kalerkantho


৭ই মার্চের ভাষণ কেন একটি অমর মহাকাব্য

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

৭ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



৭ই মার্চের ভাষণ কেন একটি অমর মহাকাব্য

৭ই মার্চকে আমরা বলি ঐতিহাসিক দিন। ৭ই মার্চে দেওয়া বঙ্গবন্ধুর ভাষণকে বলি ঐতিহাসিক ভাষণ। ইউনেসকো বিশ্বের ঐতিহ্যমণ্ডিত শ্রেষ্ঠ ভাষণগুলোর একটি হিসেবে এটাকে মর্যাদা দিয়েছে। সন্দেহ নেই ৭ই মার্চের এই ভাষণ বিশ্বের রাজনৈতিক সাহিত্যে একটি বিরল ভাষণ। আমাদের কবি নির্মলেন্দু গুণ বলেছেন, এই ভাষণ একটি মহাকাব্য। আর এই ভাষণটি যিনি দিয়েছেন, তিনি একজন মহাকবি। আমার মতে, এই ভাষণ বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষুদ্রাকৃতির মহাকাব্য। কিন্তু ১৬ কোটি বাঙালির হৃদয়ে মুদ্রিত। এই ভাষণ যিনি দিয়েছেন, লন্ডনের সানডে টাইমস তাঁকে আখ্যা দিয়েছিলেন ‘A poet of politics’ (একজন রাজনীতির কবি)। কথাটা তাৎপর্যপূর্ণ। রাজনীতি একটি জাগতিক ও লৌকিক ব্যাপার। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান তাকে অলৌকিকত্ব দান করেছেন।

ফরাসি দার্শনিক আঁদ্রে জিত বাংলাদেশ হানাদারমুক্ত হওয়ার পর ঢাকায় এসেছিলেন। তিনি একটি বুদ্ধিজীবী সমাবেশে বলেছিলেন, ‘তোমাদের ৭ই মার্চের দিনটি ও ভাষণটি শুধু ঐতিহাসিক দিন এবং ঐতিহাসিক ভাষণ নয়, এটি একটি ধ্রুপদী দিন ও ধ্রুপদী ভাষণ, যেদিন এ ভাষণের গর্ভ থেকে একটি স্বাধীন জাতির জন্ম হয়েছে। ফ্রান্সে দূর-অতীতে বাস্তিল দুর্গ ভাঙার দিনটিকে বলা হয় ধ্রুপদী দিন। এই দিনটির গর্ভেই একটি বিপ্লবের জন্ম এবং যে বিপ্লব থেকে ফরাসি প্রজাতন্ত্রের উদ্ভব।’

বাংলাদেশে পাকিস্তানি শাসকরা বাস্তিল দুর্গ তৈরি করেনি। গোটা দেশটাকেই বাস্তিল দুর্গে পরিণত করেছিল। বাস্তিল দুর্গের যুগে ফ্রান্সে রাজাদের শোষণ-পীড়নে একসময় দুর্ভিক্ষ শুরু হয়েছিল। রানি রাজশকটে প্যারিসের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি অনাহারি প্রজাদের হাহাকার শুনে সহচরীদের জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ওরা কাঁদে কেন? সহচরীরা বলেছিল, ওরা ক্ষুধার্ত। দেশে রুটির অভাব। দুর্ভিক্ষ চলছে। তাই ওরা হাহাকার করছে। রানি  সহচরীদের কথা শুনে হেসে বললেন, দেশে রুটি নেই, তা ওরা কেক খায় না কেন?

গত শতকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানেও ঘটেছিল একটি ঘটনা। খাদ্যাভাব ছিল বাৎসরিক। প্রতিবছর ধান-চালের ঘাটতি ছিল ২৭ লাখ টন। বাইরে থেকে চাল আমদানি করা হতো বটে, কিন্তু ঘাটতি পূরণের ব্যবস্থা করা হতো না। উত্তরবঙ্গে মঙ্গা (দুর্ভিক্ষ) লেগেই ছিল। এই খাদ্যাভাবপীড়িত পূর্ব পাকিস্তানে একবার পাকিস্তানের তৎকালীন ফৌজি প্রেসিডেন্ট জেনারেল আইয়ুব খান এলেন। তিনি সর্বত্র দুর্ভিক্ষাবস্থা দেখে ফ্রান্সের রানির মতো বললেন, ‘বাঙালিরা এত চাল খায় কেন? তারা গম-ভুট্টা খেতে পারে না?’

