kalerkantho

রঙ্গব্যঙ্গ

ধরাধরির পুরস্কার

মোস্তফা কামাল

৪ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



ধরাধরির পুরস্কার

রফিকুল হক ও সানাউল হাসান দুই বন্ধু। দুজনই লেখালেখি করেন। রফিকুল হক কবিতা লেখেন আর সানাউল হাসান লেখেন গল্প। দুজনই চাকরি করেন। একজন সরকারি, আরেকজন বেসরকারি। রফিকুল হক একটি বহুজাতিক কম্পানির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। বেতনাদি ভালো। বন্ধুদের নিয়ে বেশ খরচপাতি করেন। ক্লাবে নানা রকম পার্টিতে যোগদান করেন।

সানাউল হাসান সীমিত আয়ের মানুষ। তিনি পার্টিতে যেতে পারেন না। কোথাও আড্ডা দেন না। ক্লাবে-পার্টিতে যাওয়ার সাহস করেন না। অফিস থেকে বাসা আর কাজের ফাঁকে লেখালেখি করেন। তাঁর প্রতিটি লেখায় যত্নের ছাপ থাকে। বোদ্ধা পাঠকদের কাছে তিনি গুণী লেখক। কিন্তু তাঁর গল্প খুব বেশি কাগজে ছাপা হয় না। কেন হয় না, তা তিনি জানেন না।

রফিকুল হক কবিতা লেখেন। তাঁর কবিতা উঁচু মানের নয়। তিনি সাধারণ মানের কবি বলা চলে। তাঁর কবিতা জাতীয় দৈনিকে খুব একটা ছাপা হয় না। তবে লিটল ম্যাগাজিনে বেশ দেখা যায়। কিন্তু বিশিষ্টজনদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ভালো। তাঁদের তিনি প্রায়ই আপ্যায়ন করান। ক্লাবে-বিভিন্ন পার্টিতে নিমন্ত্রণ করেন। হঠাৎ হঠাৎ রফিকুল হক পুরস্কার পান। কবিতার জন্য পুরস্কার। এতে অবাক হন সানাউল হাসান। তিনি মনে মনে ঈর্ষান্বিত হন। মনে মনে বলেন, তার যেই কবিতার মান! পুরস্কার পায় কী করে!

এর কোনো উত্তর খুঁজে পান না সানাউল হাসান। অনেক ভাবনাচিন্তার পর তিনি রফিকুল হকের কাছেই জানতে চান, রফিকুল, একটা বিষয় আমার জানার খুব শখ। যদি কিছু মনে না করো, তাহলে জিজ্ঞেস করব।

রফিকুল হক বললেন, না না! কিছু মনে করব না। তোমার প্রশ্ন কী বলো?

আচ্ছা, তোমার নিজেরও তো নিজের ব্যাপারে একটা জাজমেন্ট আছে। আছে না?

অবশ্যই আছে।

তুমি যে কবিতা লেখো তা কেমন মানের?

আছে। মোটামুটি। খারাপ না আর কি! চলে।

আচ্ছা। আমার গল্প তোমার কেমন লাগে?

খুব ভালো। আমি তো তোমার গল্পের ফ্যান। তোমার লেখার হাত অনেক ভালো। আমার চেয়ে তো বটেই।

সত্যি করে বলো।

আরে! সত্যিই তো বলছি। তুমি বলো, আমার কবিতা কেমন হয়?

আমিও মন্দ বলব না। ভালোই বলব।

ভালোই কেন বলছ? আসলে তেমন ভালো হয় না। আরো ভালো লিখতে হবে। কিন্তু যা লিখছি তা লিখেই যখন পুরস্কার পাওয়া যায়, তখন আরো ভালো লেখার চেষ্টা করতে ইচ্ছা করে না।

তা অবশ্য ঠিকই বলেছ। কিন্তু তোমার পুরস্কার পাওয়ার নেপথ্যের কাহিনি কী?

সব যদি বলে দিই, তাহলে তো তুমি আমার লাইন ধরবা। তখন আমি একজন ভালো গল্পকারকে হারাব। না না। আমি জেনেশুনে তোমার ক্ষতি হতে দেব না। আরেকটা বিষয় তুমি বোধ হয় জানো না। এখন আর কেউ পুরস্কার পায় না। পুরস্কার নেয়। এই পুরস্কার নেওয়ার দরকার নেই তোমার। তুমি যেমন আছ তেমনই থাকো।

আচ্ছা, আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি। আমি পুরস্কারের জন্য দৌড়ঝাঁপ করব না। তুমি শুধু বলো, নেপথ্যের ঘটনা কী?

এগুলো শোনার দরকার কী?

জেনে রাখি। জানা থাকা ভালো না!

যোগাযোগ, বুঝলা; যোগাযোগ! সবার সঙ্গে একটু লাইন রাখতে হয়। ফুয়েল খরচ করতে হয়। বুঝলা না, যেই যুগ পড়ছে, এমনি এমনি কেউ কিছু করতে চায় না।

কী বলো!

কী বলো মানে! তোমার বই পড়ার এত সময় কারো আছে? আর কারো লেখা কেউ পড়ে? তাহলে তো কাজই হতো! না পড়েই বলে, অমুকে কী লেখে? তমুকে কী লেখে? আমি যা লিখি তা হলো সোনায় মোড়ানো। এবার বুঝছ! নিজের ঢোল নিজে পিটিয়ে কান ঝালাপালা করে দিতে হবে। তাহলেই না তুমি বড় লেখক!

এসব তুমি কী বলো!

কী বলি মানে! এসবই তো হচ্ছে। নিজের ঢোল নিজেকেই পেটাতে হবে। অন্যে পেটালে ফাটিয়ে ফেলতে পারে!

আচ্ছা আচ্ছা! বুঝছি। আমি এসবের মধ্যে নেই।

সে জন্যই তো তোমাকে বললাম, তোমার পুরস্কারের দরকার নেই। তুমি কাজ করে যাও। তোমার পাঠক দিন দিন বাড়ছে। এটাই তো তোমার বড় পুরস্কার!

ঠিক বলেছ। একেবারে ঠিক বলেছ। পাঠকই একজন লেখকের বড় পুরস্কার। এর চেয়ে বড় পুরস্কার আর কী আছে? কিন্তু সমস্যা কী জানো, এক লেখক আরেক লেখকের লেখা পড়ে না বলে মূল্যায়নও করে না।

হ্যাঁ, তা ঠিক। আবার ঈর্ষাও কাজ করে। ঈর্ষার কারণে কেউ কারো লেখার প্রশংসা করে না। সবাই আছে নিজেকে নিয়ে। যাকগে, এসব নিয়ে তুমি চিন্তা কোরো না। তোমার আসন কেউ নিতে পারবে না।

দোয়া কোরো বন্ধু! আমি যেন ধৈর্য রাখতে পারি।

অবশ্যই দোয়া করি। ভালো থেকো। এখন যাই।

আবার দেখা হবে।

রফিকুল হক চলে যান। তাঁর চলে যাওয়া দেখেন সানাউল হাসান। আর মনে মনে তাঁর কথাগুলো নিয়ে ভাবেন।

 

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক


মন্তব্য