kalerkantho

সাদাসিধে কথা

বই, বইয়ের মেলা

মুহম্মদ জাফর ইকবাল

৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



বই, বইয়ের মেলা

পৃথিবীতে যত রকমের মেলা হতে পারে তার মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর মেলা হচ্ছে বইমেলা। আমার ধারণা, পৃথিবীতে যত বইমেলা আছে তার মধ্যে সবচেয়ে মধুর বইমেলা হচ্ছে আমাদের ফেব্রুয়ারির বইমেলা। কোনো কিছু না করে বইমেলার এক কোনায় চুপচাপ বসে থেকে শুধু মেলার মানুষজন দেখে আমি আমার একটি জীবন কাটিয়ে দিতে পারব! মেলায় গুরুগম্ভীর বয়স্ক মানুষ যান, কম বয়সী তরুণ-তরুণী যায়, মা-বাবার হাত ধরে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা যায়, প্রত্যেকের ভাবভঙ্গি, চালচলন আলাদা। কেউ বই কেনে, কেউ বই দেখে আবার কেউ শুধু ঘুরে বেড়ায়। এই অতি চমৎকার বইমেলা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শুরু হয়েছে, আমি সিলেটে বসে আছি, লম্বা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অপেক্ষা করছি—কবে বইমেলায় যাব।

গতবার বইমেলায় গিয়ে অবশ্য আমার এক ধরনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়েছিল। বাচ্চাকাচ্চার জন্য বই লিখি বলে আমাকে একসময় প্রচুর অটোগ্রাফ দিতে হতো। কম বয়সী ছেলে-মেয়েরা বই নিয়ে ভিড় করে আসত। এখনো ভিড় করে আসে; কিন্তু তাদের হাতে এখন প্রায় সময়ই কোনো বই নেই, তার বদলে আছে একটা স্মার্টফোন! সেই ফোন দিয়ে তারা সেলফি তুলতে থাকে! সেলফি বা ছবি তোলার বিরুদ্ধে আমার কোনো অভিযোগ নেই; কিন্তু বইমেলায় বইয়ের ওপর অটোগ্রাফ না নিয়ে শুধু একটি সেলফি তুলে সন্তুষ্ট হয়ে চলে গেলে আমি একটু অস্বস্তি বোধ করি। এই সোশ্যাল নেটওয়ার্ক বা ফেসবুকের যুগেও আমি সাংঘাতিকভাবে বইপন্থী মানুষ। যতই দিন যাচ্ছে আমি ততই বেশি বিশ্বাস করতে শুরু করেছি যে একজন মানুষকে পরিপূর্ণ হতে হলে তাকে অবশ্যই বই পড়তে হবে।

আমার ধারণা, মানুষ আর পশুপাখির মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য হচ্ছে মানুষ বিমূর্ত চিন্তা করতে পারে, পশুপাখি পারে না। যত রকম বিমূর্ত চিন্তা আছে তার মধ্যে সবচেয়ে কার্যকর হচ্ছে বই পড়া। কাজেই কেউ যেন মনে না করে বই পড়াটি শুধু এক ধরনের বিনোদন, এটি তার থেকেও অনেক বড় একটি ব্যাপার। আমাদের একমাত্র সম্পদ হচ্ছে আমাদের মস্তিষ্ক। সেই মস্তিষ্কের সবচেয়ে বড় ব্যায়াম হতে পারে বই পড়া। মস্তিষ্ককে শাণিত করায় এর থেকে কার্যকর আর কিছু হতে পারে না। সোশ্যাল নেটওয়ার্ক-জাতীয় আপদের প্রবল আক্রমণের সামনে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ হতে পারে বই। তাই আমার মনে হয়, রীতিমতো যুদ্ধ করে হলেও আমাদের সবাইকে বইয়ের জগতে নিয়ে যেতে হবে। সে জন্য ফেব্রুয়ারির বইমেলা দেখে আমি এত উত্তেজিত হয়ে যাই।

২.

