kalerkantho


ভিন্নমত

শেয়ারবাজার পড়তে পারে উঠতে পারে—এটাই স্বাভাবিক

আবু আহমেদ

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



শেয়ারবাজার পড়তে পারে উঠতে পারে—এটাই স্বাভাবিক

প্রত্যেক দেশেরই শেয়ারবাজার পড়ে আর ওঠে। প্রত্যেক দেশেরই বিনিয়োগকারীরা খুশি হয় শেয়ারবাজার উঠলে, আর বেজার হয় পড়ে গেলে। বেশি পড়ে গেলে একটা আতঙ্ক যেন ছড়িয়ে পড়ে। যেদিন বেশি পড়ে যায় সেদিন অনেক শেয়ারের ক্রেতাই থাকে না। আবার অনেক আশাবাদের সৃষ্টি হলে দাম এত উঁচুতে যায় যে সেদিন যে কতেক শেয়ারের বিক্রেতাই  থাকে না। একদিন অনেক পড়ে গেলে লোকে ওই দিনকে বলে ব্ল্যাক মানডে, অথবা বৃহস্পতিবারে পড়লে বলে ব্ল্যাক থার্সডে (Black thursday)। এভাবে শেয়ারবাজারের মূল্যের উঠা-নামার ইতিহাসে অনেক ব্ল্যাক বা কালো দিবস এসেছে। সামনেও আসবে এটাই স্বাভাবিক। ৫ ফেব্রুয়ারি সোমবার নিউ ইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে এক দিনেই মূল্যসূচক পড়ে গেল ১২০০ পয়েন্টস। একপর্যায়ে অনেক শেয়ারের ক্রেতাই ছিল না। পরের দিনের অবস্থা নিয়েও অনেকে শঙ্কিত ছিল। পরের দিন মঙ্গলবারও বাজার খুলতে খুলতেই প্রথম পাঁচ মিনিটে ৫০০ পয়েন্টস পড়ে গেল।