বাঙালিরা চৌদ্দপুরুষ ধরে ভাত খেতে অভ্যস্ত। তারা কী করে খাবে ভুট্টা? তার ওপর ভুট্টার সরবরাহও কম। পাবনায় ক্ষুধার্ত মানুষ বিদ্রোহী হলো। পাকিস্তানি শাসকরা ক্ষুধার্ত মানুষের ওপর গুলি চালাল। বহু লোক আহত-নিহত হলো। এই আন্দোলনের নেতা ক্যাপ্টেন মনসুর আলীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের নেতা। এই আন্দোলন পাবনার ভুট্টা আন্দোলন নামে খ্যাত।

পাকিস্তানি শাসকরা বাঙালির শুধু খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের চেষ্টা করেনি। তার ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সব কেড়ে নিয়ে একটি দাস জাতিতে পরিণত করতে চেয়েছে। বলেছে, ‘তুম বাংলা বোলতা হায় কিউ, উর্দু বোল। বাংলা হিন্দুয়ানি জবান হায়।’ তারা ভাত, শাড়ি, কপালে টিপ পরা সব কিছুরই ওপর হিন্দুয়ানির ছাপ মেরেছিল। বাংলাদেশের নাম পরিবর্তন করে রেখেছিল পূর্ব পাকিস্তান। বাঙালির হাজার বছরের পরিচয় মুছে ফেলে একমাত্র পরিচয় রাখা হয়েছিল পাকিস্তানি। কিন্তু পাকিস্তানে বাঙালিকে সমান নাগরিক অধিকার দেওয়া হয়নি। তারা ছিল চরম রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার।

আমরা অনেকেই আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কনের গেটিসবার্গ ভাষণের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের তুলনা করি। তুলনা অবশ্যই করা চলে। লিঙ্কনের ভাষণ ছিল একটি গৃহযুদ্ধের পটভূমিতে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার দিকনির্দেশ। আঞ্চলিকতার গণ্ডি পেরিয়ে ভাষণটিতে বিশ্বজনীনতার আবেদন রয়েছে। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণও একটি মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার ডাক। এই ভাষণও আঞ্চলিকতার গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের স্বাধীনতা ও মুক্তির পথনির্দেশ দ্বারা বিশ্বজনীনতা লাভ করেছে। এ ক্ষেত্রে দুটি ভাষণের মধ্যে অমিল এটুকু যে একটির পটভূমি গৃহযুদ্ধ। অন্যটির মুক্তিযুদ্ধ। একটি ভাষণ জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছে। অন্য ভাষণটি একটি স্বাধীন জাতি ও তার জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রথম দিকে পশ্চিমা সাংবাদিকরা এটিকে গৃহযুদ্ধ (civil war) আখ্যা দিয়েছিলেন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই তাঁদের ভুল ভাঙে। লন্ডনের ‘অবজারভার’ পত্রিকায় তখনকার বিখ্যাত কলামিস্ট ও রাজনীতি বিশ্লেষক সিরিল ডান বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে লেখেন (তিনি ঢাকায় এসেছিলেন), “বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে এই প্রথম একজন নেতা এলেন, যিনি চরিত্রগতভাবে, নৃতাত্ত্বিকভাবে, ভাষায়, পোশাকে-আশাকে, গায়ের রঙে, আচার-আচরণে একজন নিখুঁত বাঙালি। তাঁর বজ্রকণ্ঠের ঘোষণা দেশের মানুষ মন্ত্রমুগ্ধের মতো শোনে এবং মান্য করে। পাকিস্তানের পরাক্রমশালী সামরিক জান্তা এই একটি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মানুষের কাছে পরাজিত হয়েছে। তাঁর ছয় দফা ছিল বাঙালির কাছে ম্যাগনাকার্টা। আর ৭ই মার্চের ভাষণ ছিল একটি জাতির স্বাধীনতা ও স্বাধীন অস্তিত্ব পুনর্নির্মাণের ডাক। এই ডাক সারা বিশ্বের নির্যাতিত মানুষের মনে সাড়া জাগাবে তাতে সন্দেহ নেই।”

সিরিল ডানের এই মন্তব্য যে কত সঠিক তার প্রমাণ পেয়েছিলাম বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার দুই বছরের মধ্যেই। ১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সে জোটনিরপেক্ষ ৭৩ জাতির শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। বঙ্গবন্ধু এই সম্মেলনে যোগ দেন। আমি সংক্ষেপে তাঁর একটি পরিচিতি পুস্তিকা লিখেছিলাম। প্রকাশ করেছিল বাংলাদেশ সরকারের প্রচার ও তথ্য বিভাগ। আমি বঙ্গবন্ধুর টিমে সাংবাদিক হিসেবে যাওয়ার সময় এই পুস্তিকার ইংরেজি সংস্করণ এবং ৭ই মার্চের ভাষণের ইংরেজি অনুবাদ সঙ্গে নিয়ে যাই।

কম্বোডিয়ায় তখন মার্কিন সিআইএর ষড়যন্ত্রে প্রিন্স সিহানুক ক্ষমতাচ্যুত। তিনি চীনে আশ্রয় নিয়ে ‘মারদেকা’ চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনিও এসেছিলেন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে ভূমধ্যসাগর তীরে বঙ্গবন্ধুর ভিলায়। বন্ধু তোয়াব খান (তখন বঙ্গবন্ধুর প্রেস সেক্রেটারি, এখন ঢাকার দৈনিক জনকণ্ঠের উপদেষ্টা সম্পাদক) আমাকে তাড়াতাড়ি বঙ্গবন্ধুর ভিলায় ডেকে নিয়ে গেলেন। বললেন, প্রিন্স সিহানুক এসেছেন।

