kalerkantho

ত্রিপুরা নির্বাচন

সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

২ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



ত্রিপুরা নির্বাচন

বারবার ঘুঘু ধান খেয়ে যায়—এবার আর তা হতে দেবে না বলে কিরে কেটেছিল বিজেপি। কিন্তু বিজেপির যাবতীয় স্বপ্ন ও যতেক রকম আয়োজন সব কিছু চুরমার করে, বলতে গেলে ড্যাং ড্যাং করেই জয়ের পথে বামফ্রন্ট। চারবার পার করে পঞ্চমবার। ইভিএম  কেলেঙ্কারির দৌলতে রবিবার গভীর রাত পর্যন্ত চলে ভোটগ্রহণ। ভোট পড়ার হার গতবারের চেয়ে সামান্য কম। গণনা আগামী ৩ মার্চ। অপেক্ষা নাগাল্যান্ড ও মেঘালয়ের ভোট পর্বের জন্য। কিন্তু বামফ্রন্টের অন্দরমহলের হিসাব-নিকাশের কথা নয়, আগরতলায় উপস্থিত স্থানীয় ও বহিরাগত যাবতীয় মিডিয়ার সবারই মূল্যায়ন, ‘হীরে’ নয়, ফের ‘মানিক’ বেছে নিল উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজনীতিগতভাবে অত্যন্ত স্ট্র্যাটেজিক এই রাজ্য। ভোট হওয়া ৫৯টি আসনের মধ্যে (চারিলাম কেন্দ্রের বাম প্রার্থী রামেন্দ্র নারায়ণ দেববর্মার মৃত্যুতে একটি আসনে ভোট স্থগিত রাখা হয়েছে) বামফ্রন্টের জয়লাভ সুনিশ্চিত অন্তত ৪৬টি কেন্দ্রে।

একটা জিনিস এই নির্বাচনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবেই ফুটে উঠেছে, তা হলো বামফ্রন্টের এবারের লড়াইটা ছিল মূলত বিজেপির সঙ্গে। অর্থাৎ বামফ্রন্টের জয়ের অর্থ নিশ্চিতভাবেই বিজেপির পরাজয়। কিন্তু তাদের পরাজয়ের দেয়ালের লিখন এখন থেকেই পড়ে ফেলা সম্ভব হচ্ছে কেন? আসলে ত্রিপুরাবাসীর বেশির ভাগই বিজেপিকে দিল্লি থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসা একটি দল হিসেবে মনে করেছে। এই দলের স্থানীয় স্তরে কোনো দিনই তেমন কোনো প্রভাব ছিল না। ভোটের ঠিক আগে নামাবলি বদলে কংগ্রেসের লোকজন হঠাৎই বিজেপি হয়ে বসে; যে কারণে বিজেপির নিজস্ব প্রার্থী তালিকায় ৬১ জনের মধ্যে ৪৫ জনই সাবেক কংগ্রেসি, বাকি ৯টি আসন তারা ছেড়েছিল জোটসঙ্গী আইপিএফটিকে। এই দলবদল নেতাদের এবার ত্রিপুরার মানুষ প্রত্যাখ্যান করেছে। আসলে বিজেপির এবারের লক্ষ্য ছিল যেকোনোভাবে রাজ্য দখল করা। তাই যেভাবে তারা নির্বাচনের প্রচার পর্ব থেকে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, তা এ রাজ্যে আগে কখনো হয়নি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই ছোট্ট রাজ্যের জন্য দুই-দুইবার সফর করেছেন। শুধু তা-ই নয়, ৪০ জন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বিভিন্ন পর্যায়ে রাজ্যে এসে সভা করে গেছেন। উত্তর প্রদেশের যোগী আদিত্যনাথসহ ছয়-ছয়জন মুখ্যমন্ত্রী এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত দাপিয়ে বেড়িয়েছেন। তা সত্ত্বেও মানুষের বিন্দুমাত্র সহানুভূতি বিজেপির সঙ্গে ছিল না, তার একটা বড় কারণ হলো বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন আইপিএফটির সঙ্গে বিজেপির জোট গঠন। একসময় যারা ত্রিপুরায় রক্তগঙ্গা বইয়ে দিতে চেয়েছিল, সেই সংগঠনের নেতা নরেন্দ্র চন্দ্র দেববর্মার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী মঞ্চে কোলাকুলি করেছেন, এটা কিছুতেই মেনে নেওয়া যায়নি।

