kalerkantho


সাদাকালো

বিরাজমান সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে একুশে

আহমদ রফিক

১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



বিরাজমান সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে একুশে

আজ পয়লা ফেব্রুয়ারি। শুরু হলো ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি। মহানগর ঢাকা এ মাসে নান্দনিক তৎপরতার প্রকাশ ঘটায় মহাসমারোহে। আলোচনাসভা, প্রবন্ধ পাঠ, গান এমনকি নাট্যাভিনয়ে মেতে ওঠে ঢাকা, মেতে থাকে মাতৃভাষা ও ভাষিক সংস্কৃতি বন্দনায়। বাদ যায় না শহরগুলো। শহীদ দিবস, শহীদ মিনার শব্দগুলো চেতনায় প্রাধান্য পায়। ‘একুশে’ শব্দটি সব কিছুর মধ্যমণি হয়ে ওঠে।

ঢাকায় এ সমারোহের কেন্দ্রবিন্দু বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সংলগ্ন শহীদ সোহরাওয়ার্দী উদ্যান (সাবেক রেসকোর্স ময়দান)। একাডেমি প্রাঙ্গণে নির্মিত বিশাল প্যান্ডেলে চলে ‘মহান একুশের অনুষ্ঠানমালা’, অর্থাৎ সেমিনার ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, যেখানে নানা ঘরানার সংগীতই প্রধান উপভোগ্য বিষয়।

তবে ঢাকাবাসী মানুষের জন্য বয়স নির্বিশেষে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ একুশের বইমেলা। লেখক-প্রকাশক-পাঠকক্রেতা—এই তিনে মিলে জমজমাট বইমেলা। এর প্রস্তুতি শুরু দীর্ঘ সময় ধরে, তবে শেষ দুই মাস অর্থাৎ ডিসেম্বর-জানুয়ারি ছাপাখানা, বাঁধাইখানা এবং লেখক-প্রকাশকদের চরম ব্যস্ততায় কাটে।

বইমেলা ও অনুষ্ঠানমালা জাতীয় ঐতিহ্যের মর্যাদা পেয়ে গেছে। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি নিয়ে মূল অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি ও কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি দীর্ঘদিন থেকে জাতীয় কবিতা উৎসব পশ্চিমবঙ্গের কবিদের নিয়মিত জড়ো করেছে কবিতাবিষয়ক অনুষ্ঠানে। আর সম্প্রতি এতে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসব, যার সংক্ষিপ্ত নাম আধুনিক কেতায় ‘লিট ফেস্ট’। নেপথ্য-প্রেরণা সম্ভবত ইউনেসকো স্বীকৃত ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ একুশে ফেব্রুয়ারি তথা শহীদ দিবস। সাংস্কৃতিক কলকাতা এসবের মুগ্ধ সমর্থক।

দুই.

জাতীয় চরিত্রের এই যে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানিকতা, এর সূচনা অবশ্য ১৯৫৩ সাল থেকে শহীদ দিবস একুশে পালন উপলক্ষে পাকিস্তানি শাসনামলে। একুশের প্রভাবে পূর্ববঙ্গীয় সাহিত্য-সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক অঙ্গনে বাঁকফেরা গুণগত চরিত্র বদলের ঘটনাটি বহু-আলোচিত বিষয়। একুশের প্রভাতফেরি, মিছিল, জনসভা, একুশের স্মরণিকা প্রকাশ প্রভৃতির মধ্য দিয়ে বর্তমান আনুষ্ঠানিকতায় পৌঁছান এক চমকপ্রদ ঐতিহাসিক ঘটনা। সেই সঙ্গে বটতলায় বসে বই বিক্রির প্রচেষ্টা আজকের বিশাল বইমেলায় পরিণত। সে এক ইতিহাস। বলতে হয়, ঢাকার জীবনে, জাতীয় জীবনে এক অবিশ্বাস্য ইতিহাস।

এসব কিছুর মূল উৎস ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির প্রতিবাদী ভাষা আন্দোলন, প্রশাসন প্রবর্তিত ১৪৪ ধারা ভেঙে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার প্রতিষ্ঠার জন্য রক্তদান, পুলিশের গুলিতে শহীদ ছাত্র-অছাত্রদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে ইতিহাস তৈরি। একুশে ফেব্রুয়ারি হয়ে ওঠে শহীদ দিবস, শোক দিবস, প্রতিবাদ দিবস, সেই সঙ্গে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দিবস।

একুশের মূল স্লোগান ছিল ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, রাজবন্দিদের মুক্তি চাই’, ‘সর্বস্তরে বাংলা চালু করো’। সেই সঙ্গে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ স্লোগান বাইশে ফেব্রুয়ারি (১৯৫২) থেকে ‘শহীদ স্মৃতি অমর হোক’। সে স্লোগানের ভিত্তিতে প্রাথমিক পর্বে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ এবং তা ঢাকাসহ একাধিক জেলা শহরে। সেই প্রেরণায় পরবর্তীকালে ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নির্মাণ, যা এখন সব সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু।

