kalerkantho


বিচারহীনতার পরিণতি

মামুনুর রশীদ

৫ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



বিচারহীনতার পরিণতি

আবারও রক্ত ঝরল সিলেটের পুণ্যভূমিতে। এ এক ধারাবাহিকতা, যার সূচনা একুশের পবিত্র বইমেলায় হুমায়ুন আজাদের মধ্য দিয়ে। অভিজিত থেকে দীপন আরো অনেক মুক্তচিন্তার মানুষের ওপর চলেছে ধারালো অস্ত্রের প্রয়োগ। এর আগে শামসুর রাহমানের ওপরও আঘাতের মহড়া চলেছে। একেকটি ঘটনা ঘটছে, তার প্রতিবাদও হচ্ছে। কিন্তু সে যেন শান্ত দিঘির পানিতে একটা ঢিল পড়ার মতো। তরঙ্গ ওঠে আবার মিলিয়ে যায়। খুনিরা এটা যেমন জানে, তেমনি জানে যারা আইন-শৃঙ্খলার সঙ্গে এবং বিচারব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। সেই কবে প্রথম যশোরে উদীচীর সম্মেলনে বোমা পড়ল। হতাহতের আহাজারিতে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়েছিল। যশোরের বাতাস বহুদিন ভারী হয়েছিল। আমরা যখন পড়ন্ত বিকেলে যশোরের কবরস্থান কারবালার দিকে হেঁটে যাচ্ছিলাম, তখন মানুষজন, বৃক্ষ-তরুলতা পর্যন্ত শোকে-দুঃখে-বেদনায় প্রতিবাদ জানিয়েছিল। সেই কত বছর আগের ঘটনা। তারপর রাজধানী ঢাকায় রমনার বটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠানে সবার নাকের ডগায় ঘটনাটি ঘটল। তাত্ক্ষণিক প্রতিবাদ, লেখালেখি কত কিছুরই আয়োজন দেখা গেল চারদিকে। এর মধ্যে সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড ঘটল এই রাজধানীতেই। এসব হত্যাকাণ্ডের রীতি একই ধারালো অস্ত্রের ব্যবহার। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এক অফিসার কুমিল্লার অদূরে বহু বাঙালিকে (সম্ভবত পাঁচ শ) জবাই করে হত্যা করেছিল এবং নিজেকে দাবি করেছিল একজন দেশপ্রেমিক হিসেবে। কারণ সে পাঁচ শ বুলেট বাঁচিয়েছিল। বুলেটের মূল্য তার কাছে জীবনের মূল্যের চেয়ে অনেক অনেক বেশি। পাকিস্তানের শিক্ষা ভয়ংকর। এরা প্রকাশ্য দিবালোকে একজন জননন্দিত নেত্রীকে হত্যা করতে পারে। মসজিদের ভেতর কামান দাগাতে পারে। বিদেশি ক্রিকেটারদের আক্রমণও করতে পারে। সেখানে বিচারব্যবস্থা সব সময় ধামাচাপা দেওয়ার সংস্কৃতিকে বহন করে আসছে। কিন্তু আমাদের দেশের বিচারব্যবস্থা তো সে রকম নয়। পনেরো বছরের কলঙ্কময় অধ্যায় পাড়ি দেওয়ার পর বেশ কিছু ক্ষেত্রে বিচারের বাণী নীরবে-নিভৃতে কাঁদেনি; বরং সাবেক ও বর্তমান সেনাসদস্য ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও রেহাই পাননি। তবে এখানে সেই অবস্থাটি কেন?

মুহম্মদ জাফর ইকবাল একজন শিক্ষক এবং লেখক। তাঁর লেখকসত্তা শিক্ষকতার সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে। যখনই শিক্ষা ক্ষেত্রে তিনি কোনো অনিয়ম দেখেন, প্রতিবাদ করেন। সাম্প্রতিককালে প্রশ্ন ফাঁস নিয়েও তিনি ছিলেন যথেষ্ট সোচ্চার। একজন বিবেকবান মানুষ তাঁর মুক্তবুদ্ধির প্রকাশ ঘটিয়েছেন সব সময়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির একজন শিক্ষক হিসেবে সম্প্রতি প্রযুক্তি দ্রুত বিকাশে যে সামাজিক অবক্ষয় শুরু হয়েছে, তার ব্যাপারেও তিনি সোচ্চার। আগেও যেসব ব্লগার বা মুক্তিবুদ্ধির চর্চায় নিয়োজিত যেসব মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, তাদেরই বা অপরাধ কী? আর সেই অপরাধের বিচার করবে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্যরা! ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে যে দেশ স্বাধীন হয়েছে, সে দেশের মানুষ কী মুক্তিবুদ্ধির চর্চা করতে পারবে না? অভিজিত-দীপনদের হত্যার পর বহু ব্লগার ও মুক্তবুদ্ধির চর্চায় নিয়োজিত তরুণ, প্রবীণ দেশত্যাগ করেছেন। বিজ্ঞানমনস্ক এই মানুষগুলো যদি দেশত্যাগ করে, তাহলে একসময় দেশটা মেধাশূন্য হয়ে যাবে। এই বাস্তবতা কি নীতিনির্ধারকরা বুঝতে পারছেন না?

সারকথা হচ্ছে, এসব হত্যাকাণ্ড ও হত্যাপ্রচেষ্টা বন্ধ হচ্ছে না।  সমাজের অভ্যন্তরে একটা নিরাপদ স্থানে অবস্থান  করছে এবং সুযোগ বুঝেই তারা হামলা চালাচ্ছে। সরকার জঙ্গি নিয়ন্ত্রণে নানা ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে কিন্তু এসব হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে অবিলম্বে নতুন কোনো পথ বের করতে হবে। রাজনৈতিকভাবেও মোকাবেলা করা প্রয়োজন। আবার কোনোভাবেই যেন এসব হস্তারক কোথাও আইনের বা সামাজিক আশ্রয়-প্রশ্রয় না পায়, তার ব্যবস্থাও জরুরি।

জাফর ইকবালের হত্যাপ্রচেষ্টার রহস্য উদ্ঘাটন কঠিন কাজ হবে না। কারণ একজন অপরাধী ধরা পড়েছে। যা করার দ্রুতই করতে হবে।

লেখক : নাট্যজন


মন্তব্য