ফলাফল নিয়ে কোনো সংশয় না থাকলেও রাজ্যের বামশিবির, মিডিয়া মহল তো বটেই, এমনকি সাধারণ মানুষের মধ্যেও দুটি প্রশ্ন খুবই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। একটি হলো নজিরবিহীন ইভিএম বিভ্রাট। এর পেছনে এক সুগভীর ষড়যন্ত্র থাকার আঁচ করছে অনেকেই। কিন্তু মুখ ফুটে সে কথা বলতে পারছে না প্রমাণের অভাবে। সাড়ে তিন হাজার পোলিং স্টেশনের মধ্যে প্রায় ৫১৯টি বুথে ইভিএম খারাপ হওয়ার খবর মিলেছে।

বামফ্রন্টের বক্তব্য, ইভিএমে জালিয়াতি হওয়ার আশঙ্কা বহু আগে থেকেই তারা পেয়েছিল। ঠিক সেই ব্যাপারই ঘটল রবিবার নির্বাচন পর্বের শুরু থেকে। উল্লেখ্য, কিছুদিন আগে এক প্রকাশ্য জনসভায় বিজেপির রাজ্য সভাপতি বিপ্লব দেব বলেন, ‘মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারের ভোটও কোন দিকে পড়বে, তা কেউ বলতে পারে না। সে কথা শুধু আমি জানি আর নরেন্দ্র মোদি জানেন।’ এই মন্তব্যকে ফের সামনে এনে সিপিআই (এম) বলে, বোঝাই যাচ্ছে ত্রিপুরা দখল করার জন্য কিভাবে ইভিএম জালিয়াতির জাল বিস্তার করা হয়েছে। ভোট শেষ হওয়ার কথা ছিল বিকেল ৪টায়। সেই সময় পর্যন্ত ভোট পড়ার হার ছিল ৭৪ শতাংশ। কিন্তু তার পরও বহু ভোটার বুথের সামনে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। কোথাও কোথাও ভোট শেষ হতে রাত গড়িয়ে গেছে। মূলত ইভিএম-সংক্রান্ত নানা অসুবিধার কারণেই ভোট শেষ হওয়ার সময় এতটা বাড়াতে হয়েছে। আইপিএফটি প্রভাবিত অঞ্চলে টাকারজলা কেন্দ্রে সিপিআই (এম) এজেন্টদের ওপর আক্রমণ করা হয়। সিপিআই (এম) মুখপাত্র গৌতম দাশ অভিযোগ করেছেন, এখানকার আটটি বুথে তাঁদের এজেন্টদের ঢুকতে দেওয়া হয়নি। ভোটারদেরও বাড়ি গিয়ে ভয় দেখানো হয়। এর মধ্যে তিনটি বুথে তাঁরা পুনর্নির্বাচন দাবি করেছেন।

দ্বিতীয় যে প্রশ্নটি নিয়ে মানুষের মধ্যে সংশয় দেখা দিয়েছে, তা হলো ছোট্ট একটি রাজ্য ত্রিপুরা, যাতে ছোট ছোট পরিধির ৬০টি মাত্র আসন রয়েছে। বেশির ভাগ অঞ্চলই শান্তিপূর্ণ এলাকা বলে পরিচিত। সেখানে একটানা নির্বাচনী প্রচার পর্বে কখনো কোনো রাজনৈতিক উত্তেজনা বা সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি। তা সত্ত্বেও ভোটগ্রহণকে কেন্দ্র করে এত বিশাল বাহিনীর আয়োজন বা সর্বত্র সিসিটিভির নজরদারি কেন? সেখানে ৭০ শতাংশ বুথে অনলাইনে সিসিটিভি চিত্রের লাইভ সম্প্রচার করা হয়। দিল্লি থেকে সেই বুথগুলোর নজরদারি চালানো হয়। এ ছাড়া বাকি ৩০ শতাংশ বুথে ভোট পর্ব রেকর্ডিং করে রাখা হয়েছে। এইটুকু রাজ্যের জন্য ২৫০ কম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী পাঠানো হয়েছিল। এর সঙ্গে ছিল রাজ্যের ২০০ কম্পানি বাহিনী। কিন্তু কেন? ভোট দেওয়ার সময় মানুষ বারবার এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছে।

ত্রিপুরায় যে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসতে চলেছে, তা গত কয়েকটি নির্বাচনের ধারাবাহিক ফলাফল থেকেও অনেকটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে রাজ্যের ৫৯টি বিধানসভা কেন্দ্রেই বামফ্রন্ট ৬৫ শতাংশের ওপর ভোট পেয়েছিল। তা ছাড়া উপজাতি এলাকার এটিসি নির্বাচনে তারা ২৮টির মধ্যে ২৮টি আসনেই জয়ী হয়। পঞ্চায়েত ও পুর নির্বাচনেও তারা বেশির ভাগ আসনে ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছিল। এরপর গত কয়েক বছরে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি, যাতে এই বিপুল জনপ্রিয়তায় আঘাত লাগতে পারে।

 

লেখক : পশ্চিমবঙ্গের প্রবীণ সাংবাদিক

 


মন্তব্য