kalerkantho


বইমেলা ও মানসম্পন্ন বই

ফরিদুর রহমান

৬ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



বইমেলা ও মানসম্পন্ন বই

ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে আয়োজিত বইমেলার মাঝামাঝি এক দিন একটি স্বনামধন্য প্রকাশকের স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে সদ্যঃপ্রকাশিত বইয়ের পাতা ওল্টাচ্ছিলাম। প্রথম পাঁচ পৃষ্ঠার মধ্যে অন্তত ১৫টি বানান ভুল এবং মুদ্রণ প্রমাদ আবিষ্কারের পরে উপস্থিত প্রকাশককে বললাম, ‘আপনারা কি প্রুফ দেখার ব্যাপারটা পাঠকের জন্য রেখে দিয়েছেন?’ পূর্বপরিচিত প্রকাশক সলজ্জ হাসি দিয়ে বললেন, ‘বইমেলার সময় তাড়াহুড়ার কারণে শেষ পর্যন্ত সব বই নির্ভুলভাবে বের করে আনা সম্ভব হয় না, বিশেষ করে লেখক নিজে যখন দায়িত্ব নিয়ে প্রুফ সংশোধন করে দেন, এর দায় অনেকটা লেখকের ওপরও বর্তায়।’ বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে, আলোচনায় যোগ দিয়েছেন আরো দু-তিনজন খ্যাতিমান লেখক ও পাঠক। সবাই একমত, প্রকাশনার সংখ্যার পাশাপাশি বইয়ের মান বাড়াতে হবে।

অমর একুশে গ্রন্থমেলার সমাপনী দিনে উপস্থাপিত বাংলা একাডেমির প্রতিবেদন অনুসারে ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা চার হাজার ৫৯১। এই বিপুলসংখ্যক বইয়ের মধ্যে মাত্র ৪৮৮টি মানসম্পন্ন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। খোদ বাংলা একাডেমিই যখন প্রকাশিত ১০০টির মধ্যে মাত্র ১০টি বই মানসম্পন্ন মনে করে, তখন প্রকৃত অর্থেই প্রকাশনার মান নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি সামনে চলে আসে। অস্বীকার করার উপায় নেই, ভুল বানান, ভুল বাক্য গঠন এবং ভুল তথ্যে ভরা বই আমাদের মেধা ও মননকে শাণিত করা বা অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করার চেয়ে ক্ষতিই করে বেশি, বিশেষ করে শিশুদের জন্য লেখা বইতে ইতিহাস ও তথ্য বিকৃতি, ভুল বানান এবং অসংলগ্ন বাক্য শিশুর মানসিক বিকাশকেই বাধাগ্রস্ত করে। ছড়া কবিতায় দুর্বল অন্ত্যমিল, ছন্দ ও মাত্রাজ্ঞানের অভাব ছোটদের জন্য সুখপাঠ্য না হয়ে অর্থ ও সময় অপচয়ের কারণ হয়ে ওঠে। রূপকথার গল্প, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি ও ভূত-প্রেতের গল্প অবশ্যই থাকবে, তবে তা যেন শিশুর মনোজগতে নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে তা-ও লক্ষ রাখা প্রয়োজন।

লেখক, প্রকাশক, পাঠকসহ বই ও প্রকাশনা-সংশ্লিষ্ট বিভিন্নজনের সঙ্গে কথা বলে প্রকাশনার সার্বিক মান নেমে যাওয়ার পাঁচটি কারণ চিহ্নিত করা গেছে। প্রথমত, গ্রন্থ প্রকাশের কোনো নির্ধারিত নীতিমালা এবং প্রকাশের আগে কোনো সম্পাদনা ব্যবস্থা না থাকায় যে কেউ যেমন ইচ্ছা বই লিখে তা ছাপিয়ে বইমেলায় পাঠকের সামনে হাজির করতে পারেন। যত দূর জানা যায়, বিশ্বের কোনো দেশেই যথাযথ সম্পাদনা ছাড়া বই প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আমাদের দেশেও হাতে গোনা দু-একটি প্রতিষ্ঠান নিজস্ব সম্পাদনা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে এবং মানসম্পন্ন বই প্রকাশ করে চলেছে। দ্বিতীয়ত, আমাদের প্রকাশনা মৌসুম ফেব্রুয়ারি মাসের বইমেলাকেন্দ্রিক হয়ে পড়ায় লেখক, প্রকাশক থেকে শুরু করে প্রচ্ছদশিল্পী, কম্পোজিটর, প্রুফ রিডার, মুদ্রাকর ও বাঁধাই কারিগরের মতো প্রত্যেকেই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বই প্রকাশের লক্ষ্যে প্রচণ্ড চাপের মধ্যে থাকেন বলে ভুলভ্রান্তি অনিবার্য হয়ে পড়ে। তৃতীয়ত, সাম্প্রতিক কালে ‘সাপ্লাইয়ের বই’ নামে এক ধরনের বই প্রকাশকে একটি লাভজনক ব্যবসা হিসেবে ধরে নিয়ে শুধু বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে একদল ব্যবসায়ী প্রকাশনায় যুক্ত হয়েছেন, প্রকাশনাশিল্প বা গ্রন্থ প্রকাশের ক্ষেত্রে যাঁদের অভিজ্ঞতা বা আন্তরিকতা কোনোটিই নেই। যেনতেন প্রকারে যাচ্ছেতাই বই প্রকাশ করে প্রভাব-প্রতিপত্তি খাটিয়ে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করাই তাঁদের মূল উদ্দেশ্য। চতুর্থত, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী কিংবা প্রশাসনিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের লেখা যথেষ্ট মানসম্পন্ন না হলেও প্রকাশক তাঁদের বই প্রকাশে বাধ্য হন। অবশ্য অনেক সময় প্রকাশক নিজেই উদ্যোগী হয়ে ক্ষমতাধরদের খুশি করার জন্য অযোগ্য লেখকের অপাঠ্য বই প্রকাশ করে থাকেন। পঞ্চম এবং শেষ কারণটিই সম্ভবত বর্তমানে মানহীন বই প্রকাশের প্রধান কারণ। এ ক্ষেত্রে লেখক বা কবি নিজের টাকায় কোনো একজন প্রকাশকের মাধ্যমে তাঁর বই প্রকাশের ব্যবস্থা করে থাকেন।