পরের ১০ মিনিটে অবশ্য পতনটা অনেক কমে গিয়েছিল। কেন ওদের ওইখানে এমন হলো? তাদের ওইখানেও অধিকাংশ বিশ্লেষকের মনে হয়েছিল বাজারটা অনেক বেড়ে গেছে, তাদের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ট্যাক্স কমানোর মাধ্যমে যত প্রণোদনাই দেন না কেন, বাজার সর্বকালের সর্বোচ্চ চূড়ায় সেবার সূচক ডাও (DOW) ২৭০০০ পয়েন্টসে  টিকতে নাও পারে। তাই তাদের অনেকে এখন শেয়ার বেচে প্রফিট বুকিং দিতে শুরু করল, তখনই বড় পতন শুরু হয়ে গেল। নিউ ইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জ ১২০০ পয়েন্টস পড়ে যাবে, না আরো বেশি পড়তে পারত তা নির্ভর করছিল অধিকাংশ ইনভেস্টরস (Investors) কী ভাবে তার ওপর। অধিকাংশ যদি ভাবে যে পয়েন্টস অনেক বেড়ে গেছে, তাহলে মূল্যসূচক অনেক পড়ে যাবে। আর অধিকাংশ যদি মনে করে মূল্যসূচক আরো বাড়বে, তাহলে বাজার আরো বাড়বে। বাজার কোথায় যাবে, ওই নিয়ে তাদের ওখানে ও বিশ্বব্যাপী অনেক গবেষণাই হয়। অনেকেই আরো উঠবে ভেবে উঠতি বাজারেও কেনে। আবার অনেকে অনেক হয়েছে ভেবে উঠতি বাজারে শেয়ার বেচে। ব্ল্যাক মানডে, ব্ল্যাক ওয়েডনেসডে বিশ্বের অন্য বাজারেও এসেছে। কয়েক বছর আগে সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জেও একই ঘটনা ঘটেছে। একপর্যায়ে চীনা কর্তৃপক্ষ শেয়ার বেচার ওপর অনেক বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল। কিন্তু শেয়ারবাজার অনেক ওপরে ওঠে যখন অনেক পড়ে যায় তখন সব দেশের সমাজ ও অর্থনীতি একটা ঝাঁকুনি খায়। সরকার হতভম্ব না হলেও বিব্রতবোধ করে। যখন শেয়ারবাজার ওপরে উঠতে থাকে তখন সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে শুরু করে রেগুলেটর-বিশ্লেষক অনেকেই ক্রেডিট নিতে থাকে। আর অনেক পরে ব্ল্যাক মানডে বা ব্ল্যাক থার্সডে হলে তখন অনেকে কোনো ব্যাখ্যার পেছনে লুকাতে চায়। শুরু হয়ে যায় কারণ খোঁজা। অবশেষে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সরকার এগিয়ে আসে আশ্বস্ত করার বিশেষ প্রগ্রাম নিয়ে। কিন্তু ততক্ষণে অনেক বিনিয়োগকারী প্রায় নিঃস্ব হয়ে যায়। তাদের হা-হুতাশ শোনার জন্য কাউকে পাওয়া যায় না। কিন্তু লোকে বলতে থাকে শাস্তি তাদের প্রাপ্য, কারণ তারা অনেক লোভী ছিল! নিউ ইয়র্ক স্টক মার্কেট এক বছরের ব্যবধানে ৪০ শতাংশ বেড়ে সূচক ২৭০০০ ক্রস করেছিল। এটা যুক্তরাষ্ট্রের ধনী লোকদের কাছে অভাবনীয়  ছিল। তারা অকুণ্ঠ চিত্তে ট্রাম্পকে ধন্যবাদ দিচ্ছিল যে তাদের জন্য ট্রাম্প ধনের ম্যাসেঞ্জার হয়ে এসেছেন। ট্রাম্পও স্টক মার্কেটের উত্থানের জন্য অনেক ক্রেডিট নিচ্ছিলেন। সুযোগ পেলেই বলতে থাকতেন, দেখুন, স্টক মার্কেটে কী হচ্ছে। আমাদের সম্পদ প্রত্যহ কী গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেদিন যখন ১২০০ পয়েন্টস পড়ে গেল সংবাদকর্মীরা তাঁকে প্রশ্ন করল—এবার কী বলবেন, ট্রাম্প হেঁটে চলে গেলেন। সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী মেলানিয়া, কোনো কথা বলেননি। তবে ট্রাম্প জানেন যুক্তরাষ্ট্রে যারা ম্যাটার (matter) করে তারা তাঁর ওপর অনেক দিন খুশি থাকবে। কারণ তিনি যে কর হ্রাসনীতি গ্রহণ করেছেন তাতে যুক্তরাষ্ট্রের ধনীরা বেজায় খুশি। ট্রাম্প ব্যবসা প্রফিটের ওপর ট্যাক্স হার ৩৫ শতাংশ কমিয়ে ২১ শতাংশে স্থাপন করেছেন। আর দলের লোকেরা এই পদক্ষেপকে অতি সাহসের পদক্ষেপ বলেছে। বিরোধী ডেমোক্র্যাটরাও অতটা বিরোধিতা করেনি। বরং তাদের মধ্যে অনেকেই ট্রাম্পের ট্যাক্স-কাটকে নীরবে সমর্থন দিয়ে গেছে। একদিকে ট্রাম্প তাঁর আরেক বন্ধুকে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডের চেয়ারম্যান নিয়োগ দিয়েছেন, যিনি নিজেও একজন ধনী এবং স্টক মার্কেটের কট্টর সমর্থক। অন্যদিকে ট্রাম্পের ট্যাক্স-কাট নীতি যুক্তরাষ্ট্রের বড় ব্যবসাগুলোর বণ্টনযোগ্য আয়কে কয়েক গুণ বাড়িয়ে  দেবে। তাদের দেশে ট্যাক্স ফান্ডগুলোর বড় বিনিয়োগ থাকে স্টক মার্কেটে। তাই বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টিরাও এখন অনেক খুশি। ১২০০ পয়েন্টস পড়ে যাওয়া কোনো ক্রাশ বা ধস নয়। দেখতে হবে কত ওপর থেকে সেটা পড়েছে। এটাকে বলা যেতে পারে একক দিনের বড় বাজার সংশোধন। সর্বশেষ পর্যায়ে দেখছিলাম সূচক ফান্ড তখনো ২৪০০০-এর ওপরে আছে। ওই স্তরও অনেকের কাছে স্বপ্ন। যখন ১২০০ পয়েন্টস পড়ে গেল তখন অনেকেই কারণ খুঁজতে শুরু করল। সেই একই ব্যাখ্যা—একই উপদেশ। আপনারা আতঙ্কিত হয়ে শেয়ার বেচবেন না। আতঙ্কিত হওয়ার মতো কোনো কিছু ঘটেনি। একজন বিশ্লেষক বলছিলেন, কম্পানির মৌল ভিত দেখুন, ফান্ডামেন্টালসকে (Fundamentalং)  প্রাধান্য দিন।