আমি বঙ্গবন্ধুর জীবনী পুস্তিকা ও ৭ই মার্চের ভাষণের ইংরেজি অনুবাদ সঙ্গে করে নিয়ে যাই এবং প্রিন্স সিহানুককে দেখা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উপহার দিই। তিনি বইটি হাতে নেন এবং মুহূর্তের জন্য ৭ই মার্চের ভাষণের ওপর চোখ বোলান। বঙ্গবন্ধু তাঁর পাশেই দাঁড়ানো ছিলেন। প্রিন্স সিহানুক তাঁকে বলেন, এই ভাষণ কম্বোডিয়ার মানুষকেও প্রেরণা জোগাবে। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালেই বিশ্বশান্তি পরিষদের পক্ষ থেকে সেক্রেটারি জেনারেল রমেশ চন্দ্র ঢাকায় এসে বঙ্গবন্ধুকে বিশ্ববন্ধু খেতাব ও জুলিও কুরি আন্তর্জাতিক শান্তি পদক প্রদান করেন।

রামায়ণ একটি বিশাল মহাকাব্য। তা রাবণবধের প্রাচীন কাহিনি। কিন্তু এখনো ভারতের হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘরে ঘরে পঠিত হয়। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ একটি ছোট অথচ অগ্নিগর্ভ মহাকাব্য। তা সামরিক শাসক নামের এ যুগের রাবণবধের আহ্বানে পূর্ণ। বাংলার ঘরে ঘরে এই ভাষণ রক্ষিত এবং পঠিত হওয়া প্রয়োজন। তাহলে নতুন রাবণরা এ দেশে মাথা তুলতে পারবে না। কবি গোলাম কুদ্দুস লিখেছিলেন, ‘আজ দৈত্যবধের সত্য করেছি অর্জন।’ ৭ই মার্চের ভাষণ এই দৈত্যবধের সত্য অর্জনের ছোট অথচ ধ্রুপদী মহাকাব্য। কবি নির্মলেন্দু গুণের ভাষ্য অনুযায়ী এই মহাকাব্যের মহাকবি হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

৭ই মার্চের ভাষণ, এই ধ্রুপদী ভাষণ কী দিয়েছে আমাদের? আমরা জাতি হিসেবে আমাদের পরিচয় ও অস্তিত্ব হারাতে চলেছিলাম। আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি, সভ্যতা মুছে ফেলার চেষ্টা চলছিল, বিশ্বের মানচিত্র থেকে আমরা হারিয়ে গিয়েছিলাম; ৭ই মার্চের ভাষণ আমাদের সেই হারানো জাতি পরিচয়, হাজার বছরের পুরনো ভৌগোলিক পরিচয় ফিরিয়ে দিয়েছে। অস্তিত্ব রক্ষা করেছে আমাদের লোকসংস্কৃতি ও ভাষাসংস্কৃতির দিয়েছে একটি ভূখণ্ড এবং পতাকা। বিশ্বের মানচিত্রে তা এখন সুদৃঢ়ভাবে প্রোথিত। চর্যাপদ থেকে মঙ্গলকাব্য, ময়মনসিংহ গীতিকা থেকে ভারতচন্দ্র, ভারতচন্দ্র থেকে রবীন্দ্রনাথ-নজরুল, নজরুল থেকে শামসুর রাহমান বাঙালির হাজার বছরের সাংস্কৃতিক যাত্রাপথে পথনির্দেশনার মশাল ৭ই মার্চ ও ৭ই মার্চের ভাষণ।

আগেই বলেছি ৭ই মার্চের ভাষণ আমাদের মহাকাব্য। এই মহাকাব্যের মহাকবি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাঙালির জীবনে যত দুর্দিন ঘনাক, যত বিপর্যয় নেমে আসুক, এই মহাকাব্য ও মহাকবি আমাদের রক্ষাকবচ। রমনায় বৃক্ষচূড়ায় এখনো ধ্বনিত হয় তাঁর বজ্রকণ্ঠ—‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

এই ধ্রুপদী ধ্বনি অনাদিকাল বাঙালির অস্তিত্ব ও মর্যাদা রক্ষা করবে, সারা বিশ্বের নির্যাতিত মানুষের মনে শক্তি ও সাহস জোগাবে। মৃত্যুর অমৃতলোকে পৌঁছে বঙ্গবন্ধু আজ বিশ্ববন্ধু। তাঁকে উদ্দেশ করে রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলি— ‘মুক্তিদাতা, তোমারও ক্ষমা, তোমারও দয়া রবে চির পাথেয় চিরযাত্রার।’

 

লন্ডন, রবিবার, ৪ মার্চ, ২০১৮

 



মন্তব্য