সংক্ষিপ্ত এ ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার বাধ্য হয়েছিল ১৯৫৬ সালে তাদের প্রথম সংবিধান প্রণয়ন উপলক্ষে উর্দুর সঙ্গে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিতে। কিন্তু ঔপনিবেশিক রাজভাষা ইংরেজির এমনই মহিমা যে পাকিস্তানের শাসনযন্ত্র শর্ত রাখে যে পরবর্তী ২০ বছর রাষ্ট্রের সব কাজে ইংরেজিই বহাল থাকবে।

কিন্তু পূর্ববঙ্গীয় বাঙালির ভাষা চেতনা ও জাতীয়তাবাদী চেতনার আবেগ ষাটের দশকে এতটা শক্তিমান হয়ে ওঠে যে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি অস্বীকৃত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টির ফয়সালা হয় পাকিস্তানি সামরিক শাসনের বাঙালির ওপর চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধে, একাত্তরের রণাঙ্গনে। সে যুদ্ধের পরিণামে ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়।

১৯৭২, স্বাধীন বাংলাদেশে ভাষা চেতনা ও জাতীয় চেতনা নিয়ে সেকি আবেগ! প্রবল স্রোতের মতো তা পূর্ববঙ্গীয় বাঙালিসমাজকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। বাঙালিয়ানার সে আবেগ থেকে মুক্ত ছিল না বামপন্থী রাজনীতির বড়সড় অংশ। সংক্ষেপে এ আবেগের সাংস্কৃতিক পরিচয় চিহ্নিত হয় একুশের চেতনা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হিসেবে।

তবে দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা হলো এ আবেগ তার রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক চরিত্র বজায় রাখতে পারেনি স্বাধীন বাংলাদেশে, ১৯৭২ সালে একটি সেক্যুলার সংবিধান প্রণয়ন করা সত্ত্বেও। পারেনি রাজনৈতিক নৈরাজ্যের কারণে, শাসনতান্ত্রিক চরিত্র বদলের কারণে। এ চরিত্র বদল প্রথম সংবিধানকে খর্ব করে, তার সেক্যুলার ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের মাথা কাটতে সাহায্য করে।

বাংলাদেশের দুই জেনারেল এ অঘটন ঘটায় তাদের শাসনামলে। ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা পাকিস্তানি প্রেরণায় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। অথবা ওই পূর্বচেতনার পূর্ণাঙ্গ শুদ্ধি ঘটেনি বলে ভিন্ন পরিবেশের প্রভাবে এর আবির্ভাব। সংবিধানের মাথায় চাপে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। সেক্যুলার রাজনীতির দুর্ভাগ্যজনক পরাজয়। এর বিরুদ্ধে শক্তিমান আন্দোলন গড়ে ওঠেনি। একুশের নায়ক ছাত্র-যুবসমাজও এ বিষয়ে নিরুত্তাপ ভূমিকা পালন করে চলেছে। ব্যতিক্রমীরা দুর্বল।

তাই একুশের ভুবনে যে রাজনৈতিক পরাজয়, তেমনি বড় গুরুত্বপূর্ণ পরাজয় একুশে চেতনার। তার গুরুত্বপূর্ণ স্লোগান ‘সর্বস্তরে বাংলা’ অর্থাৎ জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে বাংলা ভাষিক জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশে শুরু থেকেই অধরা রয়ে গেল। উচ্চশিক্ষা, বিজ্ঞান শিক্ষা ও উচ্চ আদালতে ভাষিক মাধ্যম হিসেবে যথারীতি ঔপনিবেশিক রাজভাষা ইংরেজির একাধিপত্যই রাজকীয় মর্যাদায় বহাল রইল।

শুধু তা-ই নয়, স্বাধীন বাংলাদেশে সুবিধাবাদী, সুবিধাভোগী শ্রেণির বিপুল বিকাশের মধ্য দিয়ে বেসরকারি শিক্ষা খাতে ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষাব্যবস্থার বিশাল বিস্ফোরণ—কিন্ডারগার্টেন থেকে স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ব্যাপকতায়। সম্প্রতি সরকারি উদ্যোগে শিক্ষাব্যবস্থায় প্রবর্তিত ‘ইংলিশ ভার্সন’ বাংলাকে ক্রমাগত পেছনে ঠেলে দিচ্ছে। এই হলো একুশের চেতনার পরিণাম।

এ পরাজয় মেনে নেওযা যায় না। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশি সমাজে এটাই বাস্তবতা। বিদেশি রাজভাষা হয়ে উঠেছে জাতীয় ভাষা, জীবিকার ভাষা, অর্থনৈতিক প্রয়োজনের ভাষা—অবশ্য শিক্ষিত নাগরিক সমাজের জন্য। গ্রামের অশিক্ষিত সাধারণ মানুষের জন্য নয়। যত অপ্রিয় হোক এ সত্য আজ মানতে হবে যে এখানে একুশের পরাজয়, তা একুশ নিয়ে আমরা যত গর্ব ও অহংকার প্রকাশ করি না কেন। আরো সত্য যে আমাদের শিক্ষিত সমাজ হয়ে উঠেছে ইংরেজি ভাষাকেন্দ্রিক, গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারভিত্তিক এমন এক নতুন সংস্কৃতিবান জনসংখ্যা, যাদের সঙ্গে একুশের চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মিল নেই। জাতি হিসেবে এখানে পিছুটান। একে বাংলা ভাষাভিত্তিক জাতিরাষ্ট্র বলা চলে না। চলে না ইউরোপীয় জাতিরাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে তুলনায়।

