kalerkantho


জঙ্গি তৎপরতার নতুন আশঙ্কা ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা

মেজর জেনারেল এ কে মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.)

৬ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



জঙ্গি তৎপরতার নতুন আশঙ্কা ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা

সাম্প্রতিক দুটি খবর বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ জঙ্গিবাদ ও তাদের তৎপরতা নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। নতুন না বলে পুরনো বিতর্ককে নতুন করে উসকে দিয়েছে বলা যায়। প্রথম খবরটির উৎস যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট, আর দ্বিতীয় খবরটির উৎস ব্রাসেলসভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ, সংক্ষেপে আইসিজি। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার স্টেট ডিপার্টমেন্টের এক নিয়মিত বিজ্ঞপ্তিতে কথিত আইএসের বাংলাদেশ শাখাকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। অন্যদিকে আইসিজি তাদের এক বিশ্লেষণে বলেছে, রাজনৈতিক অনৈক্যই বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থানের কারণ এবং তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছে আগামী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশে আবার জঙ্গি তৎপরতা বৃদ্ধি পেতে পারে। দুটি খবরই বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই আজকের নিবন্ধে খবর দুটি নিয়ে আলাদা বিশ্লেষণ তুলে ধরার চেষ্টা করব। প্রথমেই যুক্তরাষ্ট্রের মন্তব্য ও বক্তব্য নিয়ে আলোচনা।

আলোচনার শুরুতেই একটি ধ্রুপদী বাস্তবতা স্মরণে রাখতে চাই, আর তা হলো বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের মন্তব্য, বক্তব্য ও বিজ্ঞপ্তি, সব কিছুর  পেছনে তাদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার বিবেচনা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে কাজ করে। কখনো সেটা খুব নগ্নভাবে প্রকাশ পায়, আবার কখনো অত্যন্ত সূক্ষ্ম কৌশলে তার প্রকাশ ঘটে। একসময় যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত নগ্নভাবে, বলা যায় গায়ের জোরে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছে বাংলাদেশে আইএসের উপস্থিতি আছে এবং সেটার পক্ষে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক স্বীকারোক্তি আদায় করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। তার সঙ্গে তখন কোরাসে কণ্ঠ মিলিয়েছে বাংলাদেশের একটি মিডিয়া গ্রুপ এবং একটি রাজনৈতিক পক্ষের বুদ্ধিজীবীরা। ঢাকায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট এখন একটু ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে বললেও তখন স্পষ্ট বলেছেন, বাংলাদেশে আইএস আছে। তারপর বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী সজাগ ও সচেতন হওয়ার কারণে এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আন্তরিক প্রচেষ্টায় গত দেড় বছর জঙ্গি দমন ও নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করতে পেরেছে। এসব অপারেশনে যেসব জঙ্গি নিহত, আহত ও গ্রেপ্তার হয়েছে তাদের পরিচয় থেকে আইএসের কোনো ট্রেস বা খোঁজ পাওয়া যায়নি। আইএস আছে, আইএস নেই—এই বিতর্ক থেমে যায়। একটা বহুমুখী পরিণতির আশঙ্কা থেকে আমরা মুক্ত হই। বাংলাদেশ যদি যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য অনুসারে তখন আইএসের উপস্থিতি স্বীকার করে নিত তাহলে বাংলাদেশের নিরাপত্তা, জঙ্গি দমনসহ রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে যেত তা এখন সুনির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল। তবে সবাই জানেন যুক্তরাষ্ট্র আইএসের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করে রেখেছে এবং তাতে বলা আছে বিশ্বের যে প্রান্তে আইএস থাকবে সেখানেই নিজ স্বার্থ রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারবে। সেই সামরিক পদক্ষেপের কৌশল, পরিধি ও কাঠামো কেমন হবে, তা নির্ভর করবে ওই স্থান বা দেশের সার্বিক পরিস্থিতি এবং সে দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ওপর। পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া, সোমালিয়া ও ইয়েমেনের দিকে তাকালে কিছু উদাহরণ পাওয়া যায়। এসব দেশের স্বকীয়তা ও সার্বভৌমত্ব বলে এখন আর কিছু অবশিষ্ট নেই।