এবারের বইমেলায় আমার জন্য একটি অত্যন্ত চমকপ্রদ ব্যাপার ঘটেছে। সেটি হচ্ছে, সায়েন্স ফিকশন ক্যাটাগরিতে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার দেওয়া। দিন দশেক আগে আমি কলকাতায় গিয়েছিলাম। সেখানে খুব জাঁকজমক করে কলকাতা লিট ফেস্টিভাল হয়। সেখানে থেকে আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল পরাবাস্তব লেখার জন্য। মঞ্চে আমি শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের পাশে বসেছিলাম, সেটি আমার জন্য অনেক বড় একটি অভিজ্ঞতা। সেখানে আমার কাছ থেকে বাংলাদেশের সায়েন্স ফিকশন লেখালেখি নিয়ে জানত চেয়েছিল। আমি অনেক জোর গলায় বলে এসেছি, বাংলাদেশের পাঠক নিশ্চয়ই সায়েন্স ফিকশন পড়ত খুব পছন্দ করে। কারণ আমাদের দেশে অনেক সায়েন্স ফিকশন লেখক। শুধু তা-ই নয়, তাঁরা একটি সোসাইটি করেছেন এবং বইমেলায় তাঁরা শোভাযাত্রা করে গিয়ে দল বেঁধে একসঙ্গে সায়েন্স ফিকশন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন।

তবে কলকাতার মানুষকে যেটি বলিনি, সেটি হচ্ছে দেশের সাহিত্যের মূলধারার মানুষেরা সায়েন্স ফিকশনকে গুরুত্ব দিয়ে দেখে না। সবাই ধরেই নেয় সাহিত্যের কিছু সম্ভ্রান্ত এলাকা আছে, যাঁরা সেই এলাকায় ঘোরাঘুরি করতে পারেন তাঁরাই প্রকৃত সাহিত্যিক। অন্যরা লেখক, দলিল লেখক কিংবা সায়েন্স ফিকশন লেখকের মধ্যে বড় কোনো পার্থক্য নেই। আজকাল অনেক রকম সাহিত্য পুরস্কার দেওয়া হয়। প্রায় সব ক্ষেত্রেই একজন প্রবীণ ও একজন নবীন লেখক নেওয়া হয়। নবীন লেখকদের বেলায় কখনো একজন সায়েন্স ফিকশন লেখককে বেছে নিতে দেখিনি। যদিও অনেকেই আছেন, যাঁরা খুব চমৎকার লেখেন।

এ রকম একটি অবস্থায় যদি হঠাৎ করে আবিষ্কার করি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি পুরস্কার সায়েন্স ফিকশন ক্যাটাগরিতে দেওয়া হয়েছে, তাহলে অবশ্যই আনন্দিত হওয়ার কারণ আছে। মনে হচ্ছে, সাহিত্যের জগিট কাঁটাতার দিয়ে ঘিরে রাখা ছিল, শুধু সম্ভ্রান্ত কিছু মানুষ সেখানে যেতে পারতেন, হঠাৎ করে কাঁটাতার তুলে দিয়ে সেখানে অন্যদেরও ঢুকতে দেওয়া হয়েছে। সায়েন্স ফিকশন লেখক ঢুকেছেন, তাঁর পিছু পিছু ভৌতিক গল্প লেখকরা ঢুকে যাবেন, তাঁদের পিছু পিছু রহস্য উপন্যাসের লেখক এবং সবার শেষে শিশু সাহিত্যিকরা।

এই বছর সায়েন্স ফিকশনের জন্য পুরস্কার পেয়েছেন মোশতাক আহমেদ, তাঁকে আমি অনেক দিন থেকে চিনি। চেনা মানুষ পুরস্কার পেলে আনন্দ বেশি হয়। বেশ কয়েক বছর আগে তিনি মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে রাজারবাগ পুলিশ লাইনের পুলিশদের অবদান নিয়ে একটি বই লিখেছিলেন, বইটির নাম ‘নক্ষত্রের রাজারবাগ’। মোশতাক আহমেদ আমাকে অনুরোধ করেছিলেন বইটির মোড়ক উন্মোচন করে দিতে এবং আমি আনন্দের সঙ্গে রাজি হয়েছিলাম। কোনো একটি কারণে নির্দিষ্ট সময়ে মোশতাক আহমেদ জরুরি কাজে আটকা পড়ে গেলেন এবং বইটির মোড়ক উন্মোচন করা হলো না। আমি সেদিনই ঢাকা থেকে সিলেটে চলে এসেছি।

 