আরো বলা চলে না এ কারণে যে কিছুকাল থেকে এ সমাজে ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে এবং তা বিশেষভাবে শিক্ষিত সমাজের একাংশে এবং ফলগুধারার মতো সংগোপনে সমাজের বড়সড় অংশে। এখানে প্রভাব ফেলেছে ১৯৪০-৪৭ সালের রাজনীতির ধারায় পাকিস্তানের প্রেতচ্ছায়া। আমার বিশ্বাস, কিছুকাল থেকে সন্ত্রাসবাদী ধর্মীয় জঙ্গিবাদের উত্থানের পেছনে এটি অন্যতম প্রধান কারণ, প্রত্যক্ষ কারণ। পরোক্ষ কারণ গণতান্ত্রিক, যুক্তিবাদী, অসাম্প্রদায়িক সুশাসনের অভাব।

বাংলাদেশি সমাজ ও বাংলাদেশ রাষ্ট্র এখন তার রাজনৈতিক আদর্শ নিয়ে গভীর দোটানায় ভুগছে। একদিকে শাসকগোষ্ঠীর শ্রেণিস্বার্থ, অন্যদিকে ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যবাদী চেতনার অন্তর্লীন প্রভাব। একধরনের স্ববিরোধিতাও শাসক শ্রেণিতে বিরাজ করছে। তার প্রমাণ একদিকে ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলাম বিতাড়ন, অন্যদিকে নির্বাচন সামনে রেখে শিক্ষাঙ্গনে হেফাজত তোষণ, তাদের রক্ষণশীল দাবিদাওয়া মেনে পাঠ্য বইয়ে অবাঞ্ছিত পরিবর্তন ঘটানো, যার নেতিবাচক প্রভাব সুদূরপ্রসারী।

আবার একই সঙ্গে কিছুকাল আগে একাত্তরের স্থানীয় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও শাস্তি এবং জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে অভিযান। অভিযানকালীন সংঘাতে তাদের হত্যা। একে স্ববিরোধিতা ছাড়া অন্য কোনো নামে কি অভিহিত করা যায়? এর পেছনে বড় কারণ রাজনৈতিক স্বার্থ, দলীয় স্বার্থ, ব্যক্তিগত স্বার্থ—যা শাসনব্যস্থাকে জনবান্ধব হতে দিচ্ছে না, প্রগতিবাদী ও আধুনিক চেতনার হতে দিচ্ছে না।

বাংলাদেশও তাই জনৈক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী কথিত একদা-পাকিস্তানের মতো ভিন্ন ধারায় ‘অদ্ভুত রাষ্ট্র’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঔপনিবেশিকতার সাংস্কৃতিক প্রভাব তার চরিত্র থেকে মুছে ফেলা যাচ্ছে না। অন্যদিকে দূর হচ্ছে না পাকিস্তানবাদী সাম্প্রদায়িক চেতনা ও ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যবাদী চেতনার প্রভাব। আবার এর রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিভাজিত—বাঙালি ও বাংলাদেশি চেতনার ভিত্তিতে। বিস্ময়ের বিষয় যে শেষোক্ত ধারায় এক শ্রেণির বামপন্থীর সর্বাঙ্গীণ সমর্থন।

এমন এক বিচিত্র রাজনৈতিক-সামাজিক-রাষ্ট্রনৈতিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের প্রধান পরিচয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে বৃহৎ এক মুসলিম রাষ্ট্র। জনসংখ্যার ধর্মীয় পরিচয় বিচারে এটা সত্য হলেও এর রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রনৈতিক আদর্শের চরিত্র বিচারে এমনটি হওয়ার কথা ছিল না। একুশের চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তা বলে না। কিন্তু বাস্তবে তা-ই ঘটে চলেছে। এ সুযোগে জঙ্গিবাদীদের চেষ্টা বাংলাদেশকে শরিয়াভিত্তিক কট্টর ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত করা।

এ অবস্থায় সচেতন জনসমাজ, শিক্ষিত সমাজের অবশ্যকর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে একুশের চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভিত্তিতে একে প্রকৃত গণপ্রজাতন্ত্রী ও প্রগতিবাদী আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্যে সংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়া। এটাই হবে একুশের প্রতি যথাযথ সম্মান জানানো। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের কথা বলছি না, বাম রাজনীতির বর্তমান অবস্থা বিচারে।

লেখক : কবি, গবেষক, ভাষাসংগ্রামী



মন্তব্য