২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পাঁচটি কৌশল নির্ধারণ করে বৈশ্বিক সন্ত্রাসবিরোধী জোট গঠিত হয়। এক. সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন প্রতিরোধ। দুই. সন্ত্রাসীদের আন্তর্রাষ্ট্রীয় অর্থাৎ ক্রস বর্ডার চলাচল রোধ। তিন. আইএসের পক্ষে সব ধরনের প্রচার ঠেকানো। চার. জোটবদ্ধ দেশের মধ্যে আন্তর্রাষ্ট্রীয় সামরিক সহায়তা। পাঁচ. সন্ত্রাসকবলিত জোটবদ্ধ দেশকে মানবিক সহায়তা প্রদান। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আমন্ত্রণ সত্ত্বেও বাংলাদেশ নিজস্ব বিবেচনায় উল্লিখিত বৈশ্বিক জোটে যোগদান থেকে বিরত থাকে। যোগদান না করার কারণ হিসেবে সরকারের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট কিছু বলা না হলেও বাংলাদেশের জনমত ছিল সরাসরি সামরিক জোটবদ্ধতার মধ্যে না যাওয়ার পক্ষে। যুক্তরাষ্ট্র বহু দিন থেকে তাদের সামরিক বাহিনীর জন্য বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সহজে চলাচল সুবিধা পাওয়ার লক্ষ্যে কখনো সোফা (SOFA-Status of Forces Agreement), আবার কখনো বা অন্য নামে এক প্রকার আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরের চেষ্টা করে আসছে। কিন্তু বিএনপি-আওয়ামী লীগসহ কোনো সরকারই তাতে রাজি হয়নি। বাংলাদেশের জনমতও এর বিরুদ্ধে। সুতরাং বাংলাদেশে আইএসের উপস্থিতি প্রসঙ্গে যখন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একতরফা বক্তব্য আসে তখন তা নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের মনে অন্য রকম প্রশ্ন এলে সেটিকে অমূলক বলা যায় কি? বাংলাদেশের মানুষের মনোভাব এবং পালস ঢাকায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত বার্নিকাট উপলব্ধি করতে পারেন বলেই তিনি স্টেট ডিপার্টমেন্টের সাম্প্রতিক বক্তব্যকে একটু ঘুরিয়ে বলেছেন, ‘আইএস বাংলাদেশ নামের সংগঠনকে ওয়াশিংটন কর্তৃক বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করার অর্থ এই গোষ্ঠীর এ দেশে উপস্থিতি বোঝায় না (বিডিনিউজ২৪.কম, ৩ মার্চ)। ২৮ ফেব্রুয়ারি এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বার্নিকাট বলেন, ‘ওয়াশিংটনের বক্তব্যের মাধ্যমে আইএস এখানে আছে, তা বলা হচ্ছে না। বরং বোঝায় এসব গ্রুপের লোকজন আছে যারা নিজেদের সহিংস কর্মকাণ্ডকে আইএসের বলে ঘোষণা দেয়।’ স্টেট ডিপার্টমেন্টের সাম্প্রতিক এই বিজ্ঞপ্তির পেছনে আপাত দৃষ্টিতে একটা নিরীহ উদ্দেশ্য আছে বলে মনে হতে পারে। উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘অর্থ সংগ্রহ বা অন্য কোনো প্রয়োজন বা সহায়তার জন্য যদি তারা যুক্তরাষ্ট্রে যায়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে অনেক সহজে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।’ এ কথার মধ্যে স্টেট ডিপার্টমেন্টের আন্তরিকতা থাকতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের অভ্যন্তরে জঙ্গিবাদ ও তার সশস্ত্র তৎপরতার প্রেক্ষাপট, উত্থান, বিস্তারের সব তথ্য-উপাত্ত, ইতিহাস জানা থাকার পরও জঙ্গিদের জন্মদাতা ও পৃষ্ঠপোষক রাজনৈতিক দল ও পক্ষের প্রতি যখন প্রকাশ্যে সমর্থন ব্যক্ত করে, তখন তাদের কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের নিরীহ উদ্দেশ্য নিয়েও সন্দেহের সৃষ্টি হয়। আজকের এই লেখায় বিস্তারিত বলার জায়গা হবে না, তবে এটা সবাই জানে বাংলাদেশে জঙ্গি সৃষ্টির পেছনে জামায়াত ও তাদের রাজনীতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অথচ এই জামায়াতের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র কখনোই সরব বক্তব্য দেননি। তারপর জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে ২০০১-০৬ মেয়াদে বিএনপির রাষ্ট্র পরিচালনার সময় জঙ্গিদের সশস্ত্র তৎপরতা বিশ্বব্যাপী রেড অ্যালার্ট সৃষ্টি করেছিল। আন্তর্জাতিক অঙ্গনের খ্যাতিমান বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকরা তখন বলেছিলেন, এই অবস্থা চলতে থাকলে বাংলাদেশ হবে পরবর্তী আফগানিস্তান। সে সময়ে রাজশাহীর বাগমারায় জঙ্গিনেতা সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই ইসলামী বিপ্লবের নামে দিনের বেলায় উদারপন্থী নিরীহ মানুষ হত্যা করে গাছের সঙ্গে উল্টো করে লাশ ঝুলিয়ে রাখার দৃশ্য এবং তারপর ওই বাংলা ভাইকে রাজশাহীর তখনকার এসপি মাসুদের অভ্যর্থনা প্রদান ও সেই এসপির বিরুদ্ধে বিএনপি সরকারের নির্লিপ্ততা কী বার্তা দেয়, সেটি সবাই সহজে বুঝতে পারেন। এত কিছুর পরও ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের প্রাক্কালে যুক্তরাষ্ট্রের যে ভূমিকা লক্ষ করা গেছে, তাতে বাংলাদেশে তাদের প্রায়রিটি কোনটি, জঙ্গি দমন নাকি অন্য কিছু তা বোঝা কষ্ট হয়ে যায়। তাই বাংলাদেশের আরেকটি জাতীয় নির্বাচন যখন আসন্ন তখন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক আলোচ্য বক্তব্যের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী তা স্পষ্ট নয়।