পরদিন ভোরে আমি অফিসে গিয়েছি, গিয়ে দেখি মোশতাক আহমেদ আমার অফিসের সামনে অপেক্ষা করছেন, তাঁর হাতে রঙিন কাগজে মোড়ানো একটি বই। আমাকে বললেন, বইটির মোড়ক উন্মোচন করানোর জন্য তিনি রাতের ট্রেনে ঢাকা থেকে সিলেটে চলে এসেছেন। তিনি ঠিক করেছিলেন আমাকে দিয়ে মোড়ক উন্মোচন করাবেন। কাজেই সেটি তিনি করে ছাড়বেন। আমি সব সময়ই দেখে এসেছি মোড়ক উন্মোচন করা হয় দশজনের সামনে, রীতিমতো একটি আনন্দঘন অনুষ্ঠান। কিন্তু ‘নক্ষত্রের রাজারবাগ’-এর মোড়ক উন্মোচনটি হলো আমার অফিসে। আমি আর মোশতাক আহমেদ ছাড়া কেউ নেই। আমি মোড়কটি উন্মোচন করলাম, তিনি আমার হাতে বইটি তুলে দিয়ে তক্ষুনি ছুটলেন ঢাকায়। আমার জীবনে এর চেয়ে বিচিত্র মোড়ক উন্মোচন আর কখনো হয়নি, মনে হয় আর কখনো হবে না। ২০১২ সালে বইটি যখন কালি ও কলম সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছিল তখন আমার  চেয়ে বেশি খুশি মনে হয় আর কেউ হয়নি।

৩.

আমি প্রতিবছরই ভাবি, বইমেলার আগে আমি কয়েকজন নতুন লেখকের বই নিয়ে কিছু লিখব; কিন্তু কখনো সেটি ঠিক করে করতে পারিনি। এই বছরেও সেটি করা হলো না। কারণ মেলার আগে নতুন লেখকের বইগুলো খুঁজে পড়তে পারিনি। বইটি পড়া হয়নি; কিন্তু বইমেলায় গিয়ে যে বইটি কিনব বলে ঠিক করে রেখেছি সেই বইটি নিয়ে দু-একটি লাইন অন্তত লিখি।

দুই বছর আগে একজন মা আমাকে একটি ই-মেইল পাঠিয়েছিল। তার শিশুসন্তানটি কোনো একটি রক্তজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। অপ্রতিরোধ্য শোকে দিশাহারা হয়ে সেই মা শিশুটির শেষ কয়েকটি দিনের কথা লিখে আমাকে অনুরোধ করেছিল, যদি সম্ভব হয় তাহলে আমি যেন এই ধরনের শিশুদের নিয়ে কিছু একটা লিখি। একজন লেখক যখন কোনো গল্প বা উপন্যাস লেখেন, সেটি পড়ে অনেক সময়ই আমরা ব্যাকুল হয়ে যাই, কখনো কখনো সেই কাল্পনিক চরিত্রের দুঃখ-কষ্টে আমাদের চোখে পানি চলে আসে। কিন্তু বই পড়া শেষ হলে আমরা চোখ মুছে হাসিমুখে নিজের কাজে ফিরে যাই। কারণ আমরা জানি, আমাদের দুঃখটি সত্যিকারের দুঃখ নয়, কারণ চরিত্রগুলো কাল্পনিক।

কিন্তু একজন মা যখন তার শিশুসন্তানের জীবনের শেষ মুহূর্তের ঘটনাগুলো গভীর মমতা দিয়ে লিখে পাঠায়, সেটি পড়ে চোখ মুছে আবার হাসিমুখে নিজের কাজে ফিরে যাওয়া যায় না। কারণ চরিত্রগুলো কাল্পনিক নয়, তারা সত্যি। বুকের ভেতর কোথায় জানি ব্যথা টনটন করতে থাকে।

