kalerkantho


পুরুষের চেয়ে নারীর কিডনি রোগ বেশি হয়

ডা. শামীম আহমেদ

৮ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



পুরুষের চেয়ে নারীর কিডনি রোগ বেশি হয়

প্রতিবছরের মতো এবারও ৮ মার্চ পালিত হচ্ছে বিশ্ব কিডনি দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘কিডনিস অ্যান্ড উইমেন্স হেলথ : ইনক্লুড, ভ্যালু, এমপাওয়ার’। অর্থাৎ সুস্থ কিডনির জন্য নারীদের অংশগ্রহণ মূল্যায়ন ও ক্ষমতায়ন। বিশ্ব জনগোষ্ঠীর প্রায় ৫০ ভাগ নারী। তাই তাদের সুস্থ স্বাস্থ্য রাখা শুধু তাদের নিজেদের জন্য নয়, বরং সন্তান ও পরিবার-পরিজন সর্বোপরি সমাজের জন্যও বেশ গুরুত্ব বহন করে। নারীদের কিডনি রোগ হলে প্রজননক্ষমতা ব্যাহত হয়, কার্যক্ষমতা লোপ পায়। এতে সন্তানদের দেখাশোনা, পরিচর্যা বাধাগ্রস্ত হয় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হুমকির মধ্যে পড়ে।

সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৬০ বছরের পর কিডনি রোগ, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস রোগ পুরুষের চেয়ে বেশি হয় নারীদের। এ সময় তাদের মেনোপজের জন্য প্রয়োজনীয় ‘ইস্ট্রোজেন’ হরমোন কমে যায় বা থাকে না। তখন তাদের ওজন বৃদ্ধি হয় বা স্থূলতাজনিত রোগ হওয়ার প্রবণতা বাড়ে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, নারীদের শারীরিক গঠন কিডনি রোগের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তাদের প্রস্রাবে প্রদাহ পুরুষের চেয়ে বেশি হয়। তাদের মূত্রথলি এবং প্রসাবের রাস্তা পুরুষদের চেয়ে বেশ ছোট। এতে প্রস্রাবের প্রদাহের জীবাণু পায়ুনালি হয়ে প্রস্রাবের রাস্তায় প্রবেশ করে। তাদের প্রসবকালীন জটিলতার জন্য হঠাৎ কিডনি বিকল ও ধীরগতিতে কিডনি বিকল হওয়ার ঘটনা পুরুষের তুলনায় বেশি ঘটে। নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ নারীর হঠাৎ কিডনি অকেজোর কারণ এই প্রসবজনিত জটিলতা। ৮ শতাংশ নারী ও শিশুর মৃত্যু হয় এই কারণে। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রসবকালীন উচ্চ রক্তচাপ পরবর্তী সময় হার্ট ও মস্তিষ্কে নানা রোগের অন্যতম কারণ। এসএলই ও রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস হলে তাও অধিক মাত্রায় কিডনির ক্ষতি করে।

৩ শতাংশ নারী কিডনি রোগ (ধীরগতিতে কিডনি অকেজো) অবস্থায় গর্ভধারণ করে থাকে। গর্ভধারণ শুধু কিডনি রোগের ওপর নয়, বরং মা ও শিশুর ওপর প্রভাব ফেলে। এ অবস্থায় কিডনির কার্যক্ষমতার ওপর যথেষ্ট চাপ সৃষ্টি হয়, কিডনির রক্তপ্রবাহ বেড়ে যায়, সিরাম ক্রিয়েটিনিন কমে যায়। গর্ভধারণ অবস্থায় রক্তের ক্রিয়েটিনিন বেড়ে গেলে বুঝতে হবে সে কিডনি রোগী। এ অবস্থায় গর্ভধারণ করলে কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যায়, উচ্চ রক্তচাপ বেড়ে যায় ও প্রস্রাবে অ্যালবুমিনের মাত্রা বেড়ে যায়।

ধীরগতিতে কিডনি অকেজো নারীদের প্রাথমিক ধাপে গর্ভধারণ করা গেলেও চতুর্থ ও পঞ্চম ধাপে সম্ভব হয় না। এ অবস্থায় মা ও শিশু মৃত্যুর ঝুঁকিতে থাকে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শেই কিডনি অকেজো রোগীদের গর্ভধারণ করা উচিত। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই কিডনি রোগ, উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসা চালিয়ে নিয়মিত ফলোআপ এবং শিশু ডেলিভারির সময় চিকিৎসকদের পরামর্শ নেওয়া উচিত। পাশাপাশি কিডনি রোগের ধাপ, উচ্চ রক্তচাপ, প্রস্রাবে অ্যালবুমিন, রক্তশূন্যতা, ডায়াবেটিস, প্রস্রাবের প্রদাহ ও মায়ের পুষ্টির ওপর নজরদারির বিষয়টিতে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। কিডনি অকেজো অবস্থায় গর্ভধারণ করলে প্রতি মাসে কিডনির কার্যক্ষমতা, অ্যালবুমিন, রক্তচাপ, প্রস্রাবে জীবাণু, ডায়াবেটিস পরীক্ষা করে ওষুধের ধরন ও মাত্রা পর্যবেক্ষণ ও পরিবর্তন করতে হবে। কেননা কিডনি অকেজো রোগীদের ফার্টিলিটি কমে যায়, আবার কিডনি সংযোজনের পর তা বেড়ে যায়। এ জন্য সংযোজন করার পর গর্ভধারণ করা যেতে পারে। ৭০ শতাংশের ক্ষেত্রে সন্তান প্রসবের সম্ভাবনা থাকে। তবে কিডনি সংযোজনের রোগীদের বিভিন্ন রকমের ওষুধ চালিয়ে যেতে হয় এবং তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক কম থাকে বিধায় বিভিন্ন রকমের জীবাণু ও ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে বেশি।

যেকোনো দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নতির ক্ষেত্রে নারীদের সুস্বাস্থ্য অপরিহার্য। তাই নারীদের কিডনি রোগ থেকে বাঁচতে সতর্ক পদক্ষেপ নিতে হবে। তাদের কিডনি রোগ শনাক্ত করার জন্য উচ্চ রক্তচাপ, প্রস্রাবের অ্যালবুমিন ও আরবিসি নির্গত হওয়ার পরীক্ষা নিয়মিত করে যেতে হবে। পাশাপাশি পরিবারের সবাইকে কিডনি রোগ বিষয়ে সচেতন হতে হবে। ভালো স্বাস্থ্যের জন্য মায়ের পুষ্টি নিশ্চিত করা, প্রসবকালীন জটিলতা এড়ানোসহ সঠিক পরিবার পরিকল্পনা ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। প্রসবকালীন ডায়াবেটিস, এসএলই রোগের বিষয়ে সঠিক চিকিৎসা নিতে হবে। বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি কমাতে ভ্যাকসিনেশনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্তন ক্যান্সার বা গাইনোকোলজিক্যাল নানা ক্যান্সার হচ্ছে কি না তাও নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে।

লেখক : সাবেক পরিচালক ও অধ্যাপক ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি

অনুলিখন : আতাউর রহমান কাবুল


মন্তব্য