আজকের লেখায় দ্বিতীয় যে খবরটি নিয়ে আলোচনা করতে চেয়েছিলাম সেটি ছিল ব্রাসেলসভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদন, যেখানে আগামী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশে আবারও জঙ্গি তৎপরতা বৃদ্ধির আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনটির অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত না হলেও এই আশঙ্কাটির মধ্যে কিছুটা ভিত্তি আছে বলে আমার কাছে মনে হয়েছে। গত দেড় বছরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ জঙ্গিরা কয়েক ডজনবার তৎপরতা চালাবার প্রস্তুতি ও প্রচেষ্টা চালিয়ে একবারও সফল হয়নি। আইসিজি তাদের প্রতিবেদনে দুটি জঙ্গি সংগঠনের নাম বলেছে। প্রথমটি জেএমবি এবং দ্বিতীয়টি আনসার আল ইসলাম বাংলাদেশ। এই দুটি জঙ্গি সংগঠনের রাজনৈতিক গুরু জামায়াত। বাংলাদেশের রাজনীতি আজ যেখানে এসে পৌঁছেছে তাতে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তি আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এলে জামায়াতসহ উগ্রবাদী ধর্মীয় গোষ্ঠীর রাজনৈতিক অস্তিত্ব বাংলাদেশে আর থাকবে না। তাই নির্বাচনের প্রাক্কালে জামায়াতপ্রসূত ওই সব সশস্ত্র জঙ্গি সংগঠন, বিশেষ করে জেএমবি নতুন করে তৎপরতা বৃদ্ধি করার চেষ্টা করতে পারে। তাদের উদ্দেশ্য হতে পারে বড় ধরনের হত্যাকাণ্ড ও নাশকতামূলক ঘটনা ঘটিয়ে নির্বাচনকে ভণ্ডুল করে দেওয়া। আর তা না পারলে অন্তত বিক্ষিপ্ত হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা, যাতে নির্বাচনে জিতে বর্তমান সরকার আবার ক্ষমতায় এলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সরকারের গ্রহণযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হয় এবং দেশের অভ্যন্তরে ওই অজুহাতে প্রপাগান্ডা চালিয়ে মানুষকে বিভ্রান্তিতে রাখা যায়। তাহলে ওই সব অপশক্তি আবার সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পাবে এবং তাদের টিকে থাকার আশা জাগ্রত থাকবে। সুতরাং এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচ্য বিজ্ঞপ্তি এবং ব্রাসেলসভিত্তিক আইসিজি প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনের মধ্যে একটা সূক্ষ্ম যোগসূত্রের গন্ধ পাওয়া যায়, যেখানে বাংলাদেশকে ঘিরে পশ্চিমা বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের বিবেচনাটি প্রধান্য পেয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

লেখক : কলামিস্ট ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

sikder52@gmail.com



মন্তব্য