kalerkantho


পরিবেশ রক্ষা সূচকে আমরা কেন পিছিয়ে যাচ্ছি

ধরিত্রী সরকার সবুজ

২ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



পরিবেশ রক্ষা সূচকে আমরা কেন পিছিয়ে যাচ্ছি

পরিবেশ রক্ষায় বাংলাদেশকে যে আরো কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে, তা আবারও স্পষ্ট হয়েছে একটি গবেষণায়। যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল ও কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘এনভায়রনমেন্টাল পারফরম্যান্স ইনডেক্স (ইপিআই) ২০১৮’ শীর্ষক এক গবেষণায় পরিবেশ রক্ষা সূচকে বিশ্বে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান হয়েছে ১৭৯তম। এ তালিকায় বাংলাদেশের নিচে রয়েছে শুধু আফ্রিকার দেশ বুরুন্ডি। আশঙ্কাজনক হলো এ সূচকে প্রতিবারই বাংলাদেশ চলে যাচ্ছে নিচের দিকে। ২০১৪ সালে প্রকাশিত সূচকে ১৭৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৭৩তম এবং ২০১৬ সালের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৭৩তম। এবার সেটি এসে দাঁড়াল ১৭৯-তে। 

ইয়েল ও কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় মোট ১০টি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে ইপিআই সূচক তৈরি করে। বায়ুর মান, পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন, ক্ষতিকর ভারী ধাতু, জীববৈচিত্র্য ও বাসস্থান, বনায়ন, মৎস্যসম্পদ, জলবায়ু ও জ্বালানি, বায়ুদূষণ, পানিসম্পদ ও কৃষি। প্রতিটি বিষয়ের বিচার-বিশ্লেষণ শেষে প্রতিটি বিষয়ের ওপর নম্বর দেওয়া হয় এবং প্রাপ্ত নম্বরগুলো গড় করে তার ভিত্তিতেই কোনো দেশের স্থান নির্ধারণ করা হয়। এবারের তালিকায় বাংলাদেশের স্কোর হয়েছে ২৯.৫৬, যেখানে তালিকার একেবারে শীর্ষে থাকা সুইজারল্যান্ডের স্কোর হলো ৮৭.৪২। এর আগে ২০১৭ সালের ১০ ডিসেম্বর বিশ্বব্যাংক ‘বাংলাদেশ পরিবেশ সমীক্ষা ২০১৭’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। সে প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল বায়ু, পানি ও কর্মক্ষেত্রের পরিবেশদূষণ এবং শিশুদের ওপর ভারী ধাতু সিসার প্রভাবে বাংলাদেশে বছরে ক্ষতি হচ্ছে প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা। প্রতিবেদনটিতে বাংলাদেশের বায়ু, পানি ও মাটি দূষণ, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া, ঢাকার খালগুলো হারিয়ে যাওয়াসহ অন্যান্য দূষণের বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছিল।

২০১৭ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত যুক্তরাজ্যভিত্তিক বিখ্যাত চিকিৎসা সাময়িকী দ্য ল্যানসেটের একটি গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ২০১৫ সালে বিশ্বব্যাপী ৯০ লাখ মানুষ দূষণের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছে। দুই বছর ধরে চলা এই গবেষণায় পাওয়া গেছে যে দূষণজনিত মৃত্যুর ৯২ শতাংশই ঘটেছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। তবে এই গবেষণা প্রতিবেদনে আমাদের জন্য আশঙ্কার বিষয়টি হলো, তাদের তথ্য অনুসারে দূষণের কারণে মৃত্যুহার বিশ্বে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশে। আবার দূষণের কারণে মৃত্যুর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দায়ী বায়ুদূষণ এবং দ্বিতীয় অবস্থানে আছে পানিদূষণ। আমাদের পরিবেশ অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ঢাকার বাতাসে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর বস্তুকণা, ক্ষুদ্র বস্তুকণা ও ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বস্তুকণার পরিমাণ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

পরিবেশ আইন অনুযায়ী রাজধানীর বাতাসে ক্ষুদ্র বস্তুকণা বা ‘পিএম ২.৫’ এবং ‘পিএম ১০’ বা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বস্তুকণার মানমাত্রা যথাক্রমে প্রতি কিউবিক মিটারে ১৫ মাইক্রোগ্রাম ও ৫০ মাইক্রোগ্রাম। কিন্তু ঢাকার বাতাসে ২০১৫ সালে ‘পিএম ২.৫’-এর সারা বছরের গড় ছিল ৮১ মাইক্রোগ্রাম এবং ২০১৬ সালে ৭৬ মাইক্রোগ্রাম। ২০১৫ ও ২০১৬ সালে ‘পিএম ১০’-এর গড় পাওয়া গেছে যথাক্রমে ১৪৮ মাইক্রোগ্রাম ও ১৫৮ মাইক্রোগ্রাম।