আমি এ রকম মৃত্যুপথযাত্রী কিন্তু প্রাণোচ্ছল হাসি-খুশি একটি শিশুকে নিয়ে লিখতে পারব বলে মনে হয় না। তাই আমি ভাবছিলাম ওই মাকে চিঠি লিখে বলব, ‘তোমার এই অচিন্ত্যনীয় কষ্টের কথাটুকু তুমি নিজেই কষ্ট করে লেখো। তোমার মতো অন্য যারা আছে তারা হয়তো তোমার লেখাটি থেকেই সান্ত্বনা পাবে।’ আমি তার সঙ্গে যোগাযোগ করার আগেই সেই কম বয়সী মা আমাকে লিখে জানাল, সে বুকে পাথর বেঁধে কাহিনিটি লিখেছে। সে একা নয়, তার মতো আরো যারা দুর্ভাগা মা রয়েছে তারাও লিখেছে। এই বইটি দিয়ে তারা এ রকম অসহায় মায়েদের মধ্যে একটি যোগসূত্র তৈরি করতে চাইছে, যেন শেষ মুহূর্তে তাদের সন্তানরা সত্যিকার চিকিৎসা পেতে পারে, সম্ভব হলে শিশুটিকে বাঁচিয়ে তুলতে পারে।

বইমেলায় গিয়ে আমি বইটি কিনব। বইটির নাম ‘ওরা নেই ওরা আছে’। শোকাতুর মায়ের নাম সায়মা সাফিক সুমী। প্রকাশকের নাম সখী প্রকাশন।

৪.

এই বছর বইমেলায় গিয়ে আমি আরো একটি বই সংগ্রহ করব; কিন্তু আমি মোটামুটিভাবে নিশ্চিত সেই বইটি আমি নেড়েচেড়ে দেখব, চোখ বোলাব কিন্তু পড়ার সাহস পাব না। বইটির নাম ‘বীরাঙ্গনা রচনা সমগ্র’, লেখিকার নাম সুরমা জাহিদ, প্রকাশকের নাম অন্বেষা। সুরমা জাহিদ এবার মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক লেখার জন্য বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন। এর চেয়ে যথার্থ পুরস্কার আর কিছু হতে পারে কি না আমার জানা নেই।

সুরমা জাহিদের জন্ম ১৯৭০ সালে। একাত্তরে তিনি একজন অবোধ শিশু ছিলেন। এর পরও একাত্তর সালের বীরাঙ্গনাদের জন্য তাঁর ভেতরে এক ধরনের গভীর মমতা রয়েছে। সেই মমতা ও ভালোবাসায় তিনি বীরাঙ্গনাদের নিয়ে সাতটি বই লিখেছেন। সেই বইগুলোকে সংকলিত করে ৫৫টি ভিন্ন ভিন্ন জেলার মোট ৩৬১ জন বীরাঙ্গনাকে নিয়ে ‘বীরাঙ্গনা রচনা সমগ্র’ বইটি দাঁড় করেছেন। একদিকে মানুষের নিষ্ঠুরতার, অন্যদিকে নারীদের দুঃখ-কষ্ট ও বেদনার ইতিহাসের এর চেয়ে বড় কোনো দলিল আছে বলে আমার জানা নেই।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি মুক্তিযুদ্ধ কর্নার আছে। সেখানে আমরা সুরমা জাহিদের বীরাঙ্গনাদের ওপর লেখা বইগুলো সংগ্রহ করেছিলাম। মুক্তিযুদ্ধের যেকোনো ইতিহাস আমি খুব আগ্রহ নিয়ে পড়ি; কিন্তু এর পরও সুরমা জাহিদের লেখা এই বইগুলো আমি পড়তে পারি না। বুকের ভেতর এক ধরনের রক্তক্ষরণ হয়।

এর পরও আমি হৃদয়ের রক্তক্ষরণের এই বইটি বইমেলা থেকে সংগ্রহ করব।

৫.

বইমেলা নিয়ে লিখতে গিয়ে আমি এবার সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বিষয় নিয়ে লিখি। সেটি হচ্ছে নতুন লেখক ও তাঁদের প্রকাশিত বই।

আমি মোটেও জানতাম না যে আমাদের বইমেলায় নতুন লেখকরা যে বই প্রকাশ করেন, সেই বইগুলো তাঁরা নিজেদের পকেটের টাকা দিয়ে ছাপান। বিষয়টি জানার পর আমি প্রকাশকদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাঁরা আমাকে জানিয়েছেন, বইমেলায় প্রকাশিত ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ বই নাকি এ রকম নিজের পকেটের টাকায় ছাপানো বই। অন্যরা বলেছেন, সংখ্যাটি নাকি আরো বড়।