বর্তমানের বাস্তবতা হলো, কবি বা লেখক খ্যাতি অর্জনের জন্য প্রাণপাত করা তরুণ কবি-সাহিত্যিক ও প্রবীণ লেখক, যাঁরা তাঁদের বইয়ের প্রকাশনা ব্যয় বহন করতে সক্ষম, তাঁদের অনেকেই বই ছেপে বের করার জন্য প্রকাশককেই কাগজের দাম, প্রচ্ছদশিল্পীর সম্মানী এবং মুদ্রণ ও বাঁধাইয়ের ব্যয় নির্বাহের অর্থ দিয়ে থাকেন। ফলে এই বইটির গুণগত মান পর্যবেক্ষণের কোনো অবকাশ থাকে না। নগদ টাকার বিনিময়ে বই প্রকাশের বিষয়টিও ব্যবসায় পরিণত হওয়ার ফলে এক শ্রেণির প্রকাশকের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে—এঁরা বইকে বলেন ‘মাল’ এবং লেখক বা কবিকে বলেন ‘মুরগি’। দুর্ভাগ্যজনক হলো অভিজ্ঞ ও স্বনামধন্য প্রকাশকদের অনেকেই ‘মুরগি’ ধরার ব্যাপারে প্রলুব্ধ হয়ে নিজেদের সুনাম এবং একই সঙ্গে প্রকাশনাশিল্পের ক্ষতি করছেন।

বই প্রকাশের নীতিমালা বা প্রকাশের আগে সম্পাদনা ব্যবস্থা প্রবর্তনের কথা শুনে ‘মুক্তচিন্তার’ মানুষের অনেকেই আঁতকে উঠতে পারেন। এ ক্ষেত্রে বলে রাখা ভালো, বাংলা একাডেমির নিজস্ব বই প্রকাশের ক্ষেত্রেও ‘রিভিউ’য়ের ব্যবস্থা আছে। যদি এই ‘রিভিউ’ বা ‘সম্পাদনা’ বইয়ের বিষয়বস্তু, কাহিনি বা প্রকাশিত মতামতকে কোনোভাবেই প্রভাবিত বা বিকৃত করার লক্ষ্যে পরিচালিত না হয়ে এর বানানরীতি, বাক্যবিন্যাসসহ ভুলত্রুটি সংশোধনের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়, তাহলে মানসম্পন্ন বইয়ের সংখ্যা বৃদ্ধিতে তা অবশ্যই সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

মেলা প্রাঙ্গণ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সম্প্রসারিত ও সময়সীমা রাত ৯টা পর্যন্ত বর্ধিত হওয়ার ফলে মেলার বিস্তৃতি যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে পাঠক, প্রকাশক ও প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা। ফলে ২০১৮ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় বই বিক্রির পরিমাণ ৭০ কোটি ৫০ লাখ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। তবে বই প্রকাশের ব্যাপারটিকে শুধু অর্থের হিসাব দিয়ে বিবেচনা করে আনন্দিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। যদি সত্যিই প্রকাশিত বইয়ের শতকরা ৯০টিই যথেষ্ট মানসম্পন্ন না হয়ে থাকে, তাহলে প্রায় ৬৪ কোটি টাকার পুরোটাই জলে গেছে। গ্রন্থ প্রকাশের নামে এই অপচয় যতটা সম্ভব বন্ধ করে মানসম্পন্ন বই প্রকাশ নিশ্চিত করতে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া যায়, তা ভাবতে হবে এখনই। 

লেখক : সাবেক উপমহাপরিচালক (অনুষ্ঠান) বাংলাদেশ টেলিভিশন

farid.btv@gmail.com


মন্তব্য