kalerkantho


রোহিঙ্গা: শৈশব যখন নির্বাসিত

ফরিদুর রহমান

১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



রোহিঙ্গা: শৈশব যখন নির্বাসিত

মিয়ানমারের সেনাবাহিনী গত বছরের ২৫ অগাস্ট দক্ষিণ রাখাইন রাজ্যে ‘জাতিগত শুদ্ধি অভিযান’ শুরু করার পরে সাড়ে চার মাসে সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। ইউনিসেফের হিসাব অনুসারে এই বিপুলসংখ্যক উদ্বাস্তু উন্মূল মানুষের ৬০ শতাংশই শিশু। শিশুদের বেশির ভাগ তাদের পরিবারের সঙ্গে দেশ ছেড়ে এসেছে। তবে সেনাবাহিনীর গুলি ও বোমাবর্ষণ এবং নির্যাতনে নিহত পরিবারের পিতৃ-মাতৃহীন শিশুর সংখ্যাও নেহাত কম নয়।   

নির্বাসিত শিশুদের অবস্থা নিজের চোখে দেখার জন্য আমরা কয়েকজন কক্সবাজারের উখিয়ার কাছাকাছি দুটি আশ্রয়শিবির পরিদর্শন করে এসেছি। অনেকটা দূরের পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছার ফলে হাতে সময় ছিল খুবই কম। ফলে গভীর অনুসন্ধানের পরিবর্তে দৈবচয়নের মতো ১০ থেকে ১৫ বছর বয়সের কয়েকজন শিশু-কিশোরের সঙ্গে কথা বলে তারা কেন নিজের দেশ এবং ভিটামাটি ছেড়ে পরবাসীর জীবন বেছে নিয়েছে, তা বুঝতে চেষ্টা করেছি।

প্রথমেই ১৩ বছর বয়সের যে কিশোরীর সঙ্গে কথা বলেছি তার নাম ধরা যাক কামরুন নাহার। ছোট ভাইকে কোলে নিয়ে তিন দিন তিন রাতের পথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশ সীমান্ত অতিক্রম করেছে ওদের পরিবার। সেনাবাহিনী ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে, সঙ্গে পুড়ে গেছে গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগিসহ সব সহায়সম্পদ। পুড়িয়ে দিয়েছে স্থানীয় মসজিদ, মাদরাসা এবং স্কুল। গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন কামরুন নাহারের এক চাচা ও চাচাতো ভাই। তাঁদের মৃতদেহ কবরস্থ করারও সময় পাওয়া যায়নি।

১৫ বছর বয়সের কিশোর অহিদুল আলম ভয়ংকর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে হেঁটে পাহাড় ও জঙ্গলের পথ পাড়ি দিয়ে শেষ পর্যন্ত নদী পার হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। রকেটলঞ্চার ছুড়ে গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়ার সময় অহিদুলের বড় ভাই এবং এক ফুফা নিহত হয়েছেন। তার নানি আগুনে পুড়ে বড় কষ্ট পেয়ে মারা গেছেন। তাদের পুরো পরিবারকে একটি ঘরে আটকে রেখে তালা বন্ধ করে দিয়েছিল বার্মিজ সেনারা। অহিদুলদের ধারণা, ওদের জীবন্ত পুড়িয়ে মারার পরিকল্পনা ছিল তাদের। কিন্তু দরজার তালা ভেঙে রাতের অন্ধকারে তারা বেরিয়ে পড়েছিল, লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশ সীমান্ত। অশ্রুসজল চোখে একমাত্র বড় ভাইয়ের মৃত্যুর কথা বলার সময় সে জানিয়েছে, মিয়ানমার সরকারের অত্যাচার নিপীড়নের সব কথা সে মনের মধ্যে গেঁথে রেখেছে।

নূর-ই-জান্নাতের কোনো ভাই নেই। মিয়ানমারের সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম বাবাকে হারিয়ে দুই বোন, দাদি এবং মাকে সঙ্গে নিয়ে অনিশ্চয়তার পথে পা বাড়িয়েছিল নূর-ই-জান্নাত। সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী নূর-ই-জান্নাতদের দেশে অনেক কিছুই ছিল। ঘরবাড়ি, জায়গা-জমি এবং হাঁস-মুরগি নিয়ে একটি সম্পন্ন পরিবারের মেয়ে সবকিছু হারিয়ে যে জীবন অতিবাহিত করছে সেই জীবনের দুঃখ-কষ্টের কথা বলার সময় তার চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছিল অবিরল ধারায়। 

