিয়াকে ছাড়া নির্বাচনে যাবেন না। এটি কোনো গ্রহণযোগ্য যুক্তি হতে পারে না। সাংগঠনিক ও রাজনৈতিকভাবে দল টিকিয়ে রাখতে হলে তাঁদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতেই হবে। সংসদীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাসী অথচ দেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবে না, এটি একটি অরাজনৈতিক কাজ বলে বিবেচিত হতে বাধ্য। ভোট দেবে জনগণ। সুতরাং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কিংবা তাঁর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগকে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট ভয় পাবে কেন? নির্বাচনকালে যদি কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে, তবে তাকে ঠেকাতে হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত নির্বাচন পর্যবেক্ষণ টিমগুলো তো চোখ বন্ধ করে হোটেলে বসে থাকবে না, তারা সবই দেখবে। সুতরাং জুজুর ভয় না করে মাঠে নেমে সব কিছু মোকাবেলা করতে হবে। একটি সংগ্রামী রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপিকে এগুলো বোঝানো একটি বৃথা কাজ বলে আমি মনে করি। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া যদি আইনি মারপ্যাঁচে শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না পারেন, তাতেও হতাশ না হয়ে পূর্ণ উদ্যমে দেশব্যাপী নির্বাচনী প্রচারে নামতে হবে। আর যদি খালেদা জিয়া সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদের মতো আইনি বিবেচনায় নির্বাচনে অংশ নিতে সক্ষম হন, তাহলে সম্পূর্ণ দৃশ্যপট পাল্টে যেতে পারে। ক্ষমতাসীন জোট সরকারের মধ্যে এখন তেমন একটা আশঙ্কা কাজ করছে, যাকে ওয়াকিফহাল মহল অনেকটা অমূলক বলে মনে করে। তবে এ কথা ঠিক যে বিএনপি বর্তমানে একটি বিরাট অগ্নিপরীক্ষার মধ্য দিয়ে সময় পার করছে। এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই এ দলে সাংগঠনিক, রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে বিরাট পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে। নেতৃত্বে ও সংগঠনে আমূল রদবদল আসতে পারে, যা থেকে এক নতুন জাতীয়তাবাদী ও গণতান্ত্রিক বিএনপি বেরিয়ে আসতে পারে। এগুলো এখন সবই সময়ের ব্যাপার। তবে সাংগঠনিকভাবে বিএনপির সব উদ্যোগই আসতে হবে তরুণ নেতৃত্বের কাছ থেকে। নতুবা এটি সব দিক থেকেই স্থবির হয়ে পড়বে। সে জন্যই চাই ভিন্নধারার এক সময়োপযোগী উদ্যোগ বা পদক্ষেপ, যা এ দলকে দেবে এক নতুন দিকদর্শন ও এগিয়ে চলার পাথেয়।

লেখক : বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক

gaziulhkhan@gmail.com


মন্তব্য