যদি একজন লেখক নিজের পকেটের টাকা দিয়ে কোনো একজন প্রকাশককে দিয়ে তাঁর বই বের করেন, তাহলে সেই প্রকাশককে ‘প্রকাশক’ বলা যাবে না। তাঁকে ‘মুদ্রক’ বা এই ধরনের কিছু বলতে হবে। প্রকাশক তিনি, যিনি কোনো একজন লেখক-গবেষকের কাজটুকু নিজের দায়িত্বে পাঠকদের সামনে তুলে ধরবেন। সেই কাজটুকু করার জন্য তাঁর যদি অর্থের প্রয়োজন হয়, সেই অর্থটুকু প্রকাশকের নিজের জোগাড় করতে হবে। যদি প্রকাশকের সেই অর্থ না থাকে, তাহলে বুঝতে হবে প্রকাশনার বিষয়টি তাঁর জন্য নয়, তাঁকে অন্য কোনো কাজ খুঁজে নিতে হবে।

ঠিক একইভাবে নতুন লেখকের জন্যও বলতে হবে, যদি কোনো লেখক নিজের পকেটের টাকা দিয়ে একটি বই প্রকাশ করে থাকেন, তাহলে বুঝতে হবে তাঁর বইটি এখনো প্রকাশের উপযোগী হয়ে ওঠেনি। কেউ যদি সত্যি সত্যি লেখালেখি করতে চান, তাহলে তাঁকে কোনোভাবেই নিজের টাকা দিয়ে বই প্রকাশ করা চলবে না। এটি এক ধরনের অসম্মান। একজন সত্যিকারের লেখক কোনোভাবেই নিজেকে অসম্মানিত করতে পারেন না।

নতুন লেখকদের সব সময়ই বলতে শোনা যায়, তাঁরা নতুন লেখক বলে কেউ তাঁদের লেখা ছাপতে চান না।  অভিযোগটি অনেক পুরনো। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সেটি মানতে রাজি ছিলেন না। তাঁর বন্ধুদের বলেছিলেন, অভিযোগটি সত্যি নয়, ভালো লেখা হলেই ছাপা হবে। শুধু তা-ই নয়, বন্ধুদের সঙ্গে বাজি ধরে একেবারেই অপরিচিত নতুন লেখক হিসেবে তিনি ‘অতসী মামী’ নামে একটি গল্প লিখে সেই সময়কার সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত ম্যাগাজিনে ছাপিয়েছিলেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো উদাহরণ আমাদের দেশেও অনেক আছে। সবচেয়ে বড় কথা—এখন যাঁরা প্রতিষ্ঠিত লেখক তাঁরা সবাই একসময় নতুন লেখক ছিলেন, অপরিচিত লেখক ছিলেন। কাজেই নতুন লেখককে কেউ গুরুত্ব দেন না, সেই অভিযোগ আমি শুনতে রাজি নই।

এখন ইন্টারনেট ও ব্লগ আছে। কাজেই নতুন লেখকরা সেখানে লেখালেখি করতে পারেন। সেখানে বুঝতে পারবেন তাঁর লেখালেখি কতটুকু মানসম্মত হয়েছে। যদি লেখক হিসেবে তাঁর একটি পরিচিতি হয়, তখন প্রকাশকরা আনন্দের সঙ্গে তাঁর বই ছাপতে রাজি হবেন।

আমি মনে করি, প্রতিষ্ঠিত লেখক, বিভিন্ন পত্রপত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক—তাঁদেরও একটি দায়িত্ব আছে। তাঁদের সব সময় ভালো তরুণ লেখকের খোঁজ করতে হবে। যদি কাউকে খুঁজে পান তাঁকে দশজনের সামনে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। বইমেলার আগেই যদি কাজটি করা যেত, তাহলে আরো ভালো হতো। নতুন ভালো লেখকরা অনুপ্রেরণা পেতেন, উৎসাহ পেতেন।

আমাদের এত সুন্দর একটি বইমেলা, সেটি শুধু বই ছাপানোর মাঝে আটকে থাকবে, তা তো হতে পারে না। পাঠক, প্রকাশক, লেখক মিলে বইমেলার সত্যিকারের যে উদ্দেশ্য সেটিকেও তো সত্যি করে তুলতে হবে।

 

লেখক : অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও

প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট


মন্তব্য