তৌফিক হোসেনের বাবা গ্রামের চেয়ারম্যান আলী হোসেনকে মিয়ানমার সরকার রাষ্ট্রদ্রোহ হিসেবে ১৩ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে। মা ও ভাই-বোনদের নিয়ে বাংলাদেশে এসেছে তৌফিক। বিকেলের দিকে আমরা যে শিবিরে গিয়েছি সেখানকার অনুপ্রবেশকারী সবাই হিন্দু। অর্থাৎ হিন্দু-মুসলিম নয়, পুরো রাখাইন রাজ্য থেকে সব ধর্মসম্প্রদায় জনগোষ্ঠীর মানুষকে উত্খাত করার একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়েই এগিয়েছে অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন জেনারেল মং মং সোর বাহিনী।

আশ্রয়শিবিরে ১৪ বছর বয়সী যতন পালের পরিধেয় বস্ত্র দেখেই মনে হয়েছিল সে কোনো নিকটজনের মৃত্যুতে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করছে। জিজ্ঞেস করে জানা গেছে, তার বাবা এবং কাকাসহ ১১ জনকে সেনাবাহিনীর লোকেরা ধরে নিয়ে যায়। তাদের মধ্যে ৯ জন ফিরে এলেও শেষ পর্যন্ত তার বাবা এবং কাকা আর ফিরে আসেননি। একই শিবিরে ১০-১১ বছর বয়সের মেয়ে কৃষ্ণা শীল তার আশ্রিত জীবনের কথা এমন চমৎকারভাবে তুলে ধরেছে যে শুনে বিস্মিত হতে হয়। এখানে তাদের জীবনের নিরাপত্তা আছে, চাল, ডাল, আলু এবং তেলসহ খাবারদাবার এমনকি হাঁড়ি-পাতিলও পেয়েছে তারা। কিন্তু এই ছোট্ট মানুষটির ঘুমানোর জায়গা বড় ছোট। রাতে শীত করে আর লম্বা হয়ে ঘুমাতে চাইলে পা মাটিতে চলে যায়। বন্ধুবান্ধব এবং নিকটাত্মীয়রা কেউই এখানে নেই, তারা কাছে থাকলে মনের জোর থাকত এবং আরো সাহসের সঙ্গে এখানেই থাকা যেত বলে কৃষ্ণার ধারণা। 

সম্প্রতি বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারের আশ্রিতদের দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে জাতীয় আন্তর্জাতিক উদ্যোগ ও আলোচনার পরে প্রত্যাবর্তন সম্পর্কিত চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে। আমরা শিশু-কিশোরদের কাছে দেশে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছার কথা জানতে চেয়েছিলাম। কামরুন নাহার বলেছে, তাদের নিরাপত্তা দিয়ে সম্মানের সঙ্গে দেশে ফিরিয়ে নিলেই তারা যেতে পারে। অহিদুল আলম মিয়ানমার সরকারের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ ও নিরাপদ জীবনের নিশ্চয়তা চেয়েছে। নূর-ই-জান্নাত বলেছে, কোন ভরসায় তারা সেখানে ফিরে যাবে! তৌফিক বলেছে, দেশের জন্য এবং কারাবন্দি বাবার জন্য সব সময়ই তার মন খারাপ থাকে। কিন্তু রোহিঙ্গা হিসেবে স্বীকৃতি না দিলে সে দেশে ফিরতে চায় না।

ফিরে যাওয়ার কথা জানতে চাইলে যতন পাল জানায়, মংডুর মতো কোনো শহরে সরকার যদি হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের জীবনের নিশ্চয়তা দিতে পারে শুধু তাহলেই ফিরে যাবে। নিজের গ্রামে তারা ফিরে যেতে চায় না। মিয়ানমারের বলিবাজারে হারিয়ে যাওয়া বাবার জন্য অপেক্ষা করছে কৃষ্ণা। তার বিশ্বাস বাবা মরতেই পারে না, সে নিশ্চয়ই ফিরে আসবে এবং তার পরেই তারা ঠিক করবে কোথায় যাবে!

আমাদেরও বিশ্বাস, কৃষ্ণার বাবা ফিরে আসবেন এবং শিশুদের সবাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাদের নিজের বাড়িতে, স্কুলে ও খেলার মাঠে তাদের শৈশবের কাছে ফিরে যাবে।

লেখক : সাবেক উপমহাপরিচালক (অনুষ্ঠান) বাংলাদেশ টেলিভিশন

farid.btv@gmail.com


মন্তব্য