২০১৬ সালে পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ প্রকল্পের আওতায় ঢাকার বায়ুদূষণের উৎস ও ধরন নিয়ে নরওয়ের ইনস্টিটিউট অব এয়ার রিসার্চ একটি জরিপ পরিচালনা করে। জরিপে দেখা যায়, নভেম্বর মাসে ঢাকার চারপাশে প্রায় এক হাজার ইটভাটা চালু হয়, যা বায়ুদূষণের জন্য ৫৮ শতাংশ দায়ী। অবকাঠামো নির্মাণ ও মেরামতের কাজও ধুলাদূষণের জন্য মারাত্মকভাবে দায়ী।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা হেলথ ইফেক্টস ইনস্টিটিউট এবং ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশনের ‘বৈশ্বিক বায়ু পরিস্থিতি ২০১৭’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে প্রতিবছর বাংলাদেশের এক লাখ ২২ হাজার ৪০০ জন মানুষের মৃত্যু হচ্ছে বায়ুদূষণের কারণে। ফলে সার্বিক বিবেচনায় বায়ুদূষণ রোধ করার জন্য আমাদের অতি দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। ইটভাটার দূষণ নিয়ন্ত্রণে সনাতন পদ্ধতির ইটভাটা বন্ধ করে প্রযুক্তিনির্ভর উন্নত ইটভাটা স্থাপনের ব্যবস্থা নেওয়া, অবকাঠামো নির্মাণ ও নির্মাণকাজে পরিবাহিত বালু, সিমেন্ট, ইট থেকে সৃষ্ট দূষণ কমানো এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহন রাস্তা থেকে উঠিয়ে নেওয়া খুব জরুরি।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকির মধ্যে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সব সময়ই আশঙ্কাজনক স্থানে। জার্মানভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা জার্মান ওয়াচ ১৯৯৭ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বিশ্বের ২০০টি দেশে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সংঘটিত দুর্যোগের সংখ্যা, মৃত্যু ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বিবেচনা করে ‘বৈশ্বিক জলবায়ু ঝুঁকি সূচক ২০১৮’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করে গত বছরের ৯ নভেম্বর। এই তালিকায় জলবায়ু ঝুঁকির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশ ষষ্ঠ অবস্থানে রয়েছে।

এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) ২০১৬ সালে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের বনাঞ্চলের ওপর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে বনাঞ্চলের পরিমাণে বাংলাদেশের অবস্থান নিচের দিক থেকে তৃতীয় অবস্থানে। প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে বনভূমি রয়েছে মোট আয়তনের ১১.২ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো একটি ভূখণ্ডে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ বজায় থাকার জন্য প্রয়োজন ২৫ শতাংশ বনভূমির। আমাদের দেশে বনভূমির পরিমাণ তার চেয়ে অনেক কম।

গত ৩০ থেকে ৪০ বছরে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সুন্দরবন এলাকায় বনভূমির বিস্তর ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতির তুলনায় বনভূমি বৃদ্ধি করার জোরালো পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি। সম্প্রতি রোহিঙ্গা অভিবাসী বাংলাদেশে প্রবেশ করায় টেকনাফ ও কক্সবাজারের পাহাড়ি বনভূমির যে ক্ষতিসাধিত হলো, তা আর কোনো দিন পূরণ হবে কি না সন্দেহ। বনভূমি ধ্বংস হওয়ার ফলে প্রাকৃতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে। ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, সাইক্লোন থেকে বনভূমি আগে যেভাবে জনপদ ও মানুষকে রক্ষা করত, সেটা এখন কম করতে পারবে। বাংলাদেশের প্রকৃতি, পরিবেশ ও আবহাওয়া গাছপালা ও বন সৃষ্টির জন্য উর্বর ভূমি। বনায়নের কার্যকর উদ্যোগ নিলে এ ক্ষেত্রে সফলতা পাওয়া আমাদের জন্য কঠিন নয়। এখন প্রয়োজন বায়ু, পানি, কৃষি, জীববৈচিত্র্য, বনাঞ্চল, জ্বালানি ও জলবায়ুর প্রতিটি বিষয়ে সঠিকভাবে গবেষণা করে প্রকৃত সমস্যা চিহ্নিত করা এবং প্রাপ্ত সমস্যাগুলো সমাধানের মাধ্যমে একটি সুস্থ, সুন্দর, বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করা।

লেখক : প্রকৌশলী, ইংল্যান্ডের গ্রিনিচ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এনভায়রনমেন্টাল কনজারভেশন বিষয়ে মাস্টার্স


মন্তব্য