এটা সত্যি, শেয়ারবাজারের মূল্যসূচক মৌল উপাদানগুলো দ্বারা সমর্থিত অবস্থান থেকে অনেক ওপরে চলে গেলে সেই শেয়ারবাজারকে পতনের হাত থেকে কেউ রক্ষা করতে পারে না। বিশ্বের যত শেয়ারবাজারে ধস নেমেছিল সেগুলোর ইতিহাস বলে ওইগুলো শুধুই বাড়ার প্রবণতায় ভুগতেছিল। একপর্যায়ে যখন পড়া শুরু হলো, তখন ক্রেতার অভাব দেখা দিল। শেয়ারবাজার একই দিন সবটা পড়ে না। এক দিন অনেক পড়ল তো পরের দিন বা পরের কয়েক দিন বাজার আবার হারানো সূচককে ফিরে পায়। তবে আগের চূড়ায় (চবধশ) পৌঁছতে পারে না। আবার দেখা গেল কয়েক দিন বিরতি দিয়ে সূচকের বড় পতন হয়ে গেল। প্রথম পড়ার পর অনেকেই শেয়ার কিনতে বলেছিল। কিন্তু যারা কিনতে বলেছিল, তারা ভুল প্রমাণ হয়েছে। বরং বলা চলে পতনের চক্রে শেয়ারবাজার বেশিই পড়ে যায়। শেয়ারবাজার পড়ে গেলে অধিকাংশ বিনিয়োগকারীকে অখুশি হতে দেখা যায়। এই ভাবনা তাদের ভুল। শেয়ারবাজার পড়ে বলেই আবার ওঠে। শেয়ারবাজার কখনো আসমান ছুঁতে পারে না। তবে একটা ব্যাপার সত্য, শেয়ারবাজার কারো কথামতো চলে না। হাজার হাজার লোক কী চিন্তা করছে, কী অবস্থান নিচ্ছে তার ওপর এর ওপর-নিচ নির্ভর করে। এ জন্যই বলা হয় শেয়ারবাজারের বটম (bottom) বা নিম্নতম স্তর বলতে কিছু নেই। আবার টপ (top) বলতেও কিছু নেই। তবে সর্বত্রই, সব সময়ই অর্থনীতির এবং কম্পানির ফান্ডামেন্টালস ম্যাটার (matters) করে। যারা ফান্ডামেন্টালস দেখে শেষ পর্যন্ত তারাই, স্টক শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীরা কোনো যুক্তি মানে না। তারা হলো irritionals আর শেয়ারবাজার যেহেতু কতগুলো irritional লোকের পারস্পরিক ইন্টার্যাকশন (interactions) সে জন্য এই বাজারও যুক্তিহীন বা irritional। আর এ জন্যই এই বাজার বিশ্বব্যাপী লাখ লাখ লোককে এর মধ্যে টেনে আনে। এরা যদি একবার জেতার জ্বরে ভুগতে থাকে তখন এদের থামায় কে! ওয়ারেন বাফেট বলেছেন, যে শেয়ার আপনি কিনে ১০ বছর রাখতে পারবেন না, সেই শেয়ার ১০ মিনিটও রাখা দরকার নেই। কিন্তু বাফেটের এই উপদেশ  শোনার লোক খুবই কম আছে শেয়ারবাজারে।

বাংলাদেশের শেয়ারবাজারটা অনেক ছোট। তবে এরও মূল্যসূচক পড়ে গেলে চারদিকে হৈচৈ পড়ে যায়। এই বাজারের দুটি বৈশিষ্ট্য আছে, যা অন্য পরিপক্ব শেয়ারবাজারে দেখা যায় না। সেটা হলো এই বাজারের সঙ্গে কথিত বিনিয়োগকারী হিসেবে যারা সম্পৃক্ত তাদের ৯০ শতাংশ ডে ট্রেডার্স (Day traders)। তারা তিন-চার দিনের জন্য শেয়ার কিনে। লাভ হলে হলো, না হলে লোকসান দিয়ে বেছে দেয়। অন্য বৈশিষ্ট্য হলো, এই বাজারে মৌল ভিত্তির শেয়ার খুবই কম আছে। ওচঙ-এর মাধ্যমে ফিবছর যেসব শেয়ার বাজারে আসছে সেগুলোর অধিকাংশই ঘুণেধরা। ওই সব শেয়ার দীর্ঘমেয়াদের জন্য ধরে রাখার কোনো উপযুক্ত বিনিয়োগ হাতিয়ার নয়। এই বাজারকে বড় করতে হলে এবং এই বাজারের ওপর মধ্যবিত্ত শ্রেণির আস্থাকে ধরে রাখতে হলে অবশ্যই ভালো শেয়ারের জোগান দিতে হবে। সে জন্যই এই লেখক সব সময়ই বলে আসছেন বছরে অন্তত একটা বহুজাতিক কম্পানিকে, নতুন একটা দেশি ভালো কম্পানিকে শেয়ারবাজারে আনুন, দেখবেন শেয়ারবাজারের ওপর সত্যিকার বিনিয়োগকারীদের আস্থা বেড়ে গেছে। অন্য কথা হলো, এই বাজারের ওপর আস্থা এবং এই বাজারের গভীরতা (depth) বাড়াতে হলে আরো অনেক দিন উচ্চমহল থেকে একটা policy support দিয়ে যেতে হবে। তালিকাভুক্ত কম্পানির মুনাফার ওপর ট্যাক্স হার কমানো এ ক্ষেত্রে একটা অন্যতম পলিসি সাপোর্ট।

 

লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়